Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:১১
আধুনিক বাংলা কবিতার রাজপুত্র
বিশ্বজিত সাহা
আধুনিক বাংলা কবিতার রাজপুত্র

কবি শহীদ কাদরী  নিউইয়র্কে আসছেন! তারিখ ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩। সে এক অন্যরকম উত্তেজনা।

কবিতার রাজপুত্র, তিনি দেশত্যাগ করে প্রবাসী  হয়ে গেলেন। শুধু নামই শুনেছি তাঁর। কখনও দেখা হয়নি। আশির দশকের মাঝামাঝি। আমরা যখন বড় হয়ে উঠছি, শুধু শহীদ কাদরীর সাদা-কালো মলাটের দু-একটি বই হয়তো চোখে পড়েছে। ‘উত্তরাধিকার’ কাব্যগ্রন্থটি প্রথম দেখি টিএসসিতে আরেক অকাল প্রয়াত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর হাতে। টিএসসির আড্ডায় উঠে আসতো শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরীর নাম একইসাথে। একটি বই নিয়ে কাড়াকাড়ি। এখনকার মত তখন কবিতার বই ঝকঝকে প্রচ্ছদে প্রকাশিত হয়নি। সেই কবি আসছেন জাতিসংঘের সামনে নির্মিত শহীদ মিনারে শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে এবং উত্তর আমেরিকা বইমেলা উদ্বোধন করতে। অনেকটা স্বপ্নের মতো। সেই স্বপ্ন দেখা শুরু হয়, নিউইয়র্ক বইমেলা শুরুর বছর থেকে। ১৯৯২ সালে নিউইয়র্ক প্রবাসী  লেখক ড. জ্যোতিপ্রকাশ দত্তকে  দিয়ে প্রথম বইমেলা উদ্বোধন করার সিদ্ধান্ত নেয় মুক্তধারা ও বাঙালির চেতনা মঞ্চ। নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত বাংলা সংবাদপত্র ‘প্রবাসী’তে কাজ করার সুবাদে বস্টনের আরেক কবি সাজেদ কামাল, বদিউজ্জামান নাসিম, বামন দাস বসু, ইকবাল হোসেন এবং মঞ্জু বিশ্বাসের সাথেও ১৯৯১ সালে আমেরিকায় আসার পর পরিচিত হবার সুযোগ ঘটে। পরিচয় সূত্রে খুব কম সময়ের মধ্যেই কবি শহীদ কাদরীর সাথে ফোনে কথা বলার সুযোগ হয়। তাঁকে জানাই নিউইয়র্কে বইমেলা শুরু করতে যাচ্ছি আমরা। তিনি ভাবতেই পারেননি আমেরিকায় বাংলা বইমেলা হবে! বললাম এই বইমেলা একজন লেখক উদ্বোধন করবেন। আর তিনি হলেন জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত। খুশি হলেন। বললেন, এবার আসা সম্ভব হবে না।

বইমেলা শুরুর করার কথা নিয়ে যাদের সাথে আলাপ করেছি তারাই অবাক বিস্ময়ে চুপ করে থাকতেন। সান্তনার সুরে বলতেন, ভালো। সে সময় সৃজনশীল বাংলা বই পাওয়া যেতো নিউজার্সি প্রবাসী সুশান্ত মজুমদার নামে পশ্চিমবঙ্গের এক ভদ্রলোকের বাড়িতে। তিনি রবীন্দ্রজয়ন্তী বা বঙ্গ সম্মেলনে মাঝে মাঝে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা বইয়ের পশরা সাজিয়ে বসতেন। তাঁর সাথে বাংলাদেশের ডা. আলমগীর, ডা. ওয়ালেদ চৌধুরীসহ বাংলাদেশের কয়েকজন বাঙালি। যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো বাংলা বইয়ের বিক্রয় কেন্দ্রও গড়ে ওঠেনি। সেই দেশে হবে বাংলা বইমেলা!

এরপর ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের সামনে অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করে একুশের শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো এবং উত্তর আমেরিকা বইমেলার যাত্রা শুরু হলো। মেলা একদিন ব্রুকলিনে। আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন কুইন্সে। প্রথম বইমেলার স্বত:স্ফূর্ততা দেখে আমি আবার কবি শহীদ কাদরীকে ফোন করে জানাই। এরমধ্যে তিনি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় বইমেলার সংবাদ পড়েছেন। আমি ফোন করায় তিনি খুশি হলেন। বললেন পরের বছর তিনি আসবেন। ১৯৯৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মঞ্জু বিশ্বাস (অকাল প্রয়াত) এবং ইকবাল হোসেন তাঁদের গাড়িতে করে নিউইয়র্কে কবি শহীদ কাদরীকে নিয়ে এলেন।   বিকেলে পৌঁছে গেলেন তাঁরা নিউইয়র্কে। সে সময় কবি নির্মলেন্দু গুণও এসেছিলেন আমেরিকা সফরে। রাত ১২-০১ মিনিট জাতিসংঘের সামনে শহীদ মিনারের অনুষ্ঠানে কবি শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণ এবং ড. জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত তিনজনই উপস্থিত হলেন। তিনজনই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হলেন। তিনজনই বক্তব্য রাখলেন। সেটি রেকর্ড করেছিলেন টিভি এশিয়া-র সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার এনায়েত করিম বাবুল ও আলোকচিত্রী ওবায়দুল্লা মামুন। তারপর কবি শহীদ কাদরী  ফিতা কেটে উত্তর আমেরিকা বাংলা বইমেলার দ্বিতীয় বর্ষের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এই অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার মাধ্যমে কবি শহীদ কাদরী তাঁর দীর্ঘ একাকীত্ব জীবন কাটাবার পর গণ মানুষের কাছে এলেন। সেবার তিনি নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে যুক্তরাষ্ট্র সাহিত্য পরিষদের একটি সাহিত্য আসরেও যোগ দেন। কবি ফিরে গেলেন বস্টনে আবার মঞ্জুদির সাথে। পরে কবির সাথে মাঝে মাঝে কথা হতো। পরের বছর থেকেই সাপ্তাহিক প্রবাসী একুশের বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করা শুরু করে। কবি শহীদ কাদরী সম্পূর্ণ নতুন একটি কবিতা পাঠালেন পোস্টে। সে কবিতা পেয়ে আমাদের যে আনন্দ, তা প্রকাশ করার মত নয়।

তারপর এক সময় শহীদ ভাই নীরা ভাবিকে বিয়ে করে স্থায়ীভাবে নিউইয়র্কে বসবাস করা শুরু করেন। তখন থেকে আমি একটি কথা প্রায়ই বলতাম, ‘আমি সেই শহরে বাস করি, যে শহরে কবি শহীদ কাদরী বাস করেন। ’ যে বছর তিনি একুশে পুরস্কার পেলেন তার আগের বছর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী  নিউইয়র্কে এলে তাঁর  বরাবর  একটি খোলা চিঠিতে শহীদ ভাইকে নিয়ে এই কথা লিখলে তাঁর চোখে পড়ে। জানতেন তিনি প্রতিটি বইমেলা শুরু করার সভা আহ্বানের আগে তাঁকে আমি ফোন করবো। মুক্তধারায় আসা নতুন বই, পাক্ষিক দেশ, কালি ও কলম-এর জন্য ছুটে আসতেন ভাবি! কোনো সংখ্যা দেরিতে এলে শহীদ ভাইয়ের মনে কষ্টের সীমা থাকতো না! হঠাৎ করে ফোন করে বলতেন কোন একটি বইয়ের নাম। সেখানে কখনো থাকতো সুধীন্দ্রনাথ, শঙ্খ ঘোষ, অমিয় চক্রবর্তী, সৈয়দ শামসুল হক,  জয় গোস্বামী, মন্দাক্রান্তা ও  শ্রীজাত।  

এ বছর বইমেলায় এসেছিলেন হুইল চেয়ারে করে। শহীদ ভাইকে নিয়ে আসার আগেই কোন্ গেইট দিয়ে তাঁর হুইল চেয়ার আসবে, কোন্ এলিভেটর দিয়ে শহীদ ভাই মিলনায়তনে গিয়ে অনুষ্ঠান করবেন, সব আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। শহীদ ভাই মেলা প্রাঙ্গণে ঢোকার পর সকলের মধ্যমণি হয়ে উঠলেন এক নিমিষে। ঘুরে ঘুরে বইয়ের স্টলগুলো দেখলেন। সেটিই যে শহীদ ভাইয়ের জীবনের শেষ কবিতার অনুষ্ঠান হবে তা আমরা কেউ ভাবিনি! নীরা ভাবি, আপনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞত! আপনি কবিকে তাঁর প্রবাস জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম সময়গুলো অতিবাহিত করার পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছিলেন। কবির শেষ ইচ্ছে মাতৃভূমিতে যাবার। সেটিও আপনি পূরণ করলেন।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow