Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২২:৪৬
মুস্তাফিজকে ছাড়া পারবে কি টাইগাররা
মেজবাহ্-উল-হক
মুস্তাফিজকে ছাড়া পারবে কি টাইগাররা

ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের বাংলাদেশে আসার খবরটি যতটা স্বস্তির ঠিক ততটাই অস্বস্তির সংবাদ হচ্ছে ঘরের মাঠে পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে ছাড়া খেলতে নামা। কাটার মাস্টার এখন ক্রিকেটবিশ্বে প্রতিপক্ষের কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক।

তার একাদশে থাকাটাই বাংলাদেশের জন্য প্লাস-পয়েন্ট! তাই মুস্তাফিজকে ছাড়া ইংলিশদের রুখে দিতে পারবে তো টাইগাররা?

পাশাপাশি আরেকটি বিষয় চলে আসে, বাংলাদেশ কী শুধুমাত্র এক মুস্তাফিজের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক দেশের ক্রিকেটে যে উন্নতি সেটা কী শুধুই মুস্তাফিজ কেন্দ্রিক!

টাইগাররা ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপে সিমিং কন্ডিশনে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। তখন কিন্তু মুস্তাফিজ ছিলেন না। রুবেল হোসেন, তাসকিন আহমেদ ও মাশরাফি মিলেই তৈরি করেছিলেন শক্তিশালী ‘পেস আক্রমণ’।

বিশ্বকাপের ওই সাফল্য যেন ‘টনিক’ হিসেবে কাজ করে টাইগারদের মধ্যে। প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সিরিজ জয় করে বাংলাদেশ। শুধু সিরিজ নয়, পাকিস্তানকে ওয়ানডেতে রীতিমতো ‘বাংলাওয়াশ’ করে টাইগাররা।

সেই ১৯৯৯ বিশ্বকাপের পর একমাত্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ওয়ানডেতে কোনো জয় ছিল না বাংলাদেশের। এরপর বাংলাদেশ দুই দুইবার নিউজিল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ করেছে। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও জয় পেয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের সামনে কেন যেন দাঁড়াতেই পারছিল না। কিন্তু সেই পাকিস্তানকে ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে নতুন করে নজর কাড়ে মাশরাফিরা।

বিশ্বকাপে সাফল্যের পর যারা ভেবেছিলেন বাংলাদেশ হঠাৎ চমক দেখিয়েছে, সেই সব সমালোচকদের মুখে কুলুপ এঁটে দিয়েছিল টাইগাররা। কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেই ‘ঐতিহাসিক’ সিরিজেও কিন্তু মুস্তাফিজ ছিলেন না। তাহলে এখন কেন মুস্তাফিজ ছাড়া সমস্যায় পড়বে বাংলাদেশ?

তবে এটাও ঠিক যে, ভারতের বিরুদ্ধে ওয়ানডে অভিষেকের পর থেকে প্রতিটি ম্যাচেই মুস্তাফিজ যেভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন তাতে কাটার মাস্টারের উপর নির্ভরতা তৈরি হয়েই গিয়েছে। ভারতের বিরুদ্ধে সিরিজে প্রথম যে দুটি ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ, দুটিতেই বড় অবদান ছিল মুস্তাফিজের। প্রথম ম্যাচে ৫ উইকেট এবং দ্বিতীয় ম্যাচে নিয়েছেন ৬ উইকেট। যেন একাই প্রবল পরাক্রমশালী ভারতকে খাদে ফেলে দিয়েছেন সাতক্ষীরার সুপারম্যান খ্যাত এই তরুণ পেসার।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সিরিজ জয়েও বড় অবদান ছিল মুস্তাফিজের। শুধু ওয়ানডেতে নয়, টেস্টের প্রথম ম্যাচেও ম্যাচসেরা হয়েছিলেন তিনি। ডেল স্টেইন, মরনে মরকেল, ভারনন ফিলান্ডারের মতো বিশ্বমানের পেসারদের টপকে ম্যাচসেরার পুরস্কার জেতা তো চাট্টিখানি কথা নয়। ওই ম্যাচ বৃষ্টিতে ড্র না হলেও জিতেই যেতে পারতো বাংলাদেশ!

টি-২০তে মুস্তাফিজের আসল চেহেরা দেখা যায়, ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত প্রথমবারের মতো টি-২০ ফরম্যাটে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপে। ভারতে অনুষ্ঠিত টি-২০ বিশ্বকাপেও মুস্তাফিজের সামনে কাঁপতে হয়েছে বিশ্বের বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানদের। বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সেই ম্যাচটির কথা চিন্তা করুণ! অসি অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ ও শেন ওয়াটশন মুস্তাফিজের বল বুঝতেই পারেননি। হয়তো অস্ট্রেলিয়ার তারকা দুই ব্যাটসম্যান এর আগে কখনো ওরকম বাজেভাবে আউট হয়েছেন কিনা! যদি সেই ম্যাচে সিদ্ধান্ত ভুলের কারণে শেষ পর্যন্ত হেরে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু মুস্তাফিজের ঝলক দেখেছে ক্রিকেটবিশ্ব।

ভারতের সেলিব্রেটি টি-২০ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আইপিএলে সাদামাটা দল সান রাইজার্স হায়দরাবাদকে কিভাবে চ্যাম্পিয়ন করল মুস্তাফিজ তা তো কারও অজানা নয়। তারপর ইংল্যান্ডের কাউন্ট্রি ক্রিকেটের অভিষেক ম্যাচেই সাসেক্সের হয়ে চমক দেখিয়ে ম্যাচসেরা হয়ে যান কাটার মাস্টার। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচেই কাঁধের ইনজুরিতে সব কিছু যেন এলোমেলো হয়ে যায়। ছয় মাস মাঠের বাইরে থাকতে হচ্ছে দেশের সেরা পেসারকে।

তাই বলে মুস্তাফিজকে ছাড়া কী ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে পারবে না বাংলাদেশ?

হ্যাঁ, এটা ঠিক যে এখন যেকোনো দলের জন্যই মুস্তাফিজ এক আতঙ্ক। তবে মুস্তাফিজ না থাকলেও আরেকটা সুখবর আছে বাংলাদেশের জন্য— ইনজুরি থেকে ফিরেছেন রুবেল হোসেন। মনে আছে, বিশ্বকাপে অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচটির কথা! কী দুর্দান্ত বোলিংই না করেছেন রুবেল। চার উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ থেকেই বিদায় করে দিয়েছেন। নিশ্চিয়ই ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগে সেই ম্যাচের স্মৃতি রুবেলকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করবে!

গতকাল বোলিং অ্যাকশনের পরীক্ষা দিয়েছেন আরেক গতি তারকা তাসকিন! তরুণ পেসারের আত্মবিশ্বাস দেখে মনে হয়েছে, হয়তো ফিরবেনও। মাশরাফি তো ফিটই রয়েছেন। তাহলে তো বিশ্বকাপের সেই ‘পেস আক্রমণ’ই আবার ফিরে পাচ্ছে বাংলাদেশ দল। সেবার বিদেশের মাটিতে যদি দাপট দেখাতে পারেন এবার কী দেশের মাটিতে পেস-ত্রয়ী হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন!

ও ভালো কথা—এবার কিন্তু ফর্মের তুঙ্গে রয়েছেন আরেক পেসার আল আমিন হোসেনও। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপে তাকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য কোনো ম্যাচ না খেলিয়েই দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই আল আমিন এখন পেস আক্রমণে অন্যতম সেরা অস্ত্র।

মাশরাফি, রুবেল, আল আমিন, তাসকিন —বাংলাদেশে এখন অনেক তারকা পেসার। বেশ কয়েকজন তরুণ পেসারও রয়েছেন। কিংবদন্তি ওয়ালশের কোচিংয়ে যারা ইংল্যান্ড সিরিজের আগেই হয়তো অনেকটা পরিণতও হয়ে উঠবেন। তাই মুস্তাফিজ না থাকলেও পেস আক্রমণ সামর্থ্যে ঘাটতি থাকার কথা নয়।

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজের আগে বাংলাদেশ আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে একটা ওয়ানডে সিরিজ খেলবে। প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু এই সিরিজে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করার কথা বললেও শোনা যাচ্ছে পেস আক্রমণ নিয়ে ঠিকই চালানো হবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা! এই সিরিজেই ঠিক করা হবে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজের জন্য সেরা পেস-আক্রমণ। সব কিছুর পরও মুস্তাফিজের প্রসঙ্গটি সম্পূর্ণ আলাদা! গত এক বছরে কাটার মাস্টার যে অবস্থান তৈরি করেছেন তার অভাবটা পূরণ করা সহজ নয়!

up-arrow