Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০১
বাঙাল
স্বকৃত নোমান
বাঙাল

মালকোঁচা এমন বেঢপ হতে পারে ক্ষিদর আলীকে যারা দেখেনি তারা আন্দাজ করতে পারবে না। বেঢপ অবশ্য এখন, এই একুশ শতকে, যখন পোশাকের ঢপ মানে কড়া ইস্ত্রির পাজামা-পাঞ্জাবি, প্যান্ট-শার্ট বা ফতুয়া-লুঙ্গি।

বিশ শতকের শেষপাদে, যখন সারা গোলাইডাঙার চাষারা জনে জনে মালকোঁচা মেরে জমিনে হাল দিত, মই দিত, রোয়া লাগাত, ধান কাটত বা মাঠ থেকে গরু-মোষের পাল নিয়ে বাড়ি ফিরত কিংবা রোজ বিকালে গ্রামের মাঠে হাডুডু-ফুটবল খেলত, তখন লুঙ্গি পরার এ ধরনটা আলোচনার কোনো বিষয় হতে পারে, কারও মাথায়ই ছিল না। কেন থাকবে? গোলার ধানবেচা টাকায় কেনা লুঙ্গি কি এত সস্তা? সারা বছরে মাত্র এক জোড়া লুঙ্গি। জমিনের পাঁক-কাদায় তো ছ মাসে নষ্ট করে ফেলা যায় না। ছিঁড়ে গেলে সেলাই করে অথবা গিঁট দিয়ে গোটা বছর কাবার করে দিতে হয়।

গল্পটি সেই সময়ের অর্থাৎ বিশ শতকের শেষপাদের, গোলাইডাঙায় যখন বিদ্যুৎ আসেনি, কালীগঙ্গার ওপর যখন ব্রিজ হয়নি। নদীটার দক্ষিণ পাড়ে দাঁড়িয়ে বিস্তীর্ণ প্রান্তরের দিকে তাকালে দেখা যেত মালকোঁচা মারা অগুনতি কিষান। কখনো হাল দিচ্ছে, কখনো রোয়া লাগাচ্ছে, কখনো বা ধান কাটছে। সে সব কিষানের একজন ক্ষিদর আলী, নামের শুরুর অক্ষরটা লিখতেই যার পাক্কা এক মিনিট লেগে যেত, তবু অক্ষরটা জায়গামতো থাকত না, ঝাঁটার বাড়ি খাওয়া থেঁতলানো তেলাপোকার মতো শুঁড় একদিকে লেজ আরেক দিকে চলে যেত। তখন তার মুখের দিকে তাকালে মনে হতো পৃথিবীতে তার মতো অসহায় মানুষ দ্বিতীয়টি নেই। কখনো মুখটি লজ্জায় এমন রাঙা হয়ে উঠত, প্রায় চল্লিশ বছর বয়সী তাকে মনে হতো সাত বছরের নাদান বালক।

সারা দিন ক্ষেতে-খামারে কাজ করে সন্ধ্যায় যখন হাটে আসত, তখনো শুধু শীতকাল ছাড়া যথারীতি তার মালকোঁচাটা মারা থাকত। হাতে জংধরা তিন ব্যাটারির টর্চ, গায়ে বহু ব্যবহারে মলিন শার্ট এবং গ্রীষ্ম-বর্ষায় বগলের নিচে তালিমারা একটা ছাতা। চা-দোকানে ঢুকে মালকোঁচাটা ছেড়ে কোনার টেবিলটায় পায়ের ওপর পা তুলে বসে এক কাপ চায়ের অর্ডার দিত। এক চুমুক দিয়ে দশ মিনিটের বিরতি। এই ফাঁকে হাটুরেদের হাঁটা, তাদের চোখ-মুখ, কথা বলার ধরন, তর্কাতর্কি, চিত্কার-চেঁচামেচি এবং হাতাহাতি মারামারি দেখত। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে উত্তর দিত সংক্ষেপে, অনুচ্চস্বরে। কাপটা খালি করতে লেগে যেত পাক্কা এক, কখনো কখনো দেড় ঘণ্টা। দোকানের রেডিওতে বিবিসির সংবাদ শেষ হলে কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে আর দেরি করত না, টর্চটা হাতে এবং ছাতাটা বগলে নিয়ে ডানে-বাঁয়ে না তাকিয়ে সোজা বাড়ির পথ ধরত।

দুই ঈদের দিন ছাড়া বছরের অন্যদিন শবেবরাত বা শবেকদরেও না, আশুরায় তো নয়ই, কেউ তাকে কোনোদিন মসজিদে যেতে দেখেনি। রোজার মাসে রোজা রাখত কিনা কে জানে। পাড়াপড়শীদের কেউ তাকে সাহরি খেতে দেখত না। দিনের বেলায় ভাত খেতে বা বিড়ি ফুঁকতেও না।

ধর্মকর্মে উদাসীন হলেও কালীগঙ্গার ওপারে জিন্দাপীর সাদাশাহের মাজারে প্রতি বছর যে ওরস হতো সে না গিয়ে পারত না। ছওয়াবের উদ্দেশ্যে যেত না তবরকের লোভে, বোঝা মুশকিল ছিল। আর যেত সিনেমা দেখতে। বছরে দুইবার দশ মাইল পথ হেঁটে, বাকি পনেরো মাইল বাসে চড়ে জেলাশহরের হলে গিয়ে সিনেমা দেখে আসত। বন্ধুদের কাছে সিনেমা দুটির গল্প করত সারা বছর। নায়ক কিভাবে নায়িকাকে প্রেম নিবেদন করে, কিভাবে গুণ্ডাদের হাত থেকে নায়িকাকে রক্ষা করে, শেষে ভিলেনের কী পরিণতি হয়, এসব। শুনে তাদের ঈর্ষা হতো খুব, একদিন তারাও শহরে গিয়ে সিনেমা দেখার স্বপ্ন দেখত।

আর যেত যাত্রাপালা দেখতে। কোথাও যাত্রাপালার আয়োজন হলে তাকে আর বাড়িতে খুঁজে পাওয়া যেত না। সংসার চুলোয় যাক, যাত্রাপালা সে দেখবেই। আর বাজাত বাঁশি। তা অবশ্য যৌবনে, যখন তার ঘরে বউ আসেনি। কেন কে জানে, বিয়ের পর কেউ কোনো দিন আর তার বাঁশির সুর শুনতে পায়নি। হয়তো বউ তাকে বারণ করেছিল। রাতবিরাতে বাঁশি বাজালে জিন-পরী আসর করে, বারণ করাটাই স্বাভাবিক। কিংবা বউয়ের মনে হয়তো সন্দেহ জেগেছিল, বাঁশির সুর শুনে পাছে কোনো বেহায়া আওরত না আবার স্বামীর প্রেমে মজে যায়!

শুখার মৌসুম ছিল তখন। টানা এক সপ্তাহ ধরে গ্রামে গ্রামে পাবলিসিটি হলো বটতলা বাজারে জিন্দাপীরের মাজারে বিরাট উরস অনুষ্ঠিত হবে। ওয়াজ করতে আসবেন উত্তরবঙ্গের জবরদস্ত এক মাওলানা। বটতলা বাজারের ওই বিশাল বটগাছটি গোলাইডাঙা থেকেও দেখা যায়। গাছটিকেই কেন্দ্র করেই ছোটখাটো মফস্বলী হাট। প্রাচীন গাছ। একশ দেড়শ বছর তো হবেই বয়স। গাছের পুবে বিশাল দিঘিটির যেমন। না, দিঘির বয়স আসলে ঠিক আন্দাজ করা যায় না। কবে কে এই দিঘি খনন করিয়েছিল ইতিহাসের কোথাও লেখাজোখা নেই। ক্ষিদর আলী তো বটেই, তার দাদা, দাদার দাদা এবং দাদার দাদার দাদা এই দিঘিতে সাঁতার কেটেছে, বড়শি দিয়ে বড় বড় রুই-কাতল ধরেছে। তারাও দেখেছে দিঘির পাড়ে অসংখ্য ঝুরি ছড়িয়ে গাছটিকে এভাবে একঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে। ঝরনার মতো স্বচ্ছ ও সুমিষ্ট জলের কারণেই হয়তো বহু বহু এবং বহু বছর আগে সাদাশাহ এ দিঘির পাড়ে বটগাছের নিচে আস্তানা গেড়েছিলেন। গায়ে রং সাদা ছিল বলে, না পানের সঙ্গে সাদাপাতা খেতেন বলে, না সাদা আলখাল্লা পরতেন বলে তার নাম সাদাশাহ, নাকি অন্য কোনো কারণ, এলাকার কেউ কিছু জানত না। জানার চেষ্টাও কোনোদিন করেনি কেউ। লালসালুতে ঢাকা ওই কবরে আদৌ কোনো মানুষকে দাফন করা হয়েছিল ঠিক ঠিক বলা মুশকিল। এমনও হতে পারে, দিঘির দক্ষিণ পাড়ের শ্মশানে মরে পড়ে থাকা সাদা খরগোশ বা বেড়াল বা গরু-ছাগলকে মাটিচাপা দিয়ে কোনো মতলববাজ সাদাশাহের নামে এই মাজারের পত্তন করেছে। কবরে মানুষ থাকুক বা পশু, এলাকাবাসীর বিশ্বাস, ওই বটগাছের নিচে সাদাশাহ নামের এক কামেল পীর শুয়ে থেকে সারা গ্রাম পাহারা দিচ্ছেন। মৃত মানুষ কী করে গ্রাম পাহারা দেয় এ প্রশ্ন করার মতো সাহস কেউ কোনোদিন দেখায়নি।

সাদাশাহের মাজারে উরস প্রতি বছরই হয়। দূরদূরান্ত থেকে লোকজন ওয়াজ শুনতে আসে। গোলাইডাঙা থেকেও যায় অনেকে। যতটা না ওয়াজ শুনতে, তার চেয়ে বেশি উরসকেন্দ্রিক উৎসব দেখতে। চেনা-অচেনা শত শত মানুষের জমায়েত। বিশাল মাঠের একদিকে ওয়াজ-নসিহত জিকির-আজকার, আরেকদিকে এই-সেই খাবারের অস্থায়ী দোকান। কেউ চা খাচ্ছে, কেউ পান চিবুচ্ছে, কেউ বুট-পিয়াজু বা জিলাপি খাচ্ছে, আর কেউ ফুঁকছে বিড়ি। চারদিকে একটা উৎসব উৎসব ভাব।

এবারের উরসের আলাদা মাত্রা উত্তরবঙ্গের ওই মাওলানা। এর আগে এত বড় মাওলানা সাদাশাহের উরসে আসেনি। গোলাইডাঙা থেকে দলে দলে মানুষ যাচ্ছে। বালক নাবালক জওয়ান বুড়ো সবাই। ক্ষিদর আলী না গিয়ে পারে? তা ছাড়া তার বড় বেটা আবদুল কাদের কখনো উরসে যায়নি, এবার তাকে নিয়ে যাওয়ার খুব ইচ্ছা তার। বেলা থাকতে থাকতেই সে কাদেরকে নিয়ে বটতলার উদ্দেশে রওনা হয়ে গেল। এক টানা হাঁটলে পৌনে এক ঘণ্টার পথ। শুখার মৌসুমে নদী প্রায় শুকনোই থাকে, নৌকা পারাপারের ঝামেলা থাকে না। একটা জায়গায় শুধু হাঁটুজল। চটিজোড়া বগলে নিয়ে লুঙ্গিটা গুটিয়ে দুই ঊরুর ফাঁক দিয়ে টেনে পেছনে গুঁজে বেটাকে সে কাঁধে তুলে নিল। নদী পার হয়ে যখন সে বটতলার মুখে পৌঁছল তখন সন্ধ্যা। মাগরিবের নামাজ হয়ে গেছে। মাইকের শব্দে চারদিক মুখর। বড় মাওলানা তখনো স্টেজে উঠেননি, এক মৌলবি ওয়াজ করছেন। কারবালার ময়দানে হজরত আলীর বংশকে কীভাবে নির্বংশ করেছিল ইয়াজিদের সৈন্যরা, সুরে সুরে সেই কাহিনী বয়ান করছেন।

বেটাকে এক টাকার বুট কিনে দিয়ে নিজে এক কাপ চা খেয়ে ওয়াজের মাঠে গিয়ে বসল ক্ষিদর। মাঠজুড়ে খড়ের বিছানা, উপরে শামিয়ানা। তাই ঠাণ্ডার মাত্রা কিছুটা কম। দরগার পেছন থেকে তবরকের মাংসের খিদা চাগিয়ে দেওয়া গন্ধ ভেসে আসছে। ক্ষিদরের কান ওয়াজের দিকে যতটা, তার চেয়ে বেশি হাঁড়ি-পাতিলের টুংটাং শব্দের দিকে। ওয়াজ শেষ হবে সেই রাত ১০টায়। তারপর তবরক। তর সইছে না তার। কাদেরও উসখুস করছে। বারবার মাথা উঁচিয়ে স্টেজের পেছন দিকটা দেখার চেষ্টা করছে। বেটার মুখের দিকে তাকিয়ে উসখুসের কারণটা বুঝতে পারে ক্ষিদর। কতদিন গরুর মাংস খেতে পায়নি ছেলেটা। কোরবানির ঈদে মেম্বারবাড়ি আর সর্দারবাড়ি থেকে এক পোঁটলা করে দুই পোঁটলা বাটারার মাংস পেয়েছিল। তারপর মাংস দূরে থাক, গন্ধও পায়নি। গ্রামে বিয়েশাদি লাগলে বা কেউ মারাটারা গেলে মেজবান-জেয়াফত হয়। কোরবানির ঈদের পর কারও বিয়েও হলো না, কেউ মারাও গেল না।

বড় মাওলানা স্টেজে উঠলেন ঠিক সাড়ে ৭টায়। মাঘের শীত ততক্ষণে আরও জেঁকে বসেছে। মাঠের বাইরে যেদিকে চোখ যায় কুয়াশার দুধেল অন্ধকার। আসমানের চাঁদটা ঢেকে রেখেছে কুয়াশার জাল। স্থাবর-জঙ্গম কাঁপছে শীতে। শ্রোতাদের মনে নরকাগ্নির উত্তাপ। মাওলানা তার সুরেলা ওয়াজে সাত দোজখকে বটতলার মাঠে নামিয়ে এনেছেন। অপার্থিব আগুনের উত্তাপে পার্থিব হিম উধাও। শরিয়ত ছাড়া যে মারেফাতের জগতে যাওয়া যায় না, কোরআন-হাদিসের উক্তি দিয়ে তিনি নাদান শ্রোতাদের বুঝিয়ে দিলেন। শ্রোতারা সুবহানাল্লাহ আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে সারা মাঠ কাঁপিয়ে তুলতে লাগল। অন্যদের দেখাদেখি ক্ষিদরও ধ্বনি না দিয়ে পারল না।

ওয়াজ শুনতে শুনতে ক্ষিদরের চোখ ধরে আসে ঘুমে। মাংসের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে তার ঊরুতে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে কাদের। আচমকা বাপের ধাক্কা খেয়ে বেটা হুড়মুড়িয়ে উঠে বসল। চোখ ডলতে ডলতে মঞ্চের দিকে তাকাল। মাওলানার সব কথা তার বুঝে আসে না। ঘুমিয়ে পড়ার আগে একটা ওয়াজ মোটামুটি বুঝতে পেরেছিল। ওয়াজটা ছিল হাঁটুর ওপর কাপড় তোলা নিয়ে। গলা চড়িয়ে মাওলানা বলেছিলেন, মুসলমানদের আজ মুসলমানিত্ব বলতে কিছু নাই। থাকলে কেউ হাঁটুর ওপর লুঙ্গি পরত? লুঙ্গির কাছা মেরে পরা হারাম। যে ব্যক্তি কাছা মারবে কাল হাশরে তার পা দুটি কামারশালার গরম লোহার মতো হয়ে যাবে। তার চিত্কারে তখন আসমান-জমিন থরথর করে কাঁপবে।

এই ওয়াজ শুনে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল কাদের। তার চোখের সামনে বারবারই তখন বাবার লোমঅলা দুই ঊরু এবং মালকোঁচাটা ভেসে উঠছিল। ভয়ে ভয়ে সে বাবার মুখের দিকে তাকায়। মাথা নুইয়ে চুপচাপ ওয়াজ শুনছে তার বাবা। নোয়ানো মাথা সে উঁচু করার সাহস পায় না। মালকোঁচা মারার শাস্তির কথা শুনে সে যতটা ভয় পায় তার চেয়ে বেশি পায় লজ্জা। তখন তার মনে হচ্ছিল মাঠের সব শ্রোতা বুঝি তার দিকে তাকিয়ে হাসাহাসি করছে। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি সবাই তাকে ধরে স্টেজের কাছে নিয়ে বলবে, ‘এই আবাল লোকটারে দ্যাখেন হুজুর। যতক্ষুণ ক্ষ্যাতে থাহে এ্যাকবারও তফনডারে গিড়্যার নিচে নামায় না। আপনে তারে বুঝ দেন। মাথাটা নোয়ানো ছিল বলে সে ঠাওর করতে পারেনি শ্রোতাদের কেউ তার দিকে আদৌ তাকিয়ে কিনা। ’

শীতের মাত্রা ধীরে ধীরে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। শামিয়ানার কাপড় ভেদ করে বিন্দু বিন্দু কুয়াশা গড়িয়ে পড়তে থাকে মাঠে। শ্রোতারা একজন দুজন করে ওঠা ধরে। মাঠের চারদিকে ঘোরাফেরা করে। তাদের মতিগতি দেখে মাওলানার বুঝতে অসুবিধা হয় না কী কারণে তারা ব্যতিব্যস্ত। খিদা তারও যে লাগেনি তা নয়। স্টেজে ওঠার আগে ফলফলাদি কম খাননি। কিন্তু তাতে কি আর পেট ভরে? পেট ভরানোর জন্য চাই ভাত। গরম ভাতের সঙ্গে মুরগির রান আর পেয়ালা ভর্তি গোশত। বাধ্য হয়ে ওয়াজ তাকে সংক্ষেপ করতে হয়। শ্রোতাদের মনের গতিক বুঝে মোনাজাতও।

মুহূর্তে লম্বা লাইন পড়ে গেল মাঠে। লাইন সোজা রাখতে ভলন্টিয়ারদের নাকানি-চুবানি হাল। ঠেলাঠেলির মধ্যে কার ধাক্কা খেয়ে আচমকা কেঁদে উঠল কাদের। পায়ে খুব চোট পেয়েছে বেচারা। বেটাকে এক হাতে আগলে রেখে আরেক হাতে তবরকের একটা ঠোঙা নিয়ে বেটার হাতে দিল ক্ষিদর। ঠোঙাটা পেয়ে চোটের ব্যথা কথা ভুলে গেল কাদের। ততক্ষণে ক্ষিদর নিজের ঠোঙাটাও নেয়। নিয়ে আর দাঁড়ায় না। মাঠের বাইরে এসে এক ফেরিওয়ালার কুপির আলোয় বাপ-বেটা মিলে গফ গফ তবরক গিলে। দিঘিতে নেমে আঁজলা ভরে পানিও খায়।

যখন বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল রাত তখন প্রায় এগারোটা। কুয়াশার কবলে পড়ে আসমান-জমিন সব একাকার। চাঁদ-তারা কিছু ঠাওরে আসে না। বেটার ডান হাতটা শক্ত করে ধরে রাখে ক্ষিদর। পাছে এই ঘোর কুয়াশায় হারিয়ে যায় তার আদরের ধন!

নদীর পারে এসে দুজন থামে। কুয়াশা এতই গাঢ়, কোনদিকে পথ আর কোনদিকে নদী, কিছুই ঠাওরে আনতে পারে না। শীতের তীব্রতাও দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। ঠকঠক করে কাঁপছে কাদের। কী করে ক্ষিদর? গোলাইডাঙার পথ সে খুঁজে পায় না। শক্ত করে বেটার হাত ধরে সে আন্দাজি হাঁটা ধরল। না, ভুল সে করল না। পায়ের নিচে কিরকিরে বালি টের পেয়ে সে পথ আন্দাজ করতে পারে। আজন্মের চেনা পথ। অন্ধ হলেও এই পথ চিনতে সে মোটেই ভুল করবে না।

নদীর খাঁড়ির কাছে এসে থামল ক্ষিদর। টর্চটা ছেলের হাতে দিয়ে বলল, সুইচটা টিপ্যে ধরতো বাজান। আলোটা বাপের পায়ের দিকে ধরে রাখে কাদের। চটিজোড়াও বেটার হাতে ধরিয়ে দিল ক্ষিদর। তারপর চট করে মালকোঁচা মেরে হাঁটু গেড়ে বসে বলল, বাজান কান্ধে ওঠ। তখন আঁতকে ওঠে কাদের। বড় মাওলানার মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। হাঁটুর ওপর লুঙ্গি পরার শাস্তিটার কথা মনে পড়ে যায়। টর্চের আলোটা বাবার মালকোঁচার ওপর ধরে রেখে সে বলল, গুনাহ হবে বাজান! হুজুর না উয়াজে মানা করছে কাছা দিব্যের?

ক্ষিদর আলী খিক করে হেসে ওঠে। মৃদু ধমক দিয়ে বেটাকে তাড়া দেয়, আরে উঠতো বাজান। ওঠ ওঠ মেলা রাইত হইছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow