Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৩ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৩ ০০:০০
বেগমের পথচলা
রশিদা আফরোজ
বেগমের পথচলা

বাংলার নারীমুক্তির আন্দোলনে উপমহাদেশের প্রথম নারী সাপ্তাহিক 'বেগম' পত্রিকা এবং এর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন ও নূরজাহান বেগমের নাম চলে আসে। শুধু তাই নয়, বাংলায় নারী সাংবাদিকতার ইতিহাসেও নূরজাহান বেগম একটি প্রত্যয়ের নাম। ১৯২৫ সালের ৪ জুন জন্ম নেওয়া ৮৮ বছর বয়সী এই নারী এখনো নিরলসভাবে বেগম পত্রিকাটি বের করছেন।

উনিশ শতকের শেষের দিকে বাঙালি মুসলিম সমাজে নবজাগরণ ঘটে। একদিকে যেমন পুরুষরা এগিয়ে আসতে থাকে নানা অগ্রযাত্রায়, তেমনি কিছু নারীও নারীমুক্তির আন্দোলনে চার দেয়ালের গণ্ডি পেরিয়ে বের হয়ে আসে। আর এক্ষেত্রে 'বেগম' পত্রিকা অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। পত্রিকাটির আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে স্থান পায় নারী জাগরণ, কুসংস্কার বিলোপ, গ্রামগঞ্জের নির্যাতিত নারীদের চিত্র, জন্মনিরোধ, পরিবার পরিকল্পনা, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের জীবনবোধ থেকে লেখা চিঠি এবং বিভিন্ন মনীষীর বাণী। তৎকালীন সময়ে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা টালমাটাল থাকায় ঠিকমতো লেখা সংগ্রহ করা সহজসাধ্য ব্যাপার ছিল না। তবু এরই মধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে পত্রিকার জন্য লেখা সংগ্রহ করা হতো।

১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই কলকাতা থেকে প্রথম 'বেগম' প্রকাশ হয়। 'বেগম' প্রকাশের প্রথম থেকে প্রতিটি সংখ্যা প্রকাশ করতে নূরজাহান বেগমকে নিরলস পরিশ্রম করতে হয়। কারণ তৎকালীন সময়ে এখনকার মতো ছিল না সব সুবিধা। তবু নানারকম প্রতিকূলতার মাঝেও নূরজাহান বেগম সব সময় গ্রামীণ সমাজের নারীদের উন্নয়নের জন্য শিক্ষা প্রসঙ্গে কথা বলতেন। পত্রিকায়ও তিনি এ নিয়ে বিভিন্ন নিবন্ধ লিখতেন। ক্রমান্বয়ে সারা দেশে 'বেগম' পত্রিকাকে কেন্দ্র করে নারী কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের মেলবন্ধন গড়ে ওঠে। নূরজাহান বেগমের অক্লান্ত পরিশ্রম, আন্তরিকতা, কর্মনিষ্ঠা এবং মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনের পৃষ্ঠপোষকতায় 'বেগম' দ্রুত নারীদের জনপ্রিয় পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়।

পত্রিকাটির প্রথম সম্পাদক হিসেবে ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। নূরজাহান বেগম ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা 'বেগম'-এর সম্পাদক সুফিয়া কামাল সম্পাদকীয়তে লিখলেন : সুধী ব্যক্তিরা বলেন, জাতি গঠনের দায়িত্ব প্রধানত নারীসমাজের হাতে, কথাটা অনস্বীকার্য নয় এবং এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে হলে পৃথিবীর কোনো দিক থেকেই চোখ ফিরিয়ে থাকলে আমাদের চলবে না, এ কথাও মানতে হবে। শিল্প-বিজ্ঞান থেকে আরম্ভ করে গৃহকার্য ও সন্তান পালন সর্বক্ষেত্রে আমরা সত্যিকার নারীরূপে গড়ে উঠতে চাই।

'বেগম' প্রথম সংখ্যায় শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন অধ্যাপক শামসুন নাহার মাহমুদ এমএ, মিসেস বদরুন্নেসা আহমেদ, মিসেস এইচ এ হাকাম এমএলএ, সৈয়দা ফেরদৌস মহল সিরাজী, মিসেস জাহান আরা মজিদ, কাজী লুৎফুন্নেসা হারুন, বেগম ফিরোজা রহমান, নূরজাহান বেগ, বেগম জোবেদা খাতুন, মিসেস আমিনা চৌধুরী, মিসেস আনোয়ারা বেগম।

