Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:৪২
শেষ ৩ সেকেন্ডে স্বপ্ন শেষ
আসিফ ইকবাল
শেষ ৩ সেকেন্ডে স্বপ্ন শেষ
ফাইনালে জেতা হলো না। অনূর্ধ্ব-১৮ এশিয়া কাপ হকিতে শিরোপা জিতে লেখা হলো না ইতিহাস। ভারতের কাছে ৪-৫ গোলে হারের পর হতাশায় ভেঙে পড়েন বাংলাদেশের যুবারা —রোহেত রাজীব

বিকালের সূর্যটা হেলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে। গোধূলির কোনে দেখা আলোয় মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামের রূপচ্ছটা তখন ঠিকরে বেরুচ্ছিল! অনূর্ধ্ব-১৮ এশিয়া কাপ হকির বাংলাদেশ-ভারত ফাইনাল দেখতে আসা দর্শকরা ক্ষণ গুনছেন তারস্বরে ১০, ৯, ৮... কাউন্টডাউন করে।

৩ গুনতেই হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে আসে মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামে। উৎসবের আগাম মঞ্চ তৈরি করে শিরোপা জয়ের স্বপ্নে বিভোর হকিপ্রেমীদের স্তব্ধ করে দেন শিবম আনন্দ। শিবমের গোলেই যুব এশিয়া কাপের শিরোপা জেতার পাশাপাশি গ্রুপ পর্বের ম্যাচ হারের প্রতিশোধ নিল ভারত। গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশ জিতেছিল ৫-৪ গোলে। স্মরণকালের সেরা উপভোগ্য ফাইনালে মাত্র তিন সেকেন্ড আগের সামান্য ভুলে শিরোপা জয়ের স্বপ্নভঙ্গ হয় রোমান, আশরাফুলদের। তিন সেকেন্ড আগে সবাইকে চমকে ৫-৪ গোলের অবিশ্বাস্য জয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় ভারত।

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান আসেনি টুর্নামেন্ট খেলতে। জাপান আসেনি নিরাপত্তার অজুহাতে। এশিয়ান হকির দুই পরাশক্তি না থাকলেও দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তান আসায় আবেদন কমেনি একটুও। দুই পরিচিত শক্তির সঙ্গে নিজেদের আলাদা করে পরিচিত করেছেন রোমানরা। অতীত ঐতিহ্য ও শক্তির বিবেচনায় আসরের ফেবারিটের তকমা স্বাভাবিকভাবেই সেঁটে যায় ভারত ও পাকিস্তানের নামের পাশে। কিন্তু গ্রুপের প্রথম ম্যাচেই ভারতকে ৫-৪ গোলে হারিয়ে বিস্ময়ের জন্ম দেন রোমান, আশরাফুলরা। ভারতকে হারানোর আত্মবিশ্বাস নিয়ে পরের ম্যাচে ওমানকে ১০-০ গোলে গুঁড়িয়ে বাংলাদেশ জায়গা নেয় সেমিফাইনালে। সেমিতে ৬-১ গোলে চাইনিজ তাইপেকে উড়িয়ে প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপের যুব আসরের ফাইনালে ঠাঁই করে নেয়। এর আগে অবশ্য ২০০১ সালে মালয়েশিয়ার ইপোতে যুব এশিয়া কাপ খেলেছিল বাংলাদেশ। সেবার মাত্র ১ পয়েন্টের জন্য সেমিতে খেলা হয়নি। এবার আর সে ভুল হয়নি। দুঃখেও পুড়তে হয়নি। বরং ফাইনালে এসে দুঃখের নীল রঙ মেখে নিতে হয়েছে শরীরে।

আশ্বিনের তীব্র রোদ উপেক্ষা করে মাঠে উপস্থিত হন হাজার চারেক দর্শক। সবাই এসেছিলেন ইতিহাসের সাক্ষী হতে। কিন্তু ব্যর্থ মনেই ফিরে গেছেন। তবে বাড়ি ফেরার আগে সবাই নিয়ে গেছেন টানটান উত্তেজনার অসাধারণ উপভোগ্য এক ফাইনালের স্মৃতি। মনোসংযোগে যদি সামান্য বিচ্যুতি না ঘটতো, তাহলে কাল ট্রফিটা আকাশপানে তুলে ধরতেন রোমানরা। কিন্তু পারেননি। না পারলেও বাংলাদেশের হকি ইতিহাসে সেরা পারফরম্যান্সটাই করলেন রোমানরা। স্নায়ুক্ষয়ী ফাইনালের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সমান তালে লড়াই করেছে বাংলাদেশ ও ভারত। তীব্র দাবদাহ থেকে বাঁচতে ১৮ মিনিটে কুলিং ব্রেকে যায় ম্যাচ। এরপর ফিরেই গোল করে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখা শুরু করে বাংলাদেশ। ২০ মিনিটে স্বাগতিকরা এগিয়ে যায় ফিল্ড গোলে। পেনাল্টি কর্নারে আশরাফুলের শট ঠেকিয়ে দেন ভারতের গোলরক্ষক। বল ফিরে আসলে ফিরতি শটে অধিনায়ক রোমান সরকার ঠাণ্ডা মাথায় গোল করেন (১-০)। গোল উৎসব শেষ করার আগেই আনন্দ থামিয়ে দেন শিবন আনন্দ (১-১)। সমতা আসার পর দুই দল গোলের জন্য মরিয়া হয়ে পড়ে। বিরতির সামান্য আগে ৩৫ মিনিটে সবুজের হিটে ফ্লিক করে আবারও উৎসবে ভাসান মহসিন (২-১)। এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় বাংলাদেশ। ৪৩ মিনিটে সমতা আনে ভারত। নিজেদের তৃতীয় পেনাল্টি কর্নারে সমতা আনেন হার্দিক সিং (২-২)। সমতা আসার পর ম্যাচ থেকে সামান্য সময়ের জন্য ছিটকে পড়েন রোমানরা। সেই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে ৫০ মিনিটে এগিয়ে যায় ভারত। রক্ষণভাগের ভুলে গোললাইনের খুব কাছ থেকে কনজেংবাম আলতো টোকায় ব্যবধান ৩-২ করেন। ৫৯ মিনিটে সমতা আনে বাংলাদেশ। নিজেদের তৃতীয় পেনাল্টি কর্নারে ম্যাচে নিজের প্রথম গোল করেন আশরাফুল। ম্যাচের ব্যবধান ৩-৩ করার নায়ক আশরাফুলের গোল সংখ্যা ১১। আসরে সেরা গোলদাতার পুরস্কার জিতেন তিনি। সমতা এনে যখন অলআউট খেলতে শুরু করে স্বাগতিকরা, তখনই ৬২ মিনিটে জটলা থেকে ফিল্ড গোলে ব্যবধান ৪-৩ করেন কনজিংবাম। ম্যাচের তখন বাকি ৮ মিনিট। বাংলাদেশের দর্শকরা যখন মন খারাপ করে ছিলেন, তখনই ৬৪ মিনিটে স্কোরলাইন ৪-৪ করেন মাহবুব চমৎকার এক গোলে। এরপর ম্যাচ যখন ধীরে ধীরে টাইব্রেকারের দিকে গড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গে পেরেক ঠুঁকে দেন শিবন আনন্দ (৫-৪)। গোলটি খেয়ে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় মাটিতে শুয়ে পড়েন রোমান, আশরাফুলরা। আর জয়ানন্দে প্রজাপতির ডানায় চড়ে ভেসে বেড়াতে শুরু করে ভারতীয়রা।

up-arrow