Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:৩০
বঙ্গবন্ধু বললেন, পিকাসোকে মার দিতে পারবি না
বঙ্গবন্ধু বললেন, পিকাসোকে মার দিতে পারবি না

শাহাবুদ্দিন। প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা। শিল্পের পীঠস্থান প্যারিসে তার বসবাস ও শিল্পচর্চা, খ্যাতি ইউরোপ ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় যোদ্ধা তিনি। দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ যেমন অর্জন করেছেন, ভূষিত হয়েছেন ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘নাইট’ উপাধিতে এবং বার্সেলোনা অলিম্পিয়াড অব আর্টে বিশ্বের ৫০ জন মাস্টার পেইন্টারের একজন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন তিনি। আজ তার ৬৯তম জন্মদিন উপলক্ষে বিশেষ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন— শেখ মেহেদী হাসান 

 

আপনার আম্মা আপনাকে আর্ট কলেজে ভর্তি করিয়েছিলেন।

আর্ট কলেজে শামসুন নাহার শিশুকলা ভবন নামে শিশুদের ছবি আঁকার একটা স্কুল ছিল। পাকিস্তানের ইস্পাহানি, বাওয়ানিসহ বিভিন্ন এলিট ক্লাসের ছেলেমেয়েরা ওখানে আসত। শুক্র ও রবিবার ক্লাস হতো। আমার আম্মা এক দিন আমাকে রিকশায় করে সেখানে নিয়ে গেলেন। বাইরে ছেলেমেয়েদের ছবি আঁকতে দেখে আমার মনে হচ্ছিল আমি অনেক গরিব; ময়লা শার্ট, হাফপ্যান্ট পরা। লজ্জায় মায়ের আঁচল টেনে ধরেছিলাম। ভিতরে গিয়ে দেখি, একজনই লুঙ্গি পরা ব্যক্তি বাচ্চাদের রং, ব্রাশ ইত্যাদি দিচ্ছেন। তাকে দেখে আমি শান্তি পেলাম। তার নাম হান্নান। তিনি আমাকে দেখেই বললেন, আসো আসো খোকা। তুমি এখানে আঁকতে বসে যাও। আমি বসে আঁকা শুরু করি। অন্যদিকে আম্মা বিভিন্ন ফরম ফিলআপ করলেন। মাইনে দিলেন তিন টাকা। ওইদিন সারা বেলা আর্ট কলেজে ছিলাম। পরে আমার নেশা হয়ে গেল। কবে শুক্রবার, রবিবার আসবে সে অপেক্ষায় থাকতাম।

 

আপনি তখন কোথায় পড়তেন?

তেজগাঁও স্কুলে। স্কুলটা শুক্রবার বন্ধ থাকত, রবিবার খোলা থাকত। আমি রবিবার স্কুলে না গিয়ে আর্ট কলেজে যেতাম। সেখানে সিনিয়রদের আঁকা দেখতাম। যারা জলরঙ করত তাদের পানি এনে দিতাম। সাহায্য করতাম। এভাবে আমার দক্ষতা বাড়ে। প্রথমদিকে ভালো রেজাল্ট করলেও সপ্তম থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উঠলে আমার রোল হয় আটচল্লিশ। তখন হেডস্যার বাবাকে খবর দিলেন। আব্বা জানতেন না আমি ছবি আঁকি। তিনি আমাকে বদমাশ বলে ধমক দিলেন। আজিমপুর ফরিদউদ্দিন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করি। এরপর এক পর্যায়ে এসে আর্ট কলেজে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) ভর্তি হই।

 

আর্ট কলেজে ভর্তি হয়ে আপনার স্বপ্ন কী ছিল?

ছোটবেলা থেকে আমার স্বপ্ন ছিল আমি জয়নুল আবেদিন হব। উনাকে আগাগোড়ায় আমার ভালো লাগে। আর্মি আর্ট কলেজে ভর্তি হয়ে শুনি আবেদিন স্যার নাই, অবসরে গেছেন। তখন মনটা খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু আমার আত্মবিশ্বাস ছিল, উনি একদিন না একদিন আমার কাজ দেখবেন, আমাকে ডাকবেন। এরপর তো শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ।

 

জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে দেখা হলো কখন?

দেশ স্বাধীনের পর। ‘মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয়’ শিরোনামে টেলিভিশনে একটা অনুষ্ঠান হতো। আমি সেখানে দুবার গিয়েছিলাম। একটি অনুষ্ঠানে আমাকে দেখে স্যার আর্ট কলেজে খবর পাঠিয়ে তাঁর বাড়িতে ডেকে নেন। আমি গিয়েই তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম দিলাম। উনি বুকে টেনে নিলেন। তারপর আমৃত্যু তাঁর সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক। আসলে গুরু না হলে আমি এতদূর উঠতে পারতাম না। 

 

মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেন কখন?

১৯৭১ সালে আমার ফার্স্ট ইয়ার থেকে সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার কথা। ফার্স্ট ইয়ারে থাকতেই আমি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলাম। রাজনীতি ছিল আমার পারিবারিক উত্তরাধিকার। আমার বাবা ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা। সেই সূত্রে আমি ছাত্রলীগের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পোস্টার-ফেস্টুন লেখার কাজ করতাম। ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিই। ক্যাম্পে যোগ দিই পয়লা মে। আগরতলায় ছিল আমাদের সেক্টরের হেড কোয়ার্টার। আমাদের ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ। তিনি ছিলেন অসাধারণ এক মানুষ। যেমন এলিগেন্ট, তেমন সাহসী আর স্মার্ট। খালেদ মোশাররফ ও ক্যাপ্টেন হায়দার এই দুজনের জন্যই আমরা ট্রেনিং নিয়ে দেশের জন্য যুদ্ধ করতে পেরেছি। তারা দুজনই আমাকে আদর করতেন।

 

প্রশিক্ষণ শিবিরে বসেও নাকি আপনি ছবি আঁকতেন?

আগরতলায় ট্রেনিং নিয়ে আমাদের কয়েকদিন বেকার সময় কাটছিল। আমি মাঝেমধ্যে আঁকিবুঁকি করতাম। এক দিন জঙ্গলে বসে বঙ্গবন্ধুর পোর্ট্রেট আঁকছিলাম। সেই ছবি আঁকার খবর অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। খবরটি শওকত ভাইয়ের (জাতীয় সংসদের সাবেক চিফ হুইপ) কানে যায়। তিনি ডেকে নিয়ে ২২ রুপি আমার হাতে দিয়ে বললেন, যাও, আগরতলা গিয়ে রংতুলি নিয়ে আসো। তুমি আঁকা থামিয়ে দিও না। আমি ছুটি নিয়ে আগরতলা গেলাম। প্রথমে খাওয়া-দাওয়া সেরে ‘এখনই’ নামে একটি সিনেমা দেখলাম। কিন্তু ছবি আঁকার প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি খুঁজে কিছুই পাওয়া গেল না। অবশেষে পুরনো গণেশ ক্যালেন্ডার, দুর্গা ক্যালেন্ডার, মেয়েদের চোখে দেওয়ার কাজল, আইভ্রু পেনসিল, আলতা এসব কিনে ক্যাম্পে চলে আসি। সব মিলে পাঁচ টাকা দিলাম, বাকি টাকা নিজের কাছে রাখলাম। ক্যাম্পে এসে কাজল দিয়ে ছবি আঁকতে গিয়ে দেখি পিছলে যাচ্ছে। শেষমেশ হ্যারিকেনের সলতে পোড়া কালি দিয়ে ছবি আঁকছিলাম। হঠাৎ এক দিন শওকত ভাই বললেন, আমাদের ক্যাম্পে একটা বনভোজন হবে, তোমার ছবিগুলো দেখানো যায় কীভাবে?  

 

 

মুক্তিযুদ্ধের সময় আঁকা আপনার ছবিগুলো নিয়ে কি প্রদর্শনী হয়েছিল?

আমি যখন ছবি আঁকছি তখন মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী আজম খানের সঙ্গে কথা হলো। ও ছিল ১৩ নম্বর প্লাটুনে, আমি ১৭ নম্বর প্লাটুন কমান্ডার। ওর সঙ্গে ঢাকার গোপীবাগের একদল ছেলে ছিল। আমি আর আজম মিলে ঠিক করলাম ছবি প্রদর্শনী ও গানের অনুষ্ঠান করব। পরে সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফকে বিষয়টি জানাতেই উনি খুশি মনে অনুমতি দিলেন। আমাদের কাছে ওই সময় লাল, সাদা, নীল বিভিন্ন রঙের রিলিফের তাঁবু ছিল। ওই জঙ্গলের মধ্যে বিভিন্ন গাছে রশি বেঁধে ঘরের মতো জায়গা তৈরি করলাম। জাম্বুরা গাছের কাঁটা দিয়ে তার ওয়ালে টানানো হলো ১২টি ছবি। দুটো ২০০ পাওয়ারের টর্চলাইট আনা হলো ভারতীয় আর্মির কাছ থেকে। আগরতলা থেকে হারমোনিয়াম আনা হলো। আজম গাইল ‘ধন ধান্যে পুষ্প ভরা আমাদেরই বসুন্ধরা’ গানটি। এভাবে প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়। সেদিন বিশ্রামাগারসহ অন্যান্য ক্যাম্পের যোদ্ধাদের নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। আমরা সবাই মিলে খিচুড়ি খেয়েছিলাম। ওই প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী সরকারের মন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান, সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ, সেক্টরের সেকেন্ড ইন কমান্ড ক্যাপ্টেন এটিএম হায়দার, সুলতানা কামাল, সাইদা কামাল প্রমুখ।

 

আপনার নেতৃত্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সালদা নদীসহ অত্র এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ একটি যুদ্ধ হয়েছিল।

আমরা ২১ দিনের গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রায় তিন সপ্তাহ বেকার বসে থেকে মানসিকভাবে অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ল। অন্য কোথাও যেতেও পারছিলাম না। আমরা ট্রেনিং নেওয়া, সার্বিকভাবে প্রস্তুত, শুধু আর্মস, ওইপনসের জন্য আমাদের ফ্রন্টে পাঠানো হচ্ছে না। আমরা কখনো-সখনো উত্তেজিত হয়ে বলি, আর্মস দেন না কেন? মেজর খালেদ মোশাররফ এক দিন ডেকে বললেন— ফুর্তি বাহিনী যাও, সালদা নদীতে গিয়ে যুদ্ধ করে দেখিয়ে দাও। আমরা গানবাজনা আঁকিবুঁকি করতাম, এজন্য তিনি আমাদের ফুর্তি বাহিনী বলে ডাকতেন। আমাদের থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে ১৪ আগস্ট পাঠালেন। ওইদিন ছিল পাকিস্তান দিবস। পাক বাহিনী মরিয়া হয়ে উঠেছিল। সালদা নদী রেলস্টেশনে ছিল পাকিস্তানি সৈন্যদের ঘাঁটি। আমাদের জানানো হয়েছিল, পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোকজন আছে। লাকসাম, কসবা আর সালদা নদী তিনটাই আমার দায়িত্বে ছিল। আর সীমান্তের ওপারে ভারতীয় বাহিনী। আমাদের মনে কিছুটা ভয় ছিল কী হয় না হয়? আবার মনে মনে চিন্তা করলাম, মরবই যখন বাংলাদেশেই গিয়ে মরি। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে নদী সাঁতরে আমরা পজিশন নিয়ে রাত আড়াইটায় পাকিস্তানি বাহিনীকে অ্যাটাক করি এবং অত্র এলাকা দখলে নিই। আমরা ১৪ দিন খেয়ে না খেয়ে যুদ্ধ করেছিলাম।

 

আপনারা আর্মস সা.রেন্ডার করেন কবে?

