Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ১১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১০ নভেম্বর, ২০১৭ ২১:৫৪
তেঁতুলিয়ায় ঘুরে বেড়াই
সরকার হায়দার
তেঁতুলিয়ায় ঘুরে বেড়াই

বছরের সব ঋতুতেই হিমালয় কন্যা খ্যাত তেঁতুলিয়া ঘুরে বেড়ানো যায়। তবে শরৎ হেমন্তে রূপবতী কাঞ্চনজঙ্ঘা জেগে ওঠে। পরিব্রাজকদের জন্য অপরূপ সৌন্দর্য মেলে ধরে সে। এ সময় তেঁতুলিয়া ঘুরতে গেলে সকালের চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কাঞ্চনজঙ্ঘার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হবে আপনার। তাছাড়া শীতও যে উপভোগ করার মতো একটি বিষয় তা শীতকালে তেঁতুলিয়া ভ্রমণ না করলে বোঝা যায় না। বাংলাদেশের শুরুটা আসলে তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট থেকেই। জনশ্রুতি আছে যে, প্রাচীন কালে এ এলাকায় প্রচুর তেঁতুল গাছ ছিল। তেঁতুল গাছের ছায়ায় বসে পথিকেরা বিশ্রাম নিত। এক সময়ে এখানে একজন বিশিষ্ট ইংরেজ বণিক বাস করত। তার বাবার নাম ছিল টিটু এবং তার বাসগৃহ ছিল একটি উঁচু টিলার ওপর। সেখানে একটি তেঁতুল গাছ ছিল। কালক্রমে সেই ইংরেজ বণিকের বাবার নাম ‘টেটু’ এবং তেঁতুল তলা থেকে ‘লিয়া’ শব্দ দুটির সমন্বয়ে এ জনপদের নামকরণ হয় ‘তেঁতুলিয়া’।

 

কী দেখবেন

 সমতলে চা বাগান ভাবতে পারেন? তাও আবার বিশ্বখ্যাত অর্গানিক চা। অথচ চা বাগানের কথা উঠলেই মনে হয় সিলেট বা শ্রীমঙ্গলের কথা। কিন্তু সমতল ভূমিতেও যে চা বাগান হতে পারে তা পঞ্চগড় না এলে বোঝা যাবে না। পঞ্চগড় থেকে তেঁতুলিয়ার দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটারের মতো। সমতল ভূমিতে সুন্দর পাকা রাস্তা। যতই এগোবেন সবুজ আপনাকে ক্রমেই মোহিত করতে থাকবে। তেঁতুলিয়াতে এখন প্রায় তিন শতাধিক বড় এবং ক্ষুদ্র চা বাগান রয়েছে।

এসব চা বাগানে নারীরা দলে দলে পিঠে সাদা বস্তা ঝুলিয়ে চা পাতা তুলে থাকেন। অপার সৌন্দর্যের এই দৃশ্য আপনাকে বিমোহিত করে ফেলবে। ঠিক সন্ধ্যাবেলায় চা বাগানগুলোতে নেমে আসে নীরবতা। শুরু হয় কীটপতঙ্গের আনন্দ উৎসব। চাঁদ উঠলে কচি পাতার সবুজ আর জোছনা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আপনার মনে হবে নীল পরীর দেশে ভেসে বেড়াচ্ছেন। খুব বেশি নয়, এ বাগান ও বাগান করতে ভ্যান বা অটোরিকশায় ৫০০ টাকা হিসেবে রাখতে পারেন। এত টাকা নাও লাগতে পারে।

 

জিরো পয়েন্ট ও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর

হিমালয়ের কোল ঘেঁষে বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের উপজেলা তেঁতুলিয়া উপজেলার ১ নম্বর বাংলাবান্ধা ইউনিয়নে অবস্থিত বাংলাবান্ধা জিরো (০) পয়েন্ট ও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। এই স্থানে মহানন্দা নদীর তীর ও ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন প্রায় ১০ একর জমিতে ১৯৯৭ সালে নির্মিত হয় বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। শুরুতে এখানে নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য বিনিময়ও সম্পাদিত হয়। তবে এখন বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল-ভুটানের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের একমাত্র সম্ভাবনাময় স্থলবন্দর। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জিরোপয়েন্ট দেখতে ভিড় করেন পর্যটকরা।

পাসপোর্ট ভিসা সঙ্গে থাকলে এই বন্দর দিয়ে অনায়াসে তিনটি দেশ ঘুরে আসতে পারেন আপনিও। এই বাংলাবান্ধা থেকে নেপালের দূরত্ব মাত্র ৬১ কিলোমিটার, এভারেস্ট শৃঙ্গ ৭৫ কিলোমিটার, ভুটান ৬৪ কিলোমিটার, চীন ২০০ কিলোমিটার, ভারতের দার্জিলিং ৫৪ কিলোমিটার ও শিলিগুড়ি ৮ কিলোমিটার। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এখানে ব্যবসা বাণিজ্যের পাশাপাশি ইমিগ্রেশন কার্যক্রমও চলছে। এই চেকপোস্ট ব্যবহার করে সহজেই পর্যটকরা ভারত, নেপাল আর ভুটান ঘুরতে যাচ্ছেন। তেঁতুলিয়া থেকে মাত্র সতের কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাংলাবান্ধা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও বেশ সুন্দর। সীমান্তবর্তী এ জায়গাটিও ঘুরে আসতে পারেন। তেঁতুলিয়া থেকে বাসে ২০ টাকা আর অটো বা ভ্যান যোগে ৫০ টাকার মতো যাবে আপনার।

 

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে পঞ্চগড়গামী দূরপাল্লার বাসে পঞ্চগড়ে তেঁতুলিয়ায় নামতে পারেন। পঞ্চগড় পর্যন্ত পর্যাপ্ত বাস রয়েছে। সেক্ষেত্রে পঞ্চগড়ে নেমে তেঁতুলিয়া-বাংলাবান্ধাগামী লোকাল বাসে ৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে এক ঘণ্টায় তেঁতুলিয়া পৌঁছানো যাবে। অন্যদিকে পঞ্চগড় পর্যন্ত আন্তনগর ট্রেনেও যেতে পারেন। আবার সৈয়দপুর পর্যন্ত বিমানে গিয়ে সেখান থেকে বাসে বা প্রাইভেট গাড়িতে করেও যেতে পারেন নিসর্গের লীলাভূমি তেঁতুলিয়া দেখতে। যানজট না থাকলে ঢাকা থেকে সড়ক পথে সময় লাগবে ৮ ঘণ্টা। আকাশ পথের সঙ্গে সড়ক পথ ব্যবহার করলে লাগবে ৪ ঘণ্টা। সড়ক পথে এসি বাস ভাড়া ১২শ টাকার মতো। নন-এসি ৬৫০ টাকা। রেলপথ আর সড়ক পথ মিলে ভাড়া পড়বে ৫০০ টাকা। আকাশপথ আর সড়ক পথে ৫ হাজার টাকা।

 

তেঁতুলিয়ায় বনভোজন

তেঁতুলিয়া জেলা পরিষদ বাংলোটি মহানন্দা নদীর তীর ঘেঁষে। বাংলোর পাশেই আছে সুন্দর একটি বনভোজন কেন্দ্র। নদীর ওপারেই ভারত। মনমুগ্ধকর এ জায়গাটিতে কিছুটা সময় কাটাতে পারেন। আকাশ ভালো থাকলে সকাল-বিকাল এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। এখানে দেখা মিলবে গ্রাম বাংলার অনেক দৃশ্য। ডাকবাংলোর পাশেই অবস্থিত একটি মনোরম পিকনিক স্পট। এখান থেকে শরৎ হেমন্ত ও শীতকালে কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। বর্ষাকালে মহানন্দা নদীতে পানি থাকলে এর দৃশ্য আরও বেশি মনোরম হয়। শীতকালে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো। পিকনিক কর্নারটিকে নানা আকর্ষণীয় ভাস্কর্য দিয়ে সাজানোর কাজ চলছে। আছে শিশুদের বিনোদনের জন্য নানা ব্যবস্থা।

 

মহানন্দার দৃশ্য আর সন্ধ্যা উপভোগ

হিমালয় থেকে নেমে আসার সময় আঁচল ভরে নুড়ি পাথর নিয়ে আসে মহানন্দা। আর এই পাথর সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন হাজার হাজার পাথর শ্রমিক। নদীর বুক জুড়ে হাজার হাজার মানুষের কর্মব্যস্ততার দৃশ্য আপনাকে অবাক করে দেবে। শ্রম আর সৌন্দর্য যেন একাকার। মহানন্দার পাড়ে বসে অবশ্যই গোধূলি আর সন্ধ্যা উপভোগ করবেন। স্বর্গীয় অনুভূতি দেবে আপনাকে। মহানন্দায় পা ভিজিয়েও গোধূলি আর সন্ধ্যা উদযাপন করতে পারেন। তেঁতুলিয়ার রাস্তার দুই পাশের নির্মিত ভাস্কর্যগুলো দেখে আপনার কাব্যিক মন ভরে উঠবে। বাংলাদেশের নানা ঐতিহ্যের আলোকে নির্মিত হয়েছে এসব ভাস্কর্য। পুরনো টাকার নোট, পয়সা ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের নানা অনুসঙ্গ আছে এসব ভাস্কর্যে।

 

পালাটিয়া

পালাটিয়া পঞ্চগড়ের স্থানীয় প্রাচীন একটি লোকনাট্য। এ সময় তেঁতুলিয়ার পাড়ায় মহল্লায় আয়োজন হয়ে থাকে। স্থানীয় লোক শিল্পীরা পালাটিয়া পরিবেশন করে। পালাটিয়ায় ছেলেরাই মেয়েদের চরিত্রে অভিনয় করে। এই দিকে যাদের আগ্রহ তারা খোঁজখবর নিয়ে আকর্ষণীয় পালাটিয়া উপভোগ করে ফিরতে পারেন। অথবা স্থানীয় একটি নাট্য দল ‘ভূমিজ’ পর্যটকদের জন্য পালাটিয়া আয়োজন করে থাকে। তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যেতে পারে।

 

কোথায় থাকবেন

রাতযাপনের জন্য বেসরকারি কোনো ব্যবস্থা গড়ে না উঠলেও এখানে বেশ কয়েকটি সরকারি রেস্ট হাউস আছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে সরকারি ডাকবাংলো ও অপরটি জেলা পরিষদ ডাকবাংলো ছাড়াও এলজিইডির রেস্ট হাউস, বনবিভাগের রেস্ট হাউস। এসব রেস্ট হাউস ও ডাকবাংলোগুলোতে অবস্থান করতে হলে আপনাকে অফিশিয়ালি যোগাযোগ করে বুকিং নিতে হবে। ভাড়াও খুব কম।

 

কী খাবেন, কোথায় খাবেন

স্থানীয় খাবার সিদলের ভর্তা, পেলকা শাক (নানা প্রকার শাকের রান্নায় মিশ্রিত এক ধরনের স্যুপ), রাসা শাক (কচুর বীজ দিয়ে তৈরি স্যুপ) অত্যন্ত সুস্বাদু এবং খাদ্য প্রাণযুক্ত খাবারগুলো গাইডের মাধ্যমে আয়োজন করতে পারেন। তেঁতুলিয়া বাজারে বেশ কয়েকটি খাবার হোটেল আছে। খাবারের মানও যথেষ্ট ভালো, দামও কম। এ ছাড়া অন্যান্য বাজারেও খাবার পাবেন।

 

পর্যটকদের নিরাপত্তা

সহজ সরল হিসেবে এই এলাকার মানুষের সারা দেশে পরিচিতি আছে। তাই এই এলাকায় পর্যটকরা নিরাপদে ঘুরতে পারেন। তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানিউল ফেরদৌস জানিয়েছেন, দেশ-বিদেশ থেকে বহু পর্যটক এই এলাকার সৌন্দর্য উপভোগ তথা গবেষণার কাজে আসছেন। আমরা তাদের নিরাপত্তায় সর্বদা সচেষ্ট আছি।

 

গাইড খুঁজছেন

কারিগর' নামের স্থানীয় একটি ট্যুর স্বেচ্ছাসেবক টিম কাজ করে। মোবাইল নম্বরটি রেখে দিতে পারেন। যোগাযোগ— ০১৭২৩০১৪১৪৩। তো আর দেরি কেন। আড়মোড়া ভেঙে কোন মাধ্যমে যাবেন ঠিক করে টিকিট বুকিং দিয়ে নিন। মনে রাখবেন এ সময় তেঁতুলিয়ার যাত্রী থাকে বেশি। কারণ অনেকেই ছুটে যায় উত্তরের পথে প্রান্তরে আশ্রম জীবন থেকে বেরিয়ে ছুঁয়ে নিতে বিহঙ্গের স্বাদ।

এই পাতার আরো খবর
সর্বাধিক পঠিত
up-arrow