Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল, ২০১৮ ১০:১২ অনলাইন ভার্সন
ধরাছোঁয়ার বাইরে তারা!
মেজবাহ্-উল-হক
ধরাছোঁয়ার বাইরে তারা!

যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব—মহাভারতের পাঁচ মহাবীর! পাঁচ সহোদর। এদেরই বলা হয় পঞ্চপাণ্ডব। বেদব্যাস রচিত মহাভারতের এই পাঁচ চরিত্র বা পাঁচ মহাবীর পাঁচটি বিশেষ গুণে গুণান্বিত! সবার বড় যুধিষ্ঠির—ধার্মিকতা ও সত্যবাদিতার জন্য জগদ্বিখ্যাত। রথ চালনার দিক দিয়ে তার সমকক্ষ কেউ নেই। রণক্ষেত্রেও তিনি মহাপারদর্শী। ভীম হচ্ছেন দ্বিতীয় পাণ্ডব মহাশক্তিধর গদাধারী। অর্জুন হচ্ছেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনুর্বীদ। শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় বন্ধু। মহাভারতের শ্রেষ্ঠ দুই বীর এই অর্জুন ও ভীম। চতুর্থ পাণ্ডব নকুল তলোয়ার চালনায় পারদর্শী। তলোয়ার হাতে তার সঙ্গে কেউ পারতো না। শেষ পাণ্ডব সহদেব হচ্ছেন জ্যোতিষবিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী। এই পাঁচ ভাইয়ের বীরত্বেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বিজয় লাভ করে পাণ্ডব বংশ।

মহাভারতের পঞ্চপাণ্ডবের মতো বাংলাদেশ ক্রিকেট দলেও রয়েছে ‘ক্রিকেট-পঞ্চপাণ্ডব’ —মাশরাফি মর্তুজা, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। মহাভারতের পঞ্চপাণ্ডবের মতো তারা সম্পর্কে সহোদর নন, কিন্তু এই পাঁচ সিনিয়র ক্রিকেটারের কাঁধে ভর করেই একের পর এক ম্যাচে জিতছে বাংলাদেশ। ক্রিকেটের সাফল্যের গ্রাফটা তর তর করে উপরের দিকে উঠছে তো এই পাঁচ সিনিয়র ক্রিকেটারের অবদানেই!

বাংলাদেশ এখন পাঁচ ক্রিকেটার নির্ভর হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ দিন থেকে এই পাঁচ ক্রিকেটার টানা খেলে চলেছেন। দিন দিন নিজেদেরকে ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন।

১. মাশরাফি মর্তুজা —সেই ২০০১ সালে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়িয়েছেন। এখন পর্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে খেলেই চলেছেন। টেস্টে ৭৮ উইকেট, ওয়ানডেতে ২৩৮ উইকেট এবং টি-২০তে শিকার করেছেন ৪২ উইকেট। ৩৫ বছর বয়সী এই পেসারের পায়ে মোট ৭ বার অস্ত্রোপচার হয়েছে। ফিটনেসের কারণে টেস্ট ও টি-২০ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু ওয়ানডেতে এখনো তিনি সেরা বোলার। এই ১৬-১৭ বছরেও ম্যাশকে কেউ চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেননি! সদ্য সমাপ্ত ঢাকা প্রিমিয়ার লিগেও সর্বোচ্চ ৩৫ উইকেট শিকার করেছেন।

২. সাকিব আল হাসান —বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার যিনি আইসিসির অলরাউন্ডার র‌্যাঙ্কিংয়ে প্রথমবারের মতো শীর্ষে ওঠেন। এক সঙ্গে টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-২০ —তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটেই একসঙ্গে শীর্ষ অলরাউন্ডার ছিলেন। এই ঘটনা ক্রিকেটের ইতিহাসে আর নেই। ২০০৭ সাল থেকে জাতীয় দলে খেলছেন। ১১ বছরে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। এক সাকিব না থাকলে দলের যে কী অবস্থা হতে পারে তা ঘরের মাঠে লঙ্কানদের বিরুদ্ধে সিরিজ হেরেই বুঝতে পেছে বাংলাদেশ। পাইপলাইনে নেই কোনো ‘নতুন সাকিব’!

৩. তামিম ইকবাল—২০০৮ সালে অভিষেকের পর থেকে ব্যাটিংয়ে ওপেন করছেন। বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান— সেরা ওপেনার তো বটেই! টেস্টে ৮ সেঞ্চুরিসহ প্রায় চার হাজার রান (৩৯৮৫)। ওয়ানডে সেঞ্চুরি ৯টি, রান ছয় হাজার। টি-২০তে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে একমাত্র সেঞ্চুরিয়ান তিনি। ১০ বছর থেকে ওপেনিংয়ে একপ্রান্ত আগলে রেখেছেন, কিন্তু আরেকপ্রান্তে প্রায় ডজন খানেক ওপেনার পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশে তামিমের জায়গায় নতুন ওপেনার পাওয়া তো দূরের কথা এখন পর্যন্ত দীর্ঘ মেয়াদে কোনো সঙ্গীই পাননি তামিম! তাই তো দেখা যায়, যখন তামিম ইনজুরিতে থাকেন তখন ওপেনার নিয়ে ঝামেলায় পড়ে যায় দল।

৪. মুশফিকুর রহিম —মিস্টার ডিপেন্ডেবল! বাংলাদেশ দলের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড বলা হয় বগুড়ার এই তারকা ক্রিকেটারকে। যখন টপ অর্ডার ভেঙে পড়েন তখন মিডল অর্ডারে ভরসার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে যান। ওয়ানডে ও টেস্টে তার সেঞ্চুরি ৫টি করে। টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান তিনি। ২০০৫ সাল থেকে জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন। এই এক যুগে ধীরে ধীরে নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে গেছেন মুশি।

৫. মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ—জাতীয় দলে বিপদের বন্ধু! ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল তার প্রধান কারিগর ছিলেন এই মাহমুদুল্লাহ। ওই আসরে টানা দুই ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছেন। তার আগে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের আর কোনো ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করতে পারেননি। দল যখনই বিপদে পড়ে তখনই চওড়া হয় মাহমুদুল্লাহর ব্যাট। যদিও টেস্ট ও ওয়ানডে মিলে তার সেঞ্চুরি সংখ্যা মাত্র ৪টি, তবে লোয়ার অর্ডারে তার ছোট ছোট ইনিংসগুলোই তাকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে প্রতিনিয়ত যেন নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। তাকে যে চ্যালেঞ্জ জানাবে এমন ক্রিকেটার বিসিবির পাইপলাইনে নেই বললেই চলে!

বিশ্বের প্রতিটি দলেই বড় তারকা ক্রিকেটারদের ব্যাক-আপ হিসেবে তরুণ ক্রিকেটার তৈরি করা হয়। মাঝে মধ্যে তারকাদের বিশ্রাম দিয়ে রিজার্ভ বেঞ্চ ঝালিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহর বদলি কারা? এই তারকাদের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ দলকে কারা এগিয়ে নিয়ে যাবে? বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কি পঞ্চপাণ্ডবের বদলি ক্রিকেটার তৈরির জন্য আদৌও কোনো উদ্যোগ নিয়েছে? এমন তো তাদের অবসরের পর রাতারাতি বদলি ক্রিকেটার তৈরি হয়ে যাবে! সময় থাকতে বিসিবি উদ্যোগ না নিলে ক্রিকেট-পঞ্চপাণ্ডবের অবসরের পর দিশাহারা হতে পারে বাংলাদেশ দল— সাঙ্গাকারা, জয়বর্ধনে ও দিলশান অবসরের পর ঠিক যে অবস্থা হয়েছিল শ্রীলঙ্কার।

বিডিপ্রতিদিন/ই জাহান

আপনার মন্তব্য

এই পাতার আরো খবর
up-arrow