Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৯ অক্টোবর, ২০১৬ ২১:৪৩
জ্যাম আমাদের ছাড়ে না
‘আগে ময়লার পোঁটলা জানালা দিয়া রাস্তায় ফালাইতাম। এখন জামের কারণে বাসার নিচের রাস্তায় সারাদিনই রিকশা-গাড়ি আটকায়া থাকে। তাই ময়লার পোঁটলা ফালাইতে পারি না। কী আর করা, নাইমা ডাস্টবিনে ফালায়া আসতে অয়।
ইকবাল খন্দকার
জ্যাম আমাদের ছাড়ে না
কার্টুন : কাওছার মাহমুদ আইডিয়া ও ডায়ালগ : তানভীর আহমেদ

আমার এক বড় ভাই চাকরির সুবাদে প্রতিদিন মিরপুর থেকে মতিঝিল যান। এক দিন তিনি বললেন, যতদিন চাকরি আছে, করব।

তারপর নির্বাচনে দাঁড়ানোর ইচ্ছা আছে। আমি বললাম, হঠাৎ এই সদিচ্ছা! মনে চাপার কারণ কী? বড় ভাই বললেন, যে যেটার যোগ্য, তার তো সেটাই করা উচিত। আমি বললাম, তা ঠিক আছে। কিন্তু আপনি যে নির্বাচনে দাঁড়ানোর যোগ্য, এই নিশ্চয়তা কারও কাছ থেকে পেলেন? বড় ভাই বললেন, নিশ্চয়তা কারও কাছ থেকে পেতে হয় নারে পাগলা। নিজের নিশ্চয়তা নিজের কাছেই। আমি এই যে প্রতিদিন মিরপুর থেকে মতিঝিল যাই, আবার ফিরে আসি, তাতেই আমি নির্বাচনের যোগ্য হয়ে উঠেছি। চাকরির বয়স আরও পনের বছরের মতো আছে। এই পনের বছর যাতায়াত করলে পুরোপুরি যোগ্য হয়ে উঠব। আমি অবাক হয়ে বললাম, যাতায়াত করার সঙ্গে যোগ্য হয়ে ওঠার সম্পর্ক কী? বড় ভাই বললেন, সম্পর্ক আছেরে পাগলা, সম্পর্ক আছে। প্রতিদিন বাসে চড়ে যাই আর প্রতিদিনই পঞ্চাশ পঞ্চাশ কমপক্ষে একশ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়। আগামী পনের বছর যদি এটা চলে, তাহলে ঢাকা শহরের কোনো মানুষ আমার অপরিচিত থাকবে না। সবাই পরিচিত হয়ে যাবে। আমি বললাম, বাসে উঠলেই অন্য যাত্রীদের সঙ্গে পরিচয় বা ঘনিষ্ঠতা হয়ে যায়, এটা মানতে পারলাম না। বড় ভাই বললেন, এই ঘনিষ্ঠতার পেছনে মূল অবদান যার, তার নাম জ্যাম। জ্যামের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের ভিতর বসে থাকলে অন্য যাত্রীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি না হয়ে উপায় আছে? আমি তো মনে করি, এই ঘনিষ্ঠতার সুবাদে বিয়ে শাদির সম্পর্ক পর্যন্ত করা যায়। আমার এক ছোটভাই বলল, ভাই, যানজট কমানোর জন্য ঢাকায় অসংখ্য ফ্লাইওভার বানানো হলো। কিন্তু যানজট তো কমল না। তাহলে লাভটা হলো কী? তার প্রশ্নের উত্তরে আমার কিছু বলতে হলো না। পাশ থেকে আরেক ভদ্রলোক বলে দিলেন, ফ্লাইওভার তৈরি করার কারণে যানজট না কমলেও বিরাট লাভ হয়েছে। এখন সবসময়ই বৃষ্টির আমেজ পাওয়া যায়। আমি বললাম, কী রকম? ভদ্রলোক বললেন— ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে রিকশায় যখন যাবেন, তখন দেখবেন উপর থেকে পানি ‘চুইয়া’ ‘চুইয়া’ পড়ে। আমি শতভাগ শিওর, দুই-চারটা ফোঁটা গায়ে পড়লে আপনি বৃষ্টির আমেজ পাবেনই। না পেলে আমাকে ফোন দিয়েন।

আমার এক বন্ধু বলল, আজকাল আমি আর একা রিকশায় উঠি না। অনেক জায়গায় দেখিস একজন যাত্রী তোলার পর রিকশাওয়ালারা আরেকজন যাত্রী খোঁজে। মানে শেয়ারে যাওয়া আরকি। আমি বললাম, তুই একটা ধনী মানুষ। তুই রিকশায় শেয়ারে যাস? কেন, একটা রিকশায় একা যাওয়ার মতো ভাড়া কি তোর কাছে নেই? বন্ধু বলল, দোস্তরে, এটা ভাড়া থাকা না থাকার বিষয় না। এটা আমার থাকা না থাকার বিষয়।

অর্থাৎ আমি রিকশায় থাকব কী থাকব না, সেই বিষয়। আমি বললাম, তোর কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছি না। বন্ধু বলল, শোন তাহলে। আজকাল রিকশায় উঠলেই জ্যামে আটকা পড়তে হয়। জ্যামে আটকা পড়ে থাকতে থাকতে এখন আমার একটা বদঅভ্যাস হয়ে গেছে। আমি ঘুমিয়ে পড়ি। যতক্ষণ জ্যাম, ততক্ষণ ঘুম। কিন্তু রিকশায় বসে ঘুমালে যেহেতু একদিকে হেলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে, তাই আমি চাই আমার পাশে আরেকজন যাত্রী থাকুক।

যাতে আমাকে একদিকে হেলে পড়ে যেতে দেখলেই খপাৎ করে ধরে ফেলতে পারে। আমার পাশের বাসার এক বুয়ার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। কথায় কথায় সে বলল, ‘জাম’ এতো বাইড়া গেছে, কী আর কমু। শুধু জাম বাইড়া যাওয়ার কারণে আমার কাজকর্মের খুব সমস্যা হইতাছে।

আমি বললাম, জ্যাম তো বাড়তেই পারে। কিন্তু এই জ্যামের কারণে তোমার কাজকর্মের সমস্যা হবে কেন? বুয়া বলল, আগে ময়লার পোঁটলা জানালা দিয়া রাস্তায় ফালায়া দিতাম। এখন জ্যামের কারণে বাসার নিচের রাস্তায় সারাদিনই রিকশা-গাড়ি এইগুলা আটকায়া থাকে। ময়লার পোঁটলা তো আর গাড়ি ঘোড়ার উপরে ফালান যায় না। কী আর করা, নাইমা গিয়া ডাস্টবিনে ফালায়া আসতে অয়। কী ঝামেলা কন দেহি!

এই পাতার আরো খবর
up-arrow