Bangladesh Pratidin

ঢাকা, রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা আপলোড : ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:৩০
সারা হেনশোর জলে ভাসা লাইব্রেরি
তানভীর আহমেদ
সারা হেনশোর জলে ভাসা লাইব্রেরি

বিভিন্ন ধরনের নৌকার কথা আমরা শুনেছি। কাগজ দিয়ে নৌকা তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন অনেকে। কিন্তু একেবারেই ব্যতিক্রমী এক নৌকার খবর বিশ্ববাসীকে দিয়েছে অনন্য রোমাঞ্চে। এটা যেই সেই নৌকা নয়। বইভর্তি এক নৌকা। ‘দ্য বুক বার্জ’-খ্যাতি পাওয়া এই বইয়ের তরী ব্রিটেনের এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটে বেড়ায়। আর তাতেই প্রশংসার ফুলঝুরি ছুটেছে। এই অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়েছেন সারা হেনশো নামের এক তরুণী। ক্যারিয়ার গড়তে চেয়েছিলেন বিনোদন সাংবাদিকতায়। লন্ডনের প্রথম সারির খবরের কাগজে বিভিন্ন মুভি সেলিব্রেটিদের দুর্দান্ত সব খবর বের হতো তারই নামে। কিন্তু বিনোদন সাংবাদিকতার পাশাপাশি বই পড়ার অদম্য বাসনাও সুপ্ত ছিল তার মনে। তাই বলেই কিনা কে জানে হঠাৎ একদিন লন্ডনের কাগজে বিনোদন সাংবাদিকতা একেবারে ছেড়েই দিলেন। এবার তো কিছু একটা করা চাই। ঠিক করলেন বইয়ের দোকান দেবেন। লন্ডনের মতো জায়গায় ব্যবসায়ী হিসেবে টিকে থাকতে হলে যে পরিমাণ বিনিয়োগ চাই কিন্তু তা তো তার হাতে নেই। এদিকে বইয়ের ব্যবসার অবস্থাও সুবিধার নয়। ব্রিটেনের ছোটখাটো বইয়ের দোকানগুলো যখন একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তখন ব্যতিক্রম কিছু না করলে এখানে টিকে থাকাই দায়। সারা হেনশো এ পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা খুঁজতে শুরু করলেন। তিনি এমন একটি বইয়ের দোকান সাজাতে চাইলেন যা ক্রেতাদের চমকে দেবে। মানুষ যেন সহজেই তার বইয়ের দোকানে আসতে আগ্রহী হয় সে দিকটার কথাই ভাবতে লাগলেন। এমন সময়ই তার মাথায় চড়ে বসল নৌকায় বইয়ের দোকান দেওয়ার। নদীপথে এক শহর থেকে আরেক শহরে বইয়ের তরী নিয়ে তিনি ছুটে যাবেন বইপ্রেমিকদের কাছে। কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চাইলে বিনিয়োগ করা চাই। এখন এত টাকা তিনি পাবেন কোথায়। একটাই ভরসা— ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া। পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলার পর তিনি এক ব্যাংক থেকে আরেক ব্যাংকে ছুটতে শুরু করলেন। নৌকায় করে বই বিক্রি করা মানে বইয়ের তরী? সারা হেনশোর এমন অদ্ভুত পরিকল্পনা শুনে ব্যাংক কর্মকর্তারা হেসে উড়িয়ে দিলেন। শেষে সারার বাবা-মায়ের দেওয়া ধারের টাকায় সরু কিন্তু দীর্ঘ একটি নৌকা কিনলেন। ব্রিটেনে এ ধরনের নৌযানকে বলা হয় ‘ক্যানাল বার্জ’। সেই নৌকায় বই সাজিয়ে তিনি ভেসে বেড়াতে শুরু করলেন একের পর এক শহরে। শুরুটা করলেন বার্টন শহরের কাছাকাছি একটি বন্দরে নৌকা ভিড়িয়ে। কিন্তু ক্যানাল বার্জগুলোতে একটা সমস্যা ছিল। এগুলো এত বেশি সরু যে ঠিকমতো বই সাজিয়ে রাখতেই কষ্ট হয়। সারা হেনশোর এই বইয়ের তরী যাত্রা শুরু করে ২০০৯ সালে। ব্যবসায়িকভাবে যাত্রা শুরুর পর তিনি এই ভাসমান বইয়ের তরীর নাম রাখলেন ‘দ্য বুক বার্জ’। শুরুর দিকে অনেকেই আগ্রহ নিয়ে এলো। বেশ ভালো পরিমাণে বই বিক্রি হতে শুরু হলো। বই বিক্রি মানে তার ব্যবসাও ভালো চলল। তবে দুই বছরের মাথায় ব্যবসায়িক টানাপড়েনের মুখোমুখি হলেন তিনি। ব্যবসায়িক মন্দায় একপর্যায়ে ভাবতে শুরু করলেন হয়তো আর টিকতে পারবেন না। বইয়ের তরী বুঝি বন্ধ করেই দিতে হবে। কিন্তু ব্যবসায়িক জীবনে এমন কঠিন সময় যে আসতেই পারে সেটা অজানা নয় এই সুন্দরী তরুণীর। স্থানীয় এক পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন কঠিন ব্যবসায়িক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে বলেছিলেন, ‘আমি জানতাম, বহু বইয়ের দোকানের ভাগ্যে ঠিক এ পরিণতিই ঘটেছে। এত প্রতিযোগী আর বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পেরে ওঠা সত্যিই কঠিন। বিশ্বমন্দার মাঝামাঝি সময় এটা। আমি বুঝতে পারছিলাম, হয় আমাকে বইয়ের তরীটা বন্ধ করে দিতে হবে, না হলে টিকে থাকার জন্য কিছু একটা করতে হবে?’ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সারা হেনশো হাল ছাড়লেন না। তার বইয়ের তরীর নোঙর তুলে নিলেন। ছয় মাস ধরে ভেসে বেড়ালেন ইংল্যান্ড আর ওয়েলসের খালগুলোতে। নৌকা নিয়ে ছুটে বেড়ালেন বিভিন্ন শহরের পাঠকের কাছে। এতে প্রচার হলো, বিক্রিও বাড়ল। খরচ কমানোর জন্য ততদিনে সারা নিজের ফ্ল্যাটটি ছেড়ে দিয়েছেন। কোনোরকমে বিছানা আর রান্নার ব্যবস্থা করে নৌকার মধ্যেই শুরু করেছেন বসবাস। এখনো তার পুরো সময় বইয়ের নৌকাতেই কাটে। বিক্রি বাড়াতে আরও কিছু নতুন আইডিয়া তিনি চালু করেছেন। টাকা না থাকলেও সমস্যা নেই, এক বেলার খাবার, পুরনো বই বা এক দফা চুল কেটে দিয়েও সারার দোকান থেকে বই কেনা যায়। এমন সব বিচিত্র আইডিয়া তার ব্যবসায় নতুন মোড় এনে দিল। এসব অদ্ভুত আইডিয়ার কারণে পাঠক-ক্রেতাদের কাছে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন। পাশাপাশি তার বই বিক্রিও বাড়তে থাকল। গত কয়েক বছর গ্রীষ্মের সময়টা বার্জ নিয়ে সারা দেশ চষে বেড়াচ্ছেন সারা? ম্যানচেস্টার, লন্ডন, লিভারপুল, বার্মিংহাম— সব বড় শহরেই দর্শন দিয়েছে তার নৌকা? তিনি এখন চেষ্টা করছেন সেই শহরগুলোতে যেতে, যেখানে বইয়ের দোকান কাম-স্বপ্নের ভাসমান লাইব্রেরি নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন পুরো যুক্তরাজ্য। ব্রিটেনের জলপথে পাঁচ বছর ভেসে বেড়ানোর পর এখন বইয়ের বার্জ নিয়ে অন্য দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন সারা। সব ঠিক থাকলে এরপর ‘দ্য বুক বার্জ’ ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ফ্রান্সে যাবে। সারা আর তার বইয়ের তরী নিয়ে আরও জানা যাবে তার লেখা বই ‘দ্য বুকশপ দ্যাট ফ্লোটেড অ্যাওয়ে’ থেকে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow