Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৩১ আগস্ট, ২০১৮ ২২:০২
প্লাস্টিক থেকে জ্বালানি তেলের উদ্ভাবক
ড. মইনউদ্দিন সরকার
শেখ মেহেদী হাসান
প্লাস্টিক থেকে জ্বালানি তেলের উদ্ভাবক

প্রযুক্তির উত্কর্ষতার সাথে সাথে টিভি, ফ্রিজ, মাইক্রো ওভেন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, এয়ারকন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, ডিভিডি প্লেয়ার, সিএফএল বাল্ব, পানির বোতল, খেলনা, ব্যাগসহ প্লাস্টিকের বহু পণ্য ব্যবহার হচ্ছে প্রতিদিনকার জীবনে। কয়েক বছর ব্যবহারের পর যখন এসব পণ্যের কর্মক্ষমতা শেষ হয় তখন তাদের ঠিকানা হয় ডাসবিনে। বিভিন্ন আবর্জনা ফেলার স্থান হিসেবে আমাদের দেশের নদী-নালা, ডোবা এমনকি উন্মুক্ত স্থানও ব্যবহার করা হয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কোনো কোনো বর্জ্য থেকে লোহা অংশ রেখে বাকিটা ফেলে দেন। বাংলাদেশে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে দেশে প্রতি বছর ১০ মিলিয়ন মেট্রিক টন ইলেকট্রনিক্স ওয়েস্ট ও প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। ঢাকায় ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে দেশের চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তৈরি সম্ভব বলে মনে করেন বিজ্ঞানী ড. মইনউদ্দিন সরকার। প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি তেল উত্পাদন করছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এই বিজ্ঞানী। ২০০৫ সালে মার্কিন সরকার তাকে একনিষ্ঠ গবেষণার জন্য ব্রিজপোর্টে বরাদ্ধ করে ৫৭ হাজার বর্গফুট জায়গা। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি বিনিয়োগ পেয়েছিলেন দেড় কোটি ডলার। এই অর্থ দিয়ে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও স্যানিটেশন কোম্পানির কাছ থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য কিনে সরাসরি তেল উত্পাদনে নেমে পড়েন তিনি।

বিজ্ঞানী ড. মইনউদ্দিন সরকার জানান, প্লাস্টিক ছাড়া বর্তমান পৃথিবীর কথা ভাবা যায় না। একুশ শতকে পৃথিবীর ব্যাপক পরিবর্তন মানুষকে প্রযুক্তিনির্ভর করে ফেলেছে। তারা নিয়মিতভাবে সহজলভ্য প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করছে। আমরা গবেষণায় দেখেছি বিশ শতকে পৃথিবীতে উত্পাদিত হয়েছে ৬০০ কোটি টন প্লাস্টিক। যে প্লাস্টিক মানুষ ব্যবহার করে তা পরিবেশের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কারণ প্লাস্টিক পোড়ে না। নষ্ট হয় না। ড্রেন, নালা, শহরের সুয়ারেজ বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বন্যা, জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। প্লাস্টিক বর্জ্যের ঝুঁকি মোকাবিলা ও  বিকল্প জ্বালানি তৈরি নিয়ে আমি গবেষণা শুরু করি। আমরা সফল হয়েছি। প্লাস্টিক আসলে এক রকমের অশোধিত তেল। এই তেল ঠান্ডা করে যে কোনো আকৃতি দেওয়া যায় এবং সংরক্ষণ করা যায়। এর একটি অংশ দিয়ে শপিং ব্যাগ, পাত্র, খেলনা ও নানা রকমের শো-পিস তৈরি করা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা নানা বাধার সম্মুখীন হয়েছিলাম। সেসব বাধা অতিক্রম করেছি। এখন আমাদের লক্ষ্য বছরে ২০ থেকে ৩০ কোটি ব্যারেল তেল উত্পাদন।

জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্লাস্টিক উত্পাদনের ১৩ শতাংশ কঠিন বর্জ্যে পরিণত হয়। সেখানকার পরিবেশ রক্ষা সংস্থার হিসেবে প্রতি বছর তৈরি হয় পাঁচ কোটি টন প্লাস্টিক সামগ্রী। তার তিন কোটি দুই লাখ টন একবার ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া হয়। এক শতাংশ পুনঃব্যবহারযোগ্য, বাকিটা সরাসরি পরিবেশ দূষিত করে। কিছু গিয়ে পড়ে সাগরে। বাংলাদেশের চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। কারণ প্লাস্টিক বর্জ্যের বিকল্প ব্যবহার নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যা পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। পরিবেশের এই বিপুল ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া এবং প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে তেল উত্পাদনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিছুটা হলেও রোধ করা সম্ভব। প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে অশোধিত তেলে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন ৭০৭ থেকে ৭৫২ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা। আর এ প্রক্রিয়ায় যে তেল উত্পাদন করা হবে, তা বাজারের অন্য জ্বালানি থেকে আলদা নয়। বরং আরও উন্নত। এই জ্বালানি দিয়ে গাড়ি, জেনারেটরসহ সব রকমের ইঞ্জিন চালানো সম্ভব। আর প্রতি গ্যালন তেল তৈরিতে ব্যয় হবে মাত্র এক ডলার।

ড. মইনউদ্দিন সরকার নিউ ইয়র্কের ব্রিজপোর্ট ও নিউজার্সিতে প্লান্ট গড়ে তুলেছেন। তার কোম্পানির নাম ‘ন্যাচারাল স্টেট রিসার্চ ইনকরপোরেশন’ (এনএসআর)। শুধু প্লাস্টিক থেকে তেল তৈরির কাজ করছে এই কোম্পানি। এই তেলের নাম এনএসআর ফুয়েল। ড. সরকার এই প্রতিষ্ঠানের ভাইস প্রেসিডেন্ট, উদ্ভাবক ও বিজ্ঞানীদের প্রধান। তার কোম্পানির পাশাপাশি এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তেল উত্পাদন করছে আরও একটি কোম্পানি। তবে সরকার জানান, এনএসআর ফুয়েলের বিষেশত্ব এটি পরিবেশবান্ধব। এতে কোনো সালফার থাকবে না। অন্য যারা এই জ্বালানি তৈরি করছে তাতে সালফার রয়েছে। সালফার থাকার কারণে এগুলো যখন ব্যবহারিত হচ্ছে তখন বাতাসে সালফার-ডাই-অক্সাইড সরাচ্ছে। যা পরিবেশের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে উত্পন্ন ৯৫ শতাংশ তেল, বাকি ২ ভাগ হালকা গ্যাস, ৩ ভাগ অবশিষ্ট বর্জ্য থেকে যাবে। এই বর্জ্য যেন পরিবেশকে ক্ষতি না করে সে ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

ড. মইনউদ্দিন সরকারের বাড়ি কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি। বাবা কামালউদ্দিন সরকার ছিলেন সরকারি কর্মচারী। ৬ ভাই ৩ বোনের মধ্যে বড় মইনউদ্দিন। তার ছেলেবেলা ছিল সংগ্রামমুখর। এমনকি কৃষি কাজও করেছেন তিনি। তিনি বলেন, আমি গৌরিপুর হাইস্কুলের তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। একদিন স্কুল পরিদর্শনে এসেছিলেন স্থানীয় চেয়ারম্যান। তিনি জানতে চেয়েছিলেন যে, তোমরা কে কি হতে চাও। আমি বলেছিলাম, বড় হয়ে আমি বিজ্ঞানী হব। কথাটি আজও আমার মনে পড়ে। আব্বা-মা চেয়েছিলেন আমি যেন ডাক্তার হই। কিন্তু আমি নিজের ইচ্ছায় অটল ছিলাম। এ পর্যায়ে আসতে আমাকে অসম্ভব পরিশ্রম করতে হয়েছে।

মইনউদ্দিন সরকার ১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে এমএসসি পাস করে বিদেশে পাড়ি জমান। ১৯৯৬ সালে লন্ডনের ম্যানচেস্টার ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে পিএইচডি লাভ করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘হাই টেম্পারেচার সুপার কনডাক্টিং অক্সাইড’। তিনি গবেষণা করেছেন যুক্তরাজ্যে (১৯৯১-১৯৯৬), তাইওয়ানে (১৯৯৬-১৯৯৯), বার্লিনে (১৯৯৯-২০০০) এবং ২০০১ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। কাজ করেছেন কানাডা, জার্মানি, নেদারল্যান্ডসে। তাইওয়ানে গবেষণার সময় তার গবেষণার সঙ্গী ছিলেন রসায়নে নোবেলজয়ী ড. ইউয়ান লি। ২০১০ সালে প্লাস্টিক থেকে তেল উত্পাদনের পেটেন্ট করেন। তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত বেড়ে ওঠা প্রযুক্তিগুলোর অন্যতম। পুনঃব্যবহার বা রিসাইক্লেলিংয়ের জন্য বর্জ্য সংগ্রহ করার ফলে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে তেমনি প্রয়োজনীয় জ্বালানি তৈরি করা যাবে। এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে মানুষের প্রয়োজনীয় গ্রিন টেকনোলজির চাহিদাও পূরণ হবে। দিন দিন আমাদের প্লান্ট প্রসারিত হচ্ছে। সুযোগ হলে বাংলাদেশেও এ রকমের প্লান্ট করতে চাই। তাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা পাবে এবং ভবিষ্যত্ জ্বালানি নিরাপত্তা সুরক্ষিত হবে।      

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানীদের একজন ড. মইনউদ্দিন সরকার। নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিষয়ক গবেষণায় অবদান রাখায় স্বীকৃতিস্বরূপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের International Renewable Energy Innovator of the year ২০১০ সালে তিনি পুরস্কৃত হয়েছেন। এছাড়া তিনি একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মান লাভ করেছেন। ড. মইনউদ্দিন সরকার সোসাইটি অব অটোমোবাইল ইন্টারন্যাশনাল, আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব নেভাব ইঞ্জিনিয়ারিং, আমেরিকান ক্যামিক্যাল সোসাইটি, আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটি, আমেরিকান ইন্সটিটিউট অব ক্যামিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন পুর অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড ক্যামিস্ট্রি, কানাডিয়ান সোসাইটি অব ক্যামেস্ট্রি, ক্যামিক্যাল ইন্সটিটিউট অব কানাডাসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে যুক্ত আছেন। তার শতাধিক গবেষণাপত্র ছাপা হয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নালে। বই ছাপা হয়েছে ১০টি। ইতিমধ্যে তার ৬টি নিজস্ব পেটেন্ট নিবন্ধিত হয়েছে। কীর্তিমান এই বাঙালির স্ত্রী আনজুমান আরা একজন বিজ্ঞানী। তারা ব্রিজফোর্টে বসবাস করছেন।

এই পাতার আরো খবর
সর্বাধিক পঠিত
up-arrow