Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : রবিবার, ৩ জুলাই, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ৩ জুলাই, ২০১৬ ০০:২১
দেশে দেশে সন্ত্রাসী হামলা
তানভীর আহমেদ
দেশে দেশে সন্ত্রাসী হামলা

গুলশানে জিম্মি সংকট

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো জিম্মি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে ১ জুলাই রাতে। একদল বন্দুকধারী রাজধানীর কূটনৈতিক পাড়ার হলি আর্টিসান বেকারির ক্যাফেতে অস্ত্র ও বিস্ফোরকসহ ঢুকে  কয়েকজনকে জিম্মি করে। তাদের মোকাবিলা করতে গিয়ে নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। ১২ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত যৌথ বাহিনী। এতে ৬ সন্ত্রাসী নিহত হয়। একজন সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী আটক হয়। তিন বিদেশি নাগরিকসহ মোট ১৩ জনকে জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার করে সেনা কমান্ডো দল। জিম্মি ঘটনায় ২০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

বাংলাদেশে এর আগে বড় ধরনের সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা ঘটে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট। দেশের ৬৩ জেলায় জঙ্গিগোষ্ঠী জেএমবি গুরুত্বপূর্ণ চার শতাধিক স্থানে একযোগে পাঁচ শতাধিক বোমা হামলা করেছিল। এতে দুজন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়।

 

টুইন টাওয়ারে বিমান হামলা

টুইন টাওয়ার আক্রমণ হিসেবে পরিচিত এই সন্ত্রাসী হামলাটিকে পুরো বিশ্ব এখনো ভুলতে পারেনি, যার পেছনের মূল মদদদাতা হিসেবে পরিচিত আল-কায়েদা। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে এই সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। আল-কায়েদার প্রায় ১৯ জন সদস্য সেদিন টুইন টাওয়ারকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে চারটি বিমান ছিনতাই করে এবং সোজাসুজি গিয়ে টুইন টাওয়ারের এক পাশ ফুঁড়ে অন্যপাশে চলে যায়। এ ঘটনায় বিমানের ১৯ জন আক্রমণকারী ছাড়াও মারা যায় দালানটির প্রায় ৩ হাজার মানুষ। এজন্য আল-কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে অভিযুক্ত করা হয়।

ঘটনাটির পুরোপুরি বিশ্লেষণ করতে গেলে কেবল বিন লাদেনই নন, সন্ত্রাসবাদের নতুন শক্তিশালী রূপটিও ফুটে ওঠে।

 

ইস্তাম্বুলের বিমানবন্দরে হামলা

গুলি আর বোমা বিস্ফোরণে মুহূর্তেই কেঁপে উঠে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় ইস্তাম্বুলের আতাতুর্ক বিমানবন্দর। ২৮ জুন, ২০১৬ তারিখটি এই বিভীষিকার সাক্ষী হয়ে থাকল। ইস্তাম্বুলের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় নিহত হয় ৪৭ জন এবং আহত হয় ২৩৯ জন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, টার্মিনালের দুটি জায়গায় আলাদা হামলা চালায় জঙ্গিরা। প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে আন্তর্জাতিক টার্মিনালের এক তলায়, দ্বিতীয়টি দোতলায় এবং তৃতীয়টি গাড়ি পার্কিংয়ে। পুলিশ পাল্টা আক্রমণ করার কিছু সময়ের মধ্যেই প্রথম আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। এতে পুরো বিমানবন্দরে নেমে আসে মৃত্যু-আতঙ্ক। জঙ্গি হামলার পর পরই বন্ধ করে দেওয়া হয় বিমানবন্দরের কার্যক্রম।

 

মুম্বাইয়ে চার দিনব্যাপী সন্ত্রাসী তাণ্ডব

ভারতের মুম্বাই বার বার সন্ত্রাসী হামলায় কেঁপে উঠেছে। ১৯৯৩ সালের বোমা হামলায় মারা গিয়েছিল ৩৫০ জন, ২০০৬ সালে ২০৯ জন। তবে পুরো বিশ্বকেই কাঁপিয়ে দেয় ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বরের সন্ত্রাসী হামলাটি। পাকিস্তান থেকে জলপথে প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসীরা সেদিন মুম্বাইজুড়ে চালায় তাণ্ডব। সেদিন মুম্বাইয়ে ১০টিরও বেশি ধারাবাহিক গুলি ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ২৬ থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত এ হামলা চলে। এতে ১৭১ জন নিহত ও কমপক্ষে ২৩৯ জন আহত হয়। সারা বিশ্বে এ ঘটনা তীব্রভাবে নিন্দিত হয়। আটটি হামলার ঘটনা ঘটে দক্ষিণ মুম্বাইয়ে। এ ছাড়া মুম্বাইয়ের বন্দর এলাকার মাজাগাঁও ও ভিলে পার্লের একটি ট্যাক্সির মধ্যেও বিস্ফোরণ ঘটে।

 

প্যারিসে আত্মঘাতী হামলা

১৩ নভেম্বর, ২০১৫-এর সন্ধ্যায় ফ্রান্সের প্যারিস ও  সেন্ট-ডেনিসে ধারাবাহিক  ও সমন্বিত সন্ত্রাসী আক্রমণ হয়। ফ্রান্সের বাইরে তিনটি আলাদা আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং প্যারিসের কাছাকাছি চারটি ভিন্ন স্থানে গণহত্যা ও আত্মঘাতী বোমা হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এ হামলায় অন্তত ১২৮ জন নিহত হয়, যার ৮৯ জন নিহত হয় বাতাক্লান থিয়েটারে। আহত ৪১৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এতে সাত আক্রমণকারীও মারা যায়। এই সন্ত্রাসী হামলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সে ঘটা ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল। প্রথমটি ঘটল একটি কনসার্টে। শহরের কেন্দ্রস্থলে বাটাক্লঁ কনসার্ট হলে। কনসার্ট দেখতে ওই হলে জড়ো হয়েছিল কয়েক হাজার মানুষ।

 

যুক্তরাষ্ট্রের অরল্যান্ডোয় বন্দুকধারীর হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের অরল্যান্ডো শহরের ‘পালস ক্লাব’। ২০১৬ সালের সবচেয়ে আলোচিত ও ঘৃণিত সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে এখানে। এ বছর ১২ জুন অরল্যান্ডো শহরে সমকামীদের একটি নাইট ক্লাবে ব্যাপক গোলাগুলি ঘটে। এ হামলায় কমপক্ষে ৫০ হন নিহত ও ৫৩ জন আহত হয়। হামলার সময় ওই ক্লাবটিতে ১০০ জনেরও বেশি মানুষ অবস্থান করছিল। হামলার পরে ক্লাবটি থেকে বেশকিছু মানুষ দৌড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও অনেকেই ভিতরে আটকা পড়ে যায়। স্থানীয় সময় দিবাগত রাতে এ হামলা হয়। হামলার তিন ঘণ্টা পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলাকারীকে হত্যা করে। ওই হামলাকারীর নাম ওমর মতিন। পুলিশ এ ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা বলে উল্লেখ করে।

 

লন্ডনে ভয়ঙ্কর সিরিজ বোমা হামলা

২০০৫ সালের ৭ জুলাই। মধ্য লন্ডনের তিনটি আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন ও একটি বাসে আত্মঘাতী সিরিজ বোমা হামলায় নিহত হয় ৫২ জন। আহত হয় সাত শতাধিক মানুষ। ব্রিটেনের মাটিতে এটাই ছিল স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। ৭ জুলাই স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে লন্ডনের রাসেল স্কয়ারের আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন স্টেশনে প্রথম হামলা চালানো হয়। এতে নিহত হয় ২৬ জন। প্রায় কাছাকাছি সময়ে এজওয়ার ও অ্যাল্ডগেটে পৃথক দুটি হামলায় যথাক্রমে ছয় ও সাত জন নিহত হয়। এর প্রায় এক ঘণ্টা পর তাভিস্টক স্কয়ারে একটি দ্বিতল বাসে বোমা হামলা চালানো হয়। এতে নিহত হয় ১৩ জন। লন্ডনে বোমা হামলাকারী চার জঙ্গির সঙ্গে চরমপন্থি সংগঠন আল-কায়েদার সংযোগ ছিল।

 

পাকিস্তানের স্কুলে নৃশংস গুলিবর্ষণ

২০১৪ সালের শেষ দিকে পাকিস্তানের পেশোয়ারে সেনাবাহিনী পরিচালিত একটি স্কুলে বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালায় তালেবান জঙ্গিরা। এতে নিহত হয়েছে ১৩০-এর বেশি শিক্ষার্থী। তাদের বয়স ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে বলে কর্তৃপক্ষ জানায়। জঙ্গি হামলায় একই বয়সী আরও অন্তত ১২০ জনের বেশি স্কুলশিক্ষার্থী আহত হয়।   শুধু পাকিস্তান নয়, বিশ্বব্যাপী চলা সন্ত্রাসবাদের মধ্যে এটি ছিল ভয়ঙ্করতম। সেদিন দুপুরের আগে ৮ থেকে ১০ জন জঙ্গি সামরিক পোশাকে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ারের আর্মি পাবলিক স্কুলে ঢুকে পড়ে। খবর পেয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা স্কুলের দিকে অগ্রসর হলে শুরু হয় তুমুল গোলাগুলি। প্রায় ৮ ঘণ্টার অভিযানের পর স্কুলটির নিয়ন্ত্রণ নেন সেনা সদস্যরা।

 

অ্যানথ্রাক্স হামলায় বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক

টুইন টাওয়ার হামলার মাত্র এক সপ্তাহ পর, ২০০১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। সন্ত্রাসীরা এবার ভিন্ন ধরনের আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্রে— অ্যানথ্রাক্স হামলা। এতে পাঁচজন নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ১৫ জন অসুস্থ হয়ে পড়ে। হতাহতের সংখ্যা কম হলেও নতুন এই সন্ত্রাসী হামলা বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এফবিআই অফিসারদের মতে, ইতিহাসের অন্য সব আক্রমণের চেয়ে এটি ছিল সবচেয়ে কঠিন। কারণ এ আক্রমণটির কোনো অবয়ব ছিল না। এ আক্রমণে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়নি। বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়নি। একটি চিঠিতে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু ভরে পাঠিয়ে দেওয়া হয় প্রাপকের কাছে। পরোক্ষ এ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন ক্ষমতাধর মানুষের কার্যালয়।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow