Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : রবিবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:৩৫
রাতজাগা শহরের গল্প
তানভীর আহমেদ
রাতজাগা শহরের গল্প
বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটকরা নিউইয়র্কের টাইম স্কয়ারে ছুটে আসেন। আড্ডা মারার জন্য কেউ কেউ এগিয়ে আসবেনই। ভিনদেশের মানুষের সঙ্গে গল্প জমিয়ে নিতে কারোই বেগ পেতে হয় না এই শহরে।
bd-pratidin

নিউইয়র্ক সিটি

 

রাতজাগা শহর নামটি যার গায়ে জড়িয়ে আছে সে শহরের নাম নিউইয়র্ক সিটি। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের টাইম স্কয়ারকে কেন্দ্র করে রাতজাগা মানুষের রাজধানী গড়ে উঠেছে। নিউইয়র্কের সাবওয়ে সিস্টেম কখনই বন্ধ হয় না। ভোর হওয়ার আগ মুহূর্তে ঘণ্টা দুয়েক ঝিমিয়ে আবার জেগে ওঠে এই শহরটি। টাইম স্কয়ারে পর্যটকদের ভিড় এক সেকেন্ডের জন্য কমে না। সাগরের ঢেউয়ের মতো একের পর এক আসতে থাকে। আলো ঝলমলে এই শহরের দালানগুলো রাতে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। নাইট ক্লাবগুলোয় প্রচণ্ড ভিড় হয়। নাচে-গানে মানুষের হৈচৈ ক্লাবগুলোতে কথা বলাই দায়। মদের আসর বসে সেখানে। যারা নাইট ক্লাবে হৈহুল্লোড় এড়িয়ে চলতে চান তারা শহরের রাস্তায় রাস্তায় আড্ডা আর খাওয়া-দাওয়া করে রাত পার করে দেন। বিশ্বের নামিদামি রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে আর নাইট ক্লাব নিউইয়র্ক সিটিকে মাছের জালের মতো পেঁচিয়ে আছে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটকরা টাইম স্কয়ারে ছুটে আসেন। আড্ডা মারার জন্য কেউ কেউ এগিয়ে আসবেনই। ভিনদেশের মানুষের সঙ্গে গল্প জমিয়ে নিতে কারোই বেগ পেতে হয় না এই শহরে। রাতজাগা নিউইয়র্ক সিটিতে সবাই সবার বন্ধু।

 

লাস ভেগাস

যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাস। যে শহরের নাম শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে জুয়া আর উদ্দাম নাচ-গান। ‘পার্টি সিটি’ লাস ভেগাস টাকা উড়ানোর জন্য আদর্শ জায়গা। ধনকুবের ও শখের জুয়াড়িরা হাজার হাজার কোটি টাকা প্রতি রাতে উড়ান এখানে। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টাই নাচে-গানে হৈচৈয়ে মেতে থাকে লাস ভেগাস। এক সেকেন্ড না থেমে যে শহর উৎসব করে যায় তাদের রাজা লাস ভেগাস। খাবারের আয়োজনেও লাস ভেগাস যে কাউকে বিস্মিত করে। আকাশছোঁয়া দালানগুলোর ছাদে বসে এসব পার্টি। এখানে নাচ-গান করার জন্য প্রফেশনাল নৃত্যশিল্পীদের মেলা বসে। সিনেমার নায়িকারা এসে আমোদ-বিনোদনের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। লাস ভেগাস মানেই বিভিন্ন মাদকের আসর। মাতলামি আর জুয়া একটি ছাড়া আরেকটি অচল যেন। জুয়াড়িদের রাজধানীতে তাই মদ ও বিভিন্ন নেশাদ্রব্যের বাড়াবাড়ি। ক্যাসিনোর শহর। তাই ভিড় লেগেই থাকে ক্যাসিনোগুলোয়। নারী-পুরুষ কেউ কম যান না। জুয়াড়ি ছাড়াও বিশ্বের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এখানে আসে ছুটি কাটাতে। হাজার মাইল পেরিয়ে অনেক পর্যটকও লাস ভেগাসে রাতের উৎসব দেখতে ছুটে আসেন।

 

কায়রো

সিনাই উপদ্বীপ আর আফ্রিকা মহাদেশের সেতু মিসর। মিসরের রাজধানী কায়রোর গায়ে এখনো পুরনো ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির ঘ্রাণ রয়ে গেছে। কায়রোতে রাত যত বাড়ে মানুষের কোলাহল তত বাড়তে থাকে। বদলে যেতে থাকে গোটা শহর। বন্ধুদের নিয়ে নাচ-গান আর খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন বাড়তে থাকে। কায়রোর রাত পুরোটাই অ্যালকোহল নিয়ে মাতামাতির। মাতাল না হলেও কায়রোর বাসিন্দারা রাতটা অ্যালকোহল ছাড়া ভাবতেই পারে না। আড্ডা আর  হৈহুল্লোড়ে সবার হাতে থাকা চাই এক পেয়ালা মদ। কেউ কেউ বেছে নেন ওয়াইন। আরব দেশের ঐতিহ্য ছোঁয়া কফিও হতে পারে বিকল্প। রাস্তার দুই পাশে গজিয়ে থাকা ছোট ছোট ক্যাফেগুলো সারা রাত মুখর থাকে মানুষে। রাতের নীরবতা ভেঙে আড্ডা আর হাসি-ঠাট্টায় ক্যাফেগুলোয় অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয়। কায়রোর রাত দেখে মুগ্ধ হননি এমন পর্যটক বোধহয় দুনিয়ায় নেই। কিছু কিছু ক্যাফেতে স্থানীয় নৃত্যশিল্পীরা গানের তালে তালে নেচে উৎসবের আমেজ বাড়িয়ে তোলেন। জ্যাজ অ্যান্ড ব্লু উপভোগ করতে চাইলে কায়রোর ক্যাফেতে একরাত না কাটালেই নয়!

 

সাও পাওলো

ব্রাজিলের সবচেয়ে ঝলমলে শহর সাও পাওলো। ধনীদের শহর বললেও ভুল হবে না। ব্রাজিল মানেই নাচ-গান আর হৈহুল্লোড়। সাও পাওলোর নামের সেই খেতাব ছেড়ে দেওয়ার নয়। সাও পাওলোতে তাই কখনো নাচ-গান থেমে থাকে না। রাত কখন নামে এখানকার মানুষ তা বোধহয় ভুলেই গেছে। মাতলামিও চলে খুব। নেশাপণ্য বিক্রি আর নেশা শিকারি মানুষের কাছে স্বর্গ হয়ে ওঠে রাতের সাও পাওলো। রাতে এই শহরে আরাম, আয়েশ আর বিনোদনের সব ধরনের আয়োজন আছে নাইট ক্লাবগুলোয়। ডিস্কো আর ব্যালাড নাচের জন্য সাও পাওলোর নাইট ক্লাবগুলো বিখ্যাত। নাচের মঞ্চে সবসময় সুন্দরী নারীদের ভিড় লেগেই থাকে। ডিজে পার্টির জন্যও অনেকে ছুটে আসেন এই শহরে। ব্রাজিলের বেশির ভাগ নাইট ক্লাবেই ডিজে পার্টির আয়োজন রয়েছে। খাবার অর্ডার করে এসব পার্টিতে যোগ দিতে পারেন যে কেউ। নাচতে চাইলে সঙ্গীর অভাব হবে না ওখানে। ব্রাজিলের সাম্বার খোঁজ নিয়েও অনেকে রাত কাটান সাও পাওলোতে। তারাও হতাশ হবেন না। ব্রাজিলে এসে সাম্বা নাচের তাল খুঁজে নিতে রাতই উপযুক্ত সময়।

 

বুয়েনস আইরেস

পর্বতের সমুদ্র পেরিয়ে আর্জেন্টিনা। সে দেশের রাজধানী বুয়েনস আইরেস। না ঘুমানোর রোগে আক্রান্ত বুয়েনস আইরেসে রাতে কী কী আয়োজন আছে? উত্তরটা হলো, কী নেই! নাচ-গান, মদের আসর, রাতের খাবারের বিশাল আয়োজন সবই তো আছে। মেগা ক্লাবের শহর হিসেবে খ্যাত বুয়েনস আইরেসের মানুষ দারুণ বিনোদনপ্রেমী। পার্টি করার সুযোগ তাদের হাতছাড়া হয়েছে এমন রেকর্ড নেই। শহরের ধরনটাই এমন। এই শহরে রাত কাটিয়েছেন আর নাচ-গান করে রাত পার করেননি, এ কথা কেউ বিশ্বাস করবে না!

 

বার্সেলোনা

পার্টি সিটি বার্সেলোনা। স্পেনের রাতগুলোর চেহারাই অন্যরকম। রাস্তায় রাস্তায় মানুষের ভিড় দেখে বোঝার উপায় নেই রাত কয়টা বাজে। ঘড়ির দিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করেন না কেউ। মাদ্রিদ, বার্সেলোনার নামের সঙ্গেই উৎসব, আড্ডাবাজি শক্ত আঠার মতো লেগে গেছে। সারা রাত খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা আর কেনাকাটায় সময় কাটান পর্যটকরা। এই শহরগুলোর এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে হৈচৈ হয় না। বিশ্বের বড় তারকারাও ছুটে আসেন এই শহরে রাত কাটাতে।

 

হংকং

চীনের সবচেয়ে বড় দুটি প্রশাসনিক অঞ্চল হংকং এবং ম্যাকাও। দুটি শহরই পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। আলোকসজ্জা আর বড় বড় ক্যাফে, নাইট ক্লাবের শহর হংকং। চীনের মানুষের কাছে ‘পার্টি সিটি’ বলতেই হংকংয়ের নাম চলে আসে। জুয়াড়ি, মাদক ব্যবসায়ী আর সন্ত্রাসীরা এই শহরকে বেছে নিয়েছে ব্যবসা আর বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে। এখানে এসে কেউ ব্যবসা করেন, কেউ করেন উল্লাস। আনন্দ আয়োজন বলতে এখানে নাচ-গান আর মাদকের আসর। রাতের শহর একেবারেই অন্যরকম। রাস্তায় রাস্তায় চলে দলবেঁধে হৈচৈ, নাচ-গান। গাড়ি আর মানুষের ভিড় রাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে। নাইট ক্লাব, রেস্টুরেন্টে মানুষের আনাগোনা দেখলে মনে হবে সবাই ঘুম থেকে উঠে মাত্র ঘর ছাড়ল। শপিং মলগুলোতে কেনাকাটা বাড়তে শুরু করে। রাস্তার ওপর চেয়ার-টেবিল পেতে ক্যাফেগুলো দামি দামি খাবার ও পানীয় পরিবেশন করে। সংগীতশিল্পী আর নাচের তারকারা নেচে-গেয়ে বিনোদন দেন পর্যটকদের। নারীসঙ্গী নিয়ে নাইট ক্লাবে উদ্দাম নাচে-গানে মেতে ওঠেন অনেকে। বলা হয়, হংকংয়ে দিন নেই, পুরোটাই রাত!

 

বৈরুত

আনন্দ-উৎসবের শহর বৈরুত। লেবাননের এই শহর দিনে ঝিমিয়ে থাকে। সারা রাত না ঘুমানোর ফল আরকি! রাতে ঘুরে বেড়ানোর জন্য পর্যটকদের পছন্দের শহর এটি। যা ইচ্ছা তা করার স্বাধীনতা আর নিরাপত্তা আছে বলে বৈরুত রাতে জমজমাট হয়ে ওঠে। রাতে মানুষ বন্ধুবান্ধব নিয়ে বের হয় শপিং করতে। শহরের আনাচে-কানাচের দোকানগুলো তো বটেই, ডাউনটাউনের শপিং মলে মানুষ ভিড় করে। অনেকে অ্যাডভেঞ্চার খোঁজেন। তারা স্থানীয় উৎসবকে সামনে রেখে এই শহরে হাজির হন। বৈরুতে সারা বছর কোনো না কোনো উৎসব লেগেই থাকে। রাতের শহরে উৎসবের রং লাগে অন্যরকমভাবে। সঙ্গিনীকে নিয়ে এসব উৎসবে নাচ-গান খুব সাধারণ ব্যাপার। রাত বাড়লে বৈরুতের সবাই স্বজন হয়ে ওঠে। সঙ্গী জোগাড় করে নিতে বেগ পেতে হয় না ওখানে। নাচতে শুরু করলে কেউ না কেউ এগিয়ে এসে হাত ধরবে, নাচতে-গাইতে শুরু করবে। যারা নেশাজাতীয় পানীয় চান তারা নাইট ক্লাব, বারে গিয়ে ব্যস্ত থাকেন। অনেকে আবার বৈরুতে যান জুয়া খেলতে। তাদের জন্যও রয়েছে নামকরা কয়েকটি ক্যাসিনো।

 

ব্যাংকক

রাতজাগা শহরের কথা উঠলে সবাই নিউইয়র্ক আর ব্যাংককের নাম বলেন। কোনটি আসলে সেরা? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। থাইল্যান্ডের ব্যাংকক আর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির টাইম স্কয়ার কোনোটাই এক মুহূর্তের জন্য পর্যটকশূন্য হয় না। পর্যটকপ্রিয় থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে। এখানে রাত বলে কিছু নেই। দিনের ব্যস্ততা আর রাতের ব্যস্ততায় পার্থক্য কেবল নাচ-গান আর হৈচৈয়ে। সারা দিন থাইল্যান্ডের বিভিন্ন আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট ঘুরে সবাই ব্যাংককের রাত উপভোগ করতে ছুটে আসেন। ব্যাংককের রেস্টুরেন্ট ও পার্টি সেন্টার হিসেবে নাইট ক্লাবগুলোতে ভিড় লেগেই থাকে। সঙ্গে পানীয় আর সঙ্গিনীদের আনাগোনা ব্যাংককের ট্রেডমার্ক। নাইট ক্লাব, মদের বার আর বিভিন্ন রিসোর্টে নিজেদের মতো করে পার্টির আয়োজন থাকে। এসব পার্টিতে ডিজের গানে গানে নাচে সবাই। অনেকে মাতাল হয়ে পড়ে থাকে নাইট ক্লাবের মাটিতে। প্রচণ্ড ব্যস্ত ব্যাংকক শহরের এই দৃশ্য বছরে একটি দিনের জন্যও ব্যতিক্রম হয় না। পর্যটকরা বলেন, যে রাতে ঘুমায়, তার ব্যাংককে আসার দরকার নেই!

up-arrow