Bangladesh Pratidin

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ১৮ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৭ জুন, ২০১৬ ২৩:২৯
বিশেষ সাক্ষাৎকার
ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা লুটেরা কাউকে ছাড়ব না
ইকবাল মাহমুদ, চেয়ারম্যান, দুর্নীতি দমন কমিশনের
ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা লুটেরা কাউকে ছাড়ব না
বিশেষ সাক্ষাত্কারে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ

ইকবাল মাহমুদ দুদকের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে নেওয়া তার বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে গত বুধবার বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে খোলামেলা আলাপ করেছেন। বলেছেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা মেরে দেওয়া লুটেরাদের কাউকে আমরা ছাড়ব না।’ তিনি বলেন, সরকারি কাজের গাফিলতির জন্যই দুর্নীতি হয়। কাজের পদ্ধতি উন্নত হলে দুর্নীতি কমে যাবে। আগামী দিনগুলোতে তিনটি বিষয় নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছেন, শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি প্রতিরোধ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করবে দুদক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন— শিমুল মাহমুদ ও মোস্তফা কাজল

 

ইকবাল মাহমুদ, চেয়ারম্যান, দুর্নীতি দমন কমিশন

প্রশ্ন : দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে তিন মাস অতিক্রান্ত হলো আপনার। এই সময়ে দুদক নামের প্রতিষ্ঠানটি যে সক্রিয় আছে সেটা জানান দিতে পেরেছেন আপনি। আপনার যোগদানের শুরুটা কেমন ছিল? শুরুতে এসে কি দেখলেন।

ইকবাল মাহমুদ : আমি এসে যা দেখলাম, আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে আইন মানা হয়নি। আইন অনুযায়ী প্রতিটি অনুসন্ধান ৩০ দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। সেটা তিন বছরও লেগে যায়। যিনি অভিযুক্ত তিনি বিশ্বাস করেন না দুদকে অভিযোগে কিছু হবে। আর যিনি অভিযোগ করেছেন তার কাছেও প্রতিকার পাওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। অভিযোগের ফাইল এসেছে, কিন্তু বছরের পর বছর ফাইল নিষ্পত্তি হয়নি। সেখানে আইন ভঙ্গ হয়েছে। আমি তাদের শোকজ করেছি। এসব করতে গিয়ে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমি বলেছি, আমাকে রিপোর্ট দিতে হবে। আমাদের লজিস্টিক নেই, কর্মীদের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তবুও কোনো ফাইল বছরের পর বছর পড়ে থাকতে পারে না। এসব কারণে অনুসন্ধান ও তদন্ত কর্মকর্তাদের কতিপয় নির্দেশনা দিয়েছি। বলেছি, অযথা কোনো ব্যক্তিকে তলব করা যাবে না। হয়রানিও করা যাবে না। তলব সুনির্দিষ্টভাবে করতে হবে।

দুদকে আসা মামলাগুলো খুব সহজ। মামলাগুলো তো ডকুমেন্টের ভিত্তিতে দায়ের করা। যে দায়ী তাকে ডাকবেন আমাদের কর্মকর্তারা। আমি বলেছি, তার সঙ্গে ভালো আচরণ করতে হবে। অভিযোগ মানে তো অপরাধী নয়। দুদক মানে তো থানা-পুলিশ নয়। মামলাগুলো কেন ডিলে হয়, আমি বুঝতে পারি না। অধিকাংশ শোকজের সমাধান হয়ে গেছে। আমি তাদের সতর্ক করেছি। বলেছি, একই অপরাধ আবার করলে শাস্তি দেব। আশা করছি, এখন থেকে খুব দ্রুততার সঙ্গে অভিযোগের অনুসন্ধান শেষ হবে। এটা আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যেই করতে হবে। সবার সক্ষমতা একরকম নয়। কেউ না পারলে আমাকে জানাতে হবে। কিন্তু ফাইল ফেলে রাখা যাবে না দিনের পর দিন। 

প্রশ্ন : প্রায় আড়াই বছর পর আর্থিক প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলার তদন্ত ভার দুদক থেকে পুলিশের কাছে ন্যস্ত হলো। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন।

ইকবাল মাহমুদ : জনপ্রতিনিধিরাই ভালো বুঝবেন, একটি সরকারি সংস্থা কীভাবে চলবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব তাদের। আমি মনে করি, এটি একটি ভালো উদ্যোগ। সরকারি-আধা সরকারি মামলাগুলো দ্রুততার সঙ্গে শেষ করা দরকার। দুর্নীতির মূল উৎস আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা ও পলিসি ইস্যুজ। আর্থিক প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলার তদন্তভার পুলিশকে দিয়ে পার্লামেন্ট আমাদের বোঝাটা সরিয়ে দিয়েছে। পলিসির কারণেই দুর্নীতির জন্ম হয়। একটি বিনিয়োগ করতে গিয়ে যদি ৩৩ জায়গায় সাইন লাগে তাহলে কীভাবে হবে। দুর্নীতি তো এভাবেই বিকশিত হয়। সে জন্য জাতীয় সংসদকে ধন্যবাদ জানাই পাবলিক প্রতারণার মতো বিষয়গুলোকে দুদক থেকে আইন করে সরিয়ে নেওয়ার জন্য। ফলে আমরা এখন থেকে শুধুমাত্র সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক প্রতারণার বিষয়গুলো অনুসন্ধান ও তদন্ত করতে পারব।

প্রশ্ন : নিজের কর্মকাণ্ডের কারণেই ‘কাগজের বাঘ’ পরিচিতি পাওয়া দুদককে কার্যকর ও গতিশীল করতে আপনার কি কোনো পরিকল্পনা আছে? এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানাবেন।

ইকবাল মাহমুদ : কোনো প্রাণীর সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠানের তুলনা করা সঠিক নয়। বলা হয়, দুদকের কোনো ক্ষমতা নেই। আসলে দুদকের ক্ষমতা আছে। আমরা ক্ষমতা প্রয়োগ করি না। কোনো অফিসের ক্ষমতা ব্যবহার না করে অপব্যবহার করা হয়। আমি মনে করি, দুর্নীতি কমাতে হলে সিস্টেম বদলাতে হবে যাতে সেখানে দুর্নীতি ঢুকতে না পারে। সরকারি কাজের গাফিলতির জন্যই দুর্নীতি নয়। প্রাইভেট সেক্টরের দুর্নীতি পুলিশ দেখবে। সেটা আমরা দেখব না। আমরা দেখব সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির বিষয়গুলো। আসলে দুর্নীতির মূল কারণ সরকারি কাজের পদ্ধতি। সরকারি কাজের পদ্ধতি উন্নত হলে দুর্নীতি কমবে। সঠিক ও দ্রুততর না হলে দুর্নীতি কমবে না। ডিমান্ড অনুযায়ী সাপ্লাই দিলে দুর্নীতি কমবে। এ ছাড়া আপনারা জেনেছেন সরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করেছি। এর মধ্যে একটি টিম রাজউকে কাজ করছে। 

এ বছর আমরা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রোধের চেষ্টা করব। শিক্ষাঙ্গনের দুর্নীতি রোধের ব্যাপারে মনোযোগ দেব। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আমরা দুটি অনুরোধ করেছি। টেস্টে এক সাবজেক্টে ফেল করলে কোনো ছাত্র পরীক্ষা দিতে পারবে না। আমরা দক্ষ জনশক্তি চাই। জনশক্তি সাসটেন করতে গেলে শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। যে ফেল করেছে তাকে পরের ক্লাসে তুলে ক্ষমতার অপব্যবহার করা যাবে না। ক্লাস সিক্স থেকে এটা শুরু। এই সময়টা আগামী প্রজন্মকে প্রস্তুত করার সময়। এ ব্যাপারে কোনো কম্প্রমাইজ করা যাবে না। সরকার ইতিমধ্যে সরকারি সার্কুলার জারি করেছে। তাতে বলেছে, টেস্ট পরীক্ষার খাতা সংরক্ষণ করতে হবে। আমরা জিপিএ ফাইভ চাই না। চাই দক্ষ জনশক্তি। জিপিএ ফাইভ পেলেই কোয়ালিটি অর্জন হয় না। সরকার শিক্ষা খাতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। কিন্তু তার কাঙ্ক্ষিত সুফল ঘরে তুলতে পারছে না।  শিক্ষার নামে সরকারের টাকা পানিতে চলে যাচ্ছে। দক্ষ লোক বের হচ্ছে না। শিক্ষা না থাকলে কুশিক্ষার জন্ম হয়। কুশিক্ষাই জঙ্গিবাদের জন্ম দেয়। শিক্ষা ছাড়া দক্ষতা, মানবিকতা সৃষ্টি হয় না। সরকারকে সাধুবাদ জানাই পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষা অষ্টম শ্রেণিতে নেওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য। একইভাবে এসএসসি তুলে দিয়ে এইচএসসিতে পরীক্ষা নেওয়া দরকার। সেখানে যারা ভালো করবে তাদের ভালো জায়গায় ভর্তি করতে হবে। এটা হলে সরকারি চাপ কমবে। অভিভাবকদের খরচ কমবে। পৃথিবীতে সংখ্যা দিয়ে কোনো কিছু হবে না। জাতীয় অগ্রগতির জন্য দরকার গুণগত মান বাড়ানো। দক্ষতা ও মান বাড়াতে না পারলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

প্রশ্ন : দুদক থেকে দায়মুক্তি দেওয়া দুর্নীতির মামলাগুলো পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে সর্বশেষ অগ্রগতি জানাবেন।

ইকবাল মাহমুদ : আমরা দুদক থেকে দায়মুক্তি পাওয়া ৫/৬টি মামলা পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছি। একটি মামলা পুনঃতদন্তের জন্য আদালতের কাছে অনুমতি চেয়েছি, আদালত দেয়নি। পরে হাইকোর্টে গিয়েছি। অন্যগুলো পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে। আমরা মনে করছি, দায়মুক্তির বিষয়টি আবার দেখা প্রয়োজন। দুদক যেসব মামলা দায়ের করে সেগুলো নথিভুক্ত (দায়মুক্তি) হওয়ার হার খুব কম। কারণ, দুর্নীতির মামলা কাগজপত্রের ভিত্তিতে হয়। অনেক অনুসন্ধানের পর মামলা হয়। আমাদের এখানে অনেক অভিযোগ আসে। যাচাই-বাছাই হয়। তবে বাছাই কমিটিতে সমস্যা থাকতে পারে। বাছাইয়ে যেন কোনো দুর্নীতি না হয়, ফসকে না যায় সে জন্য বাছাই পর্যায়ে পরিচালকদের নিয়ে তিনটি কমিটি করা হয়েছে। তাদের ফেলে দেওয়া মামলাও দৈবচয়নের ভিত্তিতে আবার দেখা হয়। এ ছাড়া পরিচালকদের কাজের তদারকি করবেন একজন মহাপরিচালক।

প্রশ্ন : অনেক প্রতিষ্ঠিত দুর্নীতিবাজ দুদকের অনুসন্ধানে ছাড়া পেয়েছেন। এতে দুদকের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বর্তমান কমিশন কোনো ভূমিকা রাখবে কিনা?

ইকবাল মাহমুদ : মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দুদক কাজ করছে। আমরা মনে করি, মানুষকে নিয়েই দুদকের আস্থা ফেরাতে হবে। আমরা জনগণের কাছে যাচ্ছি। জনগণকে নিরুৎসাহিত করছি আমাদের কাছে আসতে। আমরা মানুষের কাছে যাওয়ার মাধ্যমেই দুদকের আস্থা ফিরিয়ে আনব। ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি করেছি। অনেকে ফোন করে বলে আপনার লোক টাকা চেয়েছে। আমি বলি, টাকা দেবেন না। মানুষকে ভয় দেখিয়ে দুর্নীতি কমাতে পারবেন না। মানুষের আশ্রয়স্থল হতে চায় দুদক। এ ছাড়া অনুসন্ধান ও তদন্তকালে কয়েকজন দুদক কর্মকর্তার নামে অভিযোগ ওঠে। আমরা ওই সব অভিযোগও তদন্ত করে খতিয়ে দেখেছি। এমন প্রক্রিয়া সব সময় চালু থাকবে।

প্রশ্ন : শুদ্ধি অভিযানের নামে দুদক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে ৮৭৩টি কারণ দর্শাও নোটিস দিয়েছেন। দুদকের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগ থেকে বেরিয়ে আসতে আপনি কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন?

ইকবাল মাহমুদ : ৮৭৩টি কারণ দর্শাও নোটিসের জবাবে সব কর্মকর্তা ও কর্মচারী দোষ স্বীকার করেছেন। আমি প্রথমবারের মতো সবাইকে সতর্ক করে কাজের সুযোগ দিয়েছি। তবে পুনরায় একই ধরনের অপরাধ ঘটলে কঠিন ও কঠোর শাস্তি পেতে হবে। দুদক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভালো কাজের জন্য পুরস্কার থাকবে।

প্রশ্ন : বিগত কমিশনের আমলে নিষ্পত্তি হওয়া ৪০ মামলার পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা কী? তদন্ত কার্যক্রম কতটুকু এগিয়েছে।

ইকবাল মাহমুদ : ৪০ মামলার পুনঃতদন্তের তথ্য সঠিক। মামলাগুলোর জন্য তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ ও বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে মামলাগুলোর তদন্ত কার্যক্রম শুরু হবে। আমরা মামলাগুলোর প্রতিটি বিষয় খতিয়ে দেখব। নেপথ্যে কারা তাদেরও বের করার প্রক্রিয়া চলছে। এসবের মধ্যে রয়েছে ডেসটিনি, বেসিক ব্যাংক, হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও মুন গ্রুপ। এসব মামলার আসামিরা বাসায় থাকতে পারছেন। অভিযুক্ত সবাইকে শিগগিরই আইনের আত্ততায় আনা হবে।  

প্রশ্ন : অভিযোগ রয়েছে, দুদক দীর্ঘ সময় নিয়ে অনুসন্ধান করে, মামলা করে। তদন্ত শেষে চার্জশিটও দেয়। কিন্তু পরে মামলাটি চূড়ান্ত বিচার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আন্তরিকতা দেখা যায় না।

ইকবাল মাহমুদ : দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত নিয়ে যেসব অভিযোগ রয়েছে, আমরা সে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি। অনুসন্ধান কর্মকর্তা অনুসন্ধানে কতটুকু সময় নিচ্ছেন সেটা মনিটরিং করা হচ্ছে। কতজনকে তলব করা হয়েছে সেটা দেখা হচ্ছে। আমি তলবের বিষয়ে তদন্ত ও অনুসন্ধান কর্মকর্তাদের স্পষ্ট করে বলেছি, অযথা ভয়ভীতির জন্য তলব করবেন না। আমরা আমাদের কর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি। মামলা গতিশীল করতে বেশ কয়েকজন আইনজীবীকে নিয়োগ দিয়েছি। আমরা তাদের সঙ্গে মিটিং করছি। আমাদের ঘাটতিগুলো বোঝার চেষ্টা করছি। মামলার গতি-প্রকৃতি মনিটরিং বাড়িয়েছি। পাশাপাশি আইনজীবীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বেশ কয়েকজন নিবেদিত, তরুণ, উদ্যমী এবং প্রতিশ্রুতিশীল আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, এর ভালো ফল পাওয়া যাবে।

প্রশ্ন : দুদকের চলমান অভিযানে ছোট চাকুরে, কেরানি, স্কুলশিক্ষক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী গ্রেফতার হয়েছেন। অথচ ক্যাডার সার্ভিসের বহু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা থাকলেও তাদের কেউ গ্রেফতার হননি। বলা হয়ে থাকে, চুনোপুঁটিরা গ্রেফতার হচ্ছেন, রাঘব-বোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন।

ইকবাল মাহমুদ : ছোট চাকুরে গ্রেফতার হয়েছে, বড় দুর্নীতিবাজরা গ্রেফতার হচ্ছে না। আসলে আমরা তো কাউকে গ্রেফতার করি না। আমরা অভিযুক্তকে আইনের হাতে সোপর্দ করি। গ্রেফতার করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। একজন লোক যদি আদালত থেকে জামিন পায়, তাকে গ্রেফতার করা যায় না। যারা বড় তারা নিশ্চয়ই এমন কিছু করে রেখেছে তাদের কাছে আমরা পৌঁছাতে পারি না। বড় দুর্নীতিবাজরা প্রায় সবাই আগেই আইনের কাছে চলে গেছেন। সে জন্য তারা আপাত দৃষ্টিতে রেহাই পেয়ে যাচ্ছেন।

প্রশ্ন : দুদক একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এর চেয়ারম্যান হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো ধরনের চাপ অনুভব করেন কিনা?

ইকবাল মাহমুদ : আমাদের কার্যক্রম পরিচালনায় বাইরের কোনো চাপ নেই। আমি মনে করি, বাইরের চাপ এখানে কাজ করছে না। তবে মানসিক চাপ আছে। আমাদের সামনে অনেক কাজ। কাজগুলো শেষ হচ্ছে না কেন, সেই চাপটা নিজের মধ্যে অনুভব করি।

প্রশ্ন : বেসিক ব্যাংক দুর্নীতির ৫৬টি মামলার তদন্ত চলছে। এসব মামলায় শেষ পর্যন্ত কী দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দেওয়া সম্ভব হবে? লোপাট হয়ে যাওয়া টাকা উদ্ধার করা যাবে?

ইকবাল মাহমুদ : বেসিক ব্যাংকের ব্যাপারে আমরা আশা করছি সবার শাস্তি হবে। আমাদের কাছে যে তথ্য-উপাত্ত আছে, আদালত সেগুলো বিবেচনায় নেবে এবং শাস্তি দেবে। এটা আমাদের প্রত্যাশা। বেসিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে আরও মামলা হবে। যারা বেসিক ব্যাংকে দুর্নীতি করে টাকা নিয়েছেন, তারা কেউ বাড়িতে নেই। তারা হয় আদালতের হেফাজতে, নয়তো কারাগারে। সরকারি ব্যাংক থেকে যারা জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে সেই লুটেরাদের আমরা রেহাই দেব না। তাদের আমরা ছাড়ব না।

প্রশ্ন : হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় শুধু ফান্ডেড অংশের বিষয়ে দায়ের হওয়া মামলার বিচার চলছে। নন-ফান্ডেড অংশের অনুসন্ধানে হাত দিয়েছিল বিগত কমিশন। এটির অগ্রগতি কী?

ইকবাল মাহমুদ : শুধু সোনালী ব্যাংক বা হলমার্ক কেলেঙ্কারি নয়, অনেক বেসরকারি ব্যাংকের মামলায় নন-ফান্ডেড ঝামেলাটি রয়েছে। এর পেছনে একটি বিষয় থাকে। সেটি হচ্ছে, বন্ধকী সম্পত্তির অতিমূল্যায়ন। ব্যাংকের নিযুক্ত সার্ভে প্রতিষ্ঠান যোগসাজশ করে ঋণগ্রহীতার সম্পত্তিটির অতিরিক্ত মূল্য দেখায়। বেসিক ব্যাংকের ক্ষেত্রেও এমন ঘটেছে। আমরা তাই বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছি ব্যাংকগুলোতে কীভাবে, কোন মাপকাঠিতে সার্ভেয়ার নিয়োগ দেওয়া হয়। এদের ওপর কোনো মনিটরিং আছে কিনা।

প্রশ্ন : বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির বিষয়টি বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে? তাদের মূল মালিকরা সম্পত্তি হাতবদল করে বিদেশে পালিয়েছে।

ইকবাল মাহমুদ : বিসমিল্লাহ গ্রুপের মামলায়ও কেউ রেহাই পাবে না। দেশের বাইরে পালালেও ইন্টারপোলের মাধ্যমে ধরে আনা হবে।

প্রশ্ন : পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারদলীয় অনেক ব্যক্তি এবং প্রভাবশালীর তথ্য বেরিয়ে আসছে। দুদক কি শেষ পর্যন্ত তাদের বিষয় নিয়ে কাজ করতে পারবে?

ইকবাল মাহমুদ : পানামা অনুসন্ধান চলছে। তাদের মধ্যে সাত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে তলব করা হয়েছে। তারা কিছুটা সময় চেয়েছেন। এ ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ চলছে। আমরা আশা করছি, এটি একটি কার্যকর অনুসন্ধান হবে। কারও দলীয় পরিচয় ও সামাজিক অবস্থান এখানে মুখ্য নয়।

প্রশ্ন: স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দুদক চেয়ারম্যানের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নজির রয়েছে। একইভাবে আপনিও কি নিজের সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করবেন? সেই সঙ্গে অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী গ্রহণ, সেগুলো অনুসন্ধান এবং জনসম্মুখে প্রকাশ করবেন কিনা? 

ইকবাল মাহমুদ : সম্পদ বিবরণীর ক্ষেত্রেও আমাদের বক্তব্য রয়েছে। দুদক আলাদা কোনো দ্বীপ নয়। দুদকের সঙ্গে সরকারের আরও কমিশন জড়িত। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। নীতিগতভাবে আমি মনে করি, সম্পদের বিবরণী দাখিল করা উচিত। এতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

আমি চাই, আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়ম-নীতির মধ্যে থেকে নিজেদের কাজটা যেন ঠিকভাবে করে। এখানে সিস্টেম যাতে কাজ করে। আমি বা কমিশনার না থাকলেও যেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যার যার কাজটা করে যায়। তাহলে অনিয়ম-দুর্নীতি হওয়ার সুযোগ কমে যাবে।

 

একনজরে

টেবিলের ফুলদানিতে তাজা চারটি ফুল। দুটি রজনীগন্ধা, দুটি গোলাপ একসঙ্গে জড়িয়ে আছে পরস্পর। রজনীগন্ধা ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে রুমটায়। গোলাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে লাল আভা। পরিপাটি টেবিলে ফাইলের কোনো স্তূপই নেই। সব ফাইলের দ্রুত নিষ্পত্তি চান দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। মাত্র তিন মাস আগে এ পদে যোগ দিয়েছেন এই শীর্ষ কর্মকর্তা। দুদক নামের প্রতিষ্ঠানটিকে ভিতর থেকে বদলে দেওয়ার কাজটি শুরু করেছেন তিনি। অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব ইকবাল মাহমুদ গত ১৪ মার্চ নতুন দায়িত্বে যোগ দিয়েই বিভিন্ন কঠোর পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে আলোচনায় এসেছেন। যার মধ্য দিয়ে দুদক সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় ফিরে আসতে শুরু করেছে। বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ১৯৮১ ব্যাচের এ কর্মকর্তার সততা, দৃঢ়তা এবং নিষ্ঠার খ্যাতি ছিল চাকরিজীবনজুড়ে। তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র সচিবসহ দেশে-বিদেশে ২৪টি দফতরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) বিকল্প নির্বাহী পরিচালক, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালকসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে পিএইচডি করছেন। তার স্ত্রী খাদিজা বেগম একজন চিকিৎসক, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। তাদের এক কন্যা ও পুত্র সন্তান রয়েছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow