Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ১৮ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ১৮ জুন, ২০১৬ ০০:৪৮
গ্রাসিয়া অ্যাওয়ার্ডজয়ী তাসমিন
গ্রাসিয়া অ্যাওয়ার্ডজয়ী তাসমিন

যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউএইচএজি টিভি চ্যানেলের সংবাদ উপস্থাপিকা তাসমিন মাহফুজ। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নারী সাংবাদিকদের সম্মানজনক পুরস্কার গ্রাসিয়া অ্যাওয়ার্ড জিতে সাড়া ফেলেছেন। তাকে নিয়ে লিখেছেন— নাদিম মজিদ

 

তাসমিন মাহফুজ জন্মেছেন ১৯৮৭ সালের ২৮ মে। জন্ম এবং বেড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন স্টেজ শো উপস্থাপন  করে থাকেন। ইতিমধ্যে ২০ হাজার শ্রোতার সঙ্গে তিনি সম্পর্কযুক্ত হয়েছেন। জিতে নিয়েছেন বিভিন্ন সম্মানজনক পুরস্কার। বাবা আবদুল ওয়াহেদ মাহফুজ, মা নাজমুন মাহফুজ এবং ভাই তামজিদ মাহফুজকে নিয়ে তার পরিবার।

তাসমিনের বাবা আবদুল ওয়াহেদ মাহফুজের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার বরকলে। তার দাদা-দাদীর নামে ১৯৯৯ সালে একটি স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেন। স্কুলের নাম আবদুল হাই-আনোয়ারা বেগম বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। বর্তমানে সেখানে ৩৫০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন।

 

পর্দার প্রতি তাসমিন মাহফুজের আগ্রহ শৈশব থেকেই। মা নাজমুন মাহফুজও ছিলেন টেলিভিশনের সংবাদ উপস্থাপিকা। তিনি ফ্লোরিডায় আমেরিকান পিবিএস এবং ক্যাবল চ্যানেলে সপ্তাহে দুটি অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও উপস্থাপনা করতেন। মায়ের আদর্শ আর কঠোর পরিশ্রম দেখে মোটেও বিচলিত হননি। মাকে দেখতেন, সাংবাদিকতা পেশাকে কতটা শ্রদ্ধার সঙ্গে পলন করতেন। সেই মায়ের আদর্শই টেলিভিশনের প্রতি আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। শুরুতে ভাবেননি, মিডিয়াই তার পেশা হবে। ২০০৯ সালে ইমোরি ইউনিভার্সিটিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষায় স্নাতক অর্জন। ২০১০ সালে ইন্টার্নশিপ করেন জাতিসংঘের নারী এবং বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে। পাশাপাশি ইমোরি ইউনিভার্সিটি থেকে আইন শিক্ষা বিষয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। ২০১২ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন এবং একই সালে জাতিসংঘ থেকে ইন্টার্নশিপ শেষ করেন। আইন বিষয়ে পড়াশোনা করলেও এটাকে পেশা হিসেবে কখনই ভাবেননি। বরং জাতিসংঘে ইন্টার্নশিপ করার সময় টেলিভিশনে কাজের সুযোগ খুঁজতেন। তাসমিন জানান, ‘সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে অনেক ভালো লাগে। প্রত্যেকটি মানুষেরই আলাদা গল্প রয়েছে এবং তাদের সে গল্প প্রকাশের জন্য সুযোগ করে দেওয়া আমার পছন্দ। তথ্য ভাণ্ডারে ভরা গল্প দর্শকদের বেশ আকৃষ্ট করে। এ ধরনের গল্প নিয়ে কাজ করতে ভালো লাগে। তাই সাংবাদিকতাকেই ক্যারিয়ার করে নিই।’ তাসমিন টেলিভিশন সাংবাদিকতার মৌলিকতা আসে শৈশব থেকেই। অপেক্ষায় থাকা তাসমিনকে সুযোগ দেয় সিহান নিউজ অ্যাজেন্সি। ২০১২ সাল থেকেই ক্যামেরার সামনে যাত্রা শুরু।

 

প্রথম সাংবাদিকতা

২০১২ সালে প্রথম টেলিভিশন রিপোর্ট দিয়ে পথচলা শুরু। রিপোর্টটি ছিল তুরস্কের প্রসিদ্ধ মসজিদ ব্লু মস্কো নিয়ে। সিহান নিউজ অ্যাজেন্সি প্রচার করেছিল। তখন ছিল রমজান মাস। সে মসজিদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সংস্কৃতির জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সেতুবন্ধন নিয়ে রিপোর্ট করে। রিপোর্টকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে মসজিদে পর্যটকদের সঙ্গে ইফতার করেন এবং ইফতার আয়োজক সংস্থা দি সেন্টার ফর ক্রস-কালচারাল কমিউনিকেশনের সঙ্গে কথা বলেন। প্রতিবেদনটিতে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতি, উন্মুক্ত মানসিকতা, আন্তধর্মীয় সংলাপের গুরুত্বও উঠে আসে।

 

ছেলেবেলার স্বপ্ন বাস্তব

ইবরু টেলিভিশনের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে নিউজ রিপোর্টার হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেন। ২০১৪ সালের জুলাই পর্যন্ত কাজ করেন। নিউইয়র্ক সিটি, নিউ জার্সি এবং ওয়াশিংটন ডিসি থেকে তিনি রিপোর্ট করেছিলেন। তারপর যোগ দেন এবিসি ফোর-এ। উটাহ চ্যানেলের সাংবাদিক এবং সাদার্ন উটাহ ব্যুরো চিফ হিসেবে কাজ করছেন। প্রতিদিন উটাহ প্রদেশে তার রিপোর্ট প্রচারিত হয়। তাসমিনের মাঝে পরিশ্রম করার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। যে কোনো ঘটনার শুটিং, ভিডিও সম্পাদনা এবং মাঠ থেকে রিপোর্টিং সবকিছুই তিনি করতে পারেন। বর্তমানে তাসমিন মাহফুজ ডব্লিউএইচএজি টিভিতে সান্ধ্যকালীন সংবাদ উপস্থাপকের দায়িত্ব পালন করছেন। তাসমিনের প্রযোজনা এবং উপস্থাপনায় করা অনুষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া, মেরিল্যান্ড, পশ্চিম ভার্জিনিয়া এবং পেনসিলভানিয়ায় প্রদর্শিত হয়ে থাকে।

 

উল্লেখযোগ্য কাজ

ইবরু টেলিভিশনে তিনি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হারিকেনের আঘাতে লণ্ডভণ্ড নিউ জার্সির রিপোর্ট করেছিলেন। পাশাপাশি তাসমিন জাতিসংঘ থেকে সরাসরি রিপোর্ট করতেন। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক, ক্রিমিয়া সংকট এবং সিরিয়ার উন্নয়ন নিয়ে খবর এবং ব্রেকিং নিউজ প্রদান করেছিলাম। তার সেরা দুটো সাক্ষাত্কার হলো নিউইয়র্কের সিটি মেয়র বিল ডে ব্লাসিও এবং নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের সাক্ষাত্কার।

 

প্রিয় প্রযোজনা

তাসমিনের প্রিয় দুটি প্রযোজনা এবিসির গুড মরনিং অ্যামেরিকা এবং এনবিসির জিমি ফ্যালেনসহ করা টুনাইট শো। আয়োজকদের সঙ্গে দর্শকদের সংযোগ পছন্দ করেন।

 

বহুভাষী

তাসমিন শুধু সাংবাদিকতায়ই পারদর্শী নন, সে একজন বহুভাষীও বটে। ইংরেজি, বাংলা, স্পেনিশ, তুর্কি, হিন্দি, উর্দু ভাষায় দারুণ দক্ষ তাসমিন। পাশাপাশি পবিত্র কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করতে পারেন।

 

দ্য গ্রাসিয়া অ্যাওয়ার্ড

নারী সংবাদকর্মী হিসেবে ২০১৫ সালে অর্জন করেন দ্য গ্রাসিয়া অ্যাওয়ার্ড ফর আউটস্ট্যান্ডিং প্রডিউসার ইন টিভি সিরিজ। অ্যাওয়ার্ডটি প্রদান করে  উইমেন ইন মিডিয়া ফাউন্ডেশন। যুক্তরাষ্ট্রে নারী মিডিয়াকর্মীদের স্বীকৃতি প্রদানের লক্ষ্যে ১৯৭৫ সাল থেকে এ পুরস্কার প্রদান করে আসছে এ প্রতিষ্ঠানটি। মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজমে তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে জিতেছেন উটাহ সোসাইটি অব প্রফেশনাল জার্নালিস্ট অ্যাওয়ার্ড।

সফলতার কারণ

আল্লাহর অনুগ্রহকে তার সফলতার প্রধান কারণ বলে মনে করেন। তার কাজগুলো যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়। পাশাপাশি বাবা-মায়ের সমর্থনের কথাও জানান।

 

মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা

চাকরির ব্যস্ততার কারণে প্রতি বছর মাতৃভূমি বাংলাদেশে আসা হয় না। কিন্তু বুকের ভেতর সবসময় বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০০৮ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন। সে বছর তার বাবার প্রতিষ্ঠিত আবদুল হাই-আনোয়ারা বেগম বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে কথা বলেছিলেন। তারা তাকে ঘিরে ধরেছিল। তাসমিন মাহফুজ স্বপ্ন দেখেন, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন সাংবাদিকতায় মূলধারায় দেখবেন। সেখানে নিজের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবেন। বাংলাদেশিরা ফেসবুক এবং টুইটারের সৌজন্যে তার কাজের মূল্যায়ন এবং পরামর্শ দেবে। 

 

টেলিভিশন মিডিয়ায় নারীর চ্যালেঞ্জ

টেলিভিশন সাংবাদিকতায় গ্রাসিয়া অ্যাওয়ার্ডের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সম্মানজনক পুরস্কার জিতেছেন। কাজ করতে করতে বুঝেছেন, এ মাধ্যমেও নারীদের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কঠোর পরিশ্রম করলে সফলতা পাওয়া যায়। ‘এখন টেলিভিশন সাংবাদিকরা সবকিছু করতে জানেন এবং নারীদের তা প্রমাণ করার জন্য দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়।’




সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত
এই পাতার আরো খবর
up-arrow