Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৭ অক্টোবর, ২০১৬ ২২:০০
সৌরবিমানের বিশ্ব ভ্রমণ
‘পাখির ডানায় ডানায় লিখে দেব তোমার নাম’
‘পাখির ডানায় ডানায় লিখে দেব তোমার নাম’

আকাশ জয়ের গল্প এটি। সৌরচালিত সোলার ইমপালস এশিয়া, উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকা হয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে এ বিমান।

এ সময় এটি উড়েছে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ৮০ কিলোমিটার গতিতে... লিখেছেন— সাইফ ইমন

 

সৌরশক্তিচালিত সোলার ‘ইমপালস টু’ পৃথিবীর প্রথম জ্বালানিবিহীন বিমান। যেটি গত বছরের শেষ দিকে যাত্রা শুরু করে কিছুদিন আগে সম্পূর্ণ পৃথিবী পরিভ্রমণ করে বিশ্বরেকর্ড করেছে। ৪২ হাজার কিলোমিটার পথ ভ্রমণ শেষ করে পাইলট বার্ট্রান্ড পিকার্ড এটিকে আবুধাবিতে নিয়ে আসে এ বছরের জুলাই মাসে। এখান থেকেই গত বছর রেকর্ড সৃষ্টিকারী এই ভ্রমণ শুরু হয়েছিল। এশিয়া, উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকা হয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে এ বিমান। প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ৮০ কিলোমিটার গতিতে উড়েছে সোলার ইমপালস।

একটি গাড়ির সমান ওজনের সোলার ইমপালস ২ বিমানে বোয়িং ৭৪৭ বিমানের সমান পাখা যুক্ত করা হয়েছে। বিমানের ব্যাটারিচালিত চারটি ইঞ্জিন নির্ভর করে এই পাখায় বসানো ১৭ হাজার সৌরকোষের ওপর। ভ্রমণের পুরো সময়টাই বিমানের সঙ্গে নির্বিঘ্ন যোগাযোগ রেখেছে মোনাকোতে অবস্থিত মিশন কন্ট্রোল। ইঞ্জিনিয়ার ও বিশেষজ্ঞরা আবহাওয়া ও পথ সম্পর্কে পাইলটকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।

 

পাইলট

সুইজারল্যান্ডের পাইলট বার্ট্রান্ড পিকার্ড সোলার ইমপালস ২ এর বিশ্বভ্রমণ পরিচালনা করেন। তিনি নিজেই এ প্রজেক্টের চেয়ারম্যান। দীর্ঘ ১৩ বছরের গবেষণার পর সৌরবিমানটি আকাশে সফলভাবে উড়াতে সক্ষম হন বার্ট্রান্ড পিকার্ড।

তবে পিকার্ড একা এই বিমান পরিচালনা করেননি। বিভিন্ন সময় তার বদলে বিমান উড়িয়েছেন সুইজারল্যান্ডের আরেক বৈমানিক আন্দ্রে বর্শবার্গ। মজার ব্যাপার বিমানটি এক সিটের হওয়ায় পাইলট দুজন অদল-বদল করে বিমানটি চালিয়েছেন। মূলত নবায়ণযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি ও এ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্যই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয় বলে জানান বার্ট্রান্ড পিকার্ড।

 

পরিবেশবান্ধব প্রথম বিমান

পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল সৌরশক্তিচালিত বিমান সোলার ইমপালস টু। সফলভাবে আকাশে উড্ডয়নের পর এটিই পৃথিবীর পরিবেশবান্ধব প্রথম বিমান। বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারকে উৎসাহিত করতেই এ ধরনের উদ্যোগ। আয়োজকরা আশা করছেন, সৌরশক্তির অভিনব এই আবিষ্কার পৃথিবীজুড়ে এ সংক্রান্ত গবেষণায় মাইলফলক হয়ে থাকবে। দূষণমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার করে দূরপাল্লার বিমান এখন আর স্বপ্ন নয়। আর তা সত্যি করে দেখাল সোলার ইমপালস প্রজেক্টের বিরল প্রতিভাবান কলাকুশলিরা।

সতেরো ফ্লাইটে বিশ্বভ্রমণ

সোলার ইমপালস টু মোট সতেরোটি ফ্লাইটে সমগ্র পৃথিবী পরিভ্রমণ করে। প্রথম ফ্লাইটে আবুধাবি থেকে মাসকট তারপর আহমেদাবাদ হয়ে বারানসীতে পৌঁছায়।   আহমেদাবাদ থেকে এক হাজার ১৭০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে বারানসিতে পৌঁছাতে বিমানটির সময় লাগে ১৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিট। সময় ২০১৫ এর ১৮ মার্চ।  

এর একদিন পর ১৯ মার্চ বারানসি থেকে সোলার ইমপালস-২ রওনা দেয় মান্দালয়ের উদ্দেশে। তারপর মান্দালয় থেকে বিমানটির পাইলট তার পঞ্চম ফ্লাইটটি পরিচালনা করে চংকিংয়ের উদ্দেশে ২৯ মার্চ। দীর্ঘ ২০ ঘণ্টা ভ্রমণের পর বিমানটি ৩০ মার্চ চংকিংয়ে অবতরণ করে।

পাইলট প্যাসিফিক পাড়ি দেবার আগে সর্বশেষ ফ্লাইটটি পরিচালনা করেন চায়নার চংকিং থেকে নানজিংয়ের উদ্দেশে।  

তারপর ৩০ মে নানজিং থেকে উড্ডয়নের পর বিমানটি বৈরী আবহাওয়ার মুখে পড়ে। ফলে ১ জুন পাইলট বিমানটিকে জাপানের নাগোয়ায় অবতরণ করাতে বাধ্য হয়। স্থানীয় সময় তখন প্রায় রাত ১২টা ছুঁই ছুঁই। এর ২৮ দিন পর বিমানটি নিয়ে পাইলট জাপান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই এর উদ্দেশে রওনা দেয়। এ ভ্রমণে বিমানটির সময় লাগে ৪ দিন ২১ ঘণ্টা ৫২ মিনিট। এর মাধ্যমে সোলার ইমপালস-২ ৮ হাজার ৯২৪ কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিয়ে বিশ্ব ইতিহাস সৃষ্টি করে। এরপর ১৮ দিনের যাত্রা বিরতির পর ২১ এপ্রিল বিমানটি সান ফ্রান্সিসকোর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।

দুই দিন ১৪ ঘণ্টা ২৯ মিনিট উড্ডয়নের পর ২৪ এপ্রিল সান ফ্রান্সিসকো এসে যাত্রা মুলতবি করে। এ সময়কালকে বিমানের লগ বুকে উল্লেখ করা হয় গোল্ডেন ফ্লাইট হিসেবে।

সোলার ইমপালস এর দশম ফ্লাইটটি পরিচালিত হয় সান ফ্রান্সিসকো থেকে ফোনেক্স পর্যন্ত। এ দূরত্বে বিমানটির সময় লাগে ১৫ ঘণ্টা ৫২ মিনিট আর দূরত্ব পাড়ি দেয় এক হাজার ১৯৯ কিলোমিটার।

এরপর ৪৮ ঘণ্টা ধরে তীব্র টর্নেডোর আঘাতে প্রতিকূল আবহাওয়ার সৃষ্টি হয় যুক্তরাষ্ট্রে।

আবহাওয়া পরিস্থিতি ভালো হলে ১২ মে পাইলট সোলার ইমপালস টু নিয়ে রওনা হন টুলসা এর উদ্দেশে।   পরবর্তী সময়ে টুলসা থেকে ২১ মে যাত্রা শুরু করে ২২ মে বিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের ডেটন এ এসে পৌঁছে।

মাত্র দুইদিন যাত্রা বিরতির পরই বিমানটি লিহাই ভ্যালির উদ্দেশে ছেড়ে যায়, উদ্দেশ্য নিউইয়র্ক।   অর্থাৎ বিমানটির ১৪তম ফ্লাইটটি পরিচালিত হয় লিহাই ভ্যালি থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত। ৪ ঘণ্টা ৪১ মিনিটের এ যাত্রায় সোলার ইমপালস টু এর পাখা উড়ে যায় স্ট্যাচু অব লিবার্টির উপর দিয়ে। এ সময়ের অনুভূতি বলতে গিয়ে পাইলট কবিতার লাইন উল্লেখ করেন— অন দ্য উইংস অব দ্য বার্ড, আই রাইট ইউর নেইম। অর্থাৎ, আমি পাখির ডানায় ডানায় লিখে দেব তোমারই নাম।

নিউইয়র্কে ৯ দিন অবস্থানের পর ২০ জুন বিমানটি সেভিলার দিকে যাত্রা শুরু করে। আর এর মধ্য দিয়েই ৭১ ঘণ্টার উড্ডয়নে কোনো রকম জ্বালানি ব্যতীত পাইলট বার্ট্রান্ড পিকার্ড সোলার ইমপালস টু নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি সম্পন্ন করেন। এরপর সোলার ইমপালস টু কায়রো হয়ে আবার আবুধাবি ফিরে বিশ্ব ভ্রমণ শেষ করে।

 

এক নজরে পুরো প্রক্রিয়া

২০০৩     : ইকলে পলিটেকনিক ফেডারেল ডি লুসানে  প্রথম সমীক্ষা

২০০৪-০৫    : ধারণা উন্নয়ন

২০০৬ : প্রথম দীর্ঘ ফ্লাইট সিমুলেশন

২০০৬-০৯    : প্রথম প্রোটোটাইপ সোলার ইমপালস ১ তৈরি

২০০৯ : সোলার ইমপালস ১ এর প্রথম উড্ডয়ন

২০০৯-১১    : মানুষ্যবাহী পরীক্ষা বিমান চালনা

২০১১-১২    : ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকার উপর দিয়ে

       অধিকতর পরীক্ষা বিমান চালনা

২০১১-১৩    : দ্বিতীয় প্রোটটাইপ সোলার ইমপালস-২ তৈরি

২০১৩ : মার্কিন আকাশে সোলার ইমপালস ১ চালনা

২০১৪ : সোলার ইমপালস-২ এর প্রথম উড্ডয়ন

২০১৫-১৬    : সোলার ইমপালস ২ এর বিশ্বভ্রমণ

 

এক নজরে সোলার ইমপালস-টু

পাইলট      : একজন

দৈর্ঘ্য        : ২১.৮৫ মিটার

পাখার প্রসারতার দৈর্ঘ্য : ৬.৩৪ মিটার

উচ্চতা       : ৬.৪০ মিটার

উইং এলাকা   : ১১.৬২৮ ফোটোভোলটাইক কোষ    

পিক রেট          : ২০০ মি

টেকঅফের ওজন : ২০০০ কেজি

ভূমিত্যাগের গতি : প্রতি ঘণ্টায় ৩৫ কিলোমিটার

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত
এই পাতার আরো খবর
up-arrow