১৯৪৮ সালে কলকাতায় প্রথম 'ঈদসংখ্যা বেগম' প্রকাশিত হয়। এ সংখ্যায় ৬২ জন নারী লেখকের লেখা ছাপা হয়। সেই সঙ্গে ইমিটেশন আর্ট পেপারে ছাপা হয় নারীদের ছবি। সংখ্যাটিতে ৬২টি বিজ্ঞাপন সংস্থা বিজ্ঞাপন দেয়। এর মূল্য ছিল ২ টাকা। ধর্ম সম্পর্কে মহিলাদের জ্ঞান লাভের জন্য ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত হয় বেগম বিশ্বনবী সংখ্যা। এ সংখ্যায় ২৪টি প্রবন্ধ, ৪টি কবিতা, ২টি সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়।

১৯৫৪ সালে প্রখ্যাত মার্কিন নারী সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী মিসেস আইদা আলসেথ ঢাকায় আসেন। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন ও নূরজাহান বেগম তাকে বেগম কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানান। এ উপলক্ষে কয়েকজন নারী কবি, সাহিত্যিকও 'বেগম' অফিসে আমন্ত্রিত হন। মিসেস আইদা আলসেথের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। তিনি 'বেগম' পত্রিকার বিভিন্ন শাখা ঘুরে দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের অনেক মাসিক পত্রিকা বের হয় কিন্তু নারীদের জন্য কোনো সাপ্তাহিক সাময়িকী এখনো প্রকাশিত হয়নি। তিনি মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন ও নূরজাহান বেগমকে একটি নারী ক্লাব গঠনের পরামর্শ দেন। তার পরামর্শ এবং উৎসাহে ১৯৫৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে 'বেগম ক্লাব' প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্লাবটির প্রেসিডেন্ট হন বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ এবং সেক্রেটারি নূরজাহান বেগম। এই ক্লাবের অনেক সদস্যই পরবর্তীতে বেগম পত্রিকায় সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।

'বেগম' পত্রিকার মাধ্যমে সামাজিক কুসংস্কারকে দূরে সরিয়ে নারীরা সামনের দিকে পথ হাঁটতে শিখেছেন। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন ও নূরজাহান বেগমের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় 'বেগম' পত্রিকা ধীরে ধীরে অন্তপুরের মেয়েদের মাঝে পেঁৗছে গেছে। মুসলিম নারীসমাজ 'বেগম'-এ লিখতে শুরু করেন। এক সময় গ্রামাঞ্চলের নারীরাও 'বেগম'-এ লিখতে থাকেন। ফলে সারা দেশে একমাত্র সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে 'বেগম' জনপ্রিয়তা পায়।

আজো নূরজাহান বেগম 'বেগম'-এর সেই ধারা অক্ষুণ্ন রেখেছেন। নারিন্দার পলেস্তারা খসা বাড়ি থেকে আজো তিনি নারীসমাজের উন্নয়নের দিকমশাল জ্বালানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। তিনি বিশ্বাস করেন বাংলাদেশের নারীদের শিক্ষাগত উন্নয়ন হলে বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর নারীদের চেয়ে এদেশের নারীদের অবস্থান হবে আরও উন্নত। নারী সাংবাদিকদের উদ্দেশে নূরজাহান বেগমের বাণী_ তোমরা গ্রামে যাও। গ্রামের নারীরা এগিয়ে যেতে চায়। কিন্তু দিকনির্দেশনার অভাবে পিছিয়ে থাকে। তোমরা তাদের হাত ধরো। পথ দেখাতে সাহায্য করো। তিনি বিশ্বাস করেন, এ দেশে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা গেলে মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের নাম সবার আগে থাকবে।

নূরজাহান বেগম আজ পড়ন্ত বিকালে পেঁৗছে গেলেও তারই বিশ্বাস আর ভালোবাসার সৃষ্টি বেগম পত্রিকা বাংলার নারীদের হাত ধরে যুগ যুগ টিকে থাকবে আপন স্বকীয়তায়।

 

 

 

up-arrow