আমরা (নাসির উদ্দিন ইউসুফ, আজম খান প্রমুখ) ঠিক করি, বঙ্গবন্ধু যতদিন দেশে না আসবেন ততদিন আর্মস সারেন্ডার করব না। ওদিকে তাজউদ্দীন সরকার আদেশ করেছে ইস্কাটনের সেক্টর কমান্ডারদের অফিসে (বর্তমান লেডিস ক্লাব) আর্মস জমা দিতে হবে। একমাত্র কাদের সিদ্দিকী আর আমরা তখনো আর্মস জমা দিইনি। বঙ্গবন্ধু ১০ এপ্রিল দেশে ফিরলে গণভবনে গিয়ে তাঁর কাছে আর্মস হস্তান্তর করি। উনি সবার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিলেন। আমি জানি আমার পরিচয় দিলে উনি আমাকে চিনবেন। কারণ আমার আব্বা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কলকাতায় একসঙ্গে পড়তেন। আমি বললাম আর্ট কলেজে পড়ি। বঙ্গবন্ধু বললেন, কোথায় বাবা? বললাম শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কলেজে পড়ি। উনি বললেন, ও বাব্বা, তুমি ছবি আঁক! ঠিক ওই মুহূর্ত থেকে তাঁর প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও অন্যরকম ভালোবাসা তৈরি হয়ে গেল। উনি তাজউদ্দীনকে ডেকে বললেন, দেখো দেখো আমার সোনার ছেলে। তোমার ছবি দেখতে চাই এক দিন, দেখাবা তো? আমি মুখ ফসকে বলে ফেলি, আপনি ছবি বোঝেন! আমি সঙ্গে সঙ্গে সরি বললাম। উনি বললেন, তোর ছবি নিয়ে আসিস। তারপর গোপনে আর্ট কলেজের পেছনে ছবি আঁকা শুরু করলাম। বিষয় বঙ্গবন্ধুর জেলজীবন। এক সপ্তাহ পর ছবি নিয়ে গণভবনে গেলাম। ওইদিন ছিল ক্যাবিনেট মিটিং। তাজউদ্দীন, নজরুল ইসলাম, কামারুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক, মনসুর আলী সাহেব সবাই আছেন। আমি অপেক্ষা করছি, তোফায়েল ভাই, হানিফ ভাই বললেন দেখা না এটা! আমি তাদের দেখাইনি। ঘণ্টাখানেক পর মিটিং শেষে আমার বন্ধু সোহেল আর আমি ছবি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সামনে গেলাম। উনি ছবি দেখে অবাক, আহা রে আমার মনটা টেনে নিল রে! আমার এখানে বিদেশিরা আসে, এখানেই এ ছবি টানানো হবে। টানানো হলো।

 

আর্ট কলেজের রজতজয়ন্তীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আপনারা অতিথি করেছিলেন।

১৯৭৩ সালে আমি তখন আর্ট কলেজের ভিপি, ওই বছর রজতজয়ন্তী পালন হয়। সবাই আমাকে ধরল যে, বঙ্গবন্ধুকে আনতে হবে। অধ্যক্ষ ও অন্যান্য শিক্ষকসহ আমরা উনার কাছে গেলাম। উনি ৪০ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে অনুষ্ঠান উদ্বোধনের জন্য বলা হলো। উনি বললেন, ‘যাব; এক দিন যাব।’ উনি এসেছিলেন।

 

প্রথমবারের মতো আপনিই শাহবাগ রেডিও অফিসে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তুলেছিলেন।

১৬ ডিসেম্বর সকাল ৮টার দিকে বাড়ির ছাদে উঠে দেখি ক্যান্টনমেন্ট, টাঙ্গাইলের দিকে ধোঁয়া উড়ছে। গাড়ি-ঘোড়ার কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ দেখি একটা ট্রাক আমাদের রাস্তায় আসতেছে। তখন আমরা ১৪ জন মিলে পজিশন নিলাম। দেখি ট্রাক ঘোরাচ্ছে। ট্রাকের সামনে তিনজন পাকিস্তানি আর্মি বসা। ট্রাক ঘোরানোর চেষ্টা করছে, পারছে না। আমাদের লুঙ্গি পরা কোমরে গামছা পিঠে স্টেনগান। ট্রাকের সামনে এগিয়ে গেলাম, সালাম দিলাম, ক্যায়া ভাই পাকিস্তান জিন্দাবাদ। ওরা আমাদের ডাকলেন। সঙ্গীদের বলে দিয়েছি, যদি আমাকে ধরে তাহলে ওদের মেরে দিবা। ওরা বলে, মোহাম্মদপুর কেদার হে। আমি বললাম এদার হে। কাছে গিয়ে দেখি একজন ক্যাপ্টেন, অন্যরা উনার গার্ড। আমার সাহস বেড়ে গেল, বললাম জয়-বাংলা। তারপর ওরা মনে এক গেয়ারে মিরপুর চলে গেল। আমরা হতভম্ব হয়ে গেছি। আমাদের জয়-বাংলা স্লোগান শুনে স্টাফ কোয়ার্টার থেকে শত শত মানুষ বের হয়ে এলো। আমরা গ্রিনরোডের দিকে এগিয়ে দেখি ফাঁকা। সামনে ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধা আর পেছনে আট নয় হাজার মানুষ স্লোগান দিচ্ছে জয়-বাংলা, বাংলাদেশ। তখন হঠাৎ আমার মাথায় এলো, শেরাটন হোটেলে অনেক বিদেশি সাংবাদিক রয়েছেন, ওদের দেখাই যে আমরা দখল করে ফেলছি।

আমরা সায়েন্স ল্যাবরেটরি হয়ে যেখানে ল্যাবএইড হয়েছে ওখানে এসে দেখি একটা মিলিটারির গাড়ি আসছে। সব পাক আর্মি। আমরা পজিশন নিলাম। আমরা সামনে ছয়জন, পেছনে ছয়জন। যাতে ওরা ফায়ার করলে সবাই না মরি। একবার মনে হচ্ছে ওরা ফায়ার করবে। সাধারণ মানুষ গাড়িটি ঘিরে ফেলল। ওরা তখন রাইফেলে সাদা রুমাল বেঁধে জানালা দিয়ে বাইরে উড়াচ্ছে। আমি সামনে গেলাম, ওরা হাত উঁচু করে সারেন্ডার করল। এক পঞ্চাশ পঞ্চান্ন বছরের অফিসার গাড়ি থেকে নামলেন। আমি তাকে স্যালুট দিলাম। তিনি তার পিস্তল আমার হাতে দিয়ে সারেন্ডার করলেন। তার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। ওই মুহূর্তে এক জনতা এসে স্যান্ডেল দিয়ে অফিসারের মুখে দিল বাড়ি। ওরা তো ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। তারপর তারা সব অস্ত্র রেখে ক্যান্টনমেন্টে চলে যায়। পরে ইয়াংম্যান সব অস্ত্র নিল। আমরা দৌড়ে শাহবাগ পৌঁছে গোলচক্করে দাঁড়িয়ে জয়-বাংলা স্লোগান দিচ্ছি। পৌনে ১১টা বাজে। হঠাৎ দেখলাম রেডিও অফিসের ওপরে পাকিস্তানের পতাকা উড়ছে। কপাল ভালো, আমাদেরই ছোটভাই মফিক (১৩ বছর বয়স)। ও ম্যাপওয়ালা বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে শাহবাগ গিয়েছিল। ওর হাত থেকে পতাকাটা নিয়ে ওয়াল টপকালাম। নিচে দেখি আর্মি। ওরা যে কোনো মুহূর্তে গুলি করতে পারে। আমি একটু ভয় পাইলাম। পরে খেয়াল করলাম আর্মিরাই ভয় পাইয়া হাত উঁচু করে সারেন্ডার করছে। স্লোগান এত জোরে হচ্ছিল যে ওরা নার্ভাস হয়ে যাচ্ছিল। ওই সময় শেরাটন হোটেলের এক কর্মী বলল, স্যার আমি আসব, আমি চিনি কীভাবে ছাদে উঠতে হয়। ও আসল। উপরে উঠে দেখি রেডিওর এক কর্মী ছাদে রয়ে গেছে। আমি জয়-বাংলা বলে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে আবারও জয়-বাংলা বলে বাংলাদেশের পতাকা উড়ালাম। ঠিক ওই সময় পিজি হাসপাতালের ছাদ থেকে ফায়ার শুরু হলো। তখন ওই ছেলে দুটো মারা যায়। নয় মাস যুদ্ধের সময় আমার সহযোদ্ধা একজন মাত্র মারা যায়, কিন্তু সেদিন শাহবাগে মারা যায় ১৩ জন। এমনকি মফিকও মারা যায়। মফিকের জন্য আজও খারাপ লাগে।

 

স্বাধীনতার পর আপনি তো নিউজিল্যান্ডে বৃত্তি পেয়েছিলেন?

স্কলারশিপের কাহিনীটা মারাত্মক। আমি জানি না অন্যরা কী ভাবে। কিন্তু ওই সময় বাংলাদেশ আমার জন্য বেহেশত। বিজয়, নতুন দেশ। কী সব নিউজিল্যান্ড থেকে স্কলারশিপ! কে যায়, এত সুন্দর দেশ থেকে? নিউজিল্যান্ড থেকে স্কলারশিপ দিছে আর্ট কলেজে। এর মধ্যে আর্ট কলেজ থেকে দুটো অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। গোল্ড মেডেল। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই স্কলারশিপের তালিকায় আমার নাম গিয়েছে। আমি এক দিন আর্ট কলেজে যাচ্ছি, এমন সময় প্রিন্সিপাল স্যার আমাকে ডেকে বললেন, শাহাবুদ্দিন তোমার একটা ভালো খবর আছে। তারপর উনি বললেন, নিউজিল্যান্ডে তোমার নাম দিয়ে দিয়েছি। সাংঘাতিক সভ্য দেশ। আমি গেছি উল্টা খ্যাইপা। আমি বললাম, স্যার, আমার পারমিশন ছাড়া কেন নাম দিয়েছেন। স্যার বললেন, তোমার ভালোর জন্য দিলাম। আমি উনার মুখের ওপর বলে দিলাম যাব না। নিউজিল্যান্ড কোনো দেশ হলো! বাংলাদেশ হাজারগুণে বেটার। স্যার তো থতমত খেয়ে গেল। উনি শিক্ষামন্ত্রী ইউসুফ আলীকে টেলিফোন করে বললেন, শাহাবুদ্দিন নিউজিল্যান্ড যাবে না। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে আমি ১২টি ছবির প্রদর্শনী করলাম। সবগুলো বিক্রি হলো ২৭ হাজার টাকা। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ওই টাকা জমা দিতে গেলাম। অনেক মানুষের ভিড়। আমি বঙ্গবন্ধুর কাছে যেতেই আমার চুল ধরল। আমি বললাম কাকা এখানে আপনার জন্য একটি চেক আছে। চেক! উনি বললেন, এ টাকায় কী হবে রে। আমি বললাম, এরকম এক্সিবিশন করেছি, সেই ছবি বিক্রির টাকা। উনি বেশ অবাক হলেন। তুমি করেছ? তুই থেকে তুমি এসে গেল। তারপর বললেন, ‘এই টাকাটা তুমি তোমার বাবাকে দিয়ে দিও। ও সারা জীবন কষ্ট করেছে; এই টাকা দিয়ে আমার কিচ্ছু হবে না।’ আমি বললাম, না না তাহলে মানব না। যখন উনি চেকটা নিলেন তখন আমার দিকে আর তাকালেন না। ওই সময় উনি আমাকে বললেন, ‘তুই একবার সেক্রেটারিয়েটে আছিস তো।’ এক দিন গেলাম। সিকিউরিটি আমাকে ঢুকতে দিল না। বলল ভিতরে দুজন মন্ত্রী আছে। আমি বললাম কে কে? ওসমানী সাহেব আর ইউসুফ আলী সাহেব। আমি অপেক্ষা করছি। এর মধ্যে মহিউদ্দীন (বঙ্গবন্ধুর বডিগার্ড) দাঁড়াইয়া ছিল। ও হঠাৎ চা আনতে যায়। এই ফাঁকে ভিতরে ঢুকতে গেলাম। ও দৌড়ে এসে আমার হাত ধরে ফেলল। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু আমাকে দেখে বললেন, আয় আয়। আমি ভিতরে ঢুকে গেলাম। আমি পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তোফায়েল ভাই শুধু আমাকে সরে যেতে বলে। আমি সরি না। বঙ্গবন্ধু ফাইল সই করে ওসমানী সাহেব ও ইউসুফ আলী সাহেবকে বললেন, চা খাবেন। ওসমানী সাহেব বললেন, আমি চা খাব না, এখন যাই। বঙ্গবন্ধু বললেন, আপনার লোক। ওকে চেনেন। আমি ওসমানী সাহেবকে সালাম দিলাম। উনি আমি কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছি তা শুনলেন। উনি চলে গেলে ইউসুফ আলী সাহেব নিজ থেকেই বললেন, ‘শাহাবুদ্দিনকে আমরা এত আদর করি। ও আমাকে মানল না। অপমান করল। ওকে নিউজিল্যান্ডে স্কলারশিপ দিলাম, ও গেল না।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘কোথায় বললে তুমি?’ উনি বললেন, নিউজিল্যান্ড। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘নিউজিল্যান্ড একটা দেশ হলো?’ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শাহাবুদ্দিনকে পিকাসোর দেশে পাঠাতে হবে। যাবি, যাবা না! তুই জয়নুল আবেদিনের চেয়ে বড় হতে পারবি না! পিকাসোকে মার দিতে পারবি না! তোরা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিস। পারবি। যা। প্যারিসে যাবি। একদিন বড় শিল্পী হবি।’ উনার কথা শুনে আমার শরীর ঘেমে গেল। ভাবলাম বঙ্গবন্ধু কয় কী! জয়নুল আবেদিনকে মার দিতে পারবি না। পিকাসোকে মার দিতে পারবি না! উনি আবার বললেন, ‘যাবি তো।’ আমি বললাম, নিশ্চয় যাব।

 

প্যারিসে যাওয়ার পর আপনার শিল্পকর্মের আঙ্গিক ও উপস্থাপনার ব্যাপক উৎকর্ষ লাভ করেছে।

প্যারিসে গিয়ে প্রথমদিকে আমার বেশ কষ্ট হয়েছে। নিজের হাতে দেশ স্বাধীন করলাম। সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনায়। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে আমি বেশ মুষড়ে পড়েছিলাম। তারপর আবার ছবি আঁকায় মন দিলাম। ওই সময় আমি নিজস্ব একটি আঙ্গিক তৈরির চেষ্টা করছিলাম। তা ছাড়া প্যারিসে না থাকলে পেইন্টিংয়ের নতুন নতুন সব কলাকৌশলগুলো জানতে পারতাম না। মুক্তিযুদ্ধই আমার শিল্পকর্মের প্রেরণা।

 

আপনার পরিবার আপনাকে কতখানি সহযোগিতা করে?

আমি খুব ভাগ্যবান। আমার স্ত্রী আনা ইসলাম এবং সন্তান চর্যা ও চিত্র আমাকে দারুণভাবে সহযোগিতা করে। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাদের ভীষণ দুর্বলতা। আমার প্রদর্শনীর আয়োজন সবকিছু আনাই করে। স্বামীর কাজের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা। সন্তানরাও আমার শিল্পচর্চাকে সম্মান করে।

up-arrow