Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

ঢাকা, রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২১:৪৬
সাফল্যগাথা
মানুষের জন্য বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠায়
অধ্যাপক ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী
মানুষের জন্য বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠায়

মানুষের জন্য বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন এক নিভৃতচারী বিজ্ঞানী। তিনি  অধ্যাপক ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী।

বিদেশের উন্নত জীবন-যাপনের সুযোগ ফেলে দেশে ফিরে আসেন। শুধু দেশের মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন সারা জীবন। একঝাঁক তরুণ গবেষককে নিয়ে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। প্রচারবিমুখ এই মানুষটিকে নিয়ে লিখেছেন— সাইফ ইমন   

 

তিনি প্রফেসর ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন। যার সব উদ্ভাবনের একটাই লক্ষ্য, তা হলো কম খরচে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি তৈরি ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আবার তিনি তার উদ্ভাবনের প্যাটেন্ট করাতে নারাজ। তার দাবি বিজ্ঞান প্রযুক্তির সুবিধা ভোগের অধিকার সবার রয়েছে। তা প্যাটেন্ট করে ব্যবহার সীমিত করা মোটেই উচিত নয়। তাই এত বছরের গবেষণায় শুধু একটি প্যাটেন্টই করিয়েছেন এই বিজ্ঞানী। ১৯৯২ সালে করা প্যাটেন্টটি হলো ‘অটোমেটিক ভোল্টেজ প্রটেকশন’। তিনি আরও বলেন, আমরা নিজেরাই যদি চিকিৎসা ও ব্যবহার্য প্রযুক্তি তৈরি করতে পারি, তাহলে একই সঙ্গে সাশ্রয়ী ও সংস্কৃতিবান্ধব ও স্বর্বজনীন হবে। ফলে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামেও মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবে কম খরচে। ড. সাইয়েদ ও অধ্যাপক ইসলামের সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি বাংলাদেশে মেডিকেল ফিজিক্স ও বায়োমেডিকেল প্রকৌশলে গবেষণার সফল সূত্রপাত করেন ১৯৭৮ সালে। এর কিছুদিন আগে যুক্তরাজ্য থেকে ইলেক্ট্রনিক্সে পিএইচডি শেষে দেশে ফেরত আসেন প্রফেসর ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী। উন্নত বিশ্বের আকর্ষণীয় সব চাকরির অফার ফিরিয়ে দেন শুধু দেশের মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা থেকে। সেই থেকে এখন অব্দি একঝাঁক তরুণ নিয়ে তিনি নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা এই বিজ্ঞানী।

 

ছিলেন আলোচিত ফটোগ্রাফার : বাংলাদেশের এই বিজ্ঞানী একজন প্রতিভাবান ফটোগ্রাফারও বটে। আমাদের দেশে বর্তমানে ফটোগ্রাফি জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও ’৮০-এর দশকের শুরুতেই ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী সাফল্য অর্জন করেন ফটোগ্রাফিতে। তখন ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত জাতীয় ফটো কনটেস্টে রঙিন ছবির ক্যাটাগরিতে প্রথম এবং সাদা-কালো ক্যাটাগরিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। এরও আগে ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফি সোসাইটি আয়োজিত এক কনটেস্টে জাতীয় পর্যায়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। পরবর্তীতে গবেষণার কাজে ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় ফটোগ্রাফিতে সময় দিতে পারেননি ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী।

 

জন্ম ও বেড়ে ওঠা : ১৯৫০ সালের মে মাসের ৯ তারিখ জন্মগ্রহণ করেন ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী। ১৯৬৫ সালে ফরিদপুর জিলা স্কুল থেকে এসএসসি এবং পরবর্তীতে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৭০ সালে বিএসসি (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। এমএস করেন পাকিস্তানের কায়দে আজম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বর্তমানে দুই সন্তানের জনক ড. খোন্দকার ঢাকার ধানমন্ডিতে বাস করছেন।   

 

উদ্ভাবনের রাজা : ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানীকে উদ্ভাবনের রাজা বললে অত্যুক্তি হবে না। বরং কম বলা হয়ে যাচ্ছে বলেই মনে হবে। দীর্ঘ দিনের গবেষণায় তিনি তরুণদের সঙ্গে নিয়ে উদ্ভাবন করেছেন একটির পর একটি নানাবিধ আবিষ্কার। যার সবগুলোই মানব কল্যাণে উৎসর্গকৃত। হৃদযন্ত্রের ওঠা-নামা পর্যবেক্ষণ করার জন্য তার দলের উদ্ভাবিত কম্পিউটারাইজড ইসিজি মেশিনটি মাত্র সাত ইঞ্চির। কম্পিউটারের সঙ্গে সংযোগে হয়ে যায় পূর্ণাঙ্গ ইসিজি মেশিন। ইসিজি ছবি প্রিন্ট করে সাধারণ কাগজে। ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্তাবস্থায় বিশ্বের যেকোনো জায়গা থেকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায় ইসিজি।

 

স্বয়ংক্রিয় শ্বাস-প্রশ্বাসযন্ত্র : নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের শ্বাস-প্রশ্বাসের হিসাব নিতে হয়। শরীরে নানা যন্ত্রপাতি দিয়ে পরীক্ষা চলে। এ সময় শিশুরা ভয় পায় কাঁদে নড়াচড়া করে। ফলে অনেক সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। অধ্যাপক সিদ্দিক ই রব্বানী এ সমস্যার সমাধানে উদ্ভাবন করেছেন স্বয়ংক্রিয় শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্র। তাতে থাকা ‘ইলেকট্রোড প্যাড’ কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত করে বুক বা পিঠ স্পর্শ করলে স্ক্রিনে ফুটে উঠবে ফুসফুসের পরিবর্তনের গ্রাফ।

 

পানিকে জীবাণুমুক্ত করার কৌশল : অধ্যাপক ড. সিদ্দিক ই রব্বানীর নেতৃত্বে গবেষকরা সূর্যের আলো ও তাপ ব্যবহার করে নদী বা পুকুরের পানিকে জীবাণুমুক্ত করার কৌশলও আবিষ্কার করেছেন। ‘সোলার ওয়াটার পাস্তুরাইজেশন’ পদ্ধতিতে মাত্র দুই ঘণ্টা তাপ দিয়ে ১০-১২ লিটার পানি জীবাণুমুক্ত করা যায়। ২০০২ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বরিশালের ৩০০ বেদে পরিবার এই পদ্ধতি ব্যবহার করে উপকৃত হয়।

 

ডিস্ট্রিবিউশন অব এফ-লেটেন্সি : অধ্যাপক সিদ্দিক-ই রব্বানী আরও উদ্ভাবন করেছেন নার্ভ কনডাকশনের নতুন এই প্যারামিটার। যা দিয়ে ঘার, পিঠ বা কোমরের ব্যথায় স্নায়ুতে চাপ থাকলে তা ধরা যাচ্ছে।

 

ডায়নামিক পেডোগ্রাফ : অধ্যাপক ড. সিদ্দিক-ই রব্বানীর উদ্ভাবিত আরও কিছু স্বল্প মূল্যের অত্যাধুনিক চিকিৎসাযন্ত্র হলো-ডায়াবেটিস রোগীদের পায়ের চাপের বিস্তার পরিমাপে ‘ডায়নামিক পেডোগ্রাফ’।

 

কৃত্রিম হাত : দেশে কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি ও সংস্থাপনে নতুন ইতিহাস রচিত হয়েছে রব্বানী স্যারের হাত ধরেই। কৃত্রিম হাতকে বলা হচ্ছে মায়ো ইলেক্ট্রিক প্রস্থেটিক হ্যান্ড। এটি ব্যবহারের ফলে রাজিয়া নামের এক শারীরিক প্রতিবন্ধী কম্পিউটারে লেখা, কাগজে লেখাসহ ইলেক্ট্রনিক সার্কিটের বিভিন্ন কাজ করতে পারছে।

 

ডিজিটাল কলকোস্কোপ : এটি কম্পিউটারের সাহায্যে জরায়ু মুখের ক্যান্সার নির্ণয়যন্ত্র অপটিক্যাল কলকোস্কোপ।

 

তিন লিড নন-ডায়াগনস্টিক ইসিজি : তিন লিড ইসিজি ইউএসবি দিয়ে সংযুক্ত করে কম্পিউটারে ইসিজি দেখার যন্ত্র।

 

টেলি মেডিসিন :  গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত রোগীরা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে শহরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগসহ চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে পারবে।

 

ডিজিটাল স্টেথোস্কোপ : কম্পিউটারে রেকর্ড করার পাশাপাশি হৃৎপিণ্ড ও শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি পরিমাপের জন্য ব্যবহার করা হয় স্টেথোস্কোপ।

 

ডিজিটাল এক্স-রে ভিউবক্স : সংযুক্ত ক্যামেরার মাধ্যমে এক্স-রে রিপোর্টের ছবি তুলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠানোর যন্ত্র এটি।

 

মাসল অ্যান্ড নার্ভ স্টিমুলেটর : আঘাত পেয়ে যাদের কোনো অঙ্গ আংশিক বা পুরোপুরি অকেজো হয়ে গেছে, সেই স্নাায়ুতন্ত্রকে পরিমিত ইলেকট্রিক শক দেওয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সচল করে তোলার যন্ত্র।

 

অ্যান্টি-সোয়েট : যাদের অতিরিক্ত হাত-পা ঘামে, তাদের হাতে বা পায়ে কার্যকর পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রবাহিত করানোর যন্ত্র এটি।

এই পাতার আরো খবর
সর্বাধিক পঠিত
up-arrow