Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : সোমবার, ২৫ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৪ জুলাই, ২০১৬ ২২:১৫
লাইফ স্টোরি
জন্মদিনের সারপ্রাইজনামা
আলিম আল রাজি
জন্মদিনের সারপ্রাইজনামা

নতুন জায়গা, নতুন মানুষ— এসবের ব্যাপারে আমার একটু ভীতি কাজ করে। মেডিকেলের ভাষায় এটা এক ধরনের এনজাইটি ডিসওর্ডার।

উদাহরণ দিলে বিষয়টা একটু পরিষ্কার হবে।

 

আমি আমার জীবনে খুব কম বিয়ের দাওয়াত খেতে গিয়েছি। যতবার গিয়েছি সঙ্গে বন্ধুবান্ধব ছিল। ওদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতাম, আড্ডা দিতাম, সময় কেটে  যেত। আশপাশে অপরিচিত মানুষ পরিবেশ থাকলেও খুব একটা অস্বস্তি হতো না। ভুলটা করে ফেলেছিলাম তিন বছর আগে। একটা বিয়েতে একবার যেতে হলো একা। একদম একা। ইচ্ছা করে গিয়েছি, এমন না।

গিয়েছিলাম এক ছোটভাইয়ের পিড়াপিড়িতে। সে আমাকে বলল সঙ্গে নিয়ে যাবে। নিয়ে গেলও। কিন্তু যেই না বিয়ে বাড়িতে পা রাখলাম সঙ্গে সঙ্গে ছোট ভাইটি উধাও। আমি পড়লাম মহাবিপদে। কাউকে চিনি না, জানি না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম চারদিকে। আমার ধীরে ধীরে ভয় বাড়তে লাগল। আমার মনে হতে থাকল বিয়েবাড়িতে বউ-জামাইকে বাদ দিয়ে সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে! আমি প্যান্ট ঠিক করলাম, পাঞ্জাবি ঠিক করলাম আর মনে মনে ছোটভাইকে খুঁজতে থাকলাম। কিন্তু পেলাম না। এর মধ্যে ঘটল আরেক ঘটনা। এক মেয়ে এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করে ফেলল, ভাইয়া কেমন আছেন? আমার পৃথিবী থমকে গেল। আমি মেয়েদের সঙ্গে কথাটথা এমনিতেই কম বলি। এই ভরা মজলিসে এখন এই মেয়েকে কী বলব। ফেকাসে মুখ করে জবাব দিলাম, ভালো আছি। আমার ফেকাসে হাসি দেখেই কিনা কে জানে মেয়ে দ্রুত চলে গেল।

 

খেতে বসার পর ঘটা আরেক বিপত্তি। আমি কিছুই সামলাতে পারলাম না। এক প্লেটে অনেক রোস্ট ছিল। আমি রোস্টে হাত দিতে গেলাম, সঙ্গে সঙ্গে পাশের ভদ্রলোক বললেন, ‘এইটা তো আমার রোস্ট!’

আমি কথা বাড়ালাম না। মনে মনে ভাবলাম, আমার রোস্ট গেল কই?

 

তার কিছুক্ষণ পর দইয়ের কাপে হাত দিলাম। পাশের ভদ্রলোক বললেন, ‘এটা তো আমার দই। ’ আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বললাম, আমার দই তাহলে গেলো কই? কিছুক্ষণ পর খাসির বাটি থেকে এক টুকরো আলু নিতে  গেলাম। এবার পাশের ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ‘এক্সকিউজ মি, আমার ছেলে আলু খেতে পছন্দ করে। এই আলুটা ওকে দিয়ে দিন। ’ আমি দিয়ে দিলাম। আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘এক কাজ করুন, আপনি বরং আমার ছেলের প্লেট থেকে রোস্টটা নিয়ে নিন। ’ আমি ছেলের দিকে তাকালাম। দেখলাম রোস্টের অর্ধেক ছেলের মুখে বাকি অর্ধেক ছেলের হাতে। ছেলের বাপ, রোস্টের অর্ধেকে টান দিয়ে বাকি অর্ধেক বের করে নিয়ে এলেন। নিয়ে আমার প্লেটে তুলে দিয়ে বললেন, নেন খান। আমি রোস্টের দিকে তাকিয়ে ‘থ্যাংক ইউ’ বলে উঠে গেলাম।

 

