Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:২৯
অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭
আমাদের বইমেলা
তানভীর আহমেদ
আমাদের বইমেলা

জাতীয় সংস্কৃতি উৎসব হিসেবে একুশের বইমেলা স্বীকৃত। প্রকাশনা শিল্পকে এগিয়ে নিতে এ ধরনের সর্বজনীন উৎসব বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে। আমাদের বইমেলা তাই বইপ্রেমী মানুষের কাছে প্রাণের মেলা। এই সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতি যেভাবে মিলেমিশে আছে তার আবেদন অতুলনীয়। বরাবরই বলা হচ্ছে, আমাদের প্রকাশনা শিল্প নানামুখী সংকটের মুখোমুখি। এ সংকট কতটা গভীর তা যেমন নিরূপণ করতে হবে, তেমনি খুঁজতে হবে এ থেকে উত্তরণের পথ। বই পড়াকে অভ্যাসে পরিণত করতে ভালো মানের বই পৌঁছে দিতে হবে পাঠকের হাতে। মাত্র কয়েক যুগ আগেও স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরেও বই পড়ার যে আগ্রহ ছিল, তা অনেকটাই কমে এসেছে। তথ্যপ্রবাহের এ যুগে পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। নিত্যনতুন যত প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় আসুক না কেন, বইয়ে আবেদন একেবারেই ভিন্ন। যে কারণে বিশ্বজুড়ে বিক্রীত বইয়ের সংখ্যা বাড়ছে। লেখকরাও তাদের লেখায় সমসাময়িক বিষয়বস্তুর সন্নিবেশ ঘটাচ্ছেন। তাই পাঠক কমছে এমনটি ভাবার অবকাশ নেই। এখনো দেশে-বিদেশে পাঠকরা মুখিয়ে থাকেন লেখকের নতুন বইয়ের জন্য। এটি আশাব্যঞ্জক বিষয়। সে আশার স্রোতের দিকে তাকালে অমর একুশে গ্রন্থমেলা চমৎকার এক মিলনমেলা। যেখানে পাঠক-লেখকরা জমায়েত হন। আমাদের প্রকাশনা শিল্পও জমে ওঠে এ মেলাকে কেন্দ্র করে। একটি ভালো বই পাঠক তৈরি করে, পাঠকের সুশিক্ষার জন্য দরকার ভালো বই। আর বইয়ের পাঠক প্রকাশনা শিল্পের অক্সিজেন। পাঠক সুশিক্ষিত হলেই বইয়ের বাজার বড় হবে। তা ছাড়া শিক্ষাবিদেরা বরাবরই বলছেন, ভালো বই-ই পারে একজন মানুষের সৃজনশীলতা ও মননশীলতার বিকাশ ঘটাতে। এ দুইয়ে দুইয়ে চার বলেই মননশীলতার বিকাশে প্রকাশনার গুরুত্বকে আলাদাভাবে আলোচনায় রাখতে হয়। জাতি হিসেবে আমরা দিন দিন উন্নতি করছি। এ উন্নতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানবিক ও সাংস্কৃতিকও। যে উন্নত দেশ ও জাতির স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা পথ চলেছি সেখানে একটি উন্নত প্রকাশনা শিল্পের প্রয়োজন। বাংলাদেশে প্রকাশনা শিল্প সমৃদ্ধ শিল্পে পরিণত হওয়ার পথ ধরেই এগোচ্ছে। ভালো লেখক, প্রকাশক ও ভালো পাঠকের যোগসূত্র স্থাপন করতে পারলেই সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের স্বপ্ন বাস্তব হবে। যাদের আমরা রোল মডেল হিসেবে দেখি তাদের দিকে তাকালে এটি সহজেই বোধগম্য, এ যুগে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে প্রজন্মকে অগ্রসর হতে হবে। বিশ্বজুড়েই রোল উঠেছে, বিশ্বায়নের যুগে কমে যাচ্ছে মননশীলতার চর্চা। বই পড়ার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এটি একটি চ্যালেঞ্জ। মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন ঘটেছে। তাই বলে আমরা পিছিয়ে পড়ছি এমনটি ভেবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বইমেলার মতো সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসব আদর্শ। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি এলেই পাঠক-লেখক-প্রকাশকদের মাঝে নতুন উদ্যম দেখা যায়। একুশে বইমেলা নতুন করে পাঠকের মনে প্রাণের সঞ্চার করে। সারা বছর অপেক্ষায় থাকা লেখক, প্রকাশক থেকে শুরু করে বইপ্রেমী পাঠকরাও উজ্জীবিত হন এ মেলা ঘিরে। সত্যি বলতে কি, বইমেলা এখন জাতীয় উৎসব। এ যেন বইকে ঘিরে আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মিলনমেলা। বিগত বছরগুলোয় আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত হয়েছি, বিশ্বপ্রশংসা মিলেছে। বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে সাংস্কৃতিক উৎকর্ষে প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠার উপযুক্ত সুযোগ তৈরি করে একুশে বইমেলা। বইমেলা শুরুর আগে থেকেই প্রকাশক-লেখকদের ব্যস্ততা বাড়ে। দেশের বেশির ভাগ প্রকাশক-লেখক সারা বছর প্রতীক্ষায় থাকেন বাংলা একাডেমির বইমেলার। প্রকাশকরাও নতুন উদ্যমে বিনিয়োগ করার জন্যও এ সময়টাকেই বেছে নেন। বইপ্রেমীদের হাতে নতুন বই তুলে দিতে তারা বইমেলা শুরুর আগ থেকেই প্রকাশনার কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত সময় কাটান। এর ইতিবাচক ফল পাওয়া যায় বইমেলায়। বইমেলার শুরুর দিন থেকে শেষ পর্যন্ত নানান স্বাদের নতুন নতুন বই আসতে থাকে। এ কারণেই বইমেলা সব শ্রেণির মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। বছর জুড়ে এত বড় আকারে প্রকাশনার প্রচলন না থাকায় পাঠকও মনস্তাত্ত্বিকভাবে বইমেলাকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছেন। প্রকাশনা শিল্পকে আরও দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোয় দাঁড় করাতে বইমেলাকে প্রভাবক হিসেবে কাজে লাগানো জরুরি। প্রকাশনা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভাগ ও জেলাভিত্তিক বইমেলার আয়োজন আরও কীভাবে জনপ্রিয় করা যায়, তা সংশ্লিষ্টদের গভীরভাবে ভাবা দরকার। আর ভুলে গেলে চলবে না, পাঠককে বইমুখী করার বিভিন্ন প্রয়াসও জরুরি। বই কেনা ও পড়া এ দুটি বিষয় প্রকাশনা শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। এ বিষয়গুলো আরও ভালো করে পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। নতুন বই কেনা ও পড়ার আগ্রহ বাড়াতে স্কুল পর্যায়ের সিলবাস থেকেই ইতিমধ্যে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সম্ভাবনাময় আগামী প্রজন্মকে জাগ্রত করতে এই পঠনবিমুখতার অভ্যাস বদলানোর দায়িত্ব এককভাবে কারও নয়। বই পাঠে নিজের সন্তানকে উৎসাহ প্রদান করতে হবে পরিবারের অভিভাবককে। শিক্ষাঙ্গনে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সুখপাঠ্য সাহিত্যের সমাবেশ করতে হবে। বড় কথা, বই পড়ার আনন্দ ছড়িয়ে দিতে হবে প্রতিটি প্রাণে। একুশে বইমেলার প্রতিটি নতুন বই সে আনন্দের মোড়কে হাজির আমাদের কাছে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow