Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ১১:৫৭ অনলাইন ভার্সন
তারাই আগে দল ছাড়ে
নঈম নিজাম
তারাই আগে দল ছাড়ে
নঈম নিজাম

একটি বই পড়ছিলাম। নাম— ‘কাছের মানুষ, কাজের মানুষ গনি খান চৌধুরী’। লেখক পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকার সাবেক নির্বাহী সম্পাদক সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত। এ বইতে রয়েছে, বরকত গনি খান চৌধুরী ও সৌমেন মিত্রের আলাদা সম্পর্কের কথা। ১৯৮৭ সালের জুলাই মাসে সৌমেন মিত্র গিয়েছিলেন রাজীব গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দিল্লিতে। রাজীব গান্ধীর কক্ষে প্রবেশের আগে তার রাজনৈতিক সচিব বললেন, ‘সৌমেন বাবু, আপনি বরকত গনি খান চৌধুরীকে ছেড়ে দিয়ে প্রিয়র সঙ্গে টিম করুন।’ সৌমেন মিত্র বিস্মিত। বিষয়টি ভালোভাবে নিলেন না। তাই সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা জবাবও দিলেন। বললেন, বরকত সাহেব আমার শুধু রাজনৈতিক গুরু নন, তিনি আমার ধর্মপিতা। পিতাকে কেউ ত্যাগ করে না। সৌমেনের উত্তর শুনে হকচকিয়ে যান রাজনৈতিক সচিব। কথা আর কোনো পক্ষ বেশি বাড়ান না। তবুও বিষয়টি সাউথ ব্লকে অনেক দূর গড়ায়। রাজীব গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের সময় পুরো ঘটনা তুলে ধরেন সৌমেন মিত্র। রাজীব গান্ধী বিস্মিত হলেন। কারণ রাজীব গান্ধী এমন কিছু বলতে তার কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেননি। তাই রাজীব গান্ধী তখন সৌমেন মিত্রকে বলেছিলেন, বরকতজি আমাদের প্রিয় নেতাই নন, আমাদের পরিবারের একজন। মা’র সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা আমি ভুলতে পারব না। এরপর রাজীব গান্ধী তার সচিবকে ডেকে নেন। জানতে চান সৌমেনের মতো নেতাকে এ কথা বলতে কে বলেছে? জবাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বললেন, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি ও অজিত পাঁজা। রাজীব তখনই তাকে সতর্ক করে দেন, ভবিষ্যতে তার অফিসে বসে এ ধরনের রাজনীতি না করার জন্য।’

এই লেখাটি পড়ার পর ভাবছি, বাংলাদেশে এমন ঘটনা হলে কী হতো?  কোনো নেতার কি সাহস আছে, প্রধান নেত্রীদের অফিসের কারও বিরুদ্ধে গিয়ে কথা বলার?  সবাই চেয়ারকে সম্মান করেন। শুধু চেয়ারকে নন, সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোকেও তোয়াজ করেন। আর চেয়ারকে ঘিরে অনেক ব্যক্তিগত কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাপট এখন রূপকথার গল্পের মতো। অথচ এমন হওয়ার কথা নয়।

 ক্ষমতায় থাকাকালে সবাই নেতিবাচক সমালোচনা শুনতে নারাজ। সবাই চান প্রশংসা শুনতে। আর তখনই তৈরি হয় চাটুকার গ্রুপ। অথচ বেলাশেষে এ চাটুকাররা থাকে না। কাজ শেষ হলে কেটে পড়ে ওরা। বাংলাদেশে এখন তো সবাই সরকারি দল। কিন্তু দিনশেষে কি হবে জানি না। ছোটবেলায় শুনতাম শেষবেলার হাটে নাকি সবার তাড়া থাকে। কারণ বাজার শেষ। কাজ কারবারও শেষ। এ নিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময়কার একটি কথা মনে পড়ছে। তার মায়ের মৃত্যুর পর যে মন্ত্রীরা বেশি কান্নাকাটি করেছিলেন তারাই তাকে আগে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধুর কম প্রশংসা করতেন না। বঙ্গবন্ধুর পাশে মোশতাক অন্য কাউকে দাঁড়াতে দিতেন না। বঙ্গবন্ধু হাসলে মোশতাক হাসতেন। আর জিয়াউর রহমানের আস্থাভাজনরাই দলে দলে যোগ দিয়েছিলেন এরশাদের মন্ত্রিসভায়। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের এক সাবেক মন্ত্রীও হাওয়া ভবনে গিয়েছিলেন। আবার অনেককে কয়েক বছর খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেকে রাজনীতিও ছেড়ে দিয়েছিলেন।  ইতিহাসের অনেক কিছু আমরা খুব সহজে ভুলে যাই। ইতিহাস সব সময় তার আপন মহিমায় চলে। তোষামোদকারীরা বিরোধী দলে থাকে না। তারা সব সময় ক্ষমতার সঙ্গে থাকতে পছন্দ করে। বিরোধী দল করে এক দল। তারা  রাজপথ দখলে রাখে। ক্ষমতায় গেলে আরেক দল উড়ে আসে। তারা মধু খায়, মধু বিলায়। আর প্রশ্ন তোলে রাজপথের আন্দোলনকারী অথবা দুঃসময়ের মানুষদের নিয়ে। এ বাস্তবতা সব সময় আমাদের দেশে ছিল। ক্ষমতাসীনদের চারপাশের মানুষগুলো সব সময় এক রকম হয়। তারা যেন তোতা পাখি। স্বার্থের জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মিথ্যার সঙ্গে চলতে পছন্দ করে। এ কারণেই হয়তো রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘গাহিছে কাশিনাথ নবীন যুবা ধ্বনিতে সভাগৃহ ঢাকি, কণ্ঠে খেলিতেছে সাতটি সুর সাতটি যেন পোষা পাখি।’ আজকাল কারও কারও কথা আমার কাছে পোষা পাখির মতোই মনে হয়। একই সুর। কিন্তু এই সুর সব সময় এক রকম থাকে না। কোথাও যেন সুর তাল লয় ক্ষয়ে যায়, যা দেখা যায় না। বোঝা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়।

৯১ সালে সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম। অন্যদিকে সংসদে বিরোধী দলের উপনেতা ছিলেন প্রয়াত আবদুস সামাদ আজাদ। এ সময়ে আওয়ামী লীগের তরুণ এমপি মির্জা আজমের সঙ্গে লড়াই শুরু বিএনপি মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের। সংসদে মির্জা আজম প্রতিদিনই অভিযোগের তীর হানতেন সালাম তালুকদারের বিরুদ্ধে। সালাম তালুকদার পাল্টা জবাব দিতেন। আমরা সংবাদকর্মীরা সংসদ গ্যালারিতে বসে উপভোগ করতাম। কাজ করি তখন দৈনিক ভোরের কাগজে। সৈয়দ বোরহান কবীর ও আমি সংসদ রিপোর্টার। মির্জা আজম আমাদের বন্ধু। এর মধ্যে একদিন বিএনপি মহাসচিব ও মন্ত্রী আবদুস সালাম তালুকদারের বিরুদ্ধে মির্জা আজম অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আসেন। সংসদে হৈচৈ। বাংলাদেশের সংসদের ইতিহাসে এমন কখনো হয়নি। শুরু হয় দুই দলের বাক-বিতণ্ডা। স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী জানতেন সংসদ কীভাবে জমাতে হয়। তিনি দুই দলকে সমান্তরাল ফ্লোর দিতেন। আমার চোখে বাংলাদেশের সেরা সংসদ ৯১ থেকে ৯৬ সালের সংসদ। সেরা স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী। শামসুল হুদা চৌধুরী ছিলেন আরেক মেজাজের। যাই হোক সংসদে সোচ্চার তরুণ সেই এমপি আজম বিপাকে পড়েন এলাকার উন্নয়ন নিয়ে। বিষয়টি অবহিত করেন তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে। তখনই বিরোধীদলীয় উপনেতা আবদুস সামাদ আজাদের সঙ্গে কথা বলেন শেখ হাসিনা। প্রবীণ এই নেতাকে দায়িত্ব দেন বিষয়টি দেখতে। আবদুস সামাদ আজাদ সচিবালয়ে যান এমপি মির্জা আজমকে নিয়ে। দেখা করেন যোগাযোগমন্ত্রী অলি আহমদ বীরবিক্রমের সঙ্গে। অলি আহমদ দুজনকে আপ্যায়ন করলেন। আবদুস সামাদ আজাদের কাছে জানতে চান কেন তিনি সচিবালয়ে। তিনি তখন অলি আহমদকে বলেন, আমি ৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মন্ত্রিত্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর প্রথম সচিবালয়ে এলাম। আসার কারণ মির্জা আজম। তার এলাকায় কোনো উন্নয়ন কাজ হচ্ছে না। এই বৈষম্যের কোনো মানে হয় না। আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। এলজিআরডিতে কাজ না হোক, আপনার মন্ত্রণালয়ে ইতিবাচক কিছু আশা করছি। অলি আহমদ তখনই বললেন, আমার মন্ত্রণালয়ে অন্য ১০ জন এমপির এলাকায় যেভাবে কাজ হয় মির্জা আজমের এলাকাতেও তাই হবে। কোনো বৈষম্য হবে না। আপনার সম্মানে দ্রুত এখানে সড়ক নির্মাণের নির্দেশ দিচ্ছি। শুধু যোগাযোগ নয়, মির্জা আজমের এলাকায় এলজিইডির কাজও হতো। এলজিআরডি মন্ত্রী আবদুস সালাম তালুকদারকে না জানিয়েই কাজের বরাদ্দ দিতেন এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। অন্য কর্মকর্তারা জানতেন, প্রধান প্রকৌশলী ইতিবাচক। তাই তারাও বরাদ্দ দিতেন আলাদা করে। এই যুগে এমন পরিবেশ আমরা চিন্তাও করতে পারি না। ভাবতেও পারি না। কোথায় যাচ্ছে আমাদের রাজনীতি জানি না। ওই পরিবেশ একদিনে নষ্ট হয়নি। নষ্টের প্রক্রিয়া সবচেয়ে বেশি জোরদার হওয়া শুরু করে ২০০১ সালের পর। সেই সময় আওয়ামী লীগের অনেক সাবেক এমপি তাদের এলাকায় যেতে বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন। দিন দিন এই অসহিষ্ণুতা বাড়ছেই।

অনেকে ভেবেছিলেন ওয়ান-ইলেভেনের পর অনেক কিছু ঠিক হয়ে যাবে। কারণ সেই সময় দুই দলের অনেক রাজনীতিকই কারাগারে ছিলেন। কারাগারে তাদের মধ্যে একটা সৌহার্দ্যভাব ছিল। আমি অনেক নেতাকে দেখতে কারাগারে যেতাম। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের দেখেছি, আদালতে আসার পর পুলিশের গাড়িতে একসঙ্গে বসে খেতে। তারা জেলখানায় একসঙ্গে টিভি দেখতেন। আড্ডা দিতেন। রান্নাবান্নাও একসঙ্গে হতো অনেকের। আর নিজেরা আলাপ করতেন, ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে কেউ কারও বিপক্ষে প্রতিহিংসাপরায়ণ হবেন না। সেই সব দিন হারিয়ে গেছে।  আওয়ামী লীগের এক নেতা বললেন, হারাবে না কেন! একটা দেশের বিরোধীদলীয় নেত্রীকে গ্রেনেড হামলা করে হত্যা চেষ্টার পর আমরা ভালো কিছু আশা করব কেন?  কুমিল্লার প্রয়াত আকবর হোসেন একটু অন্য ধাঁচের রাজনীতিক ছিলেন। সারা জীবন খদ্দর পরতেন। আমি বললাম, কুমিল্লাকে ব্র্যান্ডিং করছেন আপনি। হাসতেন। মন্ত্রী থাকাকালে এটিএন বাংলা অফিসে আমার কক্ষে বসে একদিন বলেছিলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে সোনালি অধ্যায় ষাটের দশক। তিনি শেষ জীবনে দহনে ছিলেন। তখনকার বিএনপির অনেক কার্যক্রমই তার পছন্দ হতো না। বলতেন, পোলাপাইন রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করলে পরিণতি ভালো হয় না। বিএনপির রাজনীতির অনেক খারাবি আকবর ভাই দেখে যেতে পারেননি। ইতিহাস বড়ই নিষ্ঠুর।

রাজনীতিকে তার আপন গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। মিডিয়াকে দিতে হবে স্বাভাবিকতা। তা না করে শুধু চাটুকারদের কথায় চললে সর্বনাশ হয়ে যায়। মালয়েশিয়ার আজকের রাজনীতি আবার মাহাথিরকেই টানছে। মালয়েশিয়ার মানুষ মাহাথির মোহাম্মদকে আবার প্রধানমন্ত্রী দেখতে চায়। বিরোধীদলীয় জোট এরই মধ্যে ৯২ বছর বয়সী এই নেতাকে প্রার্থী করার ঘোষণা দিয়েছে। আধুনিক মালয়েশিয়ার এই রূপকারকে তার দেশের মানুষ ভুলতে পারছে না। আর পারছে না বলেই বয়সের হিসেবে যায়নি কেউ। উন্নয়ন ও সুশাসন অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ থাকে। তাই বলে কোনো কিছুই থেমে থাকে না। উন্নয়ন ও সুশাসনকে একসঙ্গে রাখার জন্য দুঃসময়ের মানুষকে ছুড়ে ফেলে চাটুকারিতার ওপর নির্ভর করলে সর্বনাশ হয়ে যায়, যা ক্ষমতার সাদাচোখে ধরা যায় না। যখন সব কিছু দৃশ্যমান হয় তখন অনেক বিলম্ব হয়ে যায়। সারা দুনিয়াতেই মানুষের প্রত্যাশা এখনো রাজনীতিবিদদের কাছেই। একজন মাহাথির ক্ষমতায় থাকার সময় উন্নয়নকে সামনে রেখেছিলেন। এখন সব দেশে বিশ্বাস, অবিশ্বাস তৈরির প্রতিযোগিতা চলছে। বাংলাদেশের আজকালের অনেক কিছুই বুঝে উঠতে পারি না। প্রশাসনে, মিডিয়াতে সব স্তরে একই পরিবেশ। অথচ কেউই বাস্তবতা নিয়ে চিন্তা করছেন না। পরিবেশটা রবীন্দ্রনাথের সেই কথাগুলোর মতো, “সভার লোকে সবে অন্যমনা, কেহ-না কানাকানি করে। কেহ-বা তোলে হাই, কেহ-বা ঢোলে, কেহ-বা চলে যায় ঘরে।” অনেকের কাজকারবারে তাই মনে হয়। নবাগত অতি দরদীরা সমস্যাগুলো বাড়াচ্ছে। তারা ঘাটে ঘাটে সরকারের পরীক্ষিত অনেক মানুষকে সরিয়ে দিচ্ছে কৌশলে। হতাশা তৈরি করছে। ঘাটে ঘাটে সুর তাল লয় ক্ষয়ে যাচ্ছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের একই রূপ। কেন এমন হচ্ছে বুঝতে পারি না। মানুষের স্বাভাবিকতা নেই। নীতি ও নৈতিকতার ধার এখন আর ধারে না। সবাই যার যার মতো একটা ব্যাখ্যা তৈরি করে। এই ব্যাখ্যাই চাপিয়ে দেয় অপরের ওপর। নীতি আদর্শ দরজা জানালা দিয়ে পালিয়ে গেছে। বড় অদ্ভুত সব। এখন কারও উপকার করার সময় দুর্ভাবনা হয়— এই লোকটি কবে ক্ষতি করবে। কবে কুৎসা রটাবে। গালি দেবে। অতি দরদীদের নিয়ে ভাবি, এই মানুষগুলোর ঠুনকো কাচের ঘর কতদিন টিকবে! শেষতক এরা থাকবে তো? দুঃসময়ের মানুষকে দূরে হটিয়ে দিয়ে সাময়িক তারা আনন্দবিলাস করছে, করুক। কিন্তু নাটকের শেষ দৃশ্যে এই বিলাসীদের ভূমিকা কী হবে কে জানে!।

লেখক : সম্পাদক বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর
up-arrow