এরপর থেকে আমি একা একা কোনো বিয়ে-টিয়ে  খেতে যাই না। বিয়ের কথা শুনলেই ভয় পাই। ঠিক একই কারণে আমি জন্মদিনের অনুষ্ঠানও এড়িয়ে চলি। অন্যের জন্মদিনে যাই না। নিজের জন্মদিনে কেউ কিছু করছে এটা ভাবলেও আমার জ্বর চলে আসে। আসলে জন্মদিন ব্যাপারটাই আমার কাছে ভয়ঙ্কর। একজন  কেক কাটাকাটি করছে তার চারপাশে সবাই মিলে হাততালি দিচ্ছে, গান গাচ্ছে— বিষয়টা অদ্ভুত।

আমার জন্মদিন কেউ কখনো পালন করেনি।

কিন্তু বিপদ হলো, আমার প্রেম হয়ে যাওয়ার পরে।

নতুন প্রেম। প্রেম হওয়ার পর প্রথম জন্মদিন। প্রেমিকার উৎসাহের সীমা নেই। সে আমার সঙ্গে কী করবে, সারাদিন কই কই ঘুরবে ইত্যাদি মিলিয়ে লম্বা একটা রুটিন বানিয়ে ফেলল।

 

প্রতিদিন রাতে সে এই রুটিন পাঠ করে শোনায় আর আমি মনে মনে ভয়ে কাঁপি। আমি তাকে আমতা আমতা করে আমার জন্মদিন ভীতির কথা জানালাম। সে খুব একটা পাত্তা দিল না। তার একটাই শর্ত। জন্মদিনের সন্ধ্যায় তার সঙ্গে দেখা করতে হবে। নতুন প্রেম... খুব একটা না করা গেল না। শুধু মিনমিন করে বলার চেষ্টা করলাম, দেখ, বেশি কিছু করতে যেও না। সে আমাকে ধমক মেরে থামিয়ে দিল।

 

এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। জন্মদিনের সন্ধ্যা। আমি  প্রেমিকার বলে দেওয়া রেস্টুরেন্টে গেলাম। মনে মনে প্রস্তুতি নিলাম। সে নিশ্চয় কেক-টেক কাটবে। হালকা গান টান গাইবে। আমি দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে চলে আসব।

 

আমি রেস্টুরেন্টে বসে ঘামতে থাকলাম। সন্ধ্যা সাতটা বাজল। প্রেমিকা প্রবেশ করল। সুন্দর পরিপাটি সাজগোজ। হাতে ফুল নেই। কেক নেই। আমি হাঁফ  ছেড়ে বাঁচলাম। আবেগে আমার চোখে পানি চলে

এলো। এত ভালো প্রেমিকাও হয়!

 

আধ ঘণ্টা ভালো মতো কাটল।

 

হঠাৎ করে কী জানি হলো আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। আমি টের পেলাম কিছু একটা হচ্ছে। আমি ঠাওর করলাম, রেস্টুরেন্টে একসঙ্গে অনেক মেয়ে প্রবেশ করল। তারা চিৎকার করে আমাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাল। একটু বড় বড় করে বুঝতে পারলাম এরা আমার প্রেমিকার বান্ধবী। আমার বান্ধবীও তাদের সঙ্গে যোগ দিল। গান গেয়ে জন্মদিনের উইশ করতে লাগল।

 

তারপর ঘটল আরেক ঘটনা। রেস্টুরেন্টের স্পিকারে হঠাৎ করে গান বাজতে শুরু করল— আজ জন্মদিন  তোমার। কিছুক্ষণ পর আমার সামনে একটা  কেক আর মোমবাতি চলে এলো। আমাকে বাধ্য করা হলো মোমবাতি জ্বালাতে। আমি মোমবাতি জ্বালালাম। সারাজীবন দেখলাম মোমবাতি থেকে আলো বের হয়। এই প্রথম দেখলাম মোম থেকে চিড়চিড় করে কী কী জানি বের হচ্ছে। বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেক দফা হাততালি হয়ে গেল। রেস্টুরেন্টের কোনায় চলছিল একটা বিয়ের অনুষ্ঠান। ওখান থেকেও কিছু লোকজন চলে এলো আমাকে উইশ করতে। তারা এলো, আমার সঙ্গে কোলাকুলিও করল! আমি সবার সামনে ফেকাসে মুখে কেক কাটলাম। এভাবে কাটলো আধ ঘণ্টা! সবাই চলে যাওয়ার পর প্রেমিকা জিজ্ঞাসা করল, বাবু, কেমন লাগল সারপ্রাইজ?

 

এরপর থেকে আমি জন্মদিনে মোবাইল বন্ধ করে ঘুমিয়ে থাকতে ভালোবাসি।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow