Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ মার্চ, ২০১৯ ২২:৪৫

জিনবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী

৩০০ জাতের ধান ও রঙিন ভুট্টার উদ্ভাবক

শেখ মেহেদী হাসান

৩০০ জাতের ধান ও রঙিন ভুট্টার উদ্ভাবক
ছবি : রাফিয়া আহমেদ

জিনবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী কাজ করছেন ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে। বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাসাচুসেট্স ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে পড়াশোনা শেষে সেখানেই শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। তিন বছর শিক্ষকতার পর অস্ট্রেলিয়া সরকারের আমন্ত্রণে চলে যান অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় গবেষণা সংস্থায়। এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ধান-বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। এ পর্যন্ত ৩০০ রকমের নতুন জাতের ধান উদ্ভাবন করেছেন তিনি। তার প্রজেক্ট রয়েছে স্পেন, মরিশাস, অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াতে উচ্চ ফলনশীল ধান উৎপাদন ও ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে গবেষণা করছেন তিনি। সম্প্রতি তিনি উদ্ভাবন করেছেন ডায়াবেটিস ও ক্যান্সার প্রতিরোধক রঙিন ভুট্টা। তার এই উদ্ভাবন বিশ্বব্যাপী আড়োলন তুলেছে।

বিশ্বখ্যাত জিনবিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরীর জম্ম মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার কানিহাটি গ্রামে। যুক্তরাষ্ট্রের অরেগন স্টেট ইনস্টিটিউট অব মলিকুলার বায়োলজি এবং ওয়াশিংটন স্টেটের ফ্রেড হাচিনসন ক্যান্সার রিসার্চ ইনস্টিটিউটে উচ্চতর পড়াশোনার সময় তিনি ‘রেকডি’ নামক তিনটি অযৌন জিন উদ্ভাবন করেন। এর ফলে পিতৃবিহীন বীজ উৎপাদন সম্ভবপর হয়। এমআইটি, আমেরিকান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট হেলথ এবং ফ্রান্সের ইকোল নরমাল সুপিরিয়রে গবেষণা ও শিক্ষকতার সময় তিনি একাধিক নতুন ধানের জিন উদ্ভাবন করেন। তবে অস্ট্রেলিয়ায় তার গবেষণা ও উদ্ভাবন আরও বিস্তৃৃত হয়।

চীনে ইয়ং লং পিং প্রথমবারের মতো হাইব্রিড জাতের ধান উৎপাদন করেন। তিনি মাঠের মধ্যে একটি ধান খুঁজে পেয়েছিলেন। সেটি কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়মে সেখানে ছিল। ড. আবেদ চৌধুরী বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, হাইব্রিডের যে শক্তি তা প্রকৃৃতির মধ্যেই আছে। কাজেই এটা যে প্রকৃতির বিরুদ্ধে সৃষ্টি তা আমি মানতে রাজি নই। প্রকৃৃতির মাধ্যমেই একটি শস্য আরেকটি শস্যের সঙ্গে মিশে হাইবিড্র হয়। এবং নতুন জাত উদ্ভব হয়। আমরা এখন গবেষণার মাধ্যমে হাইবিড্রকে একটা উৎপাদনের পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। এর মাধ্যমে নতুন জাতের ধান উৎপাদন এবং বিশাল পরিমাণে ধান উৎপাদন করা সম্ভব। দেখুন জীব-বৈচিত্র্য আছে বলে আমরা একটি ধানের সঙ্গে আরেকটি ধানের হাইবিড্র ঘটাতে পারছি। জীব-বৈচিত্র্য যদি না থাকত তাহলে হাইব্রিডের মাধ্যমে উৎপাদন সম্ভব হতো না। এই যে আমাদের দেশের হাজার জাতের ধান, যার উৎপাদন কমে যাচ্ছে, আমার তো মনে হয় একটি হাইবিড্র মডেল বানিয়ে এর উৎপাদন বাড়িয়ে তুলতে পারি।’ বাংলাদেশের খাদ্য চাহিদা মেটাতে কেন আমাদের হাইবিড্র ধান দরকার? এ প্রসঙ্গে আবেদ চৌধুরী বলেন, ‘দুটো ভিন্ন জাতের ধান ক্রসের মাধ্যমে একত্রিত করে যখন একটি হাইবিড্র তৈরি করা হয় তখন ওই ইনব্রিডিং ডিপ্রেশন কমে গিয়ে হাইবিড্র চলে আসে। সে কারণেই কিন্তু হাইব্রিডের প্রয়োজন রয়েছে। ব্রিডের মাধ্যমে আমরা উৎপাদন কমে যাওয়া নিবৃত্ত করতে পারি। দেশীয় ধান সংরুণ, বিলুপ্তপ্রায় ধান খুঁজে বের করা ও দেশীয় ধান থেকে হাইব্রিড পদ্ধতিতে না গিয়ে ব্রিড করে নতুন ধান উদ্ভাবন করাই আমার গবেষণার লক্ষ্য। দেখুন, কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের ধান ‘কাছালত’কে ভারতীয় ধান বলে ম্যানিলার আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্র স্বীকৃতি দিয়েছিল। আমি এর প্রতিবাদ করে কাছালত ধান সংক্ষণ করে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ দিয়ে স্বীকৃতি আদায় করি যে, কাছালত বাংলাদেশের ধান। এটি ভারতের নয়।’ স্পেন, চীন, মরিশাস, অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের সিলেটে আবেদ চৌধুরীর প্রজেক্ট রয়েছে। এখানে নতুন প্রজাতির ধান উৎপাদন করা হচ্ছে। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালে মরিশাস সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রথমবারের মতো ধান চাষ করা হয়। পাহাড় ঘেরা মরিশাসে এখন ধান উৎপাদন হচ্ছে। আমরা আশাতীত সাফল্য পেয়েছি। অস্ট্রেলিয়া, চীন, স্পেনেও একই অবস্থা। ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশের সিলেটে প্রজেক্ট করেছি। কুলাউড়ায় আমরা নানারকমের ধান চাষ করছি। আমাদের উৎপাদিত সুগার-ফ্রি চালের পুষ্টিগুণ বেশি। মেশিনের পরিবর্তে ঢেঁকি-ছাঁটা চাল বাজারজাত করছি। বাজারে এখন আমাদের চালের চাহিদা বাড়ছে। কেমিক্যালমুক্ত চাল মানুষকে সুস্থ থাকতে সহায়তা করছে।’

ড. আবেদ চৌধুরী উদ্ভাবিত সোনালি মিনিকেট চাল একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। যা খেলে রক্তে শর্করা এবং সুগার কমে যায়। ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তার উদ্ভাবিত কোনো কোনো ধান তিনবার ফসল দেয়। তিনি সম্প্রতি লাল রঙের চাল ও রঙিন ভুট্টা উদ্ভাবন করেছেন। এর পুষ্টিগুণ বেশি। তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী মানুষের ডায়াবেটিস, ক্যান্সার দিন দিন বাড়ছে। এসব রোগের অন্যতম কারণ খাদ্যাভ্যাস। আমাদের চাল খেলে কার্বোহাইড্রেড এবং সুগার কমে যায়। ফলে ডায়াবেটিস অনেক নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ক্যান্সার প্রতিরোধেও ভ‚মিকা রাখে।’ এর বাজারমূল্য অন্যান্য চালের মতো। ড. আবেদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা অচিরেই এই চাল বাজারজাত করব। এখন কেউ কিনতে চাইলে আমাদের কর্মীরা সরাসরি ঠিকানা অনুযায়ী পৌঁছে দেবে।’ 

স¤প্রতি উদ্ভাবিত ‘রঙিন ভুট্টা’ সম্পর্কে ড. আবেদ চৌধুরী বলেন, ‘আমার উদ্ভাবনের মধ্যে লাল-সবুজের পতাকা অর্থাৎ বাংলাদেশের কথা মাথায় রেখেছিলাম। রঙিন ভুট্টা উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষিখেত রঙিন করে দিতে চাই। তাছাড়া ধান ও গমের তুলনায় ভুট্টার পুষ্টিমান খুবই বেশি। শিশুদের মাঝে এই ভুট্টা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাবে বলে আমার বিশ্বাস। তাছাড়া শিশুরা এই ভুট্টা খেলে তাদের দেহের পুষ্টির চাহিদা অনায়াসেই পূরণ হবে। রঙিন ভুট্টা বছরে চারবার চাষ করা যায়। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে বিএডিসির মাধ্যমে ধান ও ভুট্টার বীজ সরবরাহ করছি। মানুষ বাড়ির আশপাশে এবং পতিত জায়গায় ভুট্টা চাষ করলে তাদের খাদ্য চাহিদা মেটাতে পারবে। আমরা পুষ্টিকর ও সুস্বাদু কালো টমেটোও উদ্ভাবন করেছি। আমার লক্ষ্য ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’


আপনার মন্তব্য