Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : রবিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৪৭
আলো ছড়িয়ে এখন আড়ালে
মেজবাহ্-উল-হক
আলো ছড়িয়ে এখন আড়ালে

টেস্ট ক্রিকেটের ১৩৬ বছরের বর্নিল ইতিহাসে যে ঘটনাটি ঘটে তেমন একটি কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেন অলরাউন্ডার সোহাগ গাজী, ২০১৩ সালে চট্টগ্রাম টেস্টে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। একই টেস্টে সেঞ্চুরি ও হ্যাটট্রিকসহ আট উইকেট। তার মধ্যে যে ইনিংসে সেঞ্চুরি করেছিলেন সে ইনিংসে নিয়েছিলেন ছয় উইকেট। আর সেঞ্চুরি করেছেন আট নম্বরে ব্যাট করতে নেমে। এখন সেই সোহাগ গাজীর দলে জায়গাই হয় না।

২০১২ সালে খুলনার আবু নাসের স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠিত প্রথম টেস্টেই এক অভিনব ঘটনার জন্ম দেন পেসার আবুল হাসান রাজু। নিজের অভিষেক টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ১০ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে সেঞ্চুরি হৈ চৈ ফেলে দেন।  আবুল হাসানের কাণ্ড যেন রূপকথার গল্পকেও হারা মানায়। প্রবল সম্ভাবনাময় সেই ক্রিকেটার এখনো জাতীয় দলে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারেননি। বর্তমানে হাইপারফরম্যান্স দলে জায়গা পেলেও জাতীয় দলে সহসাই যে তার জায়গা হচ্ছে না —তা বোঝার জন্য ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

স্পিনার তাইজুল ইসলাম, অভিষেক টেস্টেই নেন ৫ উইকেট। তবে ওয়ানডে অভিষেক হয়েছে বিশ্ব রেকর্ড গড়ার মধ্য দিয়ে। বিশ্বের প্রথম বোলার হিসেবে ওয়ানডের প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে ওই ম্যাচে হ্যাটট্রিকসহ মোট ৪ উইকেট শিকার করেছিলেন। প্রবল পরাক্রমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা সেই তাইজুলকে এখনো করতে হচ্ছে সংগ্রাম। যদিও বর্তমানের ২০ সদস্যের দলে রয়েছেন তিনি। জাতীয় দলে যাওয়া আসার মধ্যেই থাকতে হচ্ছে তাকে। যেভাবে শুরু করেছিলেন সেভাবে নিজের জায়গাটা ধরে রাখতে পারেননি।

সোহাগ গাজীকে দেখে রীতিমতো কাঁপতে শুরু করতেন বিশ্বের সবচেয়ে মারকুটে ব্যাটসম্যান ক্যারিবীয় ঝড় ক্রিস গেইল। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সফরে অল্প রানে বার বার সোহাগ গাজীর বলে আউট হওয়ার পর গেইলের মধ্যে একটা ভীতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাট হাতে দারুণ পারদর্শী ছিলেন সোহাগ। কিন্তু এখন ক্রিকেটামোদীরা সেই সোহাগ গাজীর নামই যেন ভুলতে বসেছেন। জাতীয় দলে জায়গা পাকাপোক্ত করে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন এই তারকা অলরাউন্ডার।

