Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ২ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১ জুলাই, ২০১৬ ২২:৫৬
বাবাকে মনে পড়ে
বাবাকে মনে পড়ে

ভালোবাসার আরেক নাম বাবা। বাবার সান্নিধ্যে এসে সন্তানের প্রাণ জুড়ায়। রাজনীতিবিদ পিতার ব্যস্তময় সময় সন্তানের কাছে অমূল্য। বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে অনেকেই এসেছেন রাজনীতিতে। সময়ের পালাবদলে অনেকের বাবা প্রয়াত হয়েছেন। ঈদ উৎসবে তারা মিস করবেন বাবাকে। রাজনীতিবিদ বাবার স্মৃতি নিয়ে এই আয়োজন তুলে ধরেছেন— মাহমুদ আজহার ও রফিকুল ইসলাম রনি

 

মোহাম্মদ সাঈদ খোকন-------------

ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ হানিফের ছেলে

প্রতিটি মানুষের জীবনে ঈদ মানেই বাড়তি আনন্দ। সে আনন্দ পরিপূর্ণ হয় যদি বাবা-মা বেঁচে থাকেন। আমিও আনন্দ পাই, তবে বাবার শূন্যতা আজও আমাকে কষ্ট দেয়। আমি নিজে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর অনুভব করি, বাবার প্রতিটি কর্মকাণ্ডকে। যেহেতু আমার বাবা ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র ছিলেন। জাতীয় ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজে রাষ্ট্রপতি অংশ নিতেন। তখন বাবা মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে রিসিভ করতেন। এখন আমি নিজেই ঈদ মাঠে নামাজ আদায় করতে আসা মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে রিসিভ করি। তখন বাবাকে খুব, খুব মিস করি। ঈদের আগে এবং পরে বাবাকে সব সময় ব্যস্ত থাকতে হতো। তিনি সব সময় নেতা-কর্মী, ঢাকার সাধারণ মানুষ নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। মাকেও সমান ব্যস্ত থাকতে দেখেছি। সে সময় মনে মনে খুব রাগ করতাম। বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের নিয়ে ঈদের দিন নানা জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যেত, সন্তানদের সময় দিত। আর আমার বাব-মা তা করতে পারতেন না। এখন দায়িত্ব পাওয়ার এখন অনুভব করি সেদিনের সেই রাগ করাটা অহেতুক। আমাদের পরিবার ছিল অনেক বড়। চাচা, চাচি, চাচাতো ভাইসহ বিশাল পরিবারে আমাদের বেড়ে ওঠা। যে কোনো ঈদে আমরা সবাই মিলে এক ধরনের পোশাক পরতাম। তবে ঈদে বাবাকে নিয়ে যে সময় কাটাব, সে সৌভাগ্য আমার হয়ে ওঠেনি। কারণ বাবা সব সময় মানুষকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। যখনই জাতীয় ঈদগাহ মাঠে যাই, তখনই বাবার সেই স্মৃতিগুলো ভেসে ওঠে। অনেক মিস করি বাবাকে। ছোটবেলার ঈদে যতদুর মনে পড়ে, আব্বা আমাদেরকে নিয়ে ঈদ মার্কেট করতে যাবেন এমন সময় পেতেন না। কখনো আম্মার সঙ্গে যেতাম, কখনো একা।

শামা ওবায়েদ-------------------------

বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে

বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের সন্তান ছিলাম আমি। আব্বা এতটাই ব্যস্ত ছিলেন, চাঁন রাতে খেয়াল হতো কাল ঈদ। তাড়াতাড়ি করে আমাদের নিয়ে আগের রাতে শপিংয়ে যেতেন। ফুপুদের জন্য শাড়ি কিনতেন। মা আগে থেকেই প্লান করে জামা-কাপড় কিনতেন। এখন বাবা নেই। আগের মতো ঈদের শপিংয়ের জন্য বায়নাও ধরি না। বাবার সেই শূন্যতাও এখনো অনুভব করছি। ঢাকায় আমরা আসাদ গেট এলাকায় বেশি ঈদ করেছি। পরে অবশ্য বনানীতে নিজ বাসায় ঈদ করতাম। আব্বা অনেকবার জেলে গিয়েছেন। তাই বাসাও বদল করা হতো। ওই সময় ঈদের যে আনন্দ হতো, এখন আর তা হয় না। এখন মনে হয়, অনেকটাই গতানুগতিক ঈদ উদযাপন করছি। ঈদুল ফিতরে চাঁন রাতে বাবার মনে হতো আমাকে শপিং করে দিতে হবে। হুরমুড় করে বাবার সঙ্গে শপিংয়ে যেতাম। আমি নিজে পছন্দ করে বাবার জন্য পায়জামা পাঞ্জাবি কিনে দিতাম। বাবা-মা আমার জন্য জামা-কাপড় কিনে দিতেন। আর ঈদের সকালের আনন্দটাই ছিল অন্যরকম। সকালে উঠেই বাবা নামাজ শেষে ঈদ সেলামি দিয়ে খুশি করতেন। সেই দৃশ্য আজও ভুলিনি। এখন পদে পদে বাবার শূন্যতা অনুভব করছি। এটা পূরণ হওয়ার নয়। ঈদুল ফিতর আমরা ঢাকায় করলেও কোরবানির ঈদ করতাম ফরিদপুরের নগরকান্দায়। সেখানে এলাকার মানুষদের নিয়ে বাবা কোরবানি দিতেন। আগে বাবার সঙ্গে আমিও কোরবানির গরু কিনতে যেতাম। এক পর্যায়ে বাবা এমন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন যে, তার সঙ্গে আর গরু কিনতে হাটে যাওয়া হয়নি। কোরবানির ঈদের দিন বহু মানুষ আসত আমাদের গ্রামের বাড়িতে। কেউই না খেয়ে যেতেন না। বাড়িতে এসব হই-হুল্লোড়েও আমি শৈশবে আনন্দ করতাম।

মো. জাহিদ আহসান রাসেল এমপি---------------------

প্রয়াত শ্রমিক নেতা আহসান উল্লাহ মাস্টারের বড় ছেলে

ধর্মীয় অনুশাসন পালনের জন্য আব্বা সব সময়ই আমাদের তাগিদ দিতেন। আমরাও পালন করতাম। মাহে রমজানে এক মাস রোজা শেষ করার পর যখন ঈদ আসত, তখন আনন্দই হতো। ঈদের দিন সকালে সবাইকে ঘুম থেকে উঠে জাগিয়ে দিতেন। আমাদের দুই ভাইকে মসজিদে ফজরের নামাজ পড়তে নিয়ে যেতেন। ঈদের মাঠে নামাজ শেষে আমাদের বংশের যেসব মুরব্বি মারা গেছেন তাদের কবর জিয়ারত করতে যেতাম। এখনো সেই সব কাজ করে যাই। এখন ঈদের জামাত শেষ করে আব্বার কবর জিয়ারত করি। আব্বার কবর জিয়ারত করার পর আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। বাবা থাকতে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকত, সেটা এখন আর নেই। চোখের সামনেই আব্বাকে মারা যেতে দেখেছি। আব্বা যেদিন মারা যান, সেদিন আমার ব্রিটিশ কাউন্সিলে পরীক্ষা ছিল। আমি ফোন করে বললাম, বাবা আমাকে দোয়া কর, সেদিন আব্বার ব্যবহূত গাড়ি আমাকে দিয়ে দিলেন। সারাদিন আমি ব্যবহার করলাম। সেই ভালোবাসা আজ চরম মিস করি। এখন আব্বা ছাড়া ঈদের পরিপূর্ণতা নেই বললেই চলে। ঈদের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই নাস্তা, পায়েস, ফিরনি খেয়ে বাবার সঙ্গে ঈদ মাঠে নামাজ আদায় করতে যেতাম। ঈদ মাঠ থেকে ফেরার পর অনেক নেতা-কর্মী আমাদের বাড়িতে আসতেন। বাবার সঙ্গে কুশলবিনিময় করতেন। আমরা তাদের আপ্যায়ন করতাম। ঈদে টঙ্গীর বাড়িতে বাবা নেতা-কর্মীদের সময় দিতেন। এ এলাকার মানুষগুলোকে পরম ভালোবাসতেন বাবা। আব্বাকেও তারা মন দিয়েই ভালোবাসতেন। ঈদের ছুটিতে তাদের সঙ্গে ঈদ করাটা যেন বাবার ঈদানন্দ ছিল। বাবাবিহীন এ ঈদে একটাই প্রার্থনা, আল্লাহ আমার বাবাকে জান্নাতবাসী করুন।

ভূঁইয়া নন্দিত নাহিয়ান স্বজন--------------------

বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার ছেলে

শৈশবের ঈদের মতো এখন আর আনন্দ খুঁজে পাই না। স্বাভাবিকভাবেই আমরা তা উদযাপন করছি। ওই সময় বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ছোটাছুটি আর হই-হুল্লোড় এখন আর করা হয় না। নিজের সংসার নিয়েই এখন আনন্দ করতে হয়। আজ বাবা নেই। আমার বড় ভাইও দেশে নেই। মাকে নিয়ে আমি এখন ঈদ উদযাপন করি। তবে বাবার শূন্যতা সব সময়ই অনুভব করি। ঈদের দিন বাবার সঙ্গে দলের নেতা-কর্মীরা দেখা-সাক্ষাৎ করতে আসতেন। আমরাও বিকালে বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে যেতাম। এখন আর আগের মতো আনন্দ নেই। ঈদ আসে ঈদ যায়। ঈদের দিন আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে মাঠে যেতেন বাবা। একসঙ্গে নামাজ আদায় করতাম। ঈদের দিন বড় ভাইকে বাবা এক হাজার টাকা ঈদ সেলামি দিতেন। আমাকে দিতেন পাঁচশ টাকা। শৈশবে এটাই অনেক ছিল। আসলে ছোট ছিলাম বলে বাবার প্রতি আবদারই ছিল নামাজের পর সেলামি। কম দেওয়ায় আমি বাবাকে কখনো প্রশ্নও করতাম না। ঈদের দিন বিশেষ করে ধানমন্ডি বাবার বন্ধু হায়দার আকবর খান রনো আঙ্কেলের বাসায় যেতাম। রমজানের ঈদ তো বটেই,  কোরবানির ঈদেও আমরা বেশ মজা করতাম। বাসার আশপাশে বিভিন্নজনকে মাংস বিলি করতাম আমি। এ নিয়েও আমার আনন্দ ছিল সীমাহীন। ঈদের পরের দিন বাবার সঙ্গে নরসিংদীর শিবপুরে যেতাম। বাবা সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কুশলবিনিময় করতেন। ঈদের আগে বাবা আমাদের বেলি রোডের বুক ফ্যাশনে নিয়ে গিয়ে জামাকাপড় কিনে দিতেন। বাবা নিজেও পায়জামা পাঞ্জাবি নিতেন। কিন্তু সেই আনন্দ, হই-হুল্লুড়, ছোটাছুটি কিছুই নেই। সবাই এখন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। শৈশবে আমরা ঈদ সেলামি পেতাম, এখন দিতে হয়।

 

আজিজুস সামাদ ডন-----------------

বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের ছেলে

ঈদ যেহেতু আমাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব তাই এটা সব সময়ই আনন্দের। ঈদ ঠিকই থাকে আর ঈদের আনন্দের মাত্রাও ঠিক থাকে, শুধু কালের আবর্তনে বদলে যায় মুখগুলো। আগে আমি ঈদ করতাম আমার বাবার সঙ্গে। এখন আমার সন্তানরা করে তাদের বাবার সঙ্গে। আমার বাবা আবদুস সামাদ আজাদ একজন আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ হওয়ায় জীবনের চলার পথে খুব কম সময় পেতাম বাবার কাছ থেকে। নিজ এলাকা, জাতীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে খুব ব্যস্ত থাকতেন। ঈদের সময়টা আমাদের সঙ্গে কাটাবার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। সেই সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময়ই বাবার পক্ষে আমাদের সঙ্গে ঈদ করা হয়ে উঠত না। কারণ, বাবার রাজনৈতিক জীবনের একটা বিশাল অংশ কেটেছে জেলে। তেমনি এক ঈদ ছিল ’৭৫-পরবর্তী ঈদ, বঙ্গবন্ধু ছাড়া ঈদ। সেটা ছিল ১৯৭৬ কী ৭৭ সালের ঈদ। বাবা রাজশাহী জেলে।

তখন আমার বয়স খুব বেশি হলে ১৪/১৫ বছর। ঢাকা থেকে রাজশাহী যেতে তখন প্রায় ২৪ ঘণ্টার উপর লেগে যেত। মাঝে এক রাত কাটাতে হতো পাবনায়। ঈদের দিন ঢাকা থেকে একা গিয়ে হাজির হই বাবার সামনে, রাজশাহী জেলে। তখনো সন্ধ্যা হয়নি। বাবা আমাকে দেখে খুব বিস্মিত হয়েছিলেন। ওই বয়সেও কোলে নিয়ে বসিয়েছিলেন। আসলে সন্তানরা সব সময়ই বাবা-মায়ের কাছ বাচ্চা। এখন বাবা-মা নেই। দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ঈদের নামাজ শেষে সরাসরি চলে যাই জননেত্রী শেখ হাসিনাকে সালাম জানাতে। তারপর চলে যাই বাবা-মায়ের কবর জেয়ারত করতে আর জীবিত আমার একমাত্র খালাকে সালাম জানাতে। বাবাহীন ঈদ যেন পানসে হয়ে আসছে। বাবার মৃত্যুর পর কিছু আনুষ্ঠানিকতা আমার ওপর এসে বর্তায়। এ সময় আমি আর আমার ছোটভাই পালা করে আমাদের গ্রামের বাড়িতে ঈদ উদযাপন শুরু করি।

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা-------------------

প্রয়াত ভাষাসৈনিক অলি আহাদের মেয়ে

বাবাকে সালাম করে আমার ঈদের দিন শুরু হতো। একমাত্র মেয়ের জন্য ঈদের আগে মার্কেট থেকে চুড়ি থেকে শুরু করে সবকিছুই আমাকে কিনে দিতেন বাবা। প্রতি ঈদের দিন সকালেই বাবা শাহবাগ থেকে আমার জন্য অন্তত ২০টি করে লাল গোলাপ কিনে নিয়ে আসতেন। শৈশব-কৈশোরে বাবার কথাগুলো আজও আমার কানে ভাসে।

বাবা আমাকে কোনো দিন বলেননি পরীক্ষায় প্রথম হতে হবে। কিন্তু জীবনের পথ চলার যে শিক্ষা তার পুরোটাই আমি পেয়েছি বাবার কাছ থেকে। তিনি কথাটি প্রতি দিন বলতেন, বারবার বলতেন, আমি দ্বিধায় ভুগলে বলতেন, আমার চোখে পানি দেখলে বলতেন। আমি ভীরু মেয়ে চাই না, সাহসী মেয়ে চাই। জীবনের চলার পথে এর চেয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা আর কি বা হতে পারে? তিনি আরও বলতেন গতস্য শোচনা নাস্তি অর্থাৎ যা হওয়ার হয়েছে, পেছনে তাকাতে নেই। কোনো কিছু করে ফেলার পর তা নিয়ে আক্ষেপ করে সময় নষ্ট তিনি ভীষণ অপছন্দ করতেন। দেশকে ভালোবাসতেন, দেশের মানুষ ছিল তার প্রাণ। আদর্শহীন, লুটেরা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে লড়াই করছেন, সর্বস্ব দিয়ে লড়েছেন। ক্ষমতার মোহ তাকে কোনো দিন স্পর্শ করেনি। কালো টাকা আর পেশিশক্তি সর্বস্ব রাজনীতিতে আপসহীন সংগ্রাম করে গেছেন আজীবন। এক জীবনে জেল খেটেছেন ১৯ বছর। বাবা ঈদের নামাজ পড়ে দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বাসায় এসে কোলাকুলি করতেন। মা ট্রিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। তার অফিসের কলিগ বা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গেও বাবা খোশগল্প করতেন। দুপুরে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে নিয়ে আমরা একসঙ্গে খেতাম। আমার নানা-নানিরা একই ফ্ল্যাটে থাকতেন। তাই ঈদের দিন বাবা-মা তাদেরও সালাম করতেন। আমি ফুফুদের সঙ্গে বেড়াতে যেতাম। বাবাও  দলীয় নেতা-কর্মী ও আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়াতে যেতেন।

নাহিম রাজ্জাক এমপি------------------------

আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আবদুর রাজ্জাকের ছেলে

যে কোনো ঈদে বাবাকে ঘিরেই ছিল সব। আমাদের কাছে তো বটেই, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, নিজ এলাকার নেতা-কর্মী, ভোটার, শুভকাঙ্ক্ষীসহ সবার মধ্যমণি ছিলেন বাবা। সবাই বাবার কাছে আসতেন, সালাম করতেন, কুশল বিনিময় করতেন। এখনো নিজ এলাকার নেতা-কর্মী আসেন— তবে বাবা বেঁচে থাকতে যেমন একটা জমজমাটভাব ছিল, আমাদের যে উচ্ছ্বাস ছিল, এখন সেটা নেই।

ঈদ এলে যে কথাটি সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে সেটা হলো, শীতের সকালের ঈদগুলোতে বাবার আদর। কারণ শীতের মধ্যকার ঈদগুলোতে ঘুম থেকে উঠতে চাইতাম না। তখন বাবা তার আদর দিয়ে আমাদের ঘুম ভাঙাতেন। গোসল করানো, নতুন জামা-কাপড় গায়ে দেওয়াসহ আতর মাখিয়ে দেওয়া তিনিই করতেন অধিকাংশ সময়। পরে একসঙ্গে ঈদগাহে নামাজ পড়তে যেতাম। নামাজ শেষে বাসায় এসে অনেক নেতা-কর্মী বাবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করতে আসতেন। আমাদের সেসব নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। পরে বাবার হাত ধরে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যেতাম। আবার কখনো বাবার বন্ধু জননেতা তোফায়েল আহমেদসহ অনেক সিনিয়র নেতার বাসায় যেতাম। আবার বাবা যখন গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতেন, তখন দেখতাম এলাকার সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করতেন। নামাজের আগে এলাকায় উন্নয়ন নিয়ে সবার সঙ্গে মতবিনিময় করতেন। আর নামাজ শেষে এলাকার মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময়। যদিও এখন বাবার অবর্তমানে সে কাজগুলো আমি পালন করি, কিন্তু তার জায়গা পূরণ করতে পারি না। তবে চেষ্টা করে যাচ্ছি। এখন বাবা ছাড়া জীবনটাই ভিন্ন আকারে চলে গেছে। এখন শীত থাকলেও নিজের তাগাদায় উঠতে হয়। ‘আর বাবা ঘুম থেকে উঠতে জোর করেন না। খুব ইচ্ছে করছে কদমবুচি করে আলিঙ্গন করতে তোমার সঙ্গে। জানি আমার এ ইচ্ছেগুলো পূরণ হওয়ার নয়। ’

ড. খোন্দকার আকবর হোসেন বাবলু--------------

বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে

ঈদে পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় বাবার সঙ্গে নামাজ পড়তাম। সেখানেও নেতা-কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে ব্যস্ত সময় কাটাতেন। কষ্ট পেতাম না। বাবার প্রতি নেতা-কর্মীদের ভালোবাসা ছিল অনেক বেশি। এ নিয়ে কষ্টবোধ করতাম না। বাসায় এসে বাবা ও মাকে সালাম করতাম। আমরা চার ভাই, দুই বোন। সবাইকে বাবা ঈদ সেলামি দিতেন। এখন আমাদের সন্তানদের দিতে হয়। আমি সবার বড় ছিলাম। কোরবানির ঈদে আরমানিটালোয় আমরা দুটি খাসি কোরবানি দিতাম। পরের দিন বাবা আমাদের নিয়ে মানিকগঞ্জের ঘিওরে গরু কোরবানি করতেন। বাবা যখন বিএনপির মহাসচিব তখন দলের নেতা-কর্মীদের নিয়েই বেশি সময় ব্যস্ত থাকতেন। আমরাও বাবাকে বিরক্ত করতাম না। তবে বাবা আমাদের ঈদের দিন একসঙ্গে নিয়ে ঈদগাহে যেতেন। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ বিভিন্নজনের সঙ্গে কোলাকুলি করতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর তার শূন্যতা আমরা অনুভব করছি। এখন খুবই কষ্ট লাগে। বাবাকে ছাড়াই ঈদগাহে যেতে হচ্ছে। তবে মেনে নেওয়া ছাড়া আর কি বা করার আছে। বাবা খুবই সাধারণ পোশাক পছন্দ করতেন। পাজামা-পাঞ্জাবি ছিল বাবার পছন্দের পোশাক। আমাদেরও ঈদে পাজামা-পাঞ্জাবি কিনে দিতেন। এখন আমরা বাবাকে খুব মিস করি। ঈদের দিন আরমানিটোলার বাসায় আমাদের বন্ধুবান্ধবরা বাবাকে সালাম করতেন।

ব্যারিস্টার নিজাম উদ্দিন জলিল জন-----------

আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আবদুল জলিলের ছেলে

ঈদ আসে, ঈদ যায়। পবিত্র রমজানের ঈদে আব্বু নিজ হাতে এলাকার মানুষের মধ্যে শাড়ি-কাপড়, জামা, লুঙ্গি, ঈদসামগ্রী বিতরণ করতেন। এখন আমি নিজেও করি। তবে আব্বু যখন জীবত ছিলেন, তখনকার ঈদের আনন্দই আলাদা। এখনো ঈদের আনন্দ হয়, তবে একটা শূন্যতা থাকে। ঈদের সময় আব্বুর পাশে পাশে থাকতাম। সকালে ঘুম থেকে উঠতাম, আব্বাকে সালাম করে দোয়া নিয়ে তারপর গোসলখানায় ডুকতাম। ঈদগাহে যাওয়ার আগে আব্বার সঙ্গেই ওপর থেকে নিচ তলাতে নামতাম এবং ঈদ মাঠে যেতাম। ঈদ নামাজে মাঝখানে আব্বা, ছোটভাই সব সময় ডানে, আব্বা আর আমি বামে থাকতাম। পাশে বসে নামাজ আদায় করে মানুষের সঙ্গে কোলাকুলি করার পর একসঙ্গে দাদা-দাদির কবর জিয়ারত করতে যেতাম গ্রামের বাড়িতে। তারপর বাসায় ফিরে খানা খেতাম। তবে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে রমজান মাস শুরু থেকেই আব্বু আমাদের সঙ্গে ইফতার করতেন এবং সাহরি খেতেন। আব্বু ডাইনিং টেবিলের যে চেয়ারে বসতেন, সেই চেয়ারটি আজও ফাঁকা, কেউই বসেন না। যখনই খেতে বসি, তখনই চেয়ারের দিকে তাকিয়ে থাকি, আর মিস করি, যদি এক মিনিটের জন্য আব্বু এসে বলতেন, ‘নিচ্ছ না কেন? এত কম খেলে হবে না, শরীর স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে হলে খেতে হবে। মাছের মাথাটা তুমিই খাও, আর একটা মাংস উঠিয়ে নাও। ’

এম নাসের রহমান------------------

বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রয়াত সদস্য এম সাইফুর রহমানের ছেলে

আমার বাবা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। বাবার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায়। বিশেষ করে ঈদে বাবার সঙ্গে মধুর স্মৃতি আজও আমাকে নাড়া দেয়। এখনো ভুলতে পারি না শৈশব-কৈশোরে বাবার সঙ্গে থাকা স্মৃতিগুলো। বাবার সঙ্গে ঈদুল ফিতর আমরা গুলশানের বাসায় করতাম। কোরবানির ঈদ মৌলভীবাজারে করতাম। আমরা চার ভাই। এখন আমি ছাড়া সবাই দেশের বাইরে। ঈদ কাটে। বাবার শূন্যতা এখন খুবই পীড়া দেয়। গ্রামের বাড়িতে ঈদের মাঠে বাবা আমাদের সঙ্গে নিয়ে যেতেন। ঈদের মাঠে গেলে বাবার কথা বারবার মনে পড়ে। ঈদ আসলেই মনে হয় বাবা আমার পাশে আছেন।

পারিবারিক রেওয়াজ অনুযায়ী এখনো ঈদে গ্রামের বাড়ি যাই। সেখানে নেতা-কর্মী আত্মীয়স্বজনসহ সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে ঈদ-উদযাপন করি। আমাদের ঈদের জামা মূলত মা কিনে দিতেন। বাবা ব্যস্ত থাকতেন। রোজার ঈদে বাবার কাছ থেকে ঈদ সেলামি পেতাম। এখন আমাদের ঈদ সেলামি দিতে হয়। শৈশব-কৈশোরের সেই আনন্দের ঈদ আর এখন উপভোগ করি না। এখন পরিবার আর রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটে। অবশ্য এর মধ্যেও নিজেদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিই। ভাই বোনেরা ও সঙ্গে নেই। তাই ঈদ অনেকটাই স্বাভাবিকভাবেই কাটে। বাবা হারানোর শূন্যতা আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত
এই পাতার আরো খবর
up-arrow