Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বুধবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৭ অক্টোবর, ২০১৬ ২২:০৭
জয়গাথা
৩০ বছর ধরে আলো ছড়াচ্ছেন
ফাতেমা মেম
মাহমুদ আজহার
৩০ বছর ধরে আলো ছড়াচ্ছেন

রাজধানীর মুগদাপাড়ায় ছাত্রছাত্রী ও এলাকাবাসী সবাই তাকে ‘ফাতেমা মেম’ বলেই ডাকে। নাম তার ফাতেমা হামিদ।

১৯৭৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর লাভ করেন। যোগ দেন রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়া অবস্থায় একই বিভাগের ছাত্রের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হতে না হতেই পরপর জন্ম নেয় দুই সন্তান। পরিস্থিতি এমনই দাঁড়ায়, যে কারণে চাকরিও ছেড়ে দিতে বাধ্য হন তিনি। এরপর তার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পের শুরু...

 

তৃতীয় সন্তানের জননী হওয়ার পর থেকেই ফাতেমা হামিদের জয়গল্পের শুরু। সরকারি চাকরি হারিয়ে সিদ্ধান্ত নেন—এবার নিজের উদ্যোগেই কিছু একটা করবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে দমে যাননি। নিজ সন্তানদের নিজের পাওয়া শিক্ষায় শিক্ষিত করার পাশাপাশি এলাকার দুস্থ, অবহেলিত ও ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষিত করার স্বপ্নও ছিল তার। যেই চিন্তা সেই কাজ।

রাজশাহী থেকে ঢাকায় এসে মুগদাপাড়ায় একটি ভাড়া বাড়িতে গড়ে তুলেন একটি স্কুল। নাম দেওয়া হয় ‘স্ট্যান্ডার্ড টিউটোরিয়াল কিন্ডারগার্ডেন। ’ নিজের ছেলে মেয়েদের পাশাপাশি মুগদাপাড়ার দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিতদের মধ্যেও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার তীব্র ইচ্ছা ছিল তার। অনেকটা বিনা বেতনের মতোই দেড় শতাধিক ছাত্রছাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করেন ফাতেমা হামিদ। শিশু সন্তানদের নিজের মতো করে গড়ে তোলার পাশাপাশি ওই স্কুলে নিরলসভাবে শ্রম দেন। নিজের এ লড়াইয়ে সহযোগিতার হাত বাড়ান তার স্বামী আবদুল হামিদও। শুরু থেকেই ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকরা তাকে ‘ফাতেমা মেম’ বলে ডাকে। এখন ওই এলাকায় ‘ফাতেমা মেম’ বলেই ব্যাপক পরিচিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এই মেধাবী ছাত্রী।

১৯৮৫ সালে রাজধানীর ৩২, দক্ষিণ মুগদাপাড়ায় ভাড়া বাড়িতে যাত্রা শুরু হয় ওই স্কুলের। নিজের তিন সন্তানেরও হাতেখড়ি ওই স্কুলে। ক্রমেই ওই স্কল থেকে প্রতিভা বিচ্ছুরিত হতে থাকে। কোনো গৃহশিক্ষক বা কোচিংয়ের সহযোগিতা ছাড়াই মায়ের কাছে পাওয়া শিক্ষায় বিকশিত হয়ে এক ছেলে ও এক মেয়ে চিকিৎসক হন। ছোট মেয়ে ইথার হামিদ ফারিয়েল হন বিমানের পাইলট। দুর্ভাগ্য হলো— ২০১৪ সালে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে কর্তব্যরত অবস্থায় মারা যান ছেলে মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক মো. হাসিবুল হক হাসান ইমন। মেয়ে ডা. ফারজানা হামিদ ইতি এখন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে কর্মরত। স্কুলটি এখন পাশেই পরিবারের কেনা জমিতে নেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন ফাতেমা মেম। এখনো ছেলের কথা মনে হলেও ঢুকরে ঢুকরে কেঁদে ফেলেন ফাতেমা হামিদ। সেই ছেলের পেনশনের টাকার একটি অংশ ব্যয় করেন স্কুলে।  

শুধু নিজের ছেলেমেয়েই নয়, ফাতেমা মেমের কাছে পড়াশোনা করে অনেকেই এখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত। অনেকেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন— যার হাতেখড়ি ফাতেমা মেম।  

জানা যায়, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেন আবদুল্লাহিল কাফি, চট্টগ্রাম মেডিকেলে পড়াশোনা করেছেন সাবিহা শারমিন, রংপুর মেডিকেলে তানজিলা আক্তার, সিলেট মেডিকেল কলেজে সুমন মান্নান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে তানবীর রেজা ও তাইফুর রেজা, তানবীর হাসান অনিক প্রমুখ মেধাবী ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন ইথার হামিদ ফারিয়েল।

৬২ বছর বয়সী সেই ‘ফাতেমা মেম’ এখনো স্কুলটির দেখভাল করছেন। ওই স্কুলে এখন তিন শতাধিক ছাত্রছাত্রী। কার কী সমস্যা— সবই দেখছেন তিনি। সামান্য মাসিক বেতন কেউ না দিতে পারলে নিজেই তা মেটানোর দায়িত্ব নেন। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত স্কুলেই থাকেন তিনি। স্কুল ঘিরেই তার সব চিন্তা। সরকারের কোনো পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই নিজের ছেলেমেয়েদের আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে স্কুলটি চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে এখন তা নবম শ্রেণি পর্যন্ত খোলা হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণির সরকারি কোড পেলেও অষ্টম এবং দশম শ্রেণিতে পরীক্ষা দেওয়ার সরকারি সুযোগ পাচ্ছেন না। দীর্ঘ ৩০ বছর ভাড়া বাড়িতে স্কুলটি পরিচালিত হয়ে আসছে। এবার ওই স্কুলের পাশেই নিজের কেনা জমিতে স্কুলটি স্থানান্তরের চিন্তাভাবনা করছেন।

ফাতেমা হামিদের ভাষায়— আমার কোনো আয়-উন্নতি কিংবা উচ্চাশাও নেই। স্কুলের ছেলেমেয়েদের নিয়েই আমার সব ভাবনা। কারণ, নিজের ছেলেমেয়েরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের জন্য এখন আমার কোনো চিন্তা নেই। আমি সরকারের কোনো আর্থিক সহযোগিতা চাই না। শুধু জেএসসি ও দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানোর সরকারি কোড নম্বর চাই। ছেলেমেয়েদের নিজের স্কুলেই পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ চাই। আশা করি, সরকার এ বিষয়টি সুবিবেচনা করবে।

ফাতেমা হামিদ বলেন, অনেকটা শখের বশেই ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাচ্ছি। প্রতিষ্ঠান থেকে মুনাফা নয়, বরং আমার ছেলেমেয়েদের উপার্জিত টাকাও এ প্রতিষ্ঠানে ব্যয় করছি। অনেক বাচ্চা পরীক্ষার ফি দিতে পারে না, বেতন দিতে পারে না— তাদেরও আমার পরিবার যথেষ্ট সহযোগিতা করছে। অনেক সময় নিজের টাকায় বাসা বাড়াও দিতে হয়। আমি ছেলেমেয়েদের ইংরেজি ও বাংলার বিশুদ্ধ উচ্চারণসহ মৌলিক শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। ছেলেমেয়েরা যেন দেশীয় গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিকভাবেও ভালো কিছু করতে পারে, সেভাবেই গড়ে তোলার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ওই স্কুলে এখন ১৫ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন। তাদের প্রায় সবাই একসময় ওই স্কুলেরই ছাত্রছাত্রী ছিলেন। তারাও ফাতেমা মেমের পাশে থাকতে পেরে গর্বিত। ফাতেমা মেমকে সবাই সম্মান করেন। ‘ফাতেমা মেম’ তাদের অল্প সম্মানী দেন। তাতেও কারও আপত্তি নেই। জাহাঙ্গীর আলম নামে এক শিক্ষক জানান, ‘আমরা ফাতেমা মেমের সান্নিধ্য পেয়ে গর্বিত। তার কাছ থেকে আমরা যা কিছু শিখেছি, তাই ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দেওয়ার চেষ্টা করছি। মেমের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই। ’

ফাতেমা হামিদের ছোট মেয়ে পাইলট ইথার হামিদ ফারিয়েল বলেন, ‘আম্মুর শেখানো পড়াশোনায় আজ আমি এই অবস্থানে। আসলে কারও পড়াশোনার গোড়া যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে তার দ্বারা অনেক কিছুই সম্ভব। আমার মা আমাকে যে মৌলিক শিক্ষা দিয়েছেন, তা কিছুটা আমি কাজে লাগাতে পেরেছি। এমন মায়ের জন্য আমার গর্ব হয়। আমার মায়ের ইচ্ছা, স্কুলের ছেলেমেয়েদের সুবিধার্থে স্কুলটা যেন অষ্টম ও দশম শ্রেণির সরকারি কোড পায়। সরকারের কাছে অনুরোধ, যেন বিষয়টি বিবেচনার দৃষ্টিতে দেখে। ’

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত
এই পাতার আরো খবর
up-arrow