Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : শনিবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৩৫
ধারাবাহিক উপন্যাস
অটোমান সূর্য সুলতান সুলেমান - পর্ব ২৭
রণক ইকরাম
অটোমান সূর্য সুলতান সুলেমান - পর্ব ২৭

মুসলিম শাসকদের মধ্যে যেমন শীর্ষে, তেমনি পৃথিবীর ইতিহাসেও অন্যতম সেরা শাসক তিনি। সুলতান সুলেমান খান।

অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্যের সুলতান। সুলতান সুলেমানকে নিয়ে অনেক  গল্প লেখা হয়েছে। নির্মিত হয়েছে আলোচিত-সমালোচিত টিভি সিরিয়াল মুহতাশিম ইউজিয়েল। আমাদের এ উপন্যাসের ভিত্তি সেই টিভি সিরিজ বা উপন্যাস নয়। মূলত ইতিহাসের নানা বইপত্র ঘেঁটে সুলতান সুলেমানের আমলটি তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতিহাসাশ্রয়ী এ উপন্যাসের মূল ভিত্তি অটোমানদের ইতিহাস। বাকিটুকু লেখকের কল্পনা। রকমারির নিয়মিত বিশেষ আয়োজনের কারণে মাঝখানে কয়েকটি পর্ব প্রকাশ পায়নি। এখন আবার নিয়মিত প্রকাশ হবে। প্রতি শনিবারের এ বিশেষ আয়োজনে আজ ছাপা হলো ২৭তম পর্ব।

 

fb.com/TheSultanSuleman

 

 

[পূর্ব প্রকাশের পর]

সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর থেকে হুররেমের চারপাশ অনেকটাই বদলে গেছে। সুলতানের আগমনের আগ থেকেই আয়েশা হাফসা সুলতানাকে আলাদা ঘর দিয়েছেন। এটাই এখানকার নিয়ম। হারেমের কোনো নারী যদি সন্তানসম্ভবা হয়, তাহলে তার যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা বেড় যায়। হুররেমের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। অন্যদিকে বিজয়ী সুলতান আসার পর তো সবার ব্যস্ততা বেড়ে গেছে আরও কয়েক গুণ। সেবাও বেড়ে গেছে। এই হারেমে আসার পর থেকেই গোসলটা খুব উপভোগ করেন হুররেম। বিশেষ করে সকালের গোসলটা। এ ক্ষেত্রে তুর্কিদের একটা বাজে অভ্যাস আছে। ওরা চায় ওদের মেয়ে মানুষরা দিনে অন্তত দুবার গোসল করুক। প্রথম দিকে এ ব্যাপারটায় ঘোর আপত্তি ছিল হুররেমের। কিন্তু এখন তা বেশ ভালো লাগে তার।

হারেমের এদিকটায় দুটি হাম্মামখানা। একটি সাধারণ মেয়েদের জন্য। এতদিন সেখানেই গোসল করতেন হুররেম। এখন অবশ্য বড় কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ হাম্মামখানা ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছেন। প্রতিটি হাম্মামখানায় আবার তিনটি করে আলাদা ঘর। ক্যামেকান বা পোশাক পরার ঘর, সোগুকলুক অথবা উষ্ণঘর এবং একদম কেন্দ্রে হারারেট বা বাষ্পঘর।

হাম্মামখানায় প্রবেশের পরই গুনগুন গান গাইতে লাগলেন হুররেম। এরপর এক ঝটকায় খুলে ফেললেন গায়ে জড়ানো পোশাক। হুররেমের সহকারী হিসেবে বরাদ্দ পাওয়া একজন কৃষ্ণাঙ্গ দাসী তার দিকে একটি তোয়ালে বাড়িয়ে দিল। ধবধবে সাদা তোয়ালের আষ্টেপৃষ্ঠে সুগন্ধি জড়ানো। সেটি হাতে নিয়ে খড়ম পায়ে দিয়ে উষ্ণ ঘরে ঢুকলেন হুররেম। এ ঘরের বিশেষত্ব হচ্ছে এখানে সহজে মেলে উষ্ণ পানির প্রস্রবণ। ফলে ঠাণ্ডার মধ্যে গোসল করায় বেশ আরাম। উষ্ণ ঘরের ঠিক মাঝখানে একটি মারবেলের ঝরনা। ঝরনার নিচে একটি বয়লার। ফলে এর পানি বেশ উষ্ণ। ঝরনার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে দু-তিন জন মেয়ে। এরা প্রত্যেকে সুলতান ও সুলতানার সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। তাই এদের মর্যাদাও বেশি। মেয়েরা বিশাল ঝরনাটার সামনে দাঁড়ানো। হুররেমও সেদিকে যোগ দিলেন। এখন অবশ্য গুনগুন করার চেয়ে অন্যরকম একটা বিষয় খেয়াল করলেন হুররেম। মনের মধ্যে ঘুরছে একটা কথা। সত্যিই কি বিচিত্র এই পৃথিবী। পৃথিবীর মানুষ কত আলাদা। একজনের সঙ্গে আরেকজনের কত অমিল! প্রত্যেকের চুল, চামড়া, চোখ এমনকি স্তনের বোঁটা পর্যন্ত আলাদা। এ হারেমেই হুররেম দেখেছেন বিচিত্র সব মেয়েকে। এখানে মেহগনি কাঠের রংবিশিষ্ট কৃষাঙ্গী যেমন আছে, তেমনি আছে কালো চোখের গ্রিক মেয়ে। নীল চোখের সোনালি চুলের মেয়েদের পাশাপাশি আছে মিসরীয় অভিজাত মেয়েও। গা ভেজানোর পর টুলের ওপর বসে পড়লেন হুররেম। এবার নিজেই বাটিতে করে পানি উঠিয়ে শরীরে ঢালতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর  তোয়ালে নিয়ে বাষ্পঘরের দিকে পা দিলেন। মারবেলের মেঝেতে তার খড়ম ফটফট শব্দ হতে লাগল। বাষ্পঘরে পানি ঢালা অথবা খড়মের শব্দ ছাড়া কোনো শব্দ নেই। পুরো ঘরে ধোঁয়ার মিছিল যেন। এ ঘরটা অনেকটা গুম্বজাকৃতির। ঘরের অনেক ওপরের জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে সূর্য। সে আলো ঘরের ধোঁয়ার গায়ে পড়ে সৃষ্টি হয়েছে অদ্ভুত এক পরিবেশ। সাদাটে ধোঁয়ার আস্তরণে বন্দী যেন হুররেম। বাষ্পের উষ্ণতায় কিছুক্ষণের মধ্যেই তার শরীর থেকে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ঝরতে লাগল। এবার গরমের হাত থেকে বাঁচতে একটা ছোট পুকুরে শরীরটা ডুবিয়ে দিলেন। মাথাটা এলিয়ে দিলেন মারবেল বাঁধানো ঘাটে। মুখের ওপর চুল চলে আসতেই এক আঁজলা পানি নিয়ে ধুয়ে ফেললেন মুখ। এক মনে গোসল সারছিলেন। তখনই পানির অন্য প্রান্তে কারও উপস্থিতি টের পেলেন হুররেম। তাকাতেই দেখলেন দীঘল চুল ছাড়িয়ে আয়েশ করে শুয়ে আছেন মাহিদেভরান সুলতান। দুজন দাসী তার গায়ে সাবান মাখিয়ে দিচ্ছে আর কাঁধ ডলে দিচ্ছে।

মাহিদেভরানকে দেখেই নিজের শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল হুররেম খাতুনের। প্রবল ঈর্ষা ও ঘৃণা হুররেমের দুই চোখ জুড়ে। মনের ভিতর একটা প্রতিশোধের আগুনও যেন দাউ দাউ করে উঠল। দাঁড়া, আগে শাহজাদার মা হয়ে নিই। এরপর বুঝিয়ে দেব এই হুররেম কী জিনিস। মনের ভিতরের আলেকজান্দ্রা ফুসলে ওঠে হুররেমের। তিনি জানেন কী কঠিন ধৈর্য আর প্রতীক্ষায় কাটছে হারেমের একেকটি দিন। মাহিদেভরানের দিকে ক্রোধের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবছিলেন হুররেম।

তখনই চোখ মেলে তাকালেন মাহিদেভরান। এ প্রান্তে হুররেমের ক্রোধে ভরা দৃষ্টি যেন দ্বিধান্বিত করে তুলল তাকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেখান থেকে উঠে গেলেন মাহিদেভরান। সুলতানার এমন কাণ্ডে মুখ টিপে হাসলেন হুররেম। বুঝতে পারছেন সামনে কেবল তারই দিন। ভাবতে ভাবতে পানি থেকে উঠে গেলেন তিনি। এগিয়ে গেলেন বাষ্পঘরের পাশের ছোট্ট ঘরটার দিকে। এ ঘরটা খুব বেশি বড় নয়। অনেকটা খুপরির মতো। এখানে বেশকিছু পাথরের স্লাব ওপরের দিকে উঠে গেছে। একে মালিশঘর বলা হয়। এ স্লাবের ওপর দাসীরা হারেমের মেয়েদের শুইয়ে দিয়ে মালিশ করে। সারা শরীর ডলাইমলাই করে। প্রথম কোনো দাসী এলে এখানেই তার শরীর লোমমুক্ত করা হয়। আর নিয়মিত গোসলের ক্ষেত্রে এখানেই খুঁজে বের করা হয় শরীরের কোথাও একবিন্দু চুল বা লোম অবশিষ্ট আছে কিনা। বাদ পড়ে না গোপনাঙ্গও।

একটা দাসী বেশ কিছুক্ষণ হুররেমকে মালিশ করে দিল। হুররেম নিজের সুবিধামতো সারা শরীরে তেল মালিশ করিয়ে নিলেন। এরপর পোশাক পরে চলে এলেন নিজের ডেরায়।

পারগালি ইবরাহিমের মন খুব খারাপ। হুট করেই কেন যেন নিজের পরিবারের কথা মনে পড়ে গেল তার। কে জানে কেমন আছে সবাই। মাতরাকচি আসতে তার সঙ্গে নিজের অবস্থা খুলে বললেন পারগালি। কী করা যেতে পারে মাতরাকচি?

কালই প্রাসাদে ফিরেছেন মাতরাকচি। যুদ্ধের পর আরও কিছু সময় নিজের লেখাজোখা আর আঁকাআঁকির জন্য সুলতানের অনুমতিক্রমে থেকে গিয়েছিলেন তিনি। ইবরাহিমের কথা শুনে একটু মাথা চুলকালেন মাতরাকচি। বললেন, ‘বিজয়ীর বেশে থাকার কথা। সব ঠিকঠাক। কোথায় আনন্দ-ফুর্তি করবেন আর আপনি কিনা মন খারাপ করে বসে আছেন!’

মাতরাকচির দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন ইবরাহিম। ‘চাইলেই কী সব ভুলে থাকা যায় বন্ধু?’

মাতরাকচি ইবরাহিমের দিকে সুরার পাত্রটি বাড়িয়ে দিলেন। ইশারায় বললেন একটু চুমুক দিতে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও চুমুক দিলেন ইবরাহিম। হুট করেই কেন ইসাবেলার কথা মনে পড়ে গেল তার। মাতরাকচি বোধহয় সেটাই অনুমান করলেন।

‘ইবরাহিমের কি কারও কথা মনে পড়ছে?’

‘এ কারণেই আমি আপনাকে প্রবলভাবে ভয় পাই। ’

‘মানে?’

মাতরাকচির পাল্টা প্রশ্ন।

‘এই যে কিছু বলার আগেই আপনি সব বুঝে যান। ’

‘বুঝি না তো। স্রেফ অনুমান করি। ’

‘এ অনুমান ক্ষমতাই বা কজনের থাকে?’

‘কী আর করার। আমার হয়তো আছে। দাঁড়ান। রাতের ব্যবস্থা করছি। ’

মাতরাকচির ঠোঁটে দুষ্টামির হাসি।

ইবরাহিম কোনো কথা বললেন না।

‘ওহহো। রাত তো হয়েই এসেছে। ইসাবেলা না অন্য কেউ?’

‘হোক। ’

কোনো নাম নিলেন না ইবরাহিম।

দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন মাতরাকচি। অনেক আয়োজন বাকি।

ইবরাহিম তখনো আনমনে বসে।

 

ঘড়ির কাঁটা থেমে থাকে না। ইবরাহিমের অশান্ত মন চাঙ্গা করার জন্য ইসাবেলার সঙ্গ সম্ভবত দরকার ছিল। এমন বিক্ষিপ্ততা খুব অল্প সময়ই কাজ করেছে ইবরাহিমের মধ্যে। আজকের ব্যাপারটা আসলেই তাই ছিল।

দীর্ঘ ও তৃপ্তিদায়ক এক সঙ্গমের পর বসে বসে ভাবছিলেন ইবরাহিম। পাশেই শুয়ে ইসাবেলা। তাকে জড়িয়ে ধরে বেঘোরে ঘুমাচ্ছেন। নিজেকে পুড়িয়ে নিঃশেষ করছে একটি মোম। সেই মোমের দিকে তাকিয়ে ইবরাহিমের মনে হলো তিনি নিজেও অনবরত পুড়ছেন। তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ কেউ আর দেখে না। এ প্রাসাদে সুলতান সুলেমানের সবচেয়ে কাছের মানুষ পারগালি ইবরাহিম। তার পরও তার মনে কীসের শূন্যতা।

আমার সবকিছুই আছে। ইচ্ছা করলেই যে কোনো কিছু পেতে পারে আমি। কিন্তু পরিবার? আঁতকে ওঠেন ইবরাহিম। আরেকবার কেঁপে কেঁপে ওঠে তার বুক।

 

ইসাবেলার এখানে আসার কথা ছিল। না আসায় খেপে গেছেন আয়েশা হাফসা সুলতানা। মনজিলা খাতুন এসে ঘটনা ব্যাখ্যা করলেন। ইবরাহিমের ডাকের কথা শুনে প্রথমে একটু বিরক্ত হলেন। তারপর যখন জানলেন স্বয়ং সুলেমান ইবরাহিমকে এ উপহার দিয়েছেন তখন চুপসে গেলেন। কারণ, এ প্রাসাদে সুলেমানের প্রায় সমান ক্ষমতা আছে আয়েশা হাফসা সুলতানার। এর পরও সুলতান সুলতানই। সুলতানের উপরে আর কেউ নেই। তা ছাড়া ইবরাহিম সুলতানের সবচেয়ে কাছের মানুষ। তার জন্য সুলতান বিশেষ কিছু করতেই পারেন। মনজিলা খাতুন একটু সমালোচনার সুর তোলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আয়েশাই তাকে থামিয়ে দিলেন।

‘হুররেম খাতুনের কী অবস্থা। শরীর ভালো?’

‘জি সুলতানা। সব ঠিকঠাক। ’

‘নিয়মিত ওর স্বাস্থ্য পরীক্ষা চলছে তো?’

‘জি, অবশ্যই। আমি নিজে তদারকি করছি। ’

‘ওর যেন কোনো অযত্ন না হয়। আমার সুলেমান জানলে কিন্তু সব এলোমেলো হয়ে যাবে। ’

‘আমি দেখব। ’

বাঁ দিকে সুলতান সেলিম খানের আত্মপ্রতিকৃতির দিকে তাকিয়ে বুকটা ছাৎ করে উঠল আয়েশার। মানুষটা চলে গেছেন। বড্ড একা লাগে প্রায়ই। সেলিম খান থাকতেও যে তাকে খুব বেশি কাছে পেয়েছিলেন তা নয়। এর পরও এখনকার মতো না থাকার বেদনা ছিল না। আর এখন?

এখন সালতানাতের ঐশ্বর্যের সঙ্গে কেবল যোজন যোজন শূন্যতা। এ শূন্যতা কাটানোর কোনো পথ নেই। মনজিলার সঙ্গে সাম্রাজ্যের খোঁজ নিয়ে আর কতদিন। কদিন বেড়িয়ে আসা দরকার। মানিসা থেকেও ঘুরে আসা যায়। সুলেমানের সঙ্গে কথা বলতে হবে। নিজে নিজে ভাবলেন আয়েশা হাফসা সুলতানা। হুট করে প্রাসাদ ছেড়ে বাইরে যাওয়া যাবে না। আর বিষয়টা সুলেমানের মাথায়ও থাকা উচিত।

 

পরবর্তী পর্ব আগামী শনিবার

এই পাতার আরো খবর
up-arrow