Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:২৪
সেলফি আসক্তিতে মৃত্যুঝুঁকি
জিন্নাতুন নূর
সেলফি আসক্তিতে মৃত্যুঝুঁকি
হাতিরঝিলে গতকালের সকালে তোলা ছবি : জয়ীতা রায়

কি শহর, কি গ্রাম বাংলাদেশে এখন সব জায়গাতেই বিভিন্ন বয়সী মানুষ সেলফি আসক্তিতে আক্রান্ত। কথায় কথায় মোবাইল ফোনের ক্যামেরা দিয়ে নিজের বা একাধিক মানুষের ছবি তোলার বিষয়টি তারুণ্যের রোগে পরিণত হয়েছে বলে বিশেজ্ঞদের মন্তব্য। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে নিজের তোলা ছবি আপলোড করে লাইক ও কমেন্ট পেতে বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বর্তমানে বিপজ্জনক ভঙ্গিতে পোজ দিচ্ছেন সেলফি আসক্তরা। আর এতে বিভিন্ন সময় ঘটছে মারাত্মক দুর্ঘটনা, কেউবা প্রাণও হারাচ্ছেন। কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রেস্টুরেন্ট, বিনোদন কেন্দ্র কিংবা চলতি পথেই সেলফি তুলে তা ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম টুইটার, ইন্সট্রাগ্রাম ইত্যাদিতে পোস্ট করতে পছন্দ করেন অসংখ্য মানুষ। যার মধ্যে তরুণ-তরুণীর সংখ্যাই বেশি।

সেলফি বোঝাতে যদিও নিজের তোলা প্রতিকৃতি বোঝানো হয় কিন্তু এখন একজনের তোলা সেলফিতে একসঙ্গে অনেক মানুষকে পোজ দিতে দেখা যাচ্ছে।

ইদানীং সুউচ্চ ভবনের ওপর থেকে, চলন্ত মোটরসাইকেলে বসে, ব্রিজের ওপর থেকে, ব্যস্ততম সড়কে, পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে, ট্রেনের ছাদের ওপর, মাঝ নদীতে যাত্রীভর্তি নৌকার মাঝে দাঁড়িয়ে, উঁচু ভবনের ছাদে, বড় কোন দুর্ঘটনা স্থলের কাছে এবং হেলিকপ্টারে বসে বিপজ্জনক ভঙ্গিতে মানুষকে সেলফি তুলতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে নগরীর হাতিরঝিল ও ফ্লাইওভারগুলোতে তরুণদের সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়েই বিপজ্জনকভাবে সেলফি তুলতে দেখা যায়। কুড়িল ফ্লাইওভারের ওপর গত শুক্রবার বিকালে বন্ধুকে নিয়ে সেলফি তুলছিলেন একাদশ শ্রেণির ছাত্র সুমন। জীবন ঝুঁকি নিয়ে এভাবে ছবি তোলার কারণ জানতে চাইলে সুমন বলেন, বিকালে এই ফ্লাইওভার থেকে সূর্যাস্তের ভালো দৃশ্য পাওয়া যায়। তাই কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে হলেও এখানে ছবি তুলছি। আমার অন্য বন্ধুরাও এখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়েছে। আমি বাদ যাব কেন! গত ১৭ সেপ্টেম্বর পিরোজপুরের জিয়ানগরে ভাঙ্গা ব্রিজে সেলফি তুলতে গিয়ে ২০ জন আহত হন। এদিন সন্ধ্যায় উপজেলার পাড়েরহাট বাজার ও বাদুড়া মত্স্য আড়তের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী ব্রিজে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ব্রিজের ওপর সে সময় অর্ধ শতাধিক লোক ভিড় জমায়। কিন্তু কয়েকজন যুবক ভাঙা ব্রিজটির ওপর বসে সেলফি তুলতে ব্যস্ত হলে এক সময় তা সম্পূর্ণ ভেঙে খালে পড়ে যায়।

গত ৯ সেপ্টেম্বর ঈদ যাত্রায় খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদ থেকে সেলফি তুলতে গিয়ে অর্ধশত যাত্রী ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়। মূলত সিরাজগঞ্জ মনসুর আলী স্টেশনের কাছে ট্রেনটি থামার আগে ইন্টারনেট সংযোগের তারে জড়িয়ে যাত্রীরা পড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেনি। আহত যাত্রীদের ২১ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সর্বশেষ গত ১৬ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের উখিয়া থানায় যাত্রীবাহী একটি হেলিকপ্টারের এক যাত্রী দরজা খুলে সেলফি তুলতে ও ভিডিও করতে গিয়েই দুর্ঘটনায় পড়ে হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়। এতে হেলিকপ্টারের পাইলটসহ চারজন আহত ও একজন নিহত হন। দুর্ঘটনায় আহত পাইলট শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, এক যাত্রী হেলিকপ্টারের দরজা খুলে ছবি তুলছিল ও ভিডিও করছিল। এ সময় বাতাসের তারতম্যে ভারসাম্য হারিয়ে এটি বিধ্বস্ত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বর্তমান সময়ে মানুষের অতিরিক্ত সেলফি তোলার বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে দেখছি। এটি এক ধরনের মনস্তাত্বিক সমস্যা বা মেন্টাল কমপ্লেক্স ডিজিজ। মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে তার আত্মপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে অতিরিক্ত সেলফি তোলেন। যা আমাদের সমাজব্যবস্থার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।

এর মধ্য দিয়ে একজনের জীবনে ব্যক্তিগত বিষয়গুলো আর ব্যক্তিগত থাকে না। এই শিক্ষকের মতে, এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের অতিরিক্ত পড়ালেখার চাপ ও সুস্থ বিনোদনের অভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়েও অনেক সময় সেলফি তুলে বিকৃত বিনোদন পেতে চায়।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow