Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:৫৪
ফিচার
বিশ্ব আসরের স্বেচ্ছাসেবী
বিশ্ব আসরের স্বেচ্ছাসেবী
সাকিবের পেছনে টেনিস স্টেডিয়াম

শেষ হয়ে গেল বহু বর্ণের সম্মিলিত মেলা রিও অলিম্পিক। খেলোয়াড়দের পাশাপাশি বহু স্বেচ্ছাসেবক এসেছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। বাংলাদেশের আইনুল ইসলাম সাকিব ছিলেন তাদের মধ্যে। রিও অলিম্পিক নিয়ে জানিয়েছেন তার অভিজ্ঞতার কথা। লিখেছেন— নাদিম মজিদ

 

আইনুল ইসলাম সাকিব, অলিম্পিকের মতো বিশ্ব আসরের স্বেচ্চাসেবকের দায়িত্ব পালন করেছেন। যোগ্যতা থাকলে স্বাগতিক দেশের বাইরে যে কেউ স্বেচ্ছাসেবক হতে পারে সাকিব তার প্রমাণ। ২০১৪ সালে রিও অলিম্পিকে স্বেচ্ছাসেবক নেওয়ার ঘোষণার পরই ডেডলাইনের আগে আবেদন করেন সাকিব। অলিম্পিকে স্বেচ্ছাসেবার দায়িত্ব পালন বেশ সম্মানের কাজ। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রচুর আবেদন জমা পড়ে। সেখান থেকে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে স্বেচ্ছাসেবী চূড়ান্ত হয়।

 

২০১৫ সালের নভেম্বর, হালকা শীতের মাঝরাতে মোবাইলে বেজে ই-মেইল অ্যালার্ট। ঘুম ভাঙা চোখে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে রিও-অলিম্পিকের মেসেজ অ্যালার্ট। রিও অলিম্পিক কর্তৃপক্ষ তাকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নির্বাচন করেন। এ তো শুধু আনন্দই নয়, মহাআনন্দ। এরপর থেকে দিন গোনা শুরু। বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করার অপেক্ষা। হাজারও উত্তেজনা আর অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় ৫ আগস্ট। ভয়ানক সুন্দর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু হয় বিশ্ব আসরের যাত্রা।

 

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

মারকানা স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাকিবের দায়িত্ব ছিল স্টেডিয়ামের বাইরে। ড্রেস রিহার্সেলের টিকিট দেওয়া হয়েছিল তার দলকে। ওটার টিকিট নিয়েও মারামারি অবস্থা। গোটা স্টেডিয়ামের আশপাশে বাংলাদেশি তো দূরে থাক, এশিয়ান খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। এমনি এক আসরে লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন সাকিব। অলিম্পিকে যাওয়ার আগেই শুনেছিলেন এতে লড়ছে দেশের আলোচিত রাশিয়ান-বাংলাদেশি মার্গারিতা মামুন। ১৯ আগস্ট ছিল রিদমিক জিমন্যাস্টিকসের ইনডিভিজুয়াল কোয়ালিফায়ার রাউন্ড। সাকিবের কাজ ছিল অ্যাথলেটদের অলিম্পিক ভিলেজে বাস ট্রান্সপোর্টের সময়সূচি নিয়ন্ত্রণ করা। এই সুবাদের প্রতিটা অ্যাথলেটই তাকে ক্রস করে যেতে হবে। অপেক্ষায় ছিলেন মার্গারিতার সঙ্গে দেখা হওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণের। দেখা করার উত্তেজনায় তিনি রাতের খাবারও খাননি। দিনটি ছিল কোয়ালিফাইং রাউন্ড। বাংলার বাঘিনি ছিল টপে। অনেক অপেক্ষার পর রাত সাড়ে আটটায় দেখাও হয়ে গেল। অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করেন আপনি বাংলা বলতে পারেন? তার নেতিবাচক উত্তর শুনে সাকিব বলেন, আপনার জন্য একটা উপহার আছে বলেই বুক পকেট থেকে বাংলাদেশের পতাকা বের করে তাকে দেন সঙ্গে তুলে রাখেন একটি ছবি। যাওয়ার সময় বলেন, ‘আমার দেশে আপনার অনেক ভক্ত আছে। সবার প্রার্থনা গোল্ডটা যেন আপনার হয়। তার ঠিক পরের দিনই বাংলার বাঘিনি মার্গারিতা পেলেন অলিম্পিকের সর্বোচ্চ সম্মান গোল্ড মেডেল। সাকিব দেশের হয়ে মার্গারিতাকে অভিনন্দনও জানাতে ভোলেননি।

 

কয়েকটি মজার ঘটনা

স্বেচ্ছাসেবীদের বসে থাকার জোগাড় নেই। গোটা অলিম্পিকজুড়েই ছিল তাদের ব্যস্ততা। এর মধ্যে মজার ঘটনাও নেহায়েতই কম নয়। মজার ঘটনা বলতে গিয়ে সাকিব বলেন, ‘ব্রাজিলের শিক্ষার হার ৯৫% হলেও খুব কম লোকই ইংরেজি বলতে পারেন। সবাই পর্তুগিজে অভ্যস্ত। বাসার পাশের একটি সুপারশপে পরের দিনের নাস্তা কিনে আনার জন্য যাই। মূলত চকোলেট আমার খুবই প্রিয়। সুপারশপে ইংরেজি বলারও কেউ নেই। ছবি দেখেই আন্দাজ করতে থাকি আসলে জিনিসটা কি। হাতে একটা প্যাকেট নিলাম, পর্তুগিজ ভাষা না জানার কারণে উপরে চকোলেটের ছবি দেখেই কিনে বাসায় চলে আসি। পরেরদিন সকালের নাস্তা করার জন্য প্যাকেট খুলে দেখি এটা আসলে কেক নয়! কোকো পাউডার।’ অলিম্পিকের মতো আসরে মজার ঘটনা থাকবে না তা কি হয়! অ্যাথলেট গেট ব্যবহারের নিয়মিত ঘটনাও রয়েছে মজার তালিকায়। ‘সাংবাদিক আর অলিম্পিক পরিবারের সবাই চাইত অ্যাথলেট গেট ব্যবহার করে ভেন্যুতে প্রবেশ করা। কারণটা সহজেই অনুমান করা যায়। ভুল করে আর ইচ্ছে করেই বলত, তারা আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির আমি অমুক-তমুক। আসলেই তারা ভিআইপি, কিন্তু আমি তো তাদের অ্যাথলেট এন্ট্রি দিয়ে ঢুকতে দিতে পারি না। আমি বলতাম আপনার জন্য প্রিভিলেজড গেট আছে ওটা কেন ইউজ করবেন না? তারাও খুশি, আমিও খুশি। এই নিয়ে আমাদের ভিতর খুব হাসাহাসি হতো। আমি ব্যাপারগুলো ভালোভাবে সমাধান করতে পারতাম।’

 

বিশ্বজোড়া বন্ধুত্ব

অলিম্পিকের মূল উদ্দেশ্য বিশ্বের সব দেশের মাঝে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা সবাই এ সুযোগটি কাজে লাগাতে ভোলেনি। সে তালিকায় বাদ যাননি সাকিবও। ‘ব্রাজিলের মানুষ অনেক বন্ধুভাবাপন্ন। স্বেচ্ছাসেবীদের ভিতর একজন খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেল। সাকিব বলেন, ‘আমি যে বাসায় উঠেছিলাম সেটি পরিবর্তন করার কথা ছিল। নতুন বাসায় গিয়ে দেখি পুরনো বাসাই অনেক ভালো। ব্রাজিলিয়ান বন্ধুকে বলার পর সে আমাকে তার বাসায় তুলে নিল। তার পরের প্রায় ১০ দিনের মতো তার বাসায় ছিলাম তার পরিবারের সঙ্গে। ওর বাবা-মা-ভাই সবাই আমাকে ওদের পরিবারের সদস্যদের মতো বাসায় রেখেছিল। ওদের বাসা দোতলা। নিচতলায় রুম আছে, কিন্তু কেউ থাকে না। দেখা গেল, গৃহহীন আমি থেকে গোটা একটা অ্যাপার্টমেন্ট পেয়ে যাই বিনামূল্যে।’ তাছাড়া অ্যাথলেটদের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবীদের ছিল পেশাদার সম্পর্ক। কাজের বাইরে কোনো কথা নেই। তারা বললে যেন হেসে কথা বলি। তারা বিরক্ত হয় এমন কিছু করা যাবে না। তারপরও পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তাদের সঙ্গে ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে স্বেচ্ছাসেবীদের। অনেকের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুক্ত হয়েছেন। তারপরও কিছু বলতে বা করতে সাকিবের ভয় হতো। নেতিবাচক কিছু ঘটলে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হবে। কেননা ব্যক্তি সম্পর্কের চেয়ে দেশের সম্মানটা বেশি জরুরি বলে সাকিব মনে করেন।

 

বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের পরিচয়

বাংলাদেশ বিশ্বের শান্তিপ্রিয় দেশ হওয়ায় গোটা বিশ্বেই দেশটির সুনাম রয়েছে। সাকিব ব্রাজিলে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে দেশের দূত হিসেবেই কাজ করেছেন। সাকিব বলেন, ‘অনেকে বাংলাদেশকে ঠিক মতো চিনেন না। আবার অনেকে বাংলাদেশের নাম শুনে ম্যাপে দেখে আন্দাজ করতে পারেন। অনেকে মনে করে বাংলাদেশ ভারতের একটি অংশ। এসব শুনলে মাঝে মাঝে মেজাজ খারাপ হয়ে যেত। মাঝে মাঝে পাসপোর্ট বের করে বলতাম, দুটি এক দেশ নয়। একবার একজন তো বলেই বসল, আমার দেশের সিনেমা নাকি তার পছন্দের।’ শুনে অন্য সব দেশপ্রেমীদের মতো সাকিবেরও বুক ভরে যেত। আরেকটি ঘটনা সম্পর্কে সাকিব বলেন, ‘একদিন দুই অ্যাথলেটকে বাস চেনাতে অনেক দূর হাঁটতে হয়েছিল, এই ফাঁকে বাংলাদেশ নিয়ে কথা হলো। আমিও তাদের দেশ চিনি না, তারাও আমায় চেনে না। একজন বলে বসল, আই নো দ্য ফিল ব্রো! অনেকে বাংলাদেশ না চিনলে বলতাম, মাঝে মাঝে নিজের পরনের কাপড় উল্টে একটু পরখ করে দেখ, মেইড ইন বাংলাদেশ লেখা থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আমাদের পোশাক শিল্প যে অনেক উন্নত। আবার অনেকে ক্রিকেটের খবর রাখলে সাকিব-আল হাসান কিংবা তামিম ইকবালের কথা বলে বসত। অনেক পতাকা নিয়ে গিয়েছিলাম। অনেককে আবার পতাকাও দিয়েছি সু্যুভেনির হিসেবে। ব্যাপারটা এমন, মনে না রেখে যাবি কই?’

 

পজিটিভ ব্রাজিল

ব্রাজিলের রাস্তা-ঘাট চোখে পড়ার মতো। রাস্তার ধারে জটলা বাধা ব্যুলেভার্দে মিউজিক বাস্কিং। আবার হঠাৎ বেজে ওঠা সুরে দল বেঁধে নাচা উপভোগ করার মতো। ওরা আসলেই সংস্কৃতিপ্রেমী। ছেলে-বুড়ো সবাই একসঙ্গে নাচে। যা বেশ উপভোগ্য।

 

স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে রিও অলিম্পিকে যাওয়া সাকিবের বড় অর্জন অলিম্পিকের মতো বিশ্ব আসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা। যা ছিল সবচেয়ে গর্বের বিষয়।

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত
এই পাতার আরো খবর
up-arrow