Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৭

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৭
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২২:১৮
বেঁচে থাকতে জিরো এখন তারা হিরো
তানভীর আহমেদ
বেঁচে থাকতে জিরো এখন তারা হিরো

পরিবর্তন চলমান প্রক্রিয়া। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে যায়।

আজ যার মূল্যায়ন নেই, অদূর ভবিষ্যতে সে-ই হয়ে ওঠেন শিরোমণি। এমন উদাহরণ ভূরি ভূরি। ইতিহাস খুঁড়লেই চোখে পড়বে এমন জ্ঞানী-গুণী মনীষীদের, যারা বেঁচে থাকতে প্রাপ্ত সম্মান পাননি। মেলেনি খ্যাতি। উল্টো তারা হয়েছেন উপহাসের পাত্র। তাদের মেধা সমাজ ও রাষ্ট্রের চোখে কখনো কখনো হয়েছে নিন্দিত, অপরাধ। যে কারণে বেঁচে থাকতে তারা অবজ্ঞার শিকার হয়েছেন, অভিযুক্ত অপরাধী হিসেবে বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। কিন্তু সময় পরিক্রমায় ভুল ভেঙেছে মানুষের, সমাজের, রাষ্ট্রের। তাদের মেধার গভীরতা, সত্যতা মিলেছে আজ। এখন তাদের যুক্তি, তত্ত্ব, দর্শন, বাণী সবই পাঠ্য, অনুসরণীয়।   তাদের বাণী উচ্চারিত হয় মুখে মুখে। তাদের তত্ত্ব দিক প্রদর্শনকারী বলেই প্রশংসিত সব মহলে।

 

যুক্তি, দর্শন গ্রহণ করেনি এথেন্স হেমলক পানে বাধ্য হন সক্রেটিস

  সক্রেটিস, প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক

সক্রেটিসকে যুক্তি ও মুক্তচিন্তার জনক বলতে দ্বিধা নেই। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের বাণী শতাব্দী থেকে শতাব্দী মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে। যুক্তিতর্কে, সমাজ, রাষ্ট্র জীবনে তার দর্শন বারবার উল্লিখিত হয় শ্রদ্ধায়। অথচ তার পাণ্ডিত্য ও জ্ঞানের পরিসীমা উল্টো অপরাধের কাতারে নাম লেখায়। অভিযোগ ওঠে তিনি প্রচলিত দেবতাদের উপেক্ষা করছেন, তরুণদের কুপরামর্শ দিচ্ছেন। তার ভাষণ, জ্ঞান যুবকদের নৈতিক চরিত্র কলুষিত করছে, তারা বিপথগামী হচ্ছে। কিছু ভক্ত জুটলেও তার যুক্তি ও দর্শন মেনে নেয়নি সমাজ ব্যবস্থার বড় অংশ। যে কারণে তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। এথেন্সের উন্মুক্ত ময়দানে ৫০০ বিচারকের সামনে তিনি ৬০ ভোটে পরাজিত হন। হেমলক বিষপানের মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।   এখন তাকে বিশ্ববাসী জ্ঞানী, ন্যায়পরায়ণ বলে স্বীকার করেছে। তার দর্শন প্রশংসিত সর্বত্র। জ্ঞানী-গুণী, মনীষী এই সক্রেটিসের চিন্তা ও যুক্তি কালজয়ী, আজও তার দর্শন সবাইকে প্রভাবিত করছে।

 

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গৃহবন্দী রাখা হয় গ্যালিলিওকে

  গ্যালিলিও গ্যালিলি, জ্যোতির্বিদ

ইতালির বিখ্যাত সমুদ্রবন্দর পিসায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন গ্যালিলিও। আধুনিক বিজ্ঞান তাকে ইতিহাসের সেরা গণিতবিদ, পদার্থবিদ, জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিক বলে স্বীকার করলেও বেঁচে থাকতে তার বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব মেনে নিতে পারেনি সমাজ ও রাষ্ট্র। পূর্ববর্তী বিজ্ঞানী টলেমি দাবি করেছিলেন, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। কিন্তু নিজের উদ্ভাবিত টেলিস্কোপ নিয়ে পরীক্ষা শেষে গ্যালিলিও বললেন, না, সূর্য নয়, পৃথিবীই বরং সূর্যের চারদিকে ঘোরে। একই দাবি করেছিলেন কোপার্নিকাসও। এই মতবাদ দেওয়ায় গ্যালিলিও কোপার্নিকাসের মতো চার্চের রোষানলে পড়লেন। তাকে গৃহবন্দী করা হয়। বন্দীদশাতেই তার মৃত্যু হয়। মূল্যায়ন দূরে থাক— মৃত্যুর ৩০০ বছর পরেও তিনি চার্চের চোখে অপরাধীই ছিলেন।   অথচ এখন তার বন্দনা বিশ্বজুড়ে।

 

জীবনজুড়ে অপ্রাপ্তি আর হতাশায় আত্মহত্যা করেন ভ্যান গফ

  ভিনসেন্ট ভ্যান গফ, চিত্রশিল্পী

দুনিয়া কাঁপানো চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গফ। বেঁচে থাকতে তার চিত্রশিল্পের কোনো খোঁজই পায়নি বিশ্ব। জীবনে শুরুর দিকে পাদ্রীর জীবন বেছে নিয়েছিলেন। ধর্মচর্চায় মন দিয়েছিলেন। দরিদ্রতা ও অসামাজিক বলে মানুষ তাকে এড়িয়ে চলত। ২০ বছর বয়সে তিনি পুরোদমে ছবি আঁকায় মন দেন। তার আঁকা পেইন্টিংগুলোতে সূর্যের সোনালি আলো ও উজ্জ্বল রঙের বর্ণালি দেখা গেলেও তার জীবন ছিল একেবারেই উল্টো। জীবনে বলতে গেলে কিছুই পাননি। মানুষের কাছে হাসির পাত্র ছিলেন, দরিদ্র বলে অবজ্ঞার পাত্র হয়েছেন। যে কারণে আত্মহত্যা করে ইতি টানেন জীবনের। তার মৃত্যুর পর উদ্ধার হয় তার পেইন্টিংগুলো। প্রায় ৯০০ ছবি, ১ হাজার ১০০ ড্রইং ও স্কেচ ছিল।   ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও জার্মানি পেরিয়ে এই পেইন্টিংগুলো বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসিত হয়।

 

স্বীকৃতি মেলেনি, উল্টো পুড়িয়ে মারা হয় ব্রুনোকে

  জিওর্দানো ব্রুনো, গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ

১৫৪৮ সালে ইতালিতে জন্ম নেন ব্রুনো। তিনি ছিলেন একাধারে দার্শনিক, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও জ্যোতিষী। মাত্র ২৪ বছর বয়সে ব্রুনো পাদ্রী হিসেবে মনোনীত হন। তার মুক্ত ও অনুসন্ধানী চিন্তা এবং সে যুগে গির্জা কর্তৃক বাজেয়াপ্ত বই পড়ার কারণে তিনি প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাস ও শাসকগোষ্ঠীর মুখোমুখি হোন। জীবনের বেশির ভাগ সময়ই তিনি পালিয়ে বেড়ান। তিনি এই মহাবিশ্বের মতো আরও মহাবিশ্ব আছে, পৃথিবী গোল, সূর্য এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয় এবং এটি একটি নক্ষত্র ছাড়া আর কিছু নয়— এই ধারণা পোষণ করায় চার্চের রোষানলে পড়েন। তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।   দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় সবার সামনে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পুড়িয়ে মারা হয় তাকে। কিন্তু পরবর্তীতে প্রমাণ হয় তার তত্ত্বই ঠিক। এখন ইতিহাস কাঁপানো গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ হিসেবে তিনি সর্বত্র সমাদৃত।

 

বিজ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধিচর্চাকারী বলেই হত্যা করা হয় হাইপেশিয়াকে

  হাইপেশিয়া, গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ

৩৭০ খ্রিস্টাব্দে আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন হাইপেশিয়া। ইতিহাসবেত্তাদের মতে, হাইপেশিয়া মুক্তবুদ্ধিচর্চাকারীদের মধ্যে ইতিহাসের শেষ প্যাগান সায়েন্টিস্ট। কিন্তু নারী বিজ্ঞানী ও মুক্তবুদ্ধিচর্চাকারী বলে চার্চের চোখে প্রবল সমালোচিত ছিলেন। সুন্দরী হাইপেশিয়া তার গোটা জীবন গণিতের জন্য উৎসর্গ করেন। বিয়ে করেননি। এরিস্টটল, সক্রেটিস ও প্লেটোর দর্শন ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। গণিত, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা ও মেকানিক্সের জটিল বিষয়গুলোয় হাইপেশিয়া ছিলেন জনপ্রিয় শিক্ষিকা।   আলেকজান্দ্রিয়ার গভর্নর অরেস্টেসও তার জ্ঞানে মুগ্ধ ছিলেন। রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও নারী বিজ্ঞানী, মুক্তবুদ্ধিচর্চাকারী বলেই তাকে মৌলবাদী সন্ন্যাসী ও চার্চের প্যারাবোলানসরা হত্যা করে।

 

সমালোচনা, অবজ্ঞার পাত্র হয়েছিলেন কোপার্নিকাস

  নিকোলাস কোপার্নিকাস, জ্যোতির্বিদ

এক সময় মানা হতো, পৃথিবী সৌরজগতের কেন্দ্র। আর পৃথিবীকে কেন্দ্র করেই সব গ্রহ ঘুরছে। কিন্তু বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ নিকোলাস কোপার্নিকাস প্রথমবারের মতো বললেন, না পৃথিবী না, সূর্যকে কেন্দ্র করে অন্য গ্রহগুলো আবর্তিত হচ্ছে। তিনি লিখলেন, ‘দ্য রেভিলিউশানিরস অরবিয়াম কোয়েনেসিটিয়াম’। এতে দেড় হাজার বছরের টলেমির মতবাদ ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়। ধর্মযাজকরা ক্ষেপে ওঠেন। ক্যাথলিক চার্চের তীব্র সমালোচনা ও অবজ্ঞার সম্মুখীন হয়েছিলেন কোপার্নিকাস। তাকে ধর্মদ্রোহী ঘোষণা দিয়েছিল চার্চ। যে কারণে মৃত্যুর পর নাম-পরিচয়হীনভাবে অবহেলার সঙ্গে সমাধিস্থ করা হয় তাকে। কিন্তু তিনি যে ঠিক, গ্যালিলিও সেটার সত্যতা প্রমাণ করেন। এক সময় ভুল ভাঙে চার্চের। কোপার্নিকাসের মৃত্যুর ৫০০ বছর পর পোলিশ ক্যাথলিক চার্চ তাকে পুনরায় বীরের মর্যাদায় সমাহিত করেছে।   আজ এটা স্বীকৃত কোপার্নিকাসের হাত ধরেই জ্যোতির্বিদ্যার নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল।

 

সমালোচনা ও অসত্য মিথে চাপা পড়েছিলেন কাফকা

  ফ্রানৎস কাফকা, সাহিত্যিক

জার্মান ভাষায় অনবদ্য উপন্যাস ও ছোট গল্পের লেখক ফ্রানৎস কাফকা জীবিত অবস্থায় তেমন মূল্যায়ন পাননি। তার সাহিত্যকর্মের বৈচিত্র্য মোটেই প্রশংসিত হয়নি। উল্টো তাকে নিয়ে সমালোচনা, অর্ধসত্য ও অসত্য মিথের ছড়াছড়ি রয়েছে। কাফকা একজন আইনজীবী হিসেবে প্রশিক্ষণ নিলেও লেখক হিসেবেই সময় ব্যয় করেছেন। কিন্তু তার লেখা জনসম্মুখে আসেনি। নানা প্রতিকূলতা তাকে পর্যুদস্ত করেছে। যক্ষ্মা রোগেও তিনি বিছানায় শায়িত ছিলেন জীবনের লম্বা সময়। কাফকা তার সমস্ত লেখা ম্যাক্স ব্রডকে তার মৃত্যুর পর পুড়িয়ে ফেলতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু ম্যাক্স ব্রড তা করেননি। কাফকার মৃত্যুর পর পাঠক, সমালোচকরা তার ছোট গল্পের প্রশংসা করেন।   আজ তার সাহিত্যের মূল্যায়ন হয়, বিশ্বজুড়েই তার খ্যাতি।

 

 বেঁচে থাকতে এমিলি ডিকসনের মাত্র সাতটি কবিতা ছাপা হয়েছিল

  এমিলি ডিকসন, কবি

যুক্তরাষ্ট্রের কবি এমিলি ডিকসন। নীরবে লিখে গেছেন একের পর এক কবিতা। সেসব ছাপার ব্যাপারে তার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। জীবিত থাকা অবস্থায় তার মাত্র সাতটি কবিতা ছাপা হয়েছিল। প্রকাশকরা নারীর কাছ থেকে ‘মেয়েলিপনা’ কবিতা আশা করেছিলেন— ব্যতিক্রম ছিলেন এমিলি ডিকসন। যে কারণে তার কবিতা অপ্রকাশিতই থেকে যায়। সে সংখ্যাটাও চমকে দেওয়ার মতো, প্রায় ১ হাজার ৭০০ কবিতা লিখেছিলেন এমিলি। জীবন সম্পর্কে তারও বিতৃষ্ণা ছিল। সাহিত্য সমাজে কোনো স্বীকৃতি মেলেনি। বিয়ে করেননি, ব্যক্তি জীবনও সুখের ছিল না। অবশেষে ভারী পাথর গলায় বেঁধে জলে ডুবে আত্মহত্যা করেন। এমিলির মৃত্যুর পর তার বোন এমিলির লেখা অপ্রকাশিত কবিতার খোঁজ দেন।   এখন মার্কিন নারী কবি হিসেবে এমিলিকে সেরাদের একজন বলেই মানা হয়।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow