Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৭

প্রকাশ : শনিবার, ১৬ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৫ জুলাই, ২০১৬ ২১:৪৯
ছেলেবেলাপুর
আমি অভিভূত
এক কথায় রফিকুন নবী
সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি
আমি অভিভূত
প্রবীণ চিত্রকর ও কার্টুনিস্ট রফিকুন নবী

ছোটবেলায় একটু আধটু দুষ্টুমি সবাই করে থাকে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তার ছোটবেলাও ছিল এমন অনেক দুষ্টু-মিষ্টি ঘটনায় ভরা। কিন্তু কেউ যদি বলে বসেন ছোটবেলা কেন, জীবনে কখনোই কোনো দুষ্টুমি করেননি তিনি তাহলে একটু খটকা কি লাগে না? অবশ্যই লাগে। কিন্তু এই সাদা চুল-গোঁফে ভরা মানুষটিকে যতই প্রশ্ন করা হোক, যতভাবেই প্রশ্ন করা হোক না কেন, তার একটাই উত্তর—

আমি ছোটবেলায় খুব শান্ত ছেলে ছিলাম। একদম দুষ্টুমি করিনি কখনো।

দুষ্টুমি না হয় না-ইবা হলো, কোনো খেলাধুলাও কি করা হয়নি ছোটবেলায়?

উত্তর দিতে গিয়ে মুখটাকে স্বভাবসুলভ গম্ভীর ভঙ্গিতে ধরে রাখার চেষ্টা করেন সামনের মানুষটি। কিন্তু তারপরও হালকা শিশুসুলভ হাসির আভাস যেন গালের ফাঁক দিয়ে ঠোঁটের কোনায় এসে জুড়ে বসে। আরও গম্ভীর সুরে জানান তিনি, না! খুব বেশি খেলাধুলাও করা হয়নি তার ছোটবেলায়। তা হলে কেমন করে সময়গুলো কাটত বাংলাদেশের অন্যতম প্রবীণ চিত্রকর ও কার্টুনিস্ট রফিকুন নবী বা বহুল পরিচিত টোকাইখ্যাত রনবী?

‘ছোটবেলায় বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে জায়গা বদল করে। অনেকগুলো স্কুলে পড়ার সুযোগ হয়েছে আমার বাবার চাকরির সুবাদে। বাবা ছিলেন পুলিশ। দাদাও ছিলেন পুলিশ। তাই কিছুদিন পরপর বাবার সঙ্গে সঙ্গে জায়গা বদলে নতুন স্কুলে ভর্তি হতাম। পুরনো জায়গা, পুরনো মানুষকে ছেড়ে এসে নতুনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে নিতেই সময় পার হয়ে যেত। ’

এভাবে ঠিক কতগুলো জায়গা ঘুরতে হয়েছে ছোটবেলায়? প্রশ্নের উত্তরে কিছু সময় স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান। অনেকগুলো নামের ভেতরে ভেসে আসে তার কণ্ঠে সিংড়া, ফতুল্লা, বিক্রমপুরের লৌহজং, মানিকগঞ্জের শিবালয় আর ঢাকার কালীগঞ্জের কথা।

‘ঢাকায় অনেক দিন ধরেই আছি আমি। সেই যে পঞ্চাশের দশকে এখানে স্কুলে ভর্তি হলাম। তারপর থেকে এখানেই। পুরান ঢাকায় থাকতাম তখন। এসএসসি পাস করলাম পুরান ঢাকার পোগোজ হাইস্কুল থেকে। এরপর ভর্তি হলাম ঢাকার সরকারি আর্ট কলেজে। সেটাও ১৯৫৯ সালের কথা। এরপর তো কত সময়ই কেটে গেল। ’

১৯৬৪ সালে স্নাতক পাস করে ১৯৭৩ সালে গ্রিসের ‘এথেন্স স্কুল অব ফাইন আর্টসে’ পড়তে চলে যান এই চিত্রকর। এরপর একে একে প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ড্রইং পেইন্টিং বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন রফিকুন নবী। অর্জন করেছেন অনেক পুরস্কার। পেয়েছেন পৃথিবীজোড়া সম্মান, খ্যাতি আর ভালোবাসা। তার হাত ধরে আলোর মুখ দেখেছে বিখ্যাত কার্টুন টোকাই।

তবে এটুকু কেবলই তার জীবনের পরের অধ্যায়টুকু। আজকের যে রনবী তার শুরুটা তৈরি হয়েছিল অনেক অনেক আগে সেই ছোট্টবেলায়। বাবার হাত ধরে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নানাবাড়ির গ্রামেই বেশির ভাগ সময় কেটেছে রনবীর। সেসময় সবাই বাবা আর দাদার মতো পুলিশ হওয়ার জন্য উৎসাহ দিলেও একমাত্র বাবাই বলতেন— ‘আর যাই কর, পুলিশ হবা না। ’

শুধু বাবা না। বাবার পাশে সবসময় বিনা বাক্যব্যয়ে সব কাজে নীরব সম্মতি দিয়ে গেছেন মাও। নিজের ইচ্ছাতেই আঁকা ছবিগুলো দেখে উৎসাহও দিত বাড়ির বড়রা। ফলাফল হয়েছিল, ছবিকেই খুব বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলেন তিনি।

‘আমাদের সময়ে তো আর এখনকার মতো স্কুলে সব বাচ্চাদের ছবি আঁকতে দেওয়া হতো না। তাই স্কুল থেকে নয়, বাসা থেকেই উৎসাহটা পেয়েছি। ’

নিজের সবটা কৃতিত্বের দাবিদার হিসেবে পরিবারকে এগিয়ে রাখেন এই চিত্রকর। তবে বর্তমান সময়ে বাচ্চাদের পরিবার আর আগের মতো নিজেদের সৃজনশীলতার দিকে অতটা উৎসাহ দিতে পারছে না বলে মনে করেন রনবী।

‘কি করে দেবে? এখনকার বাচ্চাগুলো তো হরেক রকম প্রযুক্তি নিয়ে ব্যস্ত। টিভি, মোবাইল, কম্পিউটার— এগুলো নিয়েই মেতে থাকে। আমার নাতি-নাতনিরা সেই দূর দেশে বসে। আমার এখানে এলে ছবি আঁকতে চায় খুব। বলে, ছোট ক্যানভাস নয়, বড় ক্যানভাস লাগবে। খুব শখ ছবি আঁকবার। মাঝে মাঝে আমার আঁকা ছবির সমালোচনাও করে ওরা। কিন্তু তাদের উৎসাহ দেওয়ার সুযোগ কই আমার?’ নিজের ছোটবেলার সঙ্গে এখনকার প্রজন্মের ছোটবেলার তুলনা করতে গিয়ে একটু ক্ষুব্ধ স্বরেই মতামত জানান প্রতিভাবান এই কার্টুনিস্ট।

একটা সময় ঘরভর্তি মানুষে অভ্যস্ত চিত্রকরের আজ ঘরে খুব বেশি শোরগোল নেই। স্ত্রী আর ছোট ছেলেকে নিয়ে ছোট্ট সংসার। প্রায় সময় ছবি আঁকা, লেখালেখি আর নতুন সব প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। ঘুরে আসতে হয় দেশ-বিদেশের ডাকে। তবে তার ভেতরে পাওয়া অখণ্ড অবসরগুলোতে গান শুনতে খুব ভালোবাসেন তিনি।

‘পুরনো দিনের গান শুনতে খুব ভালো লাগে। এখনো গানের সিডি কালেক্ট করি। বাবাকে দেখতাম গান শুনতে। তখন তো আর আজকের মতো এত ভালো প্রযুক্তি ছিল না। বাবা কলের গান শুনতেন। সেটাই শুনতাম। সেসব গান যেন কানে লেগে আছে। এখনো সেগুলো শুনি। ’

তবে কেবল গান নয়। খেতেও খুব পছন্দ করেন রনবী। এখন যদিও সেভাবে কিছু খেতে পারেন না। নানারকম অসুখ এসে কমিয়ে দিয়েছে খাওয়ার সেই পরিধি।

তবে সেরা রান্নার কথা বলতে গিয়ে ছোটবেলায় খাওয়া দাদির হাতের রান্নার কথা উল্লেখ করেন তিনি। সেই সঙ্গে মায়ের হাতের সব রান্না তো রয়েছেই।

সেই ছোটবেলায় হাতে রং-পেন্সিল তুলে নিয়েছিল ছেলেটি। একটু একটু করে সেই পেন্সিল আর রং-ই তাকে এনে দিয়েছিল দুনিয়াজোড়া খ্যাতি।

আজও সেই পেন্সিল চলছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যদিও হাতটার বয়স বেড়েছে যদিও। তবু ছবি কিংবা মন? বয়স বাড়েনি কারোরই। মনের বয়স বাড়ে না— যথার্থই বলেছেন এই চিত্রকর।

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত
এই পাতার আরো খবর
up-arrow