Bangladesh Pratidin

ঢাকা, সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, সোমবার, ২১ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০১৫ ০০:০০ টা আপলোড : ২ জুন, ২০১৫ ০০:০০
তিতাস এখন কঙ্কালসার!
তিতাস এখন কঙ্কালসার!

তুই যদি আমার হইতি, আমি হইতাম তর, তরে লইয়া ঘর বানামু দহিন বালুর চর। তিতাসের বুকে পাল তোলা নৌকার মাঝিদের এমন ভাটিয়ালি গান আর শোনা যায় না।

তিতাসের কোলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস মৃত্যু আজ বরণ করেছে। সব কিছু হারিয়ে যৌবনা তিতাস কঙ্কালসার! রূপসিনী তিতাসের বিবর্ণ রূপ দেখে অদ্বৈত মল বর্মণের তিতাসের সঙ্গে তুলনা করলে শুধুই কল্পিত বলে মনে হয়। এক সময় ভোরের হাওয়ায় তার তন্দ্রা ভাঙত, দিনের সূর্য তাকে তেতিয়ে উঠাত; রাতের চাঁদ ও তারারা তাকে নিয়ে ঘুম পাড়াত, কিন্তু এখন তা পারে না। কালজয়ী উপন্যাসিক অদ্বৈত মল বর্মণ তার 'তিতাস একটি নদীর নাম' উপন্যাস লিখে তিতাসকে পরিচয় করে দিয়েছে বিশ্ববাসীর কাছে। তিতাসের নামেই দেশের অন্যতম গ্যাস কূপ তিতাস গ্যাস। তিতাসের সেই জৌলুস আর নেই। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি না থাকায় আগের মতো জেলেদের মাছ ধরতেও দেখা যায় না। স্রোতস্বিনী তিতাসের বুকে জেগে উঠেছে চর।

বিভিন্ন সূত্র মতে, মেঘনা থেকে বোমালিয়া খাল দিয়ে এসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল-নাসিরনগর ব্রিজের নিচ দিয়ে ভাটির দিকে যে পানি প্রবাহিত হচ্ছে তা থেকে তিতাস নদীর সৃষ্টি। পরে তা জেলার নবীনগর উপজেলার চিত্রি গ্রামে গিয়ে মেঘনা নদীতে গিয়ে মিলেছে। দেশের অন্যান্য নদীর চেয়ে বেশি অাঁকাবাঁকা। সর্পিল তিতাসের প্রায় ৪০ কিলোমিটার ভরে গেছে। নদীর বুকে এখন আর মাঝি-মাল্লাকে পাল তোলা নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে দেখা যায় না। বর্ষায়ও চোখে পড়ে না তিতাসের রুদ্র মূর্তি। পার দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। কোথাও কোথাও চোখে পড়ে জেগে ওঠা চর। বর্ষা মৌসুম শেষের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় বিভিন্ন নৌরুট। শুকনো স্থানে পড়ে থাকা নৌকাগুলো দেখে মনে দাগ লাগে। আখাউড়ার দিকে ধাবিত তিতাস নদী সম্পূর্ণরূপে মরে গেছে। এক সময়কার কালীদাস সায়র (সাগর) নামে পরিচিত তিতাস নদী ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাকে কল্পনাও করা যেত না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া, সদর, বিজয়নগর, নাসিরনগর ও নবীনগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে তিতাসের কূল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বড় বড় হাট বাজার।

বাজারের ব্যবসায়ীরা দোকানের পণ্য সামগ্রী নৌকা দিয়েই আনা-নেওয়া করত। ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার আনন্দবাজার, টানবাজার, গোকর্ণঘাট, বিজয়নগরের চান্দুরা বাজার, নাসিরনগরের হরিপুর, সরাইলের শাহবাজপুর, আখাউড়ার বড় বাজার ও নবীনগরের বড়াইল, গোসাইপুর এলাকায় গড়ে উঠেছে বড় বড় বাজার।

ঘাটগুলোতে ভিড় করত মালবাহী বড় বড় নৌকা। নদীকে ঘিরে আখাউড়া বড় বাজার, বিজয়নগরের চান্দুরা, নাসিরনগরের হরিপুরে গড়ে উঠেছিল বিশাল পাটের বাজার। ছিল ডাউস আকৃতির গুদাম। নদী ভরাটে জেলেদের ভাগ্যে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। কমপক্ষে অর্ধ লাখ জেলে এক সময় নৌকাও ডিঙি দিয়ে সারা বছরই মাছ ধরত। জীবিকার এক মাত্র অবলম্বন ছিল মাছ ধরা। এখন অধিকাংশ জেলে পরিবারেই পেশা পরিবর্তন হয়েছে। খনন না করায় স্রোতস্বিনী তিতাস নাব্য হারিয়েছে। অন্যদিকে বছরের পর বছর ধরে পাহাড়ি ঢলে নদী ভরাট হচ্ছে। ত্রিপুরার পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা পলি তিতাসের নাব্যকে থামিয়ে দিচ্ছে। দখলবাজদের কবলে পড়ে স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ব্রাক্ষণবাড়িয়ার শাহবাজপুর, মজলিশপুর, বাকাইল, শহরের পূর্বমেড্ডা, পাইকপাড়া, আনন্দবাজার, টানবাজার ও শিমরাইলকান্দি এলাকায় পাড় ভরাট করে গড়ে উঠেছে স্থায়ী অবৈধ স্থাপনা। নাব্য হারানোর ফলে কৃষি জমিতে সেচকার্যে বিঘ্ন ঘটছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন জানান, খনন না করা হলে তিতাস নদী মরে যাবে। হারিয়ে ফেলবে পরিবেশের ভারসাম্যতা। সেই সঙ্গে তিতাসনির্ভর প্রায় ১০ হাজার হেক্টর কৃষি জমি মরুভূমিতে রূপান্তরিত হবে।

মোশাররফ হোসেন বেলাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

 

এই পাতার আরো খবর
up-arrow