Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ১৩ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১২ অক্টোবর, ২০১৮ ২১:৫৮
ছিনতাইকারী ধরিয়ে দিয়ে ডিএমপির পুরস্কারপ্রাপ্ত
সাহসী অন্তরা
সাহসী অন্তরা
সাহসী অন্তরা

চলাফেরার পথে প্রায়ই আমাদের কোনো না কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়। কখনো আমরা তা পাশ কাটিয়ে চলে যাই, কখনো আবার শুধু নিজের জিনিস বুঝে নিয়ে বাসায় ফিরি। কিন্তু আমাদের মাঝেই কেউ কেউ আছেন যারা অন্যায় রুখে তা আইনের আওতায় সোপর্দ করেন নিজ দায়িত্বে। যা রীতিমতো সবার জন্য অনুকরণীয় ও প্রশংসনীয়। এমনই প্রশংসার দাবিদার অন্তরা রহমান। ব্যস্ত ঢাকার রাজপথ থেকে ছিনতাইকারী ধরে সোপর্দ করেছেন থানায়। এ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন পুরস্কার। বিস্তারিত জানাচ্ছেন- তানিয়া তুষ্টি

 

ঢাকার রাস্তায় দিনদুপুরে ছিনতাইয়ের ঘটনা আমাদের কাছে এখন আর খুব বেশি অবাক হওয়ার নয়। এমন ঘটনার সাক্ষী আমি, আপনি অথবা কাছের কেউ সহসাই হচ্ছেন। কিন্তু হাতের ব্যাগটি ছোঁ মেরে দৌড়ে পালানো ছিনতাইকারীর পেছনে এই ব্যস্ত ঢাকায় কেউ দৌড়াচ্ছে, তাও আবার এক নারী- এই ঘটনাটি নিশ্চয় আমাদের অবাক করবে। ঘটনা শেষ এখানেই নয়, চলন্ত বাসে উঠে যাওয়া দোষী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে টেনে নিচে নামানো এবং শেষমেশ পুলিশে দেওয়ার ঘটনা কিন্তু বিরল। এটি একান্তই সাহসিকতার পরিচয় ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।

দক্ষিণ বনশ্রী থেকে যাত্রাবাড়ীর জনপথ রোড হয়ে জুরাইনে এক আত্মীয়ের বাসায় যাচ্ছিলেন অন্তরা রহমান। দিনটি ছিল ১৭ আগস্ট শুক্রবার। যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুলের সামনে এলে রিকশায় থাকা অন্তরার হাত থেকে হঠাৎ এক ছিনতাইকারী ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে দেয় দৌড়। সাতপাঁচ কিছু না ভেবেই অন্তরাও রিকশা থেকে নেমে ছিনতাইকারীর পেছন পেছন দৌড়াতে থাকেন। চলন্ত রিকশা আর গাড়ির ভিতর দিয়ে ছিনতাইকারীকে অনুসরণ করেন তিনি। লোকটির মুখ ভালো করে দেখতে না পেলেও তার পরনের টি-শার্ট ও চেক প্যান্টের রংটা ভালো করে খেয়াল করেন। হঠাৎ লোকটি উধাও। অন্তরার মনে হলো সামনের বাসটিতে ছিনতাইকারী উঠতে পারে। চলন্ত বাসে তিনিও লাফিয়ে উঠে পড়েন। সম্পূর্ণ খালি বাসটিতে শুধু ড্রাইভার আর  হেলপার ছিল। তারা প্রথমেই অন্তরাকে নিরুৎসাহিত করে, কেউ এই বাসে ওঠেনি বলে। কিন্তু অন্তরা খেয়াল করেন পেছনের সিটে কেউ গুঁটিসুটি হয়ে বসে আছে। অন্তরা গিয়ে দেখেন তার অনুসরণ করা টি-শার্ট আর প্যান্ট মিলে গেছে। শার্টের কলার ধরে টান দিতেই দেখেন লোকটি অন্তরার ব্যাগের ওপর বসে আছে। অন্তরা জানান, সেই ব্যাগটিই আমার ছিল আর লোকটির প্যান্টের ভিতরে লুকানো ছিল আমার ফোন। সেটাও খুঁজে বের করি।

তখন আমি খুব জোরে চিৎকার করছিলাম বাসটি থামানোর জন্য। বাসচালক বাসটি না থামিয়ে আরও জোরে চালাতে লাগল। এ সময় রাস্তার কিছু লোক আমাকে চিৎকার করতে দেখে বাসটি থামাল। ছিনতাইকারী লোকটিকে বাস থেকে নামিয়ে আমি যখন চড়-থাপ্পড় দিলাম তখন সবাই জানতে চাইল কী হয়েছে। বললাম এই লোকটা আমার ব্যাগ ও মোবাইল ফোন ছিনতাই করেছে। তখন পাশ থেকে কয়েকজন ব্যক্তি এসে লোকটিকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। এ সময় ছিনতাইকারী বলল- আপা আমাকে ছেড়ে দেন, গতকাল আমি জেল থেকে ছাড়া পেয়েছি। প্রথমে তার কাকুতি মিনতি দেখে ভেবেছিলাম ওকে ছেড়ে দেব। কিন্তু যখনই শুনলাম সে মাত্র গতকাল ছাড়া পেয়েছে তখনই মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল।

বললাম, তুই গতকাল জেল থেকে ছাড়া পেয়ে যেহেতু এই কাজ করেছিস, তাই আজকে ছেড়ে দিলে এর থেকেও ভয়ঙ্কর কাজ করবি। এ সময় যাত্রাবাড়ী থানা থেকে দুজন পুলিশ অফিসার এলো। তাদের সহায়তায় লোকটিকে থানায় নিয়ে যাই। নিজে বাদী হয়ে একটি মামলা করি।

এই ঘটনায় থানার সবাই খুব খুশি হন। ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী নিজে মিষ্টি এনে সবাইকে খাওয়ান। হঠাৎ একদিন তিনি আমাকে ফোনে জানান, ডিএমপির একটি অনুষ্ঠানে আপনাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানে গিয়ে আমি রীতিমতো স্তম্ভিত। ডিএমপির পক্ষ থেকে পুরস্কারস্বরূপ স্বীকৃতি পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত এবং উৎফুল্ল হয়ে যাই। এই ঘটনার জন্য আমাকে এত বড় একটা সম্মাননা দেওয়া হবে কখনই ভাবিনি। তারা আমাকে যে ভালোবাসা ও সম্মাননা দিয়েছে সেটা আমার জন্য অনেক বড় একটা প্রাপ্তি।

এ বিষয়ে যাত্রাবাড়ী থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘অন্তরা রহমান একজন মেয়ে হয়ে যে কাজটি করেছেন তা অবশ্যই দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ঘটনা। তিনি নিজের দায়িত্ববোধ এবং আইনের প্রতি সম্মান রেখে এই কাজটি করতে সক্ষম হয়েছেন। তার এমন সাহসী ভূমিকা রাখা রীতিমতো সমাজের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয় বটে। তবে ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটুক তা আমরা চাই না। যদি ঘটেই যায়, সেখানে আমার আহ্বান কোনো নারীর প্রতিরোধের সঙ্গে আশপাশে থাকা পুরুষরাও যেন এগিয়ে আসেন। সবাই মিলে অন্যায়কে রুখে আইনের আওতায় নিয়ে আসেন।’

দুই বোন ও এক ভাইয়ের মাঝে অন্তরা রহমান দ্বিতীয়। কাজের সুবাদে বাবা মাহবুবুর রহমান দুবাই থাকেন। মা গৃহিণী। ছোট থেকে একটু শান্ত স্বভাবের হলেও মাধ্যমিক পাসের পর থেকে নিজেই আবিষ্কার করেন নিজের প্রতিবাদী স্বভাব। সামনে কারও ওপর কোনো অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ না করা পর্যন্ত তিনি শান্ত থাকতে পারেন না। বর্তমানে তিনি বিজয়নগরে একটি ল’ ফার্মে কর্মরত আছেন।

এই পাতার আরো খবর
সর্বাধিক পঠিত
up-arrow