Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০১:১৪
নতুনের জয়গান
মেহযেব চৌধুরীর ভার্চুয়াল রোবট
বাংলাদেশি গবেষকের আবিষ্কার
তানভীর আহমেদ
মেহযেব চৌধুরীর  ভার্চুয়াল রোবট

মেহযেব চৌধুরীর ভার্চুয়াল রোবটটি প্রদর্শন করেছে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়। এই রোবটটি মূলত ক্রাইম সিন পর্যবেক্ষণে সহায়তা করবে। বিচারকরা আদালতে বসেই ক্রাইম সিন ঘুরে আসতে পারবেন রোবটটির সাহায্যে। এটি ৩৬০ ডিগ্রি রেখায় অর্থাৎ ঘটনাস্থলের চারদিকের ভিডিওচিত্র ধারণ করতে পারে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রোবটটির দক্ষতা বাড়িয়েছে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দেশিত পথে চলতে পারে।  রোবটের চলার পথে কোনো বাধা থাকলে এটি সহজেই এড়িয়ে যেতে পারবে। ফলে ক্রাইম সিনে গুরুত্বপূর্ণ আলামত যেমন রক্তের ওপর দিয়ে রোবটটি হাঁটবে না। পুরো ক্রাইম সিনের ছবি পাঠাতে পারবে এটি। অল্প জায়গায় দাঁড়িয়ে ক্রাইম সিন পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা এই রোবটের সর্বোচ্চ বলেই মানছেন গবেষকরা

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি নিয়ে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানী গবেষকদের নিরন্তর প্রচেষ্টায় ভার্চুয়াল রিয়েলিটির যে দ্বার উন্মুক্ত হচ্ছে তাতে আগামী দিনের প্রযুক্তি হয়ে উঠবে আরও কার্যকরী। সে পথেই ভার্চুয়াল রোবট এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি নিয়ে নানা রকম উদ্ভাবন আলোচনায় এসেছে। ভার্চুয়াল রোবট নিয়ে সম্প্রতি প্রশংসায় ভাসছেন যে গবেষক তার নাম মেহযেব রহমান চৌধুরী। বাংলাদেশি এই গবেষকের ভার্চুয়াল রোবটের নাম ম্যাবম্যাট। বাংলাদেশি তারুণ্যের সাফল্যের গল্প বরাবরই আমাদের চমকপ্রদ করে। ব্যক্তিগত সাফল্য তো বটেই, বাংলাদেশের নামও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পায় মর্যাদা।

 

গবেষক মেহযেব রহমান চৌধুরীর এই ভার্চুয়াল রোবট যে কারণে সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হাচ্ছে তা হলো— অপরাধ তদন্তে নতুন সংযোজন। এই আবিষ্কারে তাকে সহায়তা করেছেন তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মীরা। ভার্চুয়াল রোবটের সহায়তায় অপরাধ তদন্ত পরিদর্শনে কার্যালয়ে বসেই ‘ক্রাইম সিন’ দেখতে পারবেন বিচারক ও তদন্ত কর্মকর্তারা। এই রোবট বিচারকদের প্রকৃত ক্রাইম সিনটিই ভার্চুয়ালি তুলে ধরতে সক্ষম। মূলত ভার্চুয়াল রিয়েলিটি সিস্টেম এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা একটি ক্রাইম সিনের বিস্তারিত ভিডিও ফুটেজ ধারণ করবে। দূর  থেকে নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে বিচারকরা এমনভাবে ক্রাইম সিনটি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন যেন তারা ঘটনাস্থলের মাঝেই রয়েছেন। আদালত কক্ষ ছেড়ে তাদের  বের হতে হবে না— এই বিশেষত্বই ভার্চুয়াল রোবটটি প্রযুক্তিবিদদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

 

তার ভার্চুয়াল রিয়েলিটি রোবট আবিষ্কারের খবর ইতিমধ্যে ইংল্যান্ডসহ প্রযুক্তি জগতের খবরাখবর প্রকাশ করে এমন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। ইংল্যান্ডের প্রধান পত্রিকাগুলো ছাড়াও বিশ্বখ্যাত গবেষণা পত্রিকাগুলো ছেপেছে এ খবর। ‘দ্য কনভারসেশন’-এ প্রকাশিত একটি লেখায় তিনি তার বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। এ লেখার ওপর ভিত্তি করে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ইংল্যান্ডের ডেইলি মেইল, বিজনেস ইনসাইডারসহ একাধিক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম। তার সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছে রাশিয়ার স্পুটনিক রেডিওতে। ডেইলি মেইল শিরোনাম করেছে ‘ভার্চুয়াল রিয়েলিটি রোবটস কুড সামডে টেলিপোর্ট জুরিস টু গ্রুসাম ক্রাইম সিনস টু ইনভেস্টিগেট মার্ডারস।’ দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী এবং সংবাদপাঠক মাহবুবা চৌধুরীর একমাত্র সন্তান তিনি। পড়াশোনায় ভালো করেছেন বরাবরই। যুক্তরাজ্য থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে ২০১০ সালে ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরেছিলেন। ব্যারিস্টার রফিকুল হকের সঙ্গে সে সময় কাজ করেছেন।

 

সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছেন ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এ। ২০১২ সালে অপরাধ তদন্ত বিষয়ে পড়াশোনা করতে আবারও আসেন লন্ডনে। ডারহাম ইউনিভার্সিটিতে অপরাধ তদন্ত বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে সেখানেই তিনি পিএইচডি করছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির স্কুল অব অ্যাপ্লায়েড সোশ্যাল সায়েন্সের একজন গবেষক ও শিক্ষক।

 

মেহযেব চৌধুরী এই সিস্টেমটি তৈরি করেছেন নাসার কিউরোসিটি মার্স রোভার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। এটি ৩৬০ ডিগ্রিতে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে পারে। এসব ভিডিও ও ছবি যে কোনো কম্পিউটার ও স্মার্টফোনে দেখা সম্ভব। এতে খুব শক্তিশালী কোনো ডিভাইস প্রয়োজন হয় না। আর এটা একটি ক্রাইম সিনের ছবি প্রতিটি কোণ থেকে নিখুঁতভাবে ধারণ করতে সক্ষম। এ সিস্টেমটি ব্লুটুথ রিমোট, স্মার্টফোন বা ট্যাব দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এই ম্যাবম্যাট তৈরি করতে সময় লেগেছে মাত্র এক মাস। একেবারেই নিজস্ব পরিকল্পনা এবং চেষ্টা ও অর্থায়নে তিনি এই রোবট তৈরি করেন। তাকে সহায়তা করেছেন তার বিশ্ববিদ্যালয় ও সহকর্মীরা। যুক্তরাজ্যের ৪০টি পুলিশ বিভাগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১০টির বেশি পুলিশ বিভাগ অপরাধ সংঘটন স্থানের তথ্য দিয়ে তাকে সাহায্য করেন। মাত্র ৮ মেগা পিক্সেলের ১৭০ ডিগ্রির দ্বৈত  লেন্সের দুটি ক্যামেরাকে সামনে-পেছনে লাগিয়ে বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে তিনি ৩৬০ ডিগ্রি রেখায় ভিডিও ধারণের ব্যবস্থা করেছেন। এতে তিনটি সেন্সর রয়েছে। বিশেষ অ্যাপ কিংবা রিমোট কন্ট্রোলার দিয়ে ম্যানুয়ালি এবং নির্দেশিত পথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এটি চালানো যায়। সবকিছুকে প্রোগ্রাম দিয়ে সমন্বয় করা হয়েছে।

 

প্রকৃত ঘটনা উন্মোচনে বিচারকরা যেন আদালতে বসেই ক্রাইম সিন দেখতে পারেন সে জন্য ঘটনাস্থলের ৩৬০ ডিগ্রি ছবি ধারণ, রোবটিক ও কৃত্রিম গোয়েন্দা ব্যবহার যুগোপযোগী সমাধান। এই আবিষ্কার নিয়ে মেহযেব রহমান চৌধুরী ‘দ্য কনভারসেশন’-এ তুলে ধরেছেন—

একদিন আমরা বিচারক ও জুরি বোর্ডকে আদালত কক্ষ ত্যাগ না করেই ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে ঘটনাস্থলে পাঠাতে পারব। এভাবে যদি অপরাধের স্থানে বিচারকদের পাঠানো যায়, তাহলে তা মামলায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জুরিদের জন্য সহায়ক হবে।

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস ও ওয়াশিংটন ডিসি পুলিশের পক্ষ থেকে ই-মেইলে জানানো হয়, তারা দ্রুতই এ প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করতে আগ্রহী।

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত
এই পাতার আরো খবর