Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ১০ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ৯ জুন, ২০১৬ ২৩:৪২
ঈস্টার দ্বীপের আয়নার রকমসকম
মূল : জুলিও কোর্তাজার রূপান্তর : বজলুল করিম বাহার
ঈস্টার দ্বীপের আয়নার রকমসকম

আয়না ছাড়া আমাদের বিশেষ করে মেয়েদের গার্হস্থ্য জীবন একদণ্ড চলে বলে মনে হয় না। আয়নায় প্রিয় মুখ দেখে পুলকিত হওয়ার সুখই আলাদা। কাচের পেছনে পারদ আর লাল রঙের প্রলেপ দিয়ে আয়না তৈরির প্রক্রিয়া অনেকেই দেখেছে নিকটের কাচঘরের দোকানটিতে।

যে আয়নায় প্রতিবিম্ব যত সুন্দর ও স্পষ্ট দেখা যায়, তার কদর ততো বেশি। বহু আগে বেলজিয়াম কাচের আয়নার কদর ছিল বেশি।

কিন্তু ঈস্টার দ্বীপের আয়নার ভাবসাবই আলাদা। অচেনা এ আয়নার ব্যাপার-স্যাপার শুনলে তখন একে মনে হবে জাদুই-শীশ। বাপজন্মে এ ধরনের আয়নার কথা কেউ কি কখনো শুনেছে? না দেখেছে? এ আয়নার পুবদিকে বসিয়ে দেখলে একরকম প্রতিচ্ছবি দেখায়। আবার পশ্চিম দিকে বসালে যে প্রতিচ্ছায়া ফুটিয়ে তোলে, সেই অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড কীর্তি দেখে বারবার চোখ ঘষতে হয়। একি স্বপ্ন না সত্যি!

ঈস্টার দ্বীপে, আয়নাটা, ধরো তুমি পশ্চিম দিকে কোথাও বসিয়েছো দেখবে বলে। ওমা, সে ছুটছে পেছন পানে। কোন সেই অতীতকালের সব দৃশ্য ফুটে উঠছে তার স্বচ্ছ কোলে। যদি এবার আয়নাটা পশ্চিম দিকের দেয়ালে সেট করো। সে তখন ছুটবে সামনের দিকে। অতীত থেকে বর্তমান, বর্তমান থেকে ভবিষ্যৎ, কোথায় গিয়ে সে দৃশ্য থামবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে হয়তো বা বের করা যাবে যে, কোন অবস্থানে ওটি ঠিক সময় ধরে চলবে। সে জায়গাটিতে যে ওটি মাথা ঠিক রেখে কাজ করবে। তারই বা নিশ্চয়তা কি? যেহেতু এসব আয়নার গঠন কাঠামো ও উপাদানের উপর নির্ভর করে এর প্রতিফলনের রীতি। হয়তো তাই বা কোন অজানা কারণে এরা চলে নিজের ইচ্ছেমাফিক। সাড়া দেয় নিজের মর্জিমাফিক।

এদের এই বিচিত্র রীতির পাল্লায় পড়ে বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ সলোমন লেমসের কী যে লেজে গোবরে অবস্থা হয়েছিল না? সলোমন একদা গুগেনহাইম ফাউন্ডেশনের ফেলোশিপ নিয়ে গবেষণার কাজ করতে গিয়ে ঈস্টার দ্বীপে পড়েছিলেন ওই আয়নার কবলে। সকালে কফি খেয়ে, তিনি দাড়ি কামানোর জন্যে মুখে সাবান ঘষে যেই আয়নার দিকে তাকিয়েছেন— অমনি দেখেন যে বহুকাল আগে টাইফয়েড রোগে তার মৃত্যু হয়েছে। সেই নিয়ে চলছে আহাজারি আর শোকের মাতম। ঘটনাটি ঘটে দ্বীপটির পুবধারে। এর ঠিক পরেই তিনি তার পকেট আয়নাটি ভুলে দ্বীপের পশ্চিম ধারে হারিয়ে ফেলেন। আয়নাটা শক্ত পাথরের চাঁইয়ের উপরই পড়ে গিয়েছিল। আয়নাটা খুঁজে পেয়ে ওতে চোখ রেখেই দেখেন সব আজগুবি কাণ্ডকারখানা। বালক বয়সে সলোমন হাফপ্যান্ট পরে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে স্কুলের পথে পা বাড়াচ্ছিলেন।

এরপর দেখা গেল আর অতীতের দৃশ্য। সলোমন ন্যাংটো হয়ে বসে আছেন গোছলখানার বাথটাবে। আর তার বাবা-মা তাকে সাবান মাখিয়ে গোসল করিয়ে দিচ্ছেন। বালক সলোমন আহলাদে বাথটাবে ছোটাছুটি করছেন, বসে পা নাচাচ্ছেন, পানি ছিটিয়ে একাকার করে তুলছেন। তার আধো আধো বুলিতে কী সব ডা-ডা-ডা, ফা...ফা... অস্পষ্ট সুর শোনা যাচ্ছে।

আর ঠিক তখনই ক্র্যাঙ্কে ল্যাঙ্কেন নামক স্থানে, এক গরুমোষের গোয়ালে কাজ করছিলেন তার আদরের ফুফু আম্মা রেমোদিতি। এসব দেখে তার হোৎকা দেহ আনন্দ আর স্ফুর্তির বাৎসল্য শিহরণে। ফুলে ফুলে উঠছে আর নীরব হাসিতে ভরে উঠছে প্রকাণ্ড মুখখানা। তো ঈস্টার দ্বীপের আয়নার কথা তো শুনলেন। এর অবাক করা কাণ্ডকারখানা যদি বলতে শুরু করি। তাহলে আজ আর বাস স্টপেজ থেকে পুবে যাওয়ার বাসটা ধরতে পারবো বলে মনে হয় না?

পাদটীকা : জুলিও কোর্তাজার। আর্জেন্টিনার এই লেখক অসাধারণ সব ছোট গল্পের রচয়িতা। বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে তাকে বোর্হেমের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তার অনেক গল্পেই হ্যালুমিনেশন ও অবসেসনের প্রভাব থাকে। তবে গল্পের কেন্দ্রীয় থিমে সত্তার অনুসন্ধান লক্ষণীয়। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের লুকানো চোরা বাস্তবতার কথা তিনি তুলে আনতে অভ্যস্ত। ফরাসি লিম্বলিজম ও সুররিয়ালিজমের কাছে তিনি যে ঋণী। একথা প্রকারান্তরে স্বীকার করে গেছেন। তার গ্রন্থগুলোর মধ্যে— হাউজ টেকেন ওভার, ব্লো-আপ, সিক্রেট ওয়েপন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।




up-arrow