এক সময় সোহাগ গাজীকে সাকিব আল হাসানের মতো মনে করা হতো! নিয়মিত পারফর্মও করতেন। কিন্তু এই অফ স্পিনারের বোলিং অ্যাকশন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পর সব কিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়। সোহাগ আবার ক্রিকেটে ফিরলেও তাকে আর স্বরূপে দেখা যায়নি। বরিশালের এই তারকা অলরাউন্ডারের বয়স মাত্র ২৫। তিনি ১০ টেস্ট খেলে উইকেট নিয়েছেন ৩৮টি। ওয়ানডেতে তার উইকেট সংখ্যা ২২টি। বাংলাদেশ দলে স্পিন-অলরাউন্ডার থাকলেও পেস-অলরাউন্ডার পাওয়া যাচ্ছিল না। আবুল হাসান রাজু আসার পর সেই অভাবটাও অনেকটাই পূরণ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নিজের অবস্থানটা ধরে রাখতে পারেননি। তাই দলে কোনো স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারেননি। ২৪ বছর বয়সী আবুল হাসান ৩ টেস্টে উইকেট মাত্র ৩টি পেলেও ব্যাটিংয়ে তার গড় ৮২.৫০। যেকোনো ব্যাটসম্যানের জন্য এটি ঈর্ষণীয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, ৬টি ওয়ানডে ম্যাচে খেলার সুযোগ পেয়েও কোনো উইকেট নিতে পারেননি।

তবে কিছুদিন আগে খণ্ড সময়ের জন্য বাংলাদেশে কোচিং করাতে আসা পাকিস্তানের সাবেক তারকা পেসার আকিব জাভেদ বাংলাদেশের যে কয়জন সম্ভাবনাময় পেসারের নাম উল্লেখ করেছিলেন, তাদের মধ্যে আবুল হাসান রাজুর নামও ছিল। এখন বোলিং কোচ হিসেবে ওয়ালশ এসেছেন। ক্রিকেট বোর্ড ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত তার সঙ্গে চুক্তি করেছে বোর্ড। দেখা যাক ওয়ালশের মতো কিংবদন্তিকে পেয়ে আবুল হাসান নিজেকে নতুন করে মেলে ধরতে পারেন কিনা। ২৪ বছর বয়সী তাইজুল সব সময়ই আলাদা। জাতীয় দলে তিনি সেভাবে সুযোগই পাননি। ৯ টেস্ট খেলে নিয়েছেন ৩৬ উইকেট। আর বিশ্ব রেকর্ড গড়ার পর আর মাত্র এক ম্যাচেই মাঠে নামার সুযোগ হয়েছিল তার।

তাইজুল বিরতি দিয়ে হলেও আবার জাতীয় দলে ফিরেছেন। দারুণ বোলিংও করছেন। যদিও বর্তমানে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি এখন বিশেষজ্ঞ স্পিন বোলারের জন্য কঠিনই হয়ে গেছে। কেন না টাইগাররা এখন পেস সহায়ক দল। অধিকাংশ ম্যাচেই চার পেসার নিয়ে খেলতে বাংলাদেশ। ম্যাচের পরিস্থিতি বিচারের কখনো কখনো নেওয়া হচ্ছে বিশেষজ্ঞ স্পিনার। কেন না সাকিব আল হাসান, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ও নাসির হোসেনের মতো স্পিন-অলরাউন্ডার থাকায় কোচও একজন বাড়তি স্পিনার খেলাতে চান না। তাই একাদশে জায়গা করে নেওয়াটা এখন স্পেশালিস্ট স্পিনারদের জন্য কঠিন হয়ে গেছে।

তারপরেও উপমহাদেশে স্পিনারদের আলাদা কদর থাকবেই। কিন্তু দলে জায়গা করে নেওয়ার জন্য তো ক্যারিশমা দেখাতে হবে। তাই নিজেকে নতুন করে মেলে ধরতে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে স্পিনারদের।

সোহাগ গাজী, আবুল হাসান, তাইজুল ইসলাম —আলোড়ন সৃষ্টি করে এই তিন তারকা জাতীয় দলে জায়গা করে নিলেও এখন তারা আড়ালে চলে গেছেন। ক্রিকেট বিশ্লেষকরা মনে করেন, সম্ভাবনাময় এই ক্রিকেটাররা কেন দ্রুতই রেস থেকে ছিটকে পড়ে যাচ্ছে তার কারণ অনুসন্ধান করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে। তা না হলে দেখা যাবে মুস্তাফিজের মতো তারকাদেরও হারিয়ে যেতে সময় লাগবে না!

up-arrow