Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ১৮ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৮ জুন, ২০১৬ ০০:২৮
ঘুরে বেড়াই
আহ্ গুইলিন
জাকারিয়া সৌখিন
আহ্ গুইলিন

আমাদের মূল গন্তব্য গুইলিন। অবশ্য চীনারা উচ্চারণ করে কুইলিন। গুয়াংজোতে যাত্রা বিরতি চলছে, এক রাত থেকে গুইলিন যাত্রা করব। অসম্ভব সুন্দর একটি জায়গা। সেখানে বিখ্যাত একটি নদী আছে। নাম লি রিভার। লন্ডনের টেমস নদী নিয়ে যেমন অনেক সাহিত্যকর্ম আছে, লি রিভার নিয়েও তাই।

আমার বউ ইয়াসমীনকে মজা করে বললাম, ‘আমিই সম্ভবত দ্বিতীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তি যে গুইলিনে পা রাখছে।’ বউ পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘তাহলে প্রথম ব্যক্তি কে?’ উত্তর দিলাম, ‘বিল ক্লিনটন’। বউ তাচ্ছিল্যমাখা হাসি দিলো।

মজা করে আমি বললেও কথা কিন্তু সত্যি। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় চীন সফরের সময় মিস্টার প্রেসিডেন্ট সূচিতে খুব গুরুত্বের সঙ্গে গুইলিন ভ্রমণের কথা লিখেছিলেন। আসলে সারা পৃথিবীর টুরিস্টরাই ভিড় জমান সেখানে। সারা পৃথিবী বললাম এ কারণে যে, চীন বর্তমানে সেরা টুরিজম কান্ট্রির র্যাংকিংয়ে চতুর্থ অবস্থানে আছে। ফ্রান্স, আমেরিকা এবং স্পেনের পরেই চীনের অবস্থান। বছরে ষাট মিলিয়নের ওপর টুরিস্ট আসে এই দেশে।

গুইলিন যাবো বুলেট ট্রেনে চড়ে। বিকাল পাঁচটায় ছাড়বে। সোয়া ছয়শত কিলোমিটার যাবে আড়াই ঘণ্টায়। তাও মাঝে পাঁচটা স্টপেজ।

আমরা হেলেদুলে আস্তে ধীরে রেডি হচ্ছি। পাঁচটায় ট্রেন, কিছুক্ষণ আগে গেলেই তো হলো। সাড়ে চারটার দিকে আমরা গিয়ে স্টেশনে পৌঁছলাম। গিয়ে দেখি বিশাল বড় স্টেশন। আমাদের এয়ারপোর্টের থেকেও পাঁচ গুণ বড় এবং আধুনিক। নানা ধরনের নিরাপত্তা বেষ্টনী। সব নিয়ম-কানুন মেনে আমাদের প্ল্যাটফর্ম খুঁজে বের করতে পাঁচটা পার হয়ে গেল। ততক্ষণে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এই ইংরেজি না-জানা মানুষদের কীভাবে বুঝাব, কি বুঝাব! একটু পরই সন্ধ্যা নামবে! মাথা কিছুতেই কাজ করছে না। ওদিকে আবার বউ ইয়াসমীন চেঁচামেচি করছে। আমার অলসতার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করছে।

আমি হতাশ হয়ে ওয়েটিং বেঞ্চে বসে পড়লাম। সামনে তাকিয়ে দেখি বিশাল একটা ডিজিটাল নির্দেশনা বোর্ড। সেখানে নানা রুটের দিক-নির্দেশনা— চীনা ভাষায় এবং ইংরেজিতে। দেখলাম পৌনে ছয়টায় আরও একটি ট্রেন আছে গুয়াংজো টু গুইলিন। সেটা অন্য প্ল্যাটফর্মে। উঠে দৌড় দিলাম। প্ল্যাটফর্ম খুঁজে বের করেছি। গেট ওপেন, যাত্রীরা যাচ্ছে। আমি গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে টিকিট দিয়ে ইশারায় বুঝালাম, আমি ট্রেন মিস করেছি। সে বুঝলো। সঙ্গে সঙ্গে আরও তিন-চারজন মিলে গবেষণা শুরু করল। তারপর জানাল, হবে না। সব সিট বুক। তাই তাদের অনেক কষ্টে, নানা ধরনের অঙ্গ-ভঙ্গিতে অভিনয় করে বুঝালামা, আমরা দাঁড়িয়ে যাব। দয়া করে ব্যবস্থা করো। ওরা বিষয়টা বুঝতে পেরে আমাদের দাঁড়িয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলো। লাগেজ নিয়ে দৌড়ে উঠলাম। উঠে দুই কামরার মধ্যে ফ্লোরেই বসে পড়লাম। চিড়িয়াখানার বানরের খাঁচার দিকে যেভাবে মানুষ তাকিয়ে থাকে, অন্য যাত্রীরা আমাদের দিকে সেভাবে তাকিয়ে আছে। কিন্তু আমাদের তাতে কিছুই যায় আসে না। কারণ ততক্ষণে আমরা ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’র ফিলে চলে গিয়েছি। আমি শাহরুখ, ইয়াসমীন কাজল হয়ে গেছে।

 

গুইলিন এসে আমরা যে হোটেলে উঠেছি, এখানে কোনো চীনা টুরিস্ট নেই, সবাই বিভিন্ন দেশের। আলজেরিয়া, চেক রিপাবলিক, সাউথ আফ্রিকা, আয়ারল্যান্ড, ইতালির কয়েকজনের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হলো, কিঞ্চিৎ আড্ডাও হলো। তবে বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেল এক জুটির সঙ্গে। ছেলেটি রাশিয়ান, মেয়েটি স্প্যানিশ। নাম পাভেল গাভ্রিলোভ ও আদ্রিয়ানা। বেশ ফুরফুরে স্বভাবের দুজন মানুষ। পেশায় তারা চিকিৎসক। আমাদের সমবয়সীও বটে।

সবার সঙ্গে পরিচয় এবং আড্ডা দিয়ে আমরা জানতে পারলাম, সবাই আমাদের মতো ইচ্ছে নিয়েই চীন সফরে এসেছে। ইচ্ছেটি হচ্ছে— একেবারেই ভিন্ন স্বাদ, ভিন্ন পরিস্থিতি, ভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং ইংরেজি না জানা দেশে পরতে পরতে উত্তেজনার অনুভূতি নেওয়া। 

আসলেই উত্তেজনা। আর আমরাও উত্তেজিত হয়ে সকাল-সকাল বেরিয়ে গেলাম লি রিভারের উদ্দেশে। আমরা বলতে এখন আর আমি আর আমার বউ নই, সঙ্গে পাভেল-আদ্রিয়ানাও আছে।

বাসে চড়ে পৌঁছলাম লি রিভারের পাড়ে। চোখ জুড়িয়ে গেল। আহা প্রকৃতি! নদীর পাড়জুড়ে গৌতম বুদ্ধের মতো ধ্যানমগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একেকটি পাহাড়।

লি রিভার ভ্রমণের বাহন দুটি— জলজাহাজ এবং বাঁশের ভেলা। আমার আর ইয়াসমীনের পছন্দ বাঁশের ভেলা। বিষয়টি ভিন্নস্বাদের। কিন্তু পাভেল-আদ্রিয়ানা কি পছন্দ করবে জানি না। অবাক বিষয়, ওরাও এসে বাঁশের ভেলার কথাই বলছে। প্রতিটি ভেলায় চারজন করে যাওয়া যায়। আমরা ভেলায় চেপে বসলাম। গন্তব্য ইয়াংশু গ্রাম। সেখানে গিয়ে আমরা থাকব একটি রাত।

ভেলা চলছে। ইঞ্জিনচালিত ভেলা। কিন্তু শব্দহীন। মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে আমরা মর্ত্য থেকে স্বর্গের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। লি রিভারে দুই পাশেই সারি সারি পাহাড়, পাহাড়জুড়ে মেঘের খেলা। যতই এগুচ্ছি, ততোই সূর্য থেকে দূরে পৌঁছে যাচ্ছি। ঢুকে যাচ্ছি মেঘের রাজ্যে। নিচে আয়নার মতো স্বচ্ছ জল, সেই জলে সাঁতার কাটছে হাজার হাজার পানকৌড়ি। সবমিলিয়ে ‘অসাধারণ’, ‘অসম্ভব সুন্দর’ কিংবা ‘মায়াময়’ বলেও আমি আমার অনুভূতি প্রকাশ করতে পারব না। এ অনুভূতি প্রকাশ করার মতো নয়, অনুভব করার মতো। কোনো ক্যামেরা এই সৌন্দর্যের স্বাদ বন্দী করতে পারবে না, পারবে শুধু সবার চোখ আর হূদয়।

আমরা এতটাই অবাক চোখে তাকিয়ে রইলাম যে, কারও মুখে কোনো কথা নেই। যেই পাভেল-আদ্রিয়ানা সারাক্ষণ হৈহুল্লোড় আর চড়ুই পাখির মতো ছুটোছুটি করে তারাও স্থির হয়ে আছে। অবাক সৌন্দর্যের মাঝে মুগ্ধতায় স্তব্ধ আমরা চারটি মানুষ।

দুপুরের পরপরই আমরা গিয়ে ইয়াংশু গ্রামে পৌঁছালাম। গ্রাম হলেও আধুনিক সব সুবিধাই রয়েছে। এই গ্রামের জীবনমান আমাদের শহরবাসীর তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু সেই আক্ষেপে মন ভারী করার সময় নেই, এখন শুধুই চোখ-কান-মুখ-নাক-পেট ভরে সৌন্দর্য উপভোগের সময়।

ইয়াংশু গ্রামে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ঘেঁষে মানুষের বাড়ি। আমরা যে হোটেলে উঠলাম, সেটিও একটি পাহাড়ের চূড়ায়। এখানে সূর্য বলে কিছু নেই, মাঝে মধ্যে আকাশে একেবারেই নিরুত্তাপ ডিমের কুসুমের মতো লালচে কিছু একটা দেখা যায়, ওটাকেই তারা সূর্য নামে ডাকে। আমাদের দেশের চন্দ্রও এর থেকে পাওয়ারফুল।

বিশ্রাম নিয়ে আমরা আবার ভেলায় ভাসতে গেলাম। সন্ধ্যায় নাকি জেলেরা মত্স্য শিকারে বের হয়। বড়ই সৌন্দর্য নাকি সে দৃশ্য।

ইয়াংশু গ্রামের যে নদীতে আমরা ঘুরছি তার নাম টাইগার রিভার। দেখলাম দূরে ডিমের কুসুমের মতো লালচে জিনিসটা ডুবে যাচ্ছে। সন্ধ্যা নেমে এলো। দূর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ভেসে আসছে জেলেদের নৌকা। প্রতিটি নৌকায় হ্যাজাক লাইটের মতো বাতি। কিন্তু অবাক বিষয়, প্রতিটি নৌকার দুই মাথায় দু-তিনটি করে পাখি। পাখিগুলো দেখতে অদ্ভুত। আমার কাছে হলিউডের অ্যানিমেশন মুভির কোনো দৈত্যের পোষা পাখি মনে হলো। কিন্তু মাথায় প্রশ্ন, জেলেরা মাছ ধরবে ঠিক আছে, সঙ্গে পাখি কেন? পাখির কাজ কি?

মাথায় প্রশ্নটা বেশিক্ষণ ঘুরতে পারল না, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর পেয়ে গেলাম। এগুলো সব মত্স্যশিকারি পাখি। এরা পানিতে লাফিয়ে পড়ে মুখে করে বড় বড় জ্যান্ত মাছ নিয়ে ফিরে এসে জেলেকে দেয়। কি অবাক কাণ্ড!

জেলারা দুইভাবে মত্স্য শিকার করছে। নিজেরা জাল ফেলে ছোট মাছ ধরছে, আর পাখিরা লাফিয়ে লাফিয়ে বড় মাছ ধরে আনছে। এই দেখে আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, চীনারা শুধু হাংকিপাংকি যন্ত্রপাতি দিয়েই তেলেসমাতি দেখাচ্ছে না, এদের তেলেসমাতি সবখানেই রয়েছে। এই দেশে না আসলে এই তেলেসমাতির কথা জানতামই না।

জেলেগুলো খুবই ভালো। আমরা কথা বললে তারাও বলে। আমরা আমাদের ভাষায় বলি, তারা তাদের ভাষায় বলে। কেউ কিছু বুঝি না, তবে বলি। শুধু বুঝি আমরাও হাসছি, ওরাও হাসছে। হাসির ভাষা এক। আর ক্যামেরা বের করলেই তারা পোজ দিচ্ছে। ছবি তুলতে অনেক আনন্দ তাদের।

 

রাত একটু বাড়তেই দেখি আরেক অপূর্ব দৃশ্য। পুরো নদীজুড়ে শত শত আলোকোজ্জ্বল জেলে নৌকা আর পাখির ওড়াউড়ি। অসম্ভব সুন্দর। ওহ্ গুইলিন, তুমি আমার মানব জন্ম আরেকবার ধন্য করে দিলে। 

 

পাদটীকা : আকাশের তারা হয়ে যাওয়া আমাদের অগ্রজ মুরব্বিরা বলে গেছেন— ‘জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীনে যাও’। কেন বলেছে, কিছুই বুঝিনি। কিন্তু চীনে এসে বুঝলাম, সত্যিই প্রতিটি মানুষের জন্য চীন সফর জরুরি। কারণ এখানে ঘুরতে এলেও একটি মূল্যবান বইয়ের সমান জ্ঞান নিয়ে ফিরে যাওয়া যায়। মানুষের প্রতি মানুষের মূল্যবোধ, অতিথিপরায়ণতা, টেকনোলজি, প্রকৃতি, জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস— প্রতিটি বিষয়ই শেখার মতো।




সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত
এই পাতার আরো খবর
up-arrow