Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২০ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:৫০
অভিষেকেই কাঁপিয়ে দিলেন মেহেদী
বোলিং ফিগার ৩৩-৬-৬৪-৫
মেজবাহ্-উল-হক, চট্টগ্রাম থেকে
অভিষেকেই কাঁপিয়ে দিলেন মেহেদী
টেস্টে ডাক পাওয়া নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে তার। কিন্তু মাঠে প্রমাণ দিলেন যোগ্যতার। অভিষেক টেস্টে ইংল্যান্ডের ৫ উইকেট নিয়ে রীতিমতো ক্রিকেটপ্রেমীদের চমকে দেন মেহেদী হাসান —বাংলাদেশ প্রতিদিন

হাসতে হাসতে প্রেস কনফারেন্স রুমে প্রবেশ করেন মেহেদী হাসান মিরাজ! তার হাসিটা আরও চওড়া হয়ে যায় যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো কেমন লাগছে! এমন প্রশ্নের জন্য অনেকটা প্রস্তুতই ছিলেন তিনি। তাই হাসতে হাসতেই যেন মুখস্থ বুলি আওড়ালেন, ‘অনেক ভালো লাগছে।

এ দিনটার কথা, এ ম্যাচটার কথা আমার সারা জীবন মনে থাকবে। আমার অভিষেক ম্যাচ। আমি পাঁচ উইকেট পেয়েছি। বুঝতেই তো পারছেন...। ইংল্যান্ডের সঙ্গে পাঁচ উইকেট পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের বিষয়। আল্লাহর অশেষ রহমত ছিল। সবার দোয়া ছিল আমার সঙ্গে। ’

মেহেদী হাসানের বয়স ১৮ বছর ৩৬১ দিন। এত কম বয়সে কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারের পাঁচ উইকেট নেওয়ার ঘটনা আর নেই। তাই অভিষেকেই পঞ্চম উইকেট শিকার করে অনন্য এক রেকর্ডের মালিক হলেন তরুণ এই অলরাউন্ডার। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে অভিষেকে পাঁচ শিকারির তালিকায় সপ্তম স্থানে  মেহেদী। তাছাড়া অভিষেকে পঞ্চম উইকেট নেওয়া বাংলাদেশের সপ্তম বোলার তিনি। এর আগে এই কৃতিত্ব  দেখিয়েছেন নাইমুর রহমান দুর্জয়, মঞ্জুরুল ইসলাম, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, ইলিয়াস সানী, সোহাগ গাজী ও তাইজুল ইসলাম।

নতুন বল স্পিন করানো কঠিন কাজ। কিন্তু গতকাল অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম দ্বিতীয় ওভারেই বল তুলে দেন মেহেদীর হাতে। প্রথম বলটি তার প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি টার্ন করে। তখনই নিজের আত্মবিশ্বাসের গ্রাফটা অনেক ওপরে উঠে গিয়েছিল। সেই সঙ্গে মুশফিকের উপদেশ নির্দেশনা ছিল,  মেহেদীর কাছে বেদবাক্যের মতো, ‘স্ট্যাম্পে বল রাখিস। স্ট্যাম্পে বল রাখলে এলবিডব্লিউ, বোল্ড হওয়ার চান্স থাকবে। ’

প্রথম উইকেট শিকার করতে মেহেদীকে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। নিজের পঞ্চম ওভারের পঞ্চম বলেই ইংলিশ ওপেনার বেন ডাকেটকে পাঠিয়ে দেন ড্রেসিং রুমে। একে তো প্রথম টেস্ট উইকেট তার ওপর ইংলিশ ওপেনারের অভিষেক ম্যাচ। তার মানে, এক নবাগতের বলে আরেক নবাগত আউট! মেহেদীর ৮৫.১ কিমি গতির ডেলিভারিটি বুঝতে পারেননি ডাকেট। স্লো বল টার্ন করে লাগে স্ট্যাম্পে। দ্বিতীয় শিকার গ্যারি ব্যালান্স। কিছুটা জোর দিয়ে বল করেন মেহেদী। বল গিয়ে সরাসরি আঘাত করে ইংলিশ ব্যাটসম্যান ব্যালান্সের প্যাডে। আবেদন হলেও তাতে সাড়া দেননি আম্পায়ার। কিন্তু মেহেদীর আত্মবিশ্বাসে ফের রিভিউর আবেদন করেন মুশফিক। রিপ্লেতে পরিষ্কার দেখা যায়, ব্যালান্সের প্যাডে না লাগলে তা উইকেট ভেঙে দিত। তাই আউট।

তৃতীয় শিকার আরেক ভয়ঙ্কর ব্যাটসম্যান জো রুট। ধীরগতির বল বুঝতে না পেরে স্লিপে ক্যাচ তুলে দেন। সাব্বির রহমান ক্যাচটি লুফে নিতে ভুল করেননি। দিনের দ্বিতীয় সেশনের দ্বিতীয় ওভারেই উইকেট শিকার করে ইংল্যান্ডকে ব্যাকফুটে পাঠিয়ে দেন। তখন ইংল্যান্ডের স্কোর ছিল ৮৩, চার উইকেট হারিয়ে। তবে ইংলিশদের চার উইকেটের মধ্যে তিনটিই ছিল মেহেদীর দখলে।

নিজের চতুর্থ উইকেটটি নিয়ে মেহেদী যেন টাইগারদের বুকের ওপর চাপিয়ে থাকা একটা পাথর সরিয়ে দিলেন। কেননা একে একে পাঁচবার রিভিউর বিরুদ্ধে সফল মঈন আলী ক্রমেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছিলেন। সাকিবের বলে তিনবার তো ইংলিশ এই ব্যাটসম্যানকে মাঠের আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা আউটের সংকেতই দিয়েছিলেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে সফল মঈন। তাইজুলের বলে দুবার আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে মঈনের আউটের জন্য রিভিউ আবেদন করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু বারবারই রিভিউর সিদ্ধান্ত গেছে মঈনের পক্ষে। সেই মঈনকে প্যাভিলিয়নের পথ ধরিয়ে দেন মেহেদী।

একবার নতুন জীবন পেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিলেন জনি বেয়ারস্ট্রও। হাফ সেঞ্চুরিও করেছেন এই ইংলিশ ব্যাটসম্যান। কিন্তু তাকেও আটকে দিয়ে নিজের পঞ্চম শিকারে পরিণত করেন  মেহেদী। দিন শেষে তার বোলিং ফিগার ৩৩-৬-৬৪-৫।

বল হাতে অভিষেকেই যেন মহাকাব্য লিখে ফেললেন মেহেদী।   কাঁপিয়ে দিলেন মাঠ। তবে নিজের পারফরম্যান্স নিজের কাছেই তার অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে, ‘আমি আসলে ভাবিনি যে পাঁচ উইকেট পাব। এ রকম কখনো ভাবিনি। তবে চেষ্টা করেছি যে টিমকে কিছু একটা পারফর্ম করে দেব। কিন্তু আমি কখনই চিন্তা করিনি যে পাঁচ/ছয় উইকেট পাব কিংবা নিজে আধিপত্য করব। ’

মেহেদী বলেন, ‘চিন্তা ছিল প্রথম ম্যাচে নিজেকে আগে সেট করার জন্য চেষ্টা করব। তাই জায়গায় বল করে কিভাবে নিজেকে সেট করা যায় সেই চেষ্টাই করে গেছি। বল নিয়মিত জায়গায় ফেলেছি। তাতেই হয়ে গেছে আল্লাহর রহমতে। ’

দিনের তিন ইনিংসের মধ্যে এক ইনিংসে একাই বল করেছেন মেহেদী। তার প্রথম স্পেলটি ১০ ওভারের। প্রথম টেস্টের প্রথম দিনে ৩৩ ওভার বোলিং করেও ম্যাচ শেষে যেন কোনো রকম ক্লান্তির ছাপ নেই মেহেদীর চোখেমুখে। অভিষেক ম্যাচে এমন আগুনে পারফরম্যান্সের পর ক্লান্তি থাকারও কথা নয়।

up-arrow