Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : সোমবার, ২৫ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৪ জুলাই, ২০১৬ ২২:১৬
লো প্রেসার!
ঘটনা সিক্সটি নাইন
কাসাফাদ্দৌজা নোমান
লো প্রেসার!

নিপুণ জানালো তার শরীরে নাকি ইউনিক ব্যথা। জিজ্ঞেস করলাম, ইউনিক ব্যথা ব্যাপারটা কী?

: যে ব্যথা এর আগে হয় নাই।

ঘাড় ব্যাথা, শরীর হালকা লাগে, মাঝে মাঝে বমি পায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিপুণের অসুখের সংখ্যাও বেড়ে গেল। ভয়ে রাতের খাবার খেলো না। সকাল হলো কিন্তু শরীর সুস্থ হলো না। দুপুরের পর বললাম, চলো তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।

: না ভাই পকেটে টাকা নেই।

: আরে টাকা নেই এইটা তো ব্যাপার না। আমার কাছে আছে।

: ভাই বুকে আসেন। আপনি আমার ভাই।

এলাকার ফার্মেসিতে পুরো ঘটনা খুলে বলার পর তিনি ঝটপট  প্রেসার মেপে জানালেন, প্রেসার লো। ভরপেট খাওয়া দাওয়া করলে ঠিক হয়ে যাবে। দোকানদারের কথা শুনেই নিপুণের  চোখ চকচক করে উঠলো— ‘কী খেতে হবে?’

: এই ধরেন দুধ, ডিম, গরুর মাংস, কোল্ড ড্রিংকস এই জাতীয় খাবার।

উত্তর শুনে দোকানীকে বুকে টেনে রীতিমতো জড়িয়ে ধরলো সে। বলল, ‘আপনার মতো এমন নীতিবান আর অভিজ্ঞ ডাক্তার আমি আগে দেখি নাই। থ্যাংক ইউ ডক্টর। ’

তার এই আনন্দ দেখে আমার মুখ শুকিয়ে গেল। চিকিৎসা খরচ দিতে রাজি হয়েছি। তাই বলে এখন এইসব? নিপুণ হেসে বললো, ভাই দেখেছেন তো ডাক্তার কী বলেছে? চলেন বিরিয়ানী খাই। বিরিয়ানী আপনাদের জন্য হয়তো মজাদার খাবার কিন্তু আমার জন্য তো ঔষুধ।

: বিরিয়ানীর বিল আমি দিতে পারবো না।

: কিন্তু ভাই আপনি তো বলেছেন ঔষুধসহ আমার চিকিৎসার যাবতীয় খরচ আপনি দিবেন। বুঝতেছেন না ক্যান বিরিয়ানী  তো ঔষুধ। কাচ্চির ফাঁকে ছোট ছোট মাংস আর বড় বড় আলুগুলাতো তো মেডিসিন।

বিরিয়ানী খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। নিপুণের তৃতীয় প্লেট শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ মনে পড়েছে এমন ভাব নিয়ে নিপুণ বললো, ‘ভাই, ডাক্তার তো গরুর মাংসের কথা বলছিলো। মামা একটা গরু ভুনা দিয়েন। ’

: ভাই, বোরহানী খাবেন না?

: না।

: থাক খাইয়েন না। আপনি তো আর অসুস্থ না। মামা আরেকটা বোরহানী দাও। বোরহানী হইলো ধরেন সিরাপ। এই মামা দই আছে নাকি?

দই চলে এলো। এক চামচ খেয়েই নিপুণ জিভে টোকা মারে, ভাই, মিস করলেন।

কথা বাড়ালাম না। যত কথা বাড়াচ্ছি তত বিল বাড়ছে। একসময় সে আমার প্রতি তীব্র দয়ালু হয়ে খাওয়ার টেবিল  থেকে উঠলো। বিল দেওয়ার সময় দাবি জানিয়েছে যাতে বাসায় খাওয়ার জন্য দুই প্যাকেট বিরিয়ানি পার্সেল নিই।

এবার সে দাবি জানিয়েছে পান খাবে। বিরিয়ানির পর একটা পান না হলে নাকি বিরিয়ানি আর পান্তাভাত খাওয়ার মধ্যে পার্থক্য নেই।

আমরা দু’জন হাঁটছি। ইতিমধ্যে পকেট থেকে ৮০০ টাকা  বেরিয়ে গেছে। এমন সময় নিপুণ বলল, ভাই শিট! আমি তো ভুলেই গেছিলাম।

: কী?

: না ভাই, আমাকে দিয়ে আসলে হবে না। আমার বাবাও এমন ছিলেন। ঔষুধ খেতে ভুলে যেতেন। আমিও হয়েছি বাবার মতো। এই যে দেখেন ডাক্তার কিন্তু দুধ খাইতে বলছিলেন। ওই যে চলেন সামনের দোকানে চকলেট দুধ পাওয়া যায়।

: দুধে চকলেট দেয় নাকি চকলেটে দুধ দেয়?

: কোনোটাই না। যে গরু দুধ দিবে তারে চকলেট খাওয়ায়!

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে প্রার্থনা করছি সামনে যাতে আর খাবারের  দোকান না থাকে। থাকলে আমি শেষ। কিন্তু কপালের ফের। এই সন্ধ্যাবেলা দোকানে সকালের বাসি শিঙ্গারা সাজিয়ে রেখেছে। নিপুণ বললো, ভাই, বাসি শিঙ্গারা খাইছেন?

: না।

: জীবনে খাইছেন কী? খাইয়া দেখেন। ওকে মামা, আমাকে পাঁচটা শিঙ্গারা দিয়েন। সঙ্গে পেয়াজ দিয়েন কিন্তু!

গুগল ম্যাপ বের করে দেখলাম এইখান থেকে বাসা পর্যন্ত যেতে আরও মিনিট সাতেক লাগবে। হিসাব মতো পথে আরও চারটা খাবার দোকান। রাস্তা পার হলে অবশ্য সব লোহা লক্কড়ের ব্যবসা। অতএব একবার রাস্তা পার করাতে পারলে আরও হাজারখানেক টাকা সঞ্চয় করতে পারবো। নিপুণকে প্রস্তাব দিলাম, নিপুণ, চলো রাস্তা পার হয়ে ওইপাশ দিয়ে হাঁটি। এদিকটা খুব চিপা।

: ক্যান ভাই চিপাই তো ভালো। বড় রাস্তা দেখলে মনে হয় ঢাকা শহর ইউরোপ দখল কইরা নিছে।

: ওইদিকে মানুষও কম হাঁটে। আরামসে হাঁটা যাবে।

: এই যে ভাই আপনি এত অসমাজিক কেনো? মানুষ দেখবেন, মানুষের সঙ্গে মিশবেন। আসলে ভাই, এই ফেসবুক আপনাদের সব ধ্বংস করে দিছে।

অগত্যা আগের পথেই হাঁটছি। দূর থেকে আমি দেখতে পেলাম একটা ঝালমুড়িওয়ালা। যাক এইবার মাত্র দশ টাকা খরচ করলেই হবে। কিন্তু নিপুণ আমার সমস্ত চিন্তাকে মিথ্যা বানিয়ে বিশ টাকার ঝালমুড়ি নিলো এবং আরও বিশ টাকার নিলো পার্সেল, বাসায় খাবে বলে।

সামনে একটা গ্রিল চিকেনের দোকান রয়েছে। আমি যদি পারতাম এই দোকানটাকে অদৃশ্য করে ফেলতাম। নিপুণ ধীরে ধীরে হেঁটে সেই দোকানের সামনে দাঁড়লো, ভাই, খাসি খাইছি, গরুও খাইছি, এখন মুরগিটা শুধু বাকি।

: ক্যান মহিষও তো বাকি? দুম্বা, উট...

হোটেলের ভিতরে ঢুকে একটা গ্রিল চিকেন অর্ডার দিয়ে দিলাম। সঙ্গে দুইটা পরোটা, কোক আর দই। নিপুণ ঢেঁকুর তুলে খাওয়া শেষ করে বললো, ভাই আরেকটা গ্রিল চিকেন নিই বাসায় খাওয়ার জন্য?

কথা বাড়ালাম না। বাসায় প্রায় ঢুকেই যাবো এমন সময় নিপুণ বললো, ভাই চলেন তো ফার্মেসিতে যাই। দেখি প্রেসার মেপে কী অবস্থা, যদি লো হয়?

নিপুণের প্রশ্ন শুনে খেয়াল করলাম আমার শরীরেই কেমন জানি ইউনিক ব্যথা অনুভব হচ্ছে। মনে হয় লো প্রেসার!

এই পাতার আরো খবর
up-arrow