Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১০ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:২৭
যেখানে অনন্য মাশরাফি
মেজবাহ্-উল-হক

অধিনায়ক হিসেবে মাঠে ক্যারিশমাটিক পারফর্ম করে দলকে জেতানোর ঘটনা ক্রিকেটে ভূরি ভূরি। ক্রিকেটের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশ অধিনায়কই দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো না কোনো ম্যাচে দলের জয়ে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। যাকে বলা হয় ‘ক্যাপ্টেনস নক’! অন্য অধিনায়কদের মতো মাশরাফিরও অনেক ‘ক্যাপ্টেনস নক’ আছে। অবশ্য তার বড় উদাহরণ ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ম্যাচটি। ব্যাটে-বলে-ফিল্ডিংয়ে— অসাধারণ এক মাশরাফি।

অন্য অধিনায়কদের সঙ্গে মাশরাফির পার্থক্য অন্য জায়গায়। মাশরাফির মধ্যে এমন কিছু ক্ষমতা আছে যা অন্য দেশের অধিনায়কদের মধ্যে নেই। যেমন নিজের আবেগ, দেশের আবেগকে দ্রুত সতীর্থদের মধ্যে ভাইরাসের (ইতিবাচক অর্থে) ছড়িয়ে দেওয়ার আশ্চর্য ক্ষমতা রয়েছে তার। যে কাজটা অন্য কোনো অধিনায়ক পারেন না! সবাই ভালো খেলতে পারেন, ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কিন্তু মাশরাফির মতো আবেগী অধিনায়ক আর কতজনই বা আছেন বিশ্বে!

গত টি-২০ বিশ্বকাপে পেসার তাসকিন আহমেদ ও স্পিনার আরাফাত সানি সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ হওয়ায় বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে সংবাদ সম্মেলনের পর হাউমাউ করে কেঁদে ছিলেন মাশরাফি। যদিও তখন মাশরাফির এ কান্না নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি। কেননা একজন অধিনায়ক যখন কাঁদেন তখন সতীর্থ অন্য ক্রিকেটারদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে! তবে ওই কান্নার একটা ইতিবাচক দিকও আছে। সতীর্থরা বুঝতে পারেন তাদের জন্য দলপতির কত আন্তরিকতা! এতে দলে অধিনায়কের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়। মাশরাফির বেলায় সে ঘটনাটিই ঘটেছে।

টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমকে নিয়ে গুঞ্জন আছে, মাঠে তিনি কঠিন সময়েও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতীর্থ অন্য কোনো ক্রিকেটারকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন মনে করেন না। সে ক্ষেত্রে অনেক সময় সফল হন, তবে ব্যর্থতার আশঙ্কাই থাকে বেশি। এ ক্ষেত্রে মাশরাফি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি যে কোনো কঠিন সময়ে সিনিয়রদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এ কারণে দেখা যায়, ফিল্ডিংয়ে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক সময় বেশি কালক্ষেপণ করে ফেলেন। অতিরিক্ত সময় নেওয়ার জন্য অনেকবার জরিমানাও দিতে হয়েছে মাশরাফিকে। তার পরও একজন অধিনায়ক হিসেবে কঠিন সময়ে সিরিয়রদের সঙ্গে আলোচনা করে সেরা সিদ্ধান্তটিই নিয়েছেন।

সব শেষ ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই দৃশ্যটি দেখা গেছে আরেকবার। ২৬ রানে ইংলিশদের ৪ উইকেট পতন ঘটার পরও পঞ্চম উইকেট জুটিতে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিলেন অধিনায়ক জস বাটলার ও বেয়ার স্ট্র। ২৩ ওভারে ইংল্যান্ডের স্কোর ছিল ১০৪/৪। শুরুর ধাক্কা সামলে নিয়ে ম্যাচে আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে ইংলিশরা। বাটলার ও বেয়ার স্ট্রর সামনে বাংলাদেশের কোনো বোলারই সুবিধা করতে পারছেন না। তখন উপায়ান্তর না দেখে মাঠে মাশরাফি আলোচনা করেন সহ-অধিনায়ক সাকিব এবং দুই সিনিয়র মুশফিকুর রহিম ও তামিম ইকবালের সঙ্গে (টেস্টের অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়ক)। চার সিনিয়র মিলে আলোচনা করেই তাসকিনের হাতে তুলে দেন বল।

অথচ প্রথম স্পেলে তাসকিন ২ ওভারে ১৯ রান দিয়েছিলেন। দুই সেট ব্যাটসম্যানের সামনে তাকে আনার সিদ্ধান্তটি বেশ চ্যালেঞ্জিংই ছিল। কিন্তু সবাই মিলে একমত হওয়ার কারণেই ব্রেক থ্রুর কথা চিন্তা করে আনা হয়েছিল গতি তারকাকে। আর তাসকিন এসেই দেখালেন ক্যারিশমা। বেয়ার স্ট্রককে আউট করে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন। ওই একই স্পেলে ইংলিশ অধিনায়ক জস বাটলারকে ফিরিয়ে দিয়ে ম্যাচটাই যেন হাতের মুঠোয় নিয়ে ফেলেন। সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলটা হাতেনাতেই পেয়েছেন মাশরাফি।

শুধু তাই নয়, কী আচরণ করলে কোনো ক্রিকেটারের ভিতর থেকে সেরা পারফরম্যান্সটা বের করে আনা সম্ভব তা ভালো করেই জানেন মাশরাফি। সে কারণেই দেখা যায়, ২০১৪ সালে যে বাংলাদেশ দল জিততে ভুলে গিয়েছিল সে দলটাই বদলে গেল মাশরাফির জাদুকরী নেতৃত্বে। ওয়ানডেতে তরতর করে টাইগারদের সাফল্যের গ্রাফটা ওপরের দিকে উঠছে।

একটু পেছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে অন্য এক মাশরাফিকে। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে এই ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো আসরের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠায় চলছিল মাশরাফি বন্দনা। অনেকে টাইগার ক্যাপ্টেনকে ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে উল্লেখ করছিলেন। কিছু মিডিয়ায় প্রকাশ করাও হচ্ছিল। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মাশরাফি কিছুটা অনুযোগের সঙ্গেই বলেছিলেন, ‘বীর আমি না। প্রকৃত বীর হচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধারা। তারা দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। আমাদের তো আর জীবন বাজি রাখতে হয় না।’ কতটা বিনয়ী হলে একজন অধিনায়ক এমন কথা বলতে পারেন!

মাশরাফির সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে, তিনি ভীষণ রকমের মিশুক প্রকৃতির। কারও সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব নেই। যদিও বা কখনো মনোমালিন্য হয়, সেটা মাশরাফি নিজেই মিটিয়ে ফেলেন। ড্রেসিংরুম সর্বদা হাসি-খুশি রাখার চেষ্টা করেন। অনুশীলনের পর মন চাইলে সাংবাদিকদের সঙ্গেও জমিয়ে দেন আড্ডা। বিশ্বের অন্য কোনো অধিনায়ককে এমন চরিত্রে দেখা যায় না। এ কারণেই মাশরাফি বিশ্বের অন্য যে কোনো অধিনায়কের চেয়ে আলাদা এবং অনন্য।

up-arrow