Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ২৮ জুন, ২০১৬ ২২:৩৬
ধরাছোঁয়ার বাইরের অপরাধীরা
তানভীর আহমেদ
ধরাছোঁয়ার বাইরের অপরাধীরা

এরা চিহ্নিত অপরাধী। বিশ্বজুড়ে তাদের হন্যে হয়ে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তাদের হদিস পেতে বিভিন্ন দেশ ঘোষণা করেছে পুরস্কার। এদের ঠিকানা নেই। কখন কোন দেশে এরা কোন পরিচয়ে ঘুরে বেড়ায় সেই রহস্য যেন ভাঙার নয়! অপরাধী হয়েও সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছে জীবনটা। ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা তেমনই কয়েকজন অপরাধীকে নিয়ে আজকের রকমারি—

 

বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজার লুটেরা সায়মন

২০০৯ সালের অক্টোবরে বিশ্বের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় নাম লিখিয়েছিলেন। আর ২০১৫ সালে এসে নিজের নাম কাটিয়ে নিয়েছেন তিনি। এতটাই ধুরন্ধর সায়মন মগলেভিচ। দুর্নীতি, প্রতারণা, মানি লন্ডারিং, বিভিন্ন ব্যাংক ঋণ খেলাপিসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। একজন মাল্টি মিলিয়নিয়ার অপরাধী হিসেবে তার কুখ্যাতি রয়েছে। বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজার থেকে দুর্নীতি করে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে এফবিআই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। ১৯৯৮ সালে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার স্টক মার্কেট থেকে উঠিয়ে নিয়ে হাজারো শেয়ার হোল্ডারকে পথে বসানোর নায়ক তিনি। তাকে গ্রেফতার করতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হয়েছে বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ধরা পড়লেও ছাড়া পেয়েছেন। এত অভিযোগ তবু যেন অপরাধী নন! থেকেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

 

 

 খোঁজ নেই অস্ত্র লুটের নায়ক ভিক্টর ম্যানুয়েলের

কোনো ঠিকানা নেই ভিক্টর ম্যানুয়েলের। তার হদিস তাই পাওয়া যায় না কখনই। নিজেকে গড়ে তুলেছেন মিথের নায়ক। নইলে কি আর প্রায় ৩০ বছর ধরে অদৃশ্য হয়ে থাকেন। অস্ত্র লুটের মতো মারাত্মক অভিযোগে ভিক্টরকে গ্রেফতারের চেষ্টা করছে এফবিআই। বিভিন্ন সময় অস্ত্র চুরি করে প্রায় ৭ লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতিসাধন করেছেন বিভিন্ন অস্ত্র কারখানা থেকে। ১৯৮৩ সালে তার উত্থান হয়। তারপর থেকে অস্ত্র কারখানায় হামলা করে নয় তো চুরি করে নিজের অস্ত্র ভাণ্ডার ঘরে তুলেছেন এই ভয়ঙ্কর অপরাধী। ধারণা করা হয়, চেহারা ও গলার স্বর পাল্টিয়ে ধোঁকা দিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। তাকে ধরার চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই বিশ্বের প্রধান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর। কিন্তু তিনি সেই প্রথম সারির সন্ত্রাসীদের একজন যাকে হাতের নাগালে পেয়েও ধরতে পারেনি কেউ।

 

 

 

৪০ বছর ধরে নাগালের বাইরে উইলিয়াম ব্রাডফোর্ড

১৯৭৬ সালের ঘটনা। ম্যারিল্যান্ডের শান্তি নিকেতন। সেখানেই স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে থাকতেন উইলিয়াম ব্রাডফোর্ড। সবাই তাকে ভদ্রলোক জানলেও একদিন চমকাতে হলো। কারণ খুন হয়েছেন তার স্ত্রী ও তিন সন্তান। সন্দেহভাজন থেকে খুনি প্রমাণিত হলেন ব্রাডফোর্ড। তদন্তকারী দল খোঁজ নিয়ে জানতে পারল তিনি কলম্বিয়ার দিকে পালিয়ে গেছেন। উত্তর ক্যারোলিনার দিকেও তাকে দেখা গেছে। কেন সেদিকে গেলেন? পালাতে? না, মোটেই তা নয়। তিনি  গেছেন মৃতদেহগুলো গ্রেট স্মোকি পর্বত থেকে ফেলে দিতে। স্মোকি পর্বত ন্যাশনাল পার্ক হয়ে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। স্ত্রী ও তিন সন্তান হত্যার কারণে তিনি সারা দেশে ঘৃণ্য অপরাধীতে পরিণত হন। তাকে গ্রেফতার করে কঠিন সাজা দিতে ঘরে ঘরে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। কিন্তু ৪০ বছর হতে চলল তাকে খুঁজে পায়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

 

 

 

অস্ত্র ও টাকা নিয়ে হাওয়া  জেসন ব্রাউন

সবচেয়ে বেশি পুরস্কার ঘোষিত অপরাধীদের অন্যতম জেসন ব্রাউন। তাকে গ্রেফতারে তথ্য প্রদানের জন্য দুই লাখ মার্কিন ডলারের পুরস্কার ঘোষিত আছে। তিনি কোথায় আছেন সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত নয় এফবিআই। হয়তো দেশের ভিতর হাতের নাগালেই ঘুরে বেড়াচ্ছে এই ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী। এফবিআই বিশেষভাবে যে কয়জন তালিকাবদ্ধ সন্ত্রাসীকে যে কোনো মূল্যে গ্রেফতারে তত্পর তাদের একজন তিনি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে অস্ত্র ও টাকা লুটের। ফোনিক্স, অ্যারিজোনায় তার অপরাধকর্মের পর পুলিশ তার পিছু নিলেও তাকে ধরতে পারেনি। তাকে গ্রেফতারের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অপারেশন পরিচালনা করেও ব্যর্থ হয়েছে এফবিআই। তিনি যেন থেকেও নেই। প্রায়ই বিভিন্ন দেশে তাকে দামি গাড়ি নিয়ে সেভেন স্টার রেস্টুরেন্টে পার্টিতে উপস্থিত থাকতে দেখা গেলেও তাকে গ্রেফতার করা যায়নি।

 

 

অ্যাডআর্ডো রাভেলো

অ্যাডআর্ডোকে ধরার জন্য বা তাকে ধরতে সাহায্য করার জন্য এফবিআই এক লাখ মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে।

২০০৮ সালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ আনা হয়। তিনি একজন ভয়াবহ মাদক ব্যবসায়ী। রীতিমতো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান খুলে মানুষের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতারণার কুখ্যাতি  রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার হাতের ছাপও নেই এফবিআইর কাছে। প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে  চেহারা পাল্টিয়েছেন তিনি।

 

 

গডফাদার...

মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিম

পুলিশের প্রধান কনস্টেবল ইব্রাহিম কাসকারের পুত্র দাউদ ইব্রাহিম। জীবনের শুরুতে মুম্বাইয়ের করিম লালা গ্যাং এ কাজ করতেন এবং পরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই চলে যান। সেখান থেকেই তার অপরাধের সাম্রাজ্য বিস্তৃত করতে থাকেন। তার সম্পদের পরিমাণ ৭.৫ হাজার কোটি রুপি। শিপিং, এয়ারলাইন্স ও অন্যান্য ক্ষেত্রে তার বিনিয়োগ আছে বলে ধারণা করা হয়। ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে তার ব্যবসা। দাউদ ইব্রাহিম ভারতের মুম্বাইয়ে সংগঠিত অপরাধ চক্রের প্রধান।

তার সিন্ডিকেটের নাম হলো ডি কোম্পানি। তিনি সংঘটিত অপরাধের জন্য ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় এবং মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস-এর বিশ্বের শীর্ষ পলাতক অপরাধীদের ২০১১-এর তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তার দলে প্রায় ৫ হাজার সদস্য রয়েছেন যারা বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। ১৯৯৩ সালে ১২ মার্চ মুম্বাই স্টক এক্সচেঞ্জে এক সিরিজ বোমা বিস্ফোরণে ৩১৫ জন নিহত হন। এর জন্য দাউদ ইব্রাহিমকে অভিযুক্ত করা হয়। বিভিন্ন অপরাধে দাউদ ইব্রাহিম সরাসরি জড়িত এবং তিনি পাকিস্তানে আত্মগোপন করে আছেন বলে দাবি করা হলেও পাকিস্তান সরকার ভারতের এই দাবি বার বার অস্বীকার করে আসছে। তিনি থেকেও নেই। সব সময়ই নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখেছেন।

অস্ত্র ব্যবসায়ী লিউনিড মেনিন

জন্মসূত্রে ইউক্রেনিয়ান লিউনিড মেনিন একজন প্রসিদ্ধ আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ী। ছোটবেলায় বেশ কয়েকবার পুলিশে হস্তান্তর করা হয়েছে তাকে। এ ছাড়া প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথায় কথায় ঝগড়ায় লিপ্ত হতেন তিনি।

সেই রাগী ছেলেটাই এক সময় হয়ে উঠল বিশ্বের অন্যতম কুখ্যাত অস্ত্র ব্যবসায়ী। তিনি যে অস্ত্রের ব্যবসা করতেন তা মূলত রাশিয়ান অস্ত্র কোম্পানি অ্যাভাইট্রেন্ডের অনুকরণে। অনুকরণ হলেও এই অস্ত্রের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে গোটাবিশ্বে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে এই সাম্রাজ্যের পরিধি। অস্ত্র ব্যবসার জন্য বিভিন্ন সময়ে পরিচয় বদলে অবস্থান বদল করতেন মেনিন। তিনি কখনো এক জায়গায় নির্দিষ্ট থাকতেন না। এই ধারাবাহিকতায় সত্তরের দশকে ইসরায়েলে অবস্থান নেন। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও বেশি দিন জেলের ভিতর তাকে রাখা যায়নি। ঠিকই আইনের গলিঘুপচি ঘুরে বেড়িয়ে এসেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও তাকে ধরতে ঘাম ছুটেছে সব সময়ই।

জেল পালানো গ্লেন স্টুয়ার্ট

ক্যালিফোর্নিয়ার ফলসন স্ট্যাট প্রিজন ভেঙে পালিয়ে যাওয়ার অপরাধে গ্লেন স্টুয়ার্টকে খুঁজতে শুরু করে এফবিআই। ১৯৮৭ সালের এই ঘটনার পর গ্লেনকে আর অপরাধ কাজে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু এরই মধ্যে বহু খুন করে নতুন করে আলোচনায় আসেন তিনি। একাধিক ভাষা জানার কারণে, একেক সময়ে একেক পরিচয় ধারণ করে ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছেন এফবিআইকে। তাকে গ্রেফতারে সহযোগিতার জন্য ১ লাখ মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তার হদিস নেই।

জেসন ড্রেক ব্রাউন

জেসন ড্রেক ব্রাউনকে ধরার জন্য এফবিআই সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করতে রাজি হয়েছে। প্রায় দুই লাখ মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষিত হয়েছে তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। তার বিরুদ্ধে খুন ও লুটের অভিযোগ রয়েছে। অ্যারিজোনার ফোনিক্সে হত্যা এবং লুটের  প্রধান আসামি ছিলেন। অপরাধের মাধ্যমে  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে শিরোনাম হতে পছন্দ করেন এই ভয়ঙ্কর অপরাধী। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও  ফ্রান্সেও তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে।

 

যাদের কুখ্যাতি বিশ্বজুড়ে

 

অ্যালেক্স ফ্লোরেক্স

অ্যালেক্স ফ্লোরেক্সকে গ্রেফতার করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে এফবিআই। তাকে ধরতে সহায়তা করার জন্য এক লাখ মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তার বিরুদ্ধে ফিলাডেলফিয়ায় ৫ বছরের এক মেয়েকে অপহরণ ও নৃশংসভাবে হত্যার অভিযোগ ওঠে।

২০০০ সালের এ ঘটনার পর তাকে খুঁজতে থাকে এফবিআই। পরবর্তীতে আগস্টে তার বিরুদ্ধে এই হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। কিন্তু এফবিআইর চোখে ধুলা দিয়ে তিনি পালিয়ে যান। তার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে চমকে উঠে কর্তৃপক্ষ।

 

রবার্ট উইলিয়াম ফিসার

এক লাখ মার্কিন ডলার ঘোষিত হয়েছে তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও তার সম্বন্ধে খুব বেশি তথ্য জানতে পারেনি। তার দুই সন্তান ও স্ত্রীকে খুন করার পর তিনি ঘর ছেড়ে পালিয়ে যান। তিনি পেশায় একজন মত্স্যজীবী ও শিকারি। তাকে ধরতে না পারার কারণ হচ্ছে তিনি বার বার নিজের চেহারা পাল্টান। তার জাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ফ্লোরিডা থেকে নিউ মেক্সিকো পর্যন্ত। ধারণা করা হয়, তার কাছে অত্যাধুনিক রাইফেলসহ বহু মারণাস্ত্র আছে। তাকে ধরতে বহু অভিযান চালানো হলেও তিনি ধরা পড়েননি।

 

 

গ্রেসিয়া গুয়েভারা

গ্রেসিয়ার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক মনোভাবের খুব সামান্য অভিযোগ নিয়ে এগোয় এফবিআই এবং শিগগিরই তার সম্বন্ধে ভয়াবহ সব তথ্য হাতে আসতে থাকে। তিনি একজন ঠাণ্ডা মাথার খুনি, ধর্ষক। মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি ভয়ঙ্কর সব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।

ঘরের তালা ভেঙে ভিতরে ঢুকে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও হত্যার যে বিবরণ পাওয়া গেছে তাতে এফবিআই পর্যন্ত হতভাগ। তিনি যুক্তরাষ্ট্র বা মেক্সিকোতে রয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow