Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২১:৩০
নামেই নাট্যমঞ্চ
রফিকুল ইসলাম রনি ও মোস্তফা মতিহার
নামেই নাট্যমঞ্চ
মহানগর নাট্যমঞ্চ যেখানে নাটক নয়, নিয়মিত আয়োজন করা হয় আলোচনা সভা ছবি : রোহেত রাজীব

রাজধানীবাসীর চিত্তবিনোদনের জন্য ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চটি নির্মাণ করা হলেও তা কাজে আসছে না। নামে ‘নাট্যমঞ্চ’ হলেও নাটকের ‘ন’-ও হয় না এখানে।

বরং অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় নাট্যকর্মীরা এর প্রতি বিমুখ। বখাটে, মাদকসেবী ও অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িতদের বিচরণে এ এলাকায় প্রতিনিয়তই নানা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে পথচারী। যার কারণে এই মিলনায়তন এবং এর আশপাশ এলাকা অপরাধের আখড়া হয়ে উঠেছে। রাজধানীর গুলিস্তানে বঙ্গভবন, মওলানা ভাসানী জাতীয় স্টেডিয়াম আর মহানগর নাট্যমঞ্চ যেন এক ত্রিভুজের তিনটি বিন্দু। নতুন ও পুরান ঢাকার সন্ধিস্থলে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনতিদূরেই এর অবস্থান। শুধু অবস্থানের সুবিধাই নয়, অবকাঠামো ও কারিগরি দিক থেকেও এটি ছিল আধুনিক স্থাপনা। মানুষের চিত্তবিনোদনের চিন্তা করে তৎকালীন অবিভক্ত ঢাকার মেয়র জননেতা মোহাম্মদ হানিফ ১৯৯৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এর কিছুদিন পরে একে ‘কাজী বশির মিলনায়তন’ নাম দিয়ে উন্নত শব্দযন্ত্র, আলোকসজ্জা, দামি আসন দিয়ে সমৃদ্ধও করা হয়। কিন্তু অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় সবই নষ্ট হতে বসেছে। গত রবিবার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, নাট্যমঞ্চ এবং নাট্যমঞ্চকে ঘিরে থাকা পার্কটি দিন দিন যেন পরিত্যক্ত এলাকায় পরিণত হচ্ছে। টাইলসে ঢাকা উন্মুক্তাঙ্গন বিভিন্ন জিনিস শুকানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। কৃত্রিম জলাধারে নোংরা পানি, ভাসছে ময়লা। ভাসমান লোকজনের দখলে পার্ক। কাজী বশির মিলনায়তনের ফটক ভাসমান লোকজনের দখলে। পার্কে মাদকাসক্ত ও ভাসমান লোকজনের আনাগোনা। যেখানে-সেখানে পড়ে আছে আবর্জনা।   অযত্ন, অবহেলা ও অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের কারণে নাট্য উপযোগী বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক মহানগর নাট্যমঞ্চ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। সাউন্ড সিস্টেম, লাইটিং, আসনবিন্যাস, মাত্রাতিরিক্ত হল ভাড়া (একবেলা ৩৬ হাজার ৭০০ টাকা) এবং নাট্যকর্মীদের অবাধে বিচরণের নান্দনিক পরিবেশ না থাকায় ইতিমধ্যে নাট্যকর্মীরা মিলনায়তন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। সংস্কৃতিকর্মীদের আনাগোনা নেই বললেই চলে। মহানগর নাট্যমঞ্চে এখন রাজনৈতিক জনসমাবেশ, করপোরেট সংস্থাগুলোর নানা আয়োজন এবং বিচ্ছিন্ন নাট্যকর্মীদের অশালীন পরিবেশনার বাইরে আর কিছুই হয় না। উৎসব অনুষ্ঠানের জন্য সারা বছরে হাতেগোনা কয়েক দিন ভাড়া হয় এ মঞ্চ। এতে করে প্রতিদিনের হল ভাড়া বিবেচনায় বছরে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা উপার্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। ব্যাহত হচ্ছে নাট্যচর্চাও। বিগত দিনে হলটির সৌন্দর্য রক্ষায় কোনোরকম উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। মহানগর নাট্যমঞ্চ নাট্যচর্চার প্রকাশ ও বিকাশের লক্ষ্যে তৈরি হলেও সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হচ্ছে না। এ বিষয়ে নগরের হল রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সমাজকল্যাণ ও সাংস্কৃতিক বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমানে মঞ্চনাটকের যে মান, সে অনুযায়ী এ হলটি উপযুক্ত নয়। একটি নাটকের জন্য উপযুক্ত সরঞ্জামাদি না থাকায় এখানে নাট্যকর্মীরা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এ জন্য আমরা সূত্রাপুরে জহির রায়হান মিলনায়তনটি আধুনিক নাটকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গড়ে তুলেছি। সেখানে নাট্যকর্মীরা তাদের পরিবেশনা অব্যাহত রেখেছেন। তবে এখানে মহানগর নাট্যমঞ্চে (কাজী বশির মিলনায়তন) কেউ যদি পরিবেশ তৈরি করে নাট্যচর্চা করতে পারে, তাহলে তাদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা থাকে বলে জানান এই কর্মকর্তা।  

মহানগর নাট্যমঞ্চ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ও গ্রন্থনাকারী সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, আমার স্পষ্ট মনে আছে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এ দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষাকারী শিল্প আমাদের যাত্রা ও মঞ্চনাটক। আর এসব বিষয়কে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার জন্যই এই হলটি নির্মাণ করা এবং এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। গোলাম কুদ্দুছ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সুন্দর চিন্তাকে তোয়াক্কা না করে এই মঞ্চটিকে এক ধরনের ডাস্টবিনে পরিণত করা হয়েছে। কেন তা করা হলো খতিয়ে দেখা দরকার। তিনি অচিরেই এই হলটিকে নাট্যকের উপযোগী করে কম মূল্যে রেয়াতি হারে ভাড়া দিয়ে নাট্যাঙ্গনের সংকট নিরসনে সহায়তা করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান। বিশিষ্ট যাত্রাশিল্পী মিলন কান্তি দে বলেন, মহানগর নাট্যমঞ্চকে নাটকের উপযোগী করার বিকল্প নেই। মহানগর নাট্যমঞ্চ সংলগ্ন জলাধারের পানিও নোংরা। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল আক্তারুজ্জামান বলেন, ভাবতে অবাক লাগে, মঞ্চনাটকের জন্য তৈরি হওয়া একটি মিলনায়তন কীভাবে অশালীন পরিবেশের আখড়ায় পরিণত হয়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো রকম দায় নেই? আমরা এর আগেও এই হলটি নাট্য উপযোগী করার জন্য আবেদন জানিয়েছি, এখনো জানাচ্ছি। অনতিবিলম্বে এটির উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা হোক।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow