Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ৪ আগস্ট, ২০১৮ ০৯:৫৬ অনলাইন ভার্সন
আপডেট : ৪ আগস্ট, ২০১৮ ১১:০৪
যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমি বাংলাদেশ
সামিয়া রহমান
যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমি বাংলাদেশ

রোদ-বৃষ্টি, পুলিশের হুমকি, লাঠি উপেক্ষা করে আমাদের কিশোর-তরুণরা আজ কয়েকদিন ধরে রাস্তায়। কারও উসকানিতে নয়, কারও নেতৃত্বে নয়। কোনো রাজনৈতিক সরকারের বিরুদ্ধে নয়। ওরা দাঁড়িয়েছে ঘুণেধরা সিস্টেমের বিরুদ্ধে। অচলায়তনের বিরুদ্ধে। রাজীব আর দিয়ার পরিবার প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস পেয়েছে, পেয়েছে মৃত্যুর জন্য নগদ অর্থ। কিন্তু কিশোর-তরুণদের এই আন্দোলন কি শুধু রাজীব-দিয়ার পরিবারকে নগদ অর্থসহায়তার জন্য ছিল? কিশোর-কিশোরীদের নয় দফা দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস এসেছে সরকারের তরফ থেকে। তাই যদি হয়, তবে মিরপুরে ওদের আবার লাঠিপেটা কেন? পুলিশের সঙ্গে যোগ দিয়ে কারা শিক্ষার্থীদের মারছিল? প্রশ্ন করবেন কি নিজের বিবেককে, প্রতিশ্রুতির আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা আস্থা রাখতে পারছে না কেন? নাকি সব দায় বিএনপি-জামায়াতকে দিয়ে দিচ্ছেন?

বসবাসের অযোগ্য দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বা আমাদের প্রিয় শহর ঢাকা প্রতি বছর মাথা নিচু করে প্রথম সারিতে জায়গা করে নেয়। এটা অস্বীকার করার মতো তথ্য রিপোর্ট কি কেউ বানাতে পেরেছেন? নাকি তাও বিএনপি-জামায়াতের চাল? আয়সূচক বাড়লেই কি আমার দেশটি বসবাসের যোগ্য হয়ে ওঠে? আয় তো বেড়েছে আদতে অর্থনীতির জটিল প্যাঁচঘোচে গুটি কজনার। ১৬ কোটি বাঙালি কি পেয়েছি অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের অধিকার?

একটি দেশে নিরাপদ সড়কের দাবি কেন শুধু শিক্ষার্থীদের দাবি হবে? এটি তো আমার-আপনার সবার অধিকার। হ্যাঁ প্রশ্ন অবশ্যই ওঠে, যে দেশে ছোট শিশুরা রাস্তায় যত্রতত্র পড়ে থাকে, সেখানে সুন্দর, পরিচ্ছন্ন নিরাপদ সড়কের চিন্তাও কখনোসখনো পাপই বটে। সেখানে অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা বিলাসিতাই বটে! জটিল রাজনীতির বিতর্কে যাব না। কিন্তু একটা প্রশ্ন করতেই চাই, কেন এই আন্দোলনকে সরকারবিরোধী ভাবা হচ্ছে? দেশকে নিরাপদ, সুন্দর করার জন্য ওরা দাবি তুলেছে। ওদের দাবি পূরণ হলে তো সরকারেরই লাভ। জনসমর্থন তখন সরকারের পক্ষেই যাবে। আমাদের অন্ধ রাজনীতিবিদরা কেন বোঝেন না সরকারের সমালোচনা করা মানেই সরকারের বিরোধিতা নয়, সরকারকে গঠনমূলক করা, সরকারকে জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়া।

আমরা সারাক্ষণ সমালোচনা করি নতুন প্রজন্মের আবেগ নেই, দেশকে ভালোবাসে না, শুধু ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, বন্ধুবান্ধবের জগতে স্বার্থপর হয়ে জীবন কাটায়। কিন্তু এ প্রজন্মই প্রমাণ করেছে আমরা কতটা ভুল, আমরা আদতে কতটা স্বার্থপর, লোভী, দুর্নীতিবাজ। নিয়মের কথা আমরা মুখে বলি, প্রতিনিয়ত নিয়ম ভাঙি আমরাই।

আমাদের বুদ্ধিমান, অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা কি বুঝতে পারেন, কিছু হাসি আন্দোলনকে উসকে দেয়? কখন হাসতে হয়, কখন কাঁদতে হয় তাও কি ঝানু রাজনীতিবিদদের বোঝার ক্ষমতার বাইরে? নাকি রাজনীতির বক্তব্য শুধুই অভিনয়? তাই তার বোঝার ক্ষমতা ছিল না যে এই দৃশ্য কান্নার দৃশ্য, হাসির নয়। সমালোচনার তোপে তিনি বলেন, ‘আমি একটু বেশি হাসি, তা যদি দোষ হয়, তবে আর হাসব না।...’ ক্ষমতা কি আমাদের বুদ্ধি নাশ করে? শিক্ষার্থীদের ভাষা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলাধোনা করছি। কিন্তু চিন্তা করুন তো, যাদের হাত দিয়ে এই স্লোগান হয়— ‘হয়নি বলে আর হবে না, আমরা বলি বাদ দে—লক্ষ তরুণ চেঁচিয়ে বলে, পাপ সরাব হাত দে।’ তারা কেন নোংরা ভাষা ব্যবহার করবে? অজস্র এডিটেড ফটো আমি নিজেই দেখেছি। সর্বদা বিএনপি-জামায়াতের যে জুজুর ভয় পান, তার সন্ধান এখানে করুন। দয়া করে খুঁজে বের করুন আপনি নিজ বাসায় কোন ভাষা ব্যবহার করছেন? আপনার থেকেই তো আপনার সন্তান শিখছে, তাই নয় কি? ওরা ছোট। ভুলভ্রান্তি হবেই। কিন্তু ওরা আমাদের ভুল ধরিয়ে দিচ্ছে। ক্ষমতায় থেকে, বড় হয়ে কি আমরা মানবিকতার সঙ্গে ওদের কাউন্সেলিং করতে পারি না? না পিটিয়ে, পাশে দাঁড়িয়ে ভুল শোধরাতে পারি না?

প্রতিবারের মতো এবারও আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিপক্ষ হয়ে গেল। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্যকে দেখলাম কী চমৎকারভাবে শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং করতে। আবার ব্যাটন দিয়ে পেটাতে থাকা পুলিশও সংখ্যায় কম কিন্তু ছিল না। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো পুলিশ, মন্ত্রীদেরও দেখা গেছে অনেক। কিন্তু দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তো দেশের মানুষের প্রতিপক্ষ নয়। আমরা ভুলে যাই যে, দিনরাত এক করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাদের জন্যই কাজ করে। ওদের মধ্যে যারা অন্যায় করছে চলুন তাদের ভুল ধরিয়ে দিই, জনসম্মুখে তাদের আনি। কিন্তু গুটি কজনার জন্য সমগ্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হেয় করা কি বুদ্ধিমান সাহসী শিক্ষার্থীদের সাজে? এই নষ্ট গুটি কজনা তো সব সেক্টরেই আছে? আমরা আইন চাই, বাস্তবায়ন চাই— কিন্তু আইন লঙ্ঘন করে নয় নিশ্চয়ই? এই আন্দোলনের উদ্দেশ্যই তো তাই।

আমার শুধু একটাই ভয় এখন, এই আন্দোলন এখন বিরামহীনভাবে চলতে থাকলে এই শিক্ষার্থীদের যদি কিছু হয়! যদি আরও কঠোর নির্দেশ আসে এদের নিয়ন্ত্রণ করার, যেটা মিরপুরে দেখলাম! হয়তো বয়স হয়ে গেছে বলে সুবিধাবাদী, ভীরু আমি। কিন্তু মা তো, তাই ওদের গায়ে পুলিশের লাঠি পেটানোর দৃশ্য সহ্যেরও অতীত। কিন্তু অনির্দিষ্টকাল ধরে আন্দোলন কি চলতে পারে! দেশের উন্নয়ন চাই, নিরাপত্তা চাই এবং এই ঘুণেধরা সমাজের অবক্ষয় চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মই দেখিয়ে দিতে পেরেছে। কিন্তু ক্লাসরুমে তো ফিরতেই হবে। যার দায়িত্ব সড়ক নিয়ন্ত্রণের তাকে তো দায়িত্ব পালন করতে দিতে হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ দেশের ক্ষুদ্র নাগরিক হিসেবে একটাই অনুরোধ আপনার কাছে। রাখবেন কি? ওদের আশ্বাস দিয়েছেন, কিছু কার্যকর হওয়াও শুরু হয়েছে। কিন্তু ওরা তো অনেক ছোট। আবেগের তীব্রতা বেশি, প্রকাশও বেশি। পারবেন কি একটু আদর দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে দুটো কথা বলতে? পারবেন কি নিজের সন্তানের মতো ওদের বুকে টেনে নিতে? এই দেশটা তো ওদের। ওরাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ। ওরা শুধু ভালোবাসা চায়, সুন্দর জীবন চায়, রাজনীতির পরিশীলিত বুদ্ধিদীপ্ত আশ্বাস নয়। পারবেন কি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটু আদর দিয়ে ওদের বুকে টেনে নিতে?

লেখক : হেড অব কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স, নিউজটোয়েন্টি ফোর।

বিডি-প্রতিদিন/০৪ আগস্ট, ২০১৮/মাহবুব

আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর
up-arrow