Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ, ২০১৭

প্রকাশ : সোমবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ২১:৪৯
চাল নিয়ে চালবাজি
এই চালের কারণে যদি একটা মধুর সম্প্রীতি তৈরি হয়, সেটা ভালো না? এ জমানায় সম্প্রীতি জিনিসটা কত প্রয়োজনীয়, জানো!
ইকবাল খন্দকার
চাল নিয়ে চালবাজি
কার্টুন : কাওছার মাহমুদ আইডিয়া ও ডায়ালগ : তানভীর আহমেদ

গরিব মানুষ সস্তায় চাল কিনে খেতে পারবে— এই উদ্দেশ্যে মূলত কম দামে চাল বিক্রির প্রক্রিয়াটা চালু করা হয়। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত যা শোনা যাচ্ছে, তাতে আমরা হতাশ হচ্ছি। তবে আমার এক প্রতিবেশীকে বেশ খুশি দেখা গেল। জিজ্ঞেস করলাম, যে খবর সবাইকে মর্মাহত করছে, সেই একই খবর আপনাকে আনন্দিত করছে, ব্যাপার কী? ভদ্রলোক বললেন, গরিবের চাল ধনীরা নিয়ে নিচ্ছে, এই তো খবর? আমি বললাম, যেখানে গরিবদের চাল পাওয়ার কথা, সেখানে ধনীরা পাচ্ছে, এটা কী মর্মাহত হওয়ার মতো ব্যাপার না? এটাকে কী কোনোভাবে আনন্দের খবরের ক্যাটাগরিতে ফেলা যায়? ভদ্রলোক বললেন, অবশ্যই ফেলা যায়। চাইলেই ফেলা যায়। ধনীরা পেট ভরে ভাত খেতে পারে না, কারণ তাদের প্রায় সবারই ডায়াবেটিস। এখন যেহেতু তারা গরিবদের চালও কিনে নিয়ে যাচ্ছে, তার মানে তারা এখন পেট ভরে ভাত খেতে পারছে। এতে কী বোঝা যাচ্ছে? বোঝা যাচ্ছে দেশে ডায়াবেটিসের প্রকোপ কমেছে। এটা কী আনন্দের খবর নয়? এই আনন্দে তো আমি আমার বউকে ইতিমধ্যে বলে ফেলেছি যাতে আজ ভাতের পাতিলে অর্ধেক ডিব্বা চাল বেশি দেয়। পেট ভরে একটু ভাত খাই, কী বলেন? আমি তার অর্থহীন প্যাচাল শুনে সময় নষ্ট না করে নিজের কাজে চলে গেলাম। কিন্তু ওখানে গিয়েও চালের আলোচনা থেকে রেহাই পেলাম না। আমার পাড়ার এক ছোটভাই তার এক বন্ধুর সঙ্গে চাল নিয়ে আলোচনা করছিল। সে বলছিল, যে চালগুলো বিক্রি করা হচ্ছে, সেগুলো তুলনামূলকভাবে নিম্নমানের। মোটা চাল, পাথরও নাকি পাওয়া যায়! ধনীরা এই চাল কিনে বাড়িতে নেবে, খাবে, এটা কিন্তু অবিশ্বাস্য ব্যাপার। তার বন্ধু বলল, অবিশ্বাস্য ব্যাপার বলে কিছু নেই। বাঙালি মাগনা পেলে আলকাতরাও খায়। আর কম দামে পেলে মোটা চাল বাড়িতে আনতে সমস্যা কী? খেতে না পারুক, অন্য কাজে লাগাবে। ছোট ভাই বলল, তা পারবে। বাজারে বিক্রি করে দিলেই হবে। বন্ধু বলল, আরে না, বিক্রি করে দেওয়া ছাড়াও অন্য কাজ আছে। চালে যদি পাথর পাওয়া যায়, তাহলে সেই পাথর দিয়ে ছাদ ঢালাই করে ফেলল, সমস্যা কী? আমার এক বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল অনেক বড়লোকের মতো তিনিও নাকি সস্তায় চাল কিনেছেন। তাকে আমরা ধরলাম, ভাই, কথা কি সত্য? বড়ভাই বললেন, ধরে নে সত্য। আমি বললাম, কেন এই অপকর্মটা করতে গেলেন? বড়ভাই বললেন, তোরা কি চাস না একটা বহুল প্রচলিত স্লোগানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করি? আমরা অবাক হয়ে বললাম, স্লোগানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন! কোন স্লোগান বলেন তো? বড় ভাই বললেন, ওই যে মাছে ভাতে বাঙালি! আসলে আমার বাসায় সবাই পোলাও-কোর্মা বার্গার ইত্যাদি খায় তো। ভাবলাম বেশি বেশি করে চাল নিয়ে গেলে যদি ভাত খাওয়ার রেওয়াজটা চালু থাকে। আমি বললাম, ভাত খাওয়ার রেওয়াজ চালু রাখার জন্য, মাছে ভাতে বাঙালি স্লোগানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য আপনি বাজার থেকে চাল কিনে নিলেই পারেন। গরিবের চাল কেন নিতে হবে? বড়ভাই বললেন, বাজার থেকে বেশি দামে চাল কেনার চেয়ে দুটো বার্গার কিনে নেওয়া অনেক ভালো। সস দিয়ে বার্গার খাওয়ার কিন্তু মজাই আলাদা।

এখন যার কথা বলব, আমার এলাকার মানুষ তাকে পাতিনেতা হিসেবে চেনে। তাকে বললাম, চাল নিয়ে এই যে অনিয়ম হচ্ছে, এই অনিয়ম বন্ধ করার কি কোনো উপায় নেই? তিনি বললেন, মনে কর উপায় আছে। কিন্তু কেন বন্ধ করতে যাব। এই চালের কারণে যদি একটা মধুর সম্প্রীতি তৈরি হয়, সেটা ভালো না? এ জমানায় সম্প্রীতি জিনিসটা কত প্রয়োজনীয়, জানো! আমি বললাম, জিনিসটা যদি একটু বুঝিয়ে বলতেন ভালো হতো। তিনি বললেন, এত বোঝাতে পারব না। আমার পাড়ার কিছু লোক আমাকে পছন্দ করত না। আমার যে প্রতিদ্বন্দ্বী, তার সঙ্গে মিটিং-মিছিলে যেত। ওই লোকগুলোকে ডেকে ১০ কেজি করে চাল দিয়ে দিলাম। ওরা এখন আমার দলে চলে এসেছে। চালের কারণে এই যে সম্প্রীতিটা তৈরি হলো, তোমার কিন্তু উচিত এটাকে সাধুবাদ দেওয়া। আমি বললাম—‘সাধু’ না দিয়ে যদি শুধু ‘বাদ’ দিই?

এই পাতার আরো খবর
up-arrow