Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : সোমবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৯ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:৫৭
মিরপুরে মাশরাফি ঝড়
মেজবাহ্-উল-হক

নাসির হোসেন ব্যাট হাতে ড্রেসিং রুম থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শেরেবাংলার গ্যালারিতে গর্জন ওঠে ‘নাসির’ ‘নাসির’! ‘দ্য ফিনিশার’কে একাদশে দেখেই যেন দর্শকদের অন্যরকম তৃপ্তি! পাহাড়সম চাপ নিয়ে নাসিরও হতাশ করেননি। দলের বিপদে স্লো উইকেটে ২২ গজে গিয়ে খেললেন ২৭ বলে ২৭ রানের অসাধারণ এক ইনিংস।

তবে নাসির তার নিজের ইনিংসের চেয়ে প্রশংসিত হবেন মাশরাফিকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য।

‘দ্য ফিনিশারে’র নিরাপদ সঙ্গ পেয়ে টাইগার ক্যাপ্টেন কী বিস্ফোরক ইনিংসটাই না খেললেন! ২৯ বলে ৪৪ রান। তিনটি বিশাল ছক্কার সঙ্গে দুই বাউন্ডারি। উইকেটের কন্ডিশন এবং দলের পরিস্থিতির কথা চিন্তা করলেও মাশরাফির ১৫১.৭২ স্ট্রাইকরেটে খেলা ইনিংসটি মহামূল্যবান। গতকাল নাসির ছাড়া আর কোনো ব্যাটসম্যানের স্ট্রাইকরেট একশ ছুঁতে পারেনি। দুই ব্যাটসম্যান মিলেই গতকাল গড়েছেন ইনিংসের সর্বোচ্চ রানের জুটি। অষ্টম উইকেটে মাশরাফি ও নাসিরের জুটিতে মাত্র ৪৯ বলে ৬৯ রান এসেছিল বলেই বাংলাদেশের স্কোরটা শেষ পর্যন্ত ২৩৮ হয়েছিল।

তবে মাশরাফি ও নাসিরের ব্যাটিংয়ে যেমন ছিল খুনে ম্যাজাজের বহিঃপ্রকাশ তেমনি মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের ব্যাটিংয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে শিল্পের ছোঁয়া! একপ্রান্তে যখন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানরা একের পর এক উইকেট বিলিয়ে দিচ্ছেন অন্য প্রান্তে ইংলিশ বোলারদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মাহমুদুল্লাহ। স্ট্রাইকরেট ঠিক রেখে নিখুঁতভাবে ব্যাটিং করেছেন। গতকাল মাহমুদুল্লাহর ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছিল ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে ইংলিশদের বিরুদ্ধে খেলা সেই অসাধারণ ‘সেঞ্চুরি’ ইনিংসটাই যেন অনুবাদ করে চলেছেন। কিন্তু ৭৫ রানে আটকে যান মাহমুদুল্লাহ। বলা যায় আটকে দেওয়া হয়! কেননা বাংলাদেশের আম্পায়ার শরফুদ্দৌলার দেওয়া লেগ বিফোরের আউটটি মেনে নিতে পারেননি তিনি। রিভিউ চেয়েছিলেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি! আসলে রিভিউ থাকলেও মাঠের আম্পায়ার যখন কোনো সিদ্ধান্ত দেন সেটাকে যেন ৮০ ভাগ সত্য জেনে নিয়েই সিদ্ধান্ত নেন টিভি আম্পায়ার।

তবে মাহমুদুল্লাহ কিংবা লোয়ার অর্ডারের মাশরাফি-নাসিরের ইনিংস যত সুন্দর ছিল ঠিক টপ অর্ডারের অন্য ব্যাটসম্যানদের ইনিংসগুলো ছিল ততটাই বিশ্রী! দুই ওপেনার ইমরুল কায়েস, তামিম ইকবাল এবং মুশফিকুর রহিম আউট হয়েছেন ইংলিশ বোলারদের শট বলের ফাঁদে পড়ে। সাব্বির রহমান বোল্ড। সাকিব আল হাসান আউট হয়েছেন লেগ স্ট্যাম্পের বাইরের বল ফ্লিক করতে গিয়ে।

প্রস্তুতি ম্যাচে ও প্রথম ওয়ানডেতে সেঞ্চুরিয়ান ইমরুল গতকালও শুরু করেছিলেন আগ্রাসীভাবে। প্রথম বলেই বাউন্ডারি। কিন্তু আউট হয়ে গেলেন পুল করতে গিয়ে। ক্রিস ওয়াকসের শট বল বুঝতে না পেরে  যেন অলসভাবে ব্যাট চালালেন, মিড স্কোয়ার লেগে উইলির সহজ ক্যাচ। আরেক ওপেনার তামিম ইকবালও একই ভুল করলেন। শট বল পুল করতে গিয়ে মিড উইকেটে মঈন আলীর সহজ ক্যাচ। ওয়াকসের চালাকি যেন বুঝতেই পারলেন না দুই ওপেনার। ইংলিশ পেসার নিজের পর পর ওভারে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে শট বল করে দুই ওপেনারকে ড্রেসিং রুমের পথ দেখিয়ে দিলেন। এই জন্যই বলা হয় ক্রিকেট বুদ্ধিমত্তার খেলা। মাথা খাটিয়ে বের করতে হয় প্রতিপক্ষের দুর্বলতা। শট বলে যে শুরু থেকেই দুই ওপেনার ইতস্তবোধ করছিলেন তা বুঝতে পেরেছিলেন ইংলিশ বোলার।

২৫ ও ২৬ রানে পর পর দুই ওপেনারকে হারিয়ে বিপাকে পড়ে যায় বাংলাদেশ। মারকুটে সাব্বির রহমান উইকেটে গিয়ে সময় নিচ্ছিলেন। নিলেনও। কিন্তু কী লাভ হলো! ২১ বল খেলে মাত্র ৩ রান করে জেক বলের বলে বোল্ড হয়ে যান। মাহমুদুল্লাহর সঙ্গে মুশফিকের জুটিটা বেশ জমে উঠেছিল। দুই ভায়রা ভাই মিলে চতুর্থ উইকেট জুটিতে মাত্র ৫১ বলে হাফ সেঞ্চুরি করে ফেলেন। ধারাভাষ্যকাররা বার বার বলছিলেন অ্যাডিলেডের সেই ম্যাচটির কথা। যে ম্যাচে মাহমুদুল্লাহ ও মুশফিকের ১৪১ রানের মহাকাব্যিক জুটিতেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় ঘণ্টা বেজে গিয়েছিল ইংল্যান্ডের। সে ম্যাচে মাহমুদুল্লাহ করেছিলেন সেঞ্চুরি। আর মুশফিক খেলেছিলেন ৮৯ রানের ঝড়ো ইনিংস। গতকালও কালতালীয়ভাবে ৮৯ রানের সময়ই সাজঘরে ফিরলেন মুশফিক, তবে স্কোরটি ব্যক্তিগত নয়, ছিল দলীয়।

তামিম ও ইমরুলের মতো সেই একই ভুল করলেন মুশফিকও। শট বল পুল করতে গিয়ে ক্যাচ। মাহমুদুল্লাহর সঙ্গে তার জুটিটা আটকে গেল সেই ৫০ রানেই। তবে সাকিবের আউট ছিল খুবই বেশ বাজে। লেগ স্ট্যাম্পের বাইরের বল, ছেড়ে দিলেই ওয়াইড হয়ে যেত। কিন্তু সাকিব ফ্লিক করতে গিয়ে উইকেটরক্ষক বাটলারের সহজ ক্যাচে পরিণত হলেন।

১১৩ রানের মাথায় পঞ্চম উইকেট হিসেবে সাকিবের বিদায়ের পর মনে হচ্ছিল ২০০ রানই যেন দূরের বাতিঘর। কেননা আগের ম্যাচে স্পোর্টিং উইকেটেই যেখানে শেষ ১৭ রানে বাংলাদেশের লোয়ার অর্ডারের ছয় ব্যাটসম্যান আউট হয়ে গিয়েছিল সেখানে এই স্লো উইকেট কিইবা আশা করা যায়। কিন্তু মাশরাফির বিস্ফোরক ব্যাটিং এবং নাসিরের দৃঢ়তায় ৮ উইকেটে ২৩৮ রান করে বাংলাদেশ। আগের সিরিজে আফগানদের বিরুদ্ধে যে উইকেটে ২০৮ রান করেও লড়াই হয়েছিল হাড্ডাহাড্ডি শেরেবাংলার সেই ৩নং উইকেটে এই স্কোর চ্যালেঞ্জিংই বটে! শেষ পর্যন্ত ম্যাচে জয়ী হয়ে সিরিজে ফিরে বাংলাদেশ।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

বাংলাদেশ : ২৩৮/৮, ৫০ ওভার (মাহমুদুল্লাহ ৭৫, মাশরাফি ৪৪, মোসাদ্দেক ২৯, নাসির ২৭*, মুশফিক ২১, তামিম ১৪, ইমরুল ১১। ওয়াকাস ২/৪০, বেল ২/৪৪, রশিদ ২/৫৩।

ইংল্যান্ড : ২০৪/১০, ৩৪.৪ ওভার (বাটলার ৫৭, বিসট্রো ৩৫, রশিদ ৩৩। মাশরাফি ৪/২৯, তাসকিন ৩/৪৭, মোসাদ্দেক ১/৫ নাসির ১/২৯, সাকিব ১/৫০)

ফল : বাংলাদেশ ৩৪ রানে জয়ী।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow