Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৭

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৫ জুলাই, ২০১৬ ২২:০৩
ঠিকানা থাকুক আপদমুক্ত
রফিকুল ইসলাম রনি
ঠিকানা থাকুক আপদমুক্ত
কোন গোপন কুঠুরিতে আশ্রয় নিয়ে কারা নাশকতার ছক আঁটছে তার হদিস রাখা খুব কঠিন। ছবি : জয়ীতা রায়

উন্নয়ন ও জীবিকার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় মেগাসিটি ঢাকায় সারা দেশ থেকে ছুটে আসছে মানুষ। ঢাকার জনসংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে ৪ শতাংশ হারে। সরকারি হিসাবে, প্রতিদিন নতুন করে ১ হাজার ৪১৮ জন মানুষ যুক্ত হচ্ছে রাজধানীতে। বর্তমানে রাজধানীর জনসংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। প্রতি বর্গকিলোমিটারে এখানে বাস করছে ৪৪ হাজার ১০০ জন মানুষ, যা ঢাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরে পরিণত করেছে। এই জনবহুল নগরীতে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে জঙ্গি তত্পরতা। গুলশান ও শোলাকিয়া হত্যাকাণ্ডের পর জঙ্গিদের বাড়ি ভাড়া দেওয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। জঙ্গিদের বাড়ি ভাড়া ও আশ্রয় দেওয়ার কারণে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন বাড়ি মালিককে আটক করেছে পুলিশ। রাজধানী ঢাকাসহ জনবহুল সিটি এলাকার কোন গোপন কুঠুরিতে আশ্রয় নিয়ে কারা নাশকতার ছক আঁটছে সেটা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে হদিস রাখা খুব কঠিন। এ জন্য দেশের প্রতিটি নাগরিককে এগিয়ে আসার তাগিদ দিয়েছে সরকার। মোটকথা আপনার প্রিয় ঠিকানাটি নিরাপদ কিনা, উগ্রপন্থি জঙ্গি নামের আপদমুক্ত কিনা সেটি নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।       

ইতিপূর্বে ভাড়াটিয়াদের তথ্য জমা দেওয়ার জন্য বাড়ি মালিকদের ফরম দিয়েছিল পুলিশ প্রশাসন। সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার প্রেক্ষাপটে ভাড়াটিয়ার তথ্য সংরক্ষণের বিষয়টি আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, আমরা এ পর্যন্ত ৪৯টি থানা থেকে প্রায় ২০ লাখ তথ্য ফরম হাতে পেয়েছি। প্রতিটি ফরমে গড়ে চারজন ব্যক্তির তথ্য আছে। সেই হিসাবে রাজধানীর প্রায় ৮০ লাখ লোকের তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। সেই তথ্যের ডাটাবেজ তৈরির কাজও চলছে। এটি একটি বড় কাজ।

পুলিশ জানিয়েছে, শেওড়াপাড়ায় নুরুল ইসলামের ও ভাটারায় ড. গিয়াস উদ্দিনের বাড়িতে বসেই আঁকা হয়েছিল গুলশানের জঙ্গি হামলার ছক। কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় সন্ত্রাসী হামলার আগেও জঙ্গিরা একটি বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল। গুলশানে হামলাকারী জঙ্গি নিবরাসরাই ঝিনাইদহে ভিন্ন নামে বাসা ভাড়া নিয়েছিল। সম্প্রতি বাড়ি ভাড়া নিয়ে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা বেড়ে যাওয়ার ভাবিয়ে তুলেছে বাড়িওয়ালাদের। তারা বলছেন, গোপনে বাসা ভাড়া নিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা নতুন না হলেও ভয়াবহ জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তারা বলছেন, বাড়ি ভাড়া নিয়ে সম্প্রতি যেসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে তাতে আতঙ্কে আছি। মানুষকে বিশ্বাস করাটাই মুশকিল হয়ে পড়েছে। নিজের বাড়ি ভাড়া দেব তা নিয়েও শঙ্কায় থাকতে হচ্ছে। বাসা ভাড়া দেওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড এবং ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি জমা রেখেছি। কিন্তু এরপরও ভরসা পাচ্ছি না। কখন কী হয় বলা মুশকিল। আমরা ঝুঁকির মধ্যে থাকতে চাই না।

এদিকে মেস ভাড়া বা বাসা ভাড়া নিয়ে সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদের জড়িয়ে পড়ায় রাজধানীতে বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ইতিমধ্যে যেসব বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াদের সম্পর্কে তথ্য দেননি, তাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। ভাড়াটিয়াদের তথ্য না দেওয়ায় ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি। এ ছাড়াও পুলিশের পক্ষ থেকে বাড়ির মালিকদের সতর্ক করা হয়েছে, অপরিচিত যুবকদের বাসা ভাড়া দেওয়ার ব্যাপারে ভালো করে তথ্য যাচাই-বাছাই করতে হবে। অন্যদিকে এলাকায় অপরিচিত যুবকদের রহস্যজনক ঘোরাঘুরি করলেও স্থানীয় পুলিশকে খবর দিতে বলা হয়েছে। এ জন্য সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরদেরও কাজে লাগানো হচ্ছে। কাউন্সিলররাও নিজ নিজ এলাকায় বাড়ির মালিকদের সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন। ব্যাচেলর মেস ও কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলগুলোতে চালানো হচ্ছে বিশেষ নজরদারি।

রাজধানীর গোপীবাগ এলাকার কে এম দাস লেনের বাড়ির মালিক মোশাররফ হোসেন জানান, পাঁচতলা বাড়ির নিচ তলায় তিনি মেস ভাড়া দিয়েছেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের ছাত্ররা ওই মেসে থাকছেন।   তিনি বলেন, বাড়ি ভাড়া নিয়ে সম্প্রতি যেসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে তাতে আতঙ্কে আছি। কে এম দাস লেনের ওই মেসের বাসিন্দা কবি নজরুল কলেজের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র হাসান মেহেদী। তিনি বলেন, গুলশান ও শোলাকিয়ায় সন্ত্রাসী হামলা ঘটনার পর থেকে বাড়ির মালিক খুব কড়াকড়ি করছেন। নতুন করে বেশ কিছু শর্ত দিয়েছেন। যেমন- বাসায় বন্ধু-বান্ধব আনা যাবে না, রাত ৯টার মধ্যে বাসায় ঢুকতে হবে, গ্রামের বাড়ি বা অন্য কোথাও গেলে তাকে জানিয়ে যেতে বলেছেন।

ওই ঘটনার পর লক্ষ্মীবাজার কদমতলী মন্দির এলাকার বাড়ির মালিক জাহাঙ্গীর আলম মেস ভাড়াটিয়াদের তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, ব্যাচেলর বা মেস ভাড়া দিয়ে সমস্যায় পড়তে চাই না। পত্র-পত্রিকায় যা দেখছি তাতে রীতিমতো শঙ্কায় আছি। তা ছাড়া মেসের ছেলেরা রাত-বিরাতে বাসায় ফেরে। বাসায় থাকার জন্য বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আসে। আড্ডা দেয়। কখন কী হয় বলা যায় না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি মেস ভাড়া দেব না। কারণ আমার ঠিকানাটা আমি নিরাপদ রাখতে চাই।

 

এই পাতার আরো খবর
up-arrow