Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৬ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:০৮
মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন
সওগাত ও বেগম
নিবন্ধ ♦ পূরবী বসু
সওগাত ও বেগম

এই তো, মে ২৩, ২০১৬-এ বাংলার নারী জাগরণ ও নারী সাংবাদিকতার, বিশেষ করে মুসলমান নারী প্রগতি-আন্দোলনের পথিকৃৎ নূরজাহান বেগম চলে গেলেন পৃথিবী ছেড়ে। ১৯৪৭ সালে নূরজাহান বেগমের পিতা উপমহাদেশের স্বনামধন্য সাংবাদিক ও সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের প্রতিষ্ঠিত ‘বেগম’ পত্রিকার হাল ধরেছিলেন নূরজাহান বেগম ও পারিবারিক সুহৃদ এবং প্রখ্যাত কবি ও সমাজসেবী সুফিয়া কামাল। নাসিরউদ্দীনের ইচ্ছায় সুফিয়া কামাল হন সম্পাদক আর নূরজাহান বেগম হন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। বেগম পত্রিকা শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভারতবর্ষ ইংরেজদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে ও বাংলা ভাগ হয়ে যায়। পূর্ববঙ্গ পূর্ব পাকিস্তান হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সুফিয়া কামাল ঢাকা চলে আসেন। বেগম-এর মাত্র কয়েকটি সংখ্যা বের হয়েছে তখন। সুফিয়া কামাল চলে যাওয়ার পরে নূরজাহান বেগম কলকাতা থেকে প্রকাশিত বেগম-এর সম্পাদকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

১৯৫০ সালে বেগমের প্রকাশনার স্থান কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। নূরজাহান বেগম ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে আজীবন অর্থাৎ তার মৃত্যুর বছর (২০১৬) পর্যন্ত একনাগাড়ে প্রায় ৭০ বছর নানা উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে নারীদের এই কাগজটি চালিয়ে গেছেন তার অসাধারণ মনের জোরে। নিষ্ঠার বলে। আর এই মহীয়সী নারী তার চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং অসামান্য পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ক্ষমতা, এমন কি দীর্ঘ কর্মক্ষম জীবনের (নূরজাহান বেগম একানব্বই বছর বেঁচেছিলেম আর মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন বেঁচেছিলেন ১০৬ বছর) উত্তরাধিকারও হয়তো পেয়েছিলেন তার পিতার কাছ থেকেই। অবিভক্ত বাংলার সাহিত্য ও সমাজের এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ছিলেন তখনকার দিনের স্বনামধন্য প্রকাশনা ‘সওগাত’ পত্রিকার সম্পাদক। অন্য কথায় প্রথম বাঙালি মুসলমান সম্পাদক।

দুই পর্যায়ে সওগাত পত্রিকাটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯১৮ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে কলকাতা থেকে সওগাত পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকার সপ্তনীতির অন্যতম দুই নীতি ছিল—১. সমাজের অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিচালনা করা। এবং ২. নারীশিক্ষা ও নারী জাগরণমূলক প্রবন্ধাদি এবং জগত্জুড়ে মেয়েদের অর্জন ও অবদানের ওপর সচিত্র মহিলা সংবাদ প্রকাশ করা। যদিও সওগাত প্রকাশ-শুরুর পনেরো বছর আগেই বেগম রোকেয়া ‘মহিলা’ পত্রিকায় ‘অলঙ্কার না ব্যাজ অব স্নেভারি’ নামক প্রবন্ধে নারী শিক্ষা, নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্ব্বিতা, সমাজে ও কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য, ধর্মের নামে নারীর ওপর পুরুষের প্রভুত্ব ও অত্যাচারের বর্ণনা ও বিশ্লেষণ যুক্তি সহকারে উপস্থাপন করেছিলেন যা এক বছর পরে ‘আমাদের অবনতি’ নামে সৈয়দ এমদাদ আলী সম্পাদিত ‘নবনূর’ পত্রিকায় পুনঃপ্রকাশিত হয়েছিল। বেগম রোকেয়া কলকাতায়, খায়রুন্নেসা খাতুন সিরাজগঞ্জে এবং তাদের জন্মেরও আগে নবাব ফয়জুন্নেসা কুমিল্লায় মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন, তথাপি ১৯১৮ সালে বাংলার সামগ্রিক মুসলমান মেয়েদের অবস্থা ছিল বাস্তবিকই শোচনীয়। অধিকাংশ নারী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চা থেকে প্রায় পুরোপুরিই বঞ্চিত হচ্ছিলেন। তার মধ্যেও মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন চেষ্টা করেছেন শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান মেয়েদের খুঁজে বের করে এনে তাদের লেখার ব্যাপারে উৎসাহিত করতে। সেই সময় নারী শিক্ষা ও নারী প্রগতির কথা বলাও গুনাহর কাজ বলে গণ্য হতো। ১৯১৮ থেকে ১৯২২-এর মধ্যে নাসিরউদ্দীনের নিরলস চেষ্টার পরও মাত্র চার-পাঁচটি মুসলমান নারী রচিত কাঁচা হাতের কবিতা জোগাড় করে ছাপাতে সমর্থ হয়েছিলেন তিনি।

প্রথম সংখ্যা সওগাতে প্রকাশিত হয়েছিল বেগম রোকেয়ার একটি কবিতা, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ও কায়কোবাদের কবিতা, জলধর সেনের ছোট গল্প, শাহাদাত হোসেনের ও আবদুল গফুরের প্রবন্ধ। দুটি সচিত্র প্রবন্ধ ছাপা হয় অতীতের বিখ্যাত মুসলমান নারীদের ওপর। মুসলমান নারীদের ছবি ছাপা হওয়া ইসলামবিরোধী বলে সওগাত প্রথম থেকেই গোঁড়া মুসলমানদের কুনজরে পড়ে। একে নারীদের লেখা সংগ্রহের অক্ষমতা, কট্টর মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরোধিতা, তার ওপর গ্রাহকের স্বল্পতা ইত্যাদি মিলিয়ে ১৯২২ সালে সওগাত বন্ধ হয়ে যায়। সেই সময় প্রগতিবাদী মুসলমান সমাজের গড়া ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও ‘শিখা’ গোষ্ঠীও গোঁড়া মুসলমানদের রোষানলে পড়ে। আবুল হোসেন, কাজী আবদুল ওদুদ ও কাজী মোতাহার হোসেন মিলে এই বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন করার চেষ্টা করেছিলন। তাদের আদর্শ ছিল ‘জাতিধর্ম নির্বিশেষে নবীন, পুরাতন সর্বপ্রকার চিন্তা ও জ্ঞানের সমন্বয় ও সংযোগ’ ঘটানো।

অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলামের পত্রিকা ‘লাঙল’ ও ‘গণবাণী’ও গোঁড়া ধর্মীয়বাদীদের বিরোধিতায় এবং পূর্ণ অসহযোগিতায় বন্ধ হয়ে যায়। বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের এই সময়টা ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা ধরনের স্রোতে উত্তাল। বাঙালি মুসলমান সমাজে তখন তাদের স্বাতন্ত্র্য ও মৌলিক পরিচিতির ব্যাপারে শুরু হয়েছিল আত্মসন্ধান এবং সূক্ষ্ম এক টানাপড়েন। ধর্ম, জাতীয়তা, ভাষা কোনটা আগে কোনটা পরে আসবে ব্যক্তি ও সামাজিক পরিচয়ে বাঙালি মুসলমান সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এবং নিজেদের স্বাতন্ত্র্যের অনুসন্ধান করে হয়ে পড়েছিলেন দিশাহারা। তবে শিক্ষিত বাঙালি মুসলমানরা ততদিনে মোটামুটি তাদের দৈশিক ও ভাষাগত পরিচয়ের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের একটা রফা করে ফেলেছেন। তারা মেনে নিয়েছেন উর্দু ও আরবি ইসলামের মহিমা প্রচারের জন্য, ধর্মকর্মের জন্য আদর্শ ভাষা হলেও বাঙালির মুখের ভাষাও সাহিত্য-সংস্কৃতির মাধ্যম বাংলা ভাষাই।

সওগাত প্রকাশনা শুরুর সময়টার বর্ণনা করতে গিয়ে বহু বছর পরে ঢাকায় মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন বলেছিলেন, কট্টর গোঁড়া ধর্মাবলম্বীরা, নাসিরউদ্দীনের ভাষায় ‘কতগুলো নিষেধের বেড়াজাল সৃষ্টি করে সমাজকে পঙ্গু করে রেখেছিলেন, যেমন তারা মনে করতেন ইংরেজি পড়া, গল্প, উপন্যাস পড়া, গান করা বা গান শোনা, ছবি আঁকা, আমোদ-আহ্লাদ ও খেলাধুলা করা এসবই গুনাহর কাজ। স্বাধীনভাবে চিন্তা করে কেউ কিছু লিখলে তিনি নিন্দনীয় হতেন এবং তার লেখা কোনো কাগজে ছাপা হতো না। এমন একটা যুগে সওগাতের জন্ম।’

সওগাত-এর প্রথম পর্যায়ের প্রকাশনাকাল ১৯১৮ থেকে ১৯২২ সাল। এরপর চার বছর মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ও তার মতো প্রগতিশীল বাঙালি মুসলমান বিদ্যোৎসাহীরা প্রায় প্রতি বিকালে বসে আলোচনা করতেন তাদের পরবর্তী কর্মপদ্ধতি নিয়ে। নতুন করে কাগজ বের করলে কেমন ধারার কাগজ হবে সেটা, তার লক্ষ্য, চরিত্র ও সম্ভাব্য লেখককুলের বৈশিষ্ট্য নিয়ে তারা মতবিনিময় করতেন। এই সব সভায় নিয়মিত আসতেন কাজী নজরুল ইসলাম।

অবশেষে ১৯২৬ সালের শেষদিকে শুরু হয় নবপর্যায়ের সওগাত। সওগাতের উষালগ্নে সমাজ যতই প্রাচীনপন্থি থাকুক না কেন, কিছু ব্যক্তিমনীষার উল্লেখযোগ্য অর্জন সম্ভব হয়েছিল তখন, কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাও ঘটেছিল যা বিশেষভাবে স্মরণীয়। নিচে সওগাতের প্রকাশকালে সেই রকম কিছু ব্যক্তিমনীষার সাফল্য ও রাজনৈতিক-সামাজিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা উল্লেখ করা হলো। যেমন—

১. ১৯২১ সালে প্রথম মুসলিম মহিলা মাসিক পত্রিকা ‘আন্বেষা’ প্রথম মুসলমান নারী সম্পাদক সুফিয়া খাতুনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। (তবে এটা প্রায় সর্বজনস্বীকৃত যে, সুফিয়া বেগমের নাম সম্পাদক হিসেবে উল্লিখিত হলেও পত্রিকাটি সম্পাদনা ও প্রকাশনার সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন সুফিয়া খাতুনের স্বামী। তবে তার দৃষ্টিভঙ্গি খুব প্রগতিশীল ছিল না। বরং রক্ষণশীল ছিল বলেই দাবি করা যায়)।

২. লীলা নাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী হিসেবে অনেক বাধা পেরিয়ে (তখনো মেয়েদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অনুমোদন লাভ করেনি) ভাইস চ্যান্সেলরের বিশেষ অনুমতি নিয়ে পড়তে শুরু করেন।

৩. ঢাকার ফজিলাতুন্নেসা কলকাতার বেথুন কলেজে বিএতে ভর্তি হয়েছিলেন ১৯২৩ সালে।

৪. লীলা নাগ (আয়) নারী শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ও নারীদের সুস্বাস্থ্য ও দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলতে দীপালী সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনিই প্রথম নারী যিনি ‘নারী শিক্ষা মন্দির’ ও ‘শিক্ষাভবন’ নামে দুটি ইংরেজি স্কুল ও ১২টি প্রাইমারি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন ১৯২৩ সালে।

৫. নূরুন্নেসা খাতুন প্রথম মুসলমান নারী ঔপন্যাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ১৯২৪ সালে।

৬. চট্টগ্রামের শামসুন্নাহার মাহমুদ ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯২৫ সালে।

৭. ১৯২৫ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের আকস্মাৎ মৃত্যুর পরের বছরই কংগ্রেস দ্বারা ‘বেঙ্গল অ্যাক্ট’ বাতিল হয়ে যায়, যা মুসলমান সমাজে প্রচণ্ড হতাশার সৃষ্টি করে।

৮. ১৯২৬ সালের কলকাতার হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার ফলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্কের দ্রুত অবনতি হয়।

৯. মানিকগঞ্জের ফাতেমা খানম কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে প্রথম বাঙালি মুসলমান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ১৯২৭ সালে।

১০. স্কুল প্রতিষ্ঠার ১৬ বছর পর প্রথমবারের মতো বেগম রোকেয়া তার নিজের প্রতিষ্ঠিত স্কুলে বাংলা ক্লাস শুরু করেন ১৯২৭ সালে।

১১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম মুসলমান নারী ফজিলাতুন্নেসার গণিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান দখল করেন ১৯২৭ সালে।

১২. এমএ পাস করার পর সেই বছরই (১৯২৭ সালে) ফজিলাতুন্নেসা বিলাতে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার ব্যাপারে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সাহায্য কামনা করেন। মুসলমান মেয়ের, বিশেষ করে অবিবাহিত, শিক্ষিত, অল্পবয়সী মুসলমান নারীর, বিলাতে যাওয়ার মতো বেপর্দার কাজে প্রধান সহযোগী ও উদ্যোক্তা হওয়ায় নাসিরউদ্দীনের ওপর অনেক ঝড়ঝাপটা আসে। এমন কি প্রকাশ্য রাস্তায় ধর্মান্ধ লোকদের দ্বারা আক্রান্তও হন নাসিরউদ্দীন।

১৩. বাংলার মেয়েরা ভোটের অধিকার অর্জন করেন ১৯২৯ সালে। সমগ্র ভারতে একসঙ্গে সব রাজ্যের মেয়েরা ভোটের অধিকার পাননি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজ্যের নারীরা তা অর্জন করেন। বাংলার নারীরা পান ১৯২৯ সালে।

১৪. বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে পূর্ববাংলার কয়েকজন প্রগতিশীল জ্ঞানপিপাসু মুসলমান ব্যক্তি মিলে মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। এই বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমাজ ছিল বাংলার একটি বুদ্ধিমুক্তির আন্দোলনের দল যা ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত শিখা পত্রিকার সঙ্গে একই সময় গঠিত হয়ছিল। মুসলিম সাহিত্য সমাজের কর্ণধার ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন, কাজী আবদুল ওদুদ এবং আবুল হুসেন। ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত এক দশক চলেছিল এই ঢাকাকেন্দ্রিক গোষ্ঠীটির কর্মকাণ্ড।

১৫. সেই ১৯২৬-১৯২৭ সালে, বোরকা না পরে কেবল শাড়ি পরে ফজিলাতুন্নেসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে যেতেন বলে তাকে অনেক দিন ইট-পাটকেলের মুখে পড়তে হয়। কিন্তু বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমাজের সদস্যরা অ্যান্টি-পর্দা লীগের সদস্য ছিলেন এবং তারা ফজিলাতুন্নেসাকে সমর্থন দান করেন। পরে ফজিলাতুন্নেসা যখন অঙ্কে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হন, তখন ঢাকার অ্যান্টাই-পর্দা গ্রুপের তরফ থেকে ফজিলাতুন্নেসাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

১৯২৬ সালে নবপর্যায়ে সওগাত বেরুতে শুরু করে। অবরোধের ভিতরে থেকেও যে মুসলমান মেয়েরা কলম ধরত সাহস করেছেন, তদের লেখার ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে, অতি যত্নের সঙ্গে উৎসাহ ও সহযোগিতা করেছেন নাসিরউদ্দীন। ছাপানোর আগে বেশকিছু লেখার আগাগোড়া সংশোধন ও পরিমার্জন করেন।

মাসিক সওগাত বের করার কিছুদিন পরই কাজী নজরুল ইসলামসহ বেশকিছু সমমনা মুক্তিবুদ্ধির লোকের অনুরোধে মাসিক সওগাতের সঙ্গে সঙ্গে সাপ্তাহিক সওগাতও বেরুতে থাকে। কাজী নজরুল ইসলামের ‘লাঙল’ ও ‘গণবাণী’সহ বহু পত্রিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিজেদের লেখার জন্য নিজস্ব একটি পত্রিকার প্রয়োজনীয়তার কথা সবাই টের পান। সাপ্তাহিক সওগাতে শিক্ষা সমস্যা, সাম্প্রদায়িক সমস্যা, ভাষা নিয়ে বিতর্ক, রাজনীতি, সাহিত্যে হালচাল ইত্যাদির সঙ্গে পরিবেশিত হতো নারীর অধিকার বিষয়ক প্রবন্ধাদি ও খবরাখবর। দেশ-বিদেশের বরণীয় নারীদের বিভিন্ন ধরনের অর্জন ও অবদানের কথা ছবিসহ ছাপানো হতো। এছাড়া দেশি মেয়েদের সাফল্যগাথা এবং নারী সমিতিগুলোর কর্মসূচি নিয়মিত ছাপানো হতো।

মুসলমান মেয়েদের পাশাপাশি হিন্দু, ব্রাহ্ম ও খ্রিস্টানদের লেখাপড়া, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগদান করতে উৎসাহদান করেন নাসিরউদ্দীন। পর্দার আড়ালে শিক্ষা ও জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত মুসলমান নারীর দুঃসহ জীবনযাপনের বাস্তবতা অস্থির করে তুলেছিল মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনকে। সওগাতের মাধ্যমে তিনি নারীমুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান সমাজের মেয়েদের কঠোর অবরোধ ও বহুরকম নিষেধের গণ্ডি থেকে বের করে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। তিনি বলতেন, ‘নারী না জাগলে জাতি জাগবে না’।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow