Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২১ অক্টোবর, ২০১৬ ২১:০২
অনুপ্রেরণীয়
পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র প্রেসিডেন্ট
পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র প্রেসিডেন্ট
ছোট একটি শোবার ঘর, রান্নাঘর, টিনের চালের এই বাড়িতেই থাকেন উরুগুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসে মুজিকা

মাসে বেতন পেতেন মাত্র ১২ হাজার ৫০০ ডলার। যার বেশির ভাগই দান করে দিতেন উরুগুয়ের এই সাবেক প্রেসিডেন্ট।

থাকেন জীর্ণ খামারবাড়িতে। জীবনটা উৎসর্গ করে দিয়েছেন মানুষের জন্য। বলা হচ্ছে, হোসে মুজিকার কথা। প্রথম জীবনে বেকারির ডেলিভারি বয় ও ফুল বিক্রেতা হিসেবে কাজ শুরু করে পরবর্তীতে উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন ২০১৫ সাল পর্যন্ত। নির্লোভ ও নিরহংকার একজন মাটির মানুষ নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন। জানাচ্ছেন— সাইফ ইমন

 

সংগ্রামী জীবন

উরুগুয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোসে মুজিকা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন ২০১০ সালের ১ মার্চ থেকে ২০১৫ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত। তার জন্ম ১৯৩৫ সালে। খুব ছোট বয়স থেকেই হোসে মুজিকা সংসারের প্রয়োজনে বেকারির ডেলিভারি বয়ের চাকরি নিতে হয়।

মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়ে চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। এমনকি তাকে বাড়ির পেছনে বয়ে যাওয়া খাঁড়ি থেকে লিলি ফুল তুলে বিক্রি করেও সংসার চালাতে হয়। এভাবেই দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে এগিয়ে যেতে থাকে হোসে মুজিকার জীবন। পরবর্তী সময়ে চরমপন্থি নেতা হিসেবে পরিচিতি পান তিনি।

 

রাজনৈতিক উত্থান ও জেল জীবন

যৌবন বয়সেই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেন এই সাবেক প্রেসিডেন্ট। ষাটের দশকের শুরুর দিকে ‘তুপামারোস আরবান বিবেল মুভমেন্ট’ নামের এক সদ্য প্রতিষ্ঠিত সশস্ত্র গেরিলা দলে যোগদান করেন তিনি। ষাট ও সত্তর দশকে কিউবার বিপ্লবে অনুপ্রাণিত গেরিলা দলের নেতা হিসেবে উরুগুয়ের বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়িয়েছেন। জীবনে গুলিবিদ্ধ হন ছয়বার। ১৯৭২ সালে সরকারি বাহিনী মুজিকাকেও গ্রেফতার করে। ১৪ বছর জেলে বন্দী জীবন কাটিয়েছেন মুজিকা। সেখানে এক বছর গোসল করার সুযোগ পাননি তিনি। যে কক্ষে তাকে রাখা হয়েছিল সেটি ছিল কুনো ব্যাঙ, আরশোলা, ইঁদুর, টিকটিকিদের স্বর্গরাজ্য। ঠিকমতো খাবারও জুটত না কপালে। সঙ্গীদের সঙ্গে শুকনো রুটি ভাগ করে খেতে হতো।

 

প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠা

নিজ দেশে এই বামপন্থি গেরিলা নেতা খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। বামপন্থি দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে মুজিকা ও তার তুপামারোস মুভমেন্ট অব পপুলার পার্টিসিপেশন (এমপিপি) নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ১৯৯৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুজিকা ডেপুটি এবং ১৯৯৯ সালে সিনেটর নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বের কারণে   এমপিপির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ২০০৪ সালে ব্রড ফ্রন্টের সবচেয়ে বড় শাখা হয়ে ওঠে এমপিপি। ওই বছরের নির্বাচনে আবারও সিনেটর নির্বাচিত হন। ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট তাবারে ভাসকেস তাকে মৎস্য, গবাদিপশু, কৃষি বিষয়কমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। ২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিপক্ষ লুইস আলবার্তো লাকালেকে পরাজিত করেন মুজিকা। ২০১০ সালে এসে উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন।

সবচেয়ে গরিব প্রেসিডেন্ট

প্রেসিডেন্ট ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকবে না এই নীতিতে বিশ্বাসী মুজিকা প্রতি মাসে বেতন পেতেন ১২ হাজার ৫০০ ডলার। ১ হাজার ২৫০ ডলার রেখে বাকি টাকা দুস্থদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। তার আর্থিক দৈন্যতা আছে কিনা জানতে চাইলে এক স্প্যানিশ টিভি চ্যানেলকে মুজিকা বলেছিলেন, এই টাকায় বেশ ভালো আছি। মুজিকার নামে কোনো ঋণ নেই। তার কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টও নেই। নিজেকে তিনি পরিচয় দেন একজন কৃষক হিসেবে। ২০১০ সালে নিজের আয়কর বিবরণীতে তিনি বার্ষিক আয় দেখান মাত্র ১ হাজার ৮০০ ডলার। যা কিনা তার ২৮ বছর পুরনো গাড়ির দাম। ২০১২ সালের বিবরণীতে স্ত্রীর অর্ধেক সম্পদ যুক্ত করেন তিনি। এই সম্পদের মধ্যে রয়েছে স্ত্রীর জমি, ট্রাক্টর ও বাড়ির দাম।

 

 

সাদামাটা জীবন

প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে তার জন্য নির্ধারিত সরকারি বাড়ি-গাড়ি কোনোটাই ব্যবহার করেননি মুজিকা। রাজধানী মন্টিভিডিওর পাশে স্ত্রীর মালিকানাধীন ভাঙা এক খামার বাড়িতে থাকেন তিনি। মুজিকার বাড়ির বাইরে কাপড় কাচার ঘর। এখনো কর্দমাক্ত পথ পেরিয়ে নিজের খামার বাড়িতে পৌঁছাতে হয় তাকে। খামারে স্ত্রীর সঙ্গে নিয়মিত কৃষিকাজ করেন তিনি। খামারে চাষ করছেন হরেক রকমের ফুল। গাছে সার দেওয়া, খেত নিড়ানো থেকে শুরু করে ফুল তোলা সব কাজ করেন নিজ হাতেই। মুজিকা অপচয় কখনো পছন্দ করেন না। তার ভাষায়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাসযোগ্য পৃথিবীকে আমরা আসলে সবাই মিলে ধ্বংস করছি। আমি শুধু বলতে চাই, আমরা ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে যেন উন্নয়নের কথা ভাবি। নইলে আমরা কেবল নতুন প্রজন্মের জন্য মৃত্যু ক্রয় করছি।

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত
এই পাতার আরো খবর
up-arrow