আবুল কাসেম ফজলুল হক বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক, লেখক, গবেষক, ইতিহাসবিদ, অনুবাদক, সমাজ বিশ্লেষক, সাহিত্য সমালোচক ও রাষ্ট্রচিন্তক। তাঁর সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার কাজী সোহাগ
বাংলাদেশ প্রতিদিন : বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
আবুল কাসেম ফজলুল হক : জনজীবনে অন্তহীন সমস্যা আছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বা প্রধান সমস্যাসমূহ সমাধানের লক্ষ্য স্থির করতে হবে। এজন্য একটা দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির ভিত্তিতে স্বল্পমেয়াদি কর্মসূচি নিয়ে কাজ করতে হবে। পাঁচ বছর পরপর বাংলাদেশে নির্বাচনের বিধান আছে। কাজেই স্বল্পমেয়াদি কর্মসূচি এ পাঁচ বছরকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত। আর দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি ১৫ বছর, ২০ বছর এ রকম মেয়াদের হওয়া উচিত। বাংলাদেশের বাস্তবতায় কথা বলছি। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, প্রশাসনব্যবস্থার সংস্কার, বিচারব্যবস্থা ও আইনকানুনের সংস্কার ইত্যাদি অপরিহার্য। সংস্কারের মাধ্যমে রাতারাতি সমস্যাগুলোর সমাধান করা যাবে না। সময় লাগবে। কিন্তু কাজ করে করে এগোতে হবে। আর রাজনীতিতে দুর্নীতির যে দৃষ্টান্ত বিশেষ করে ১৯৭২ সাল থেকে দেখে আসছি, এটা পর্যায়ক্রমে কমাতে হবে। জনগণের মধ্যে ধারণা সৃষ্টি করতে হবে যে বিএনপি এবং বিএনপি সরকার এ সমস্যাবলি সমাধানের ব্যাপারে আন্তরিক। সরকারকে কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে সরকার জনগণের।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : ১৮ মাস পর সংসদীয় গণতন্ত্রে আবার প্রবেশ করলাম। এই গণতন্ত্রে একটা নতুন স্ট্রাকচার তৈরি হয়েছে। যেখানে জামায়াত প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংসদীয় গণতন্ত্রের চিত্রপটটা কেমন হতে পারে?
আবুল কাসেম ফজলুল হক : এখানে একটা বিষয় বিবেচ্য। আমাদের দেশে গণতন্ত্র সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন কোনো ধারণা নেই। গণতন্ত্র কী এবং গণতন্ত্র কী নয়, এ সম্পর্কে একটা ধারণা লিখিত পুস্তিকা আকারে জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করতে হবে। গণতন্ত্র রাতারাতি প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারটা একটা আদর্শ গণতন্ত্র নয়। কিন্তু আমরা বাস্তবায়িত করব এবং পর্যায়ক্রমে গণতান্ত্রিক আদর্শে পৌঁছব, এ লক্ষণ নিয়ে কাজ করতে হবে। এভাবে গণতন্ত্র কী এবং গণতন্ত্র কী নয়, বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্রের রূপ ও প্রকৃতি কী হবে; এ বিষয়ে লিখিত পুস্তক অথবা পুস্তিকা আকারে বক্তব্য না দিলে গণতন্ত্র প্রকৃতপক্ষে অর্থপূর্ণ হয় না।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : এটা দেওয়ার দায়িত্ব কার?
আবুল কাসেম ফজলুল হক : প্রত্যেকে তাদের দল থেকে এটা প্রচার করবেন। যাঁরা রাজনীতির নেতৃত্বে থাকবেন তাঁদের ব্যক্তিগত লেখার মাধ্যমেও এ বক্তব্য প্রকাশ করতে হবে। তা ছাড়া একটা দলের সঙ্গে নানান সংগঠন থাকে। শাখা সংগঠন যেমন শ্রমিকদের সংগঠন, ছাত্রদের সংগঠন, কৃষকদের সংগঠন ইত্যাদি। এসব সংগঠনের পক্ষ থেকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তারা কী করবে এবং কী করবে না সে বিষয়ে পরিচ্ছন্ন বক্তব্য দিতে হবে। এটা আমি ছাড়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তিকেই দেখি না চিন্তা করতে। এভাবে কেউ বলেনও না। কিন্তু এ কথাটা বহুদিন ধরে বলে আসছি এবং লিখে আসছি। এখন দুই বছর ধরে আমি আর লিখছি না।
আমাদের রাজনীতিতে নৈতিক চেতনার নিদারুণ অভাব আছে। নৈতিক চেতনার অভাবের কারণেই পরিচ্ছন্নভাবে গণতন্ত্র সম্পর্কে কোনো বক্তব্য না দিয়ে গণতন্ত্র শুধু কথার কথা হিসেবে থাকে। দেশে কয়েক বছর ধরে একটা শান্তিপূর্ণ অবস্থা যাচ্ছে। সংঘাত-সংঘর্ষ আছে কিন্তু আগে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে এবং একদলের সঙ্গে অন্য দলের যে সংঘাত-সংঘর্ষ, খুনখারাবি-মারামারি হতো সেটা এখন প্রায়ই ঘটে না। জনগণের ভিতর থেকে এসে রাজনৈতিক নেতারা কাজ করবেন। এগুলো গণতান্ত্রিক আদর্শের কতগুলো বেসিক নীতি। কিন্তু এ নীতিগুলো আমাদের দেশে কোনো রাজনৈতিক নেতা, কোনো রাজনৈতিক দল প্রচার করেনি। শেরেবাংলা ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ তিনজনই তো আমাদের বড় নেতা। আরও অনেক নেতা আছেন তাঁরাও প্রভাবশালী, গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ তিনজন বলা যায়, আমাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতা। জনগণের জন্য, জনগণের কল্যাণে তাঁদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। অন্যদেরও আছে। মৌখিক রাজনীতির মধ্যে অগ্রগতি-জাতীয় সংসদ থেকে কিছু বিষয় পাওয়া যায়। কিন্তু আমরা যে গণতন্ত্রের দিকে যেতে চাই সে রকম গণতন্ত্রের ধারণা জাতীয় সংসদ থেকেও কমই বলা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সংবিধান প্রণয়নকে কেন্দ্র করে কিছু কথা হয়েছে। কিন্তু সন্তোষজনক পর্যায়ে হয়নি। ১৯৭২ সাল থেকে এ ধারার মৌলিকতা ধীরে ধীরে হারিয়েছে। সুবিধাবাদ বলে যে কথাটা বলা হয়, ইংরেজিতে অপরচুনিজম এটা হয়ে গিয়েছিল। তো নানান কারণে আমাদের দেশের ভিতরকার এবং বাইরের বৃহৎ শক্তিগুলোর কারণে কিছুকাল ধরে, দীর্ঘ সময় নয়, বাংলাদেশে এক রকম মানে সংঘাত-সংঘর্ষ অনেক কমে গেছে। গুপ্তহত্যা-জাতীয় এক ধরনের হত্যাকাণ্ড এখনো বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় আছে এবং তার অনেক খবর দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। অনেক খবর প্রকাশিত হয় না।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আপনি কি এ ক্ষেত্রে মৌলবাদী শক্তির উত্থানকে মিন করছেন?
আবুল কাসেম ফজলুল হক : মৌলবাদী শক্তি-এ কথাটা এখন আগের মতো করে বলার অবস্থা নেই। মৌলবাদ বলে যে কথাটা বলা হতো সেটা কী এবং কী নয়, এটাও কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক মহল থেকে পরিষ্কার করা হয়নি। আমি যতটুকু দেখেছি সেটা হলো, মৌলবাদ কথাটা প্রথম জনসাধারণ ও সাধারণ শিক্ষিত মানুষ বুঝতে পারত না। মৌলবাদ এটা আবার কী! নানাভাবে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হতো তাতে আমার নিজের জীবন থেকে আমি বুঝেছি যে মৌলবাদ বলতে তারা বুঝিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীকে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীকে মৌলবাদী বলে আমার কখনো মনে হয়নি। ইসলামের কথা বলেছে, তারা খেলাফত প্রতিষ্ঠার কথাও বলেছে। কিন্তু তার মধ্যে পাশ্চাত্য বিদ্যা, পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞান এগুলোকে গ্রহণ করার কথাও তারা বলেছে। সেই অর্থেই তারা কেবল ১৪০০ বছর আগের খেলাফত রাষ্ট্র গঠনের মধ্যে চিন্তার সীমাবদ্ধতা রাখেনি। সেখানে জামায়াতকেও ইসলামসংক্রান্ত ব্যাপারে ধীরে ধীরে সুবিধাবাদী হয়ে উঠতে দেখা গেছে। চার-পাঁচ বছর ধরে তো জনগণকে ইসলামের কথা তারা একেবারেই বলে না।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : তাদের এ পরিবর্তনের কারণ কী?
আবুল কাসেম ফজলুল হক : গণতন্ত্রের ম্যানিফেস্টো আর এই যে জামায়াতে ইসলামীর ম্যানিফেস্টো এবং বক্তব্য, সবটাই বদলে গেছে। তাদের এখনকার নীতিনির্ধারকদের ধারণা যে এই যুগে ইসলামভিত্তিক রাজনীতি চলবে না। সেজন্য তাঁরা সেক্যুলার রাজনীতি অবলম্বন করে চলছেন। এ অবস্থায় কাকে আপনি মৌলবাদী বলবেন? এদিক দিয়ে বিবেচনা করলে জামায়াতে ইসলামীকে যদি মৌলবাদী বলা হয়, তাহলে অন্যান্য দলকেও কি মৌলবাদী বলা যায় না? এবারের নির্বাচনে জামায়াত উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো করেছে। আগামী বছরগুলোতে যদি জামায়াতকে আগের মতোই শুধু দেখা হয় এবং জামায়াতের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়, তাহলে পাঁচ বছর পরে যদি আবার নির্বাচন হয় তাহলে জামায়াত বর্তমানের চেয়ে আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : দেশের রাজনীতির পরিবর্তনটা কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?
আবুল কাসেম ফজলুল হক : আমরা পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। এই স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁদেরও একটা উচ্চ শিষ্টাচার ছিল। উচ্চতা ছিল। সেটা তো এখন নেই। আমি আশা করি, আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ তাঁদের দলের চরিত্র উন্নত করার চেষ্টা করবেন। রাজনীতির চরিত্র উন্নত করার চেষ্টা করবেন। সে ক্ষেত্রে আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রের মান আগের থেকে আরও বাড়বে বলে মনে করি। সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পরে আদর্শগত প্রশ্নে রাজনীতিতে একরকম শূন্যতা বিরাজ করছে। গণতন্ত্র কী, গণতন্ত্র কী নয় এ সম্পর্কে কয়েক বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউকে এবং আরও নানান দেশে নানান ভাষার যেসব বইপত্রের সংবাদ আমরা পাই; সেখানে দেখা যায় যে প্রতি ১০ বছরেই গণতন্ত্র সম্পর্কে কিছু নতুন বই লিখেছেন এবং যেগুলো তাদের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে। এখন অনেকটা ফ্রিস্টাইলে গণতন্ত্র চলছে। তার ফলে গোটা মানবজাতি একটা ক্রাইসিসের মুখোমুখি হবে। আমাদের বাংলাদেশ ক্রাইসিসমুক্ত হতে পারে ধীরে ধীরে যদি সেই নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারি। আমাদের দেশে জনচরিত্র নষ্ট হয়ে যায় যদি রাজনৈতিক চরিত্র রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে না থাকে। যাঁরা গণতন্ত্রের কথা বলেন, তাঁদের গণতন্ত্রের প্রকৃত স্বরূপ এবং এর নৈতিক ভিত্তিটি অনুধাবন করা জরুরি। দুর্নীতি দমন কি কেবল পুলিশি ব্যবস্থা, জেলখানা কিংবা ফাঁসি দিয়ে সম্ভব? ইতিহাস বলে, কেবল দণ্ডবিধি দিয়ে দুর্নীতি নির্মূল করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন গভীর নৈতিক জাগরণ। আমাদের প্রচলিত আইন ও নীতিগুলো নৈতিকতার কষাকষিতে কতটা উত্তীর্ণ, তা বিচার করা আজ সময়ের দাবি। নৈতিকতা কোনো স্থবির বিষয় নয়। এটি সময়ের প্রয়োজনে বিবর্তিত হয়। তবে এ পরিবর্তন মানুষের পোশাক বা স্টাইলের মতো দ্রুত নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার ফসল। সমাজ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর কল্যাণে এ নৈতিক পরিবর্তনের বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করা উচিত।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আপনি অতীতে বলেছেন, জিওপলিটিকসে বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে বা আগামীতে এই প্রভাবটা কী ধরনের হতে পারে?
আবুল কাসেম ফজলুল হক : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রভাবটা বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে পরাধীন করে ফেলবে। এখনকার পরাধীনতা আগের মতো না। আগে যেমন ইংরেজরা বাংলা-বিহার-ওড়িশা দখল করেছিল; তার পরে সারা ভারত দখল করেছিল। তার মধ্যে নানান কূটকৌশল ছিল। সেই কূটকৌশলের মধ্যে বাংলার যে শাসন এটা ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়েছিল এবং ইংরেজ শাসনে এগিয়েছিল। পরবর্তী ১০০ বছরের মধ্যে সমগ্র ভারত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন হয়। যেভাবে ইংরেজরা গোটা ভারতবর্ষকে তাদের অধীনে নিয়ে যায়, যেভাবে তারা শাসন চালায় সে রকমটা আর হবে না। এখনকার যে পরাধীনতা এবং সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদ এগুলোর প্রকৃতি ভিন্ন। এখন কূটকৌশলের মাধ্যমে এই রাষ্ট্রগুলোর সরকার গঠন, এই রাষ্ট্রগুলোর সংস্কৃতি, অর্থনীতি এ ব্যাপারগুলোকে তারা ডমিনেট করবে, কর্তৃত্ব করবে এবং দুর্বল জাতিগুলো তাদের অধীনে চলে যাবে। এই অধীনতার কষ্ট রাতারাতি বোঝা যাবে না। সময় লাগবে। অনেক কথা আছে বলার কিন্তু সেসব কথা এখন বলতে চাই না। আমরা আশা করতে চাই যে যাঁরা এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন, ক্ষমতাসীন আছেন, তাঁরা আমাদের রাজনীতির মান ধীরে ধীরে উন্নত করবেন এবং একটা উন্নতির ধারায় নিয়ে যাবেন।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : একটা সরকার পরিচালিত হয় রাজনীতিবিদ এবং আমলাদের সমন্বয়ে। এ দুটির মধ্যে আমরা দেখেছি সব সময় বিভেদ থাকে, বিভাজন থাকে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
আবুল কাসেম ফজলুল হক : আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসন ও রাজনীতির মধ্যে একটা ভারসাম্য থাকা অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আমলাতন্ত্র এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যে যে দূরত্ব বা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, তা রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো দুর্বল করে দিচ্ছে। অসম ক্ষমতা ও ‘কেরানি’প্রথা-আপনি সঠিকভাবেই বলেছেন যে ক্ষমতা যখন কেবল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হাতে কুক্ষিগত হয় এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে না, তখন প্রশাসনিক স্থবিরতা দেখা দেয়। এটি একটি একমুখী ব্যবস্থা তৈরি করে, যা সাধারণ মানুষের সেবা প্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। আমলারা প্রায়ই তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা (যেমন বিসিএস ক্যাডার) এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কারণে রাজনীতিবিদদের প্রতি এক ধরনের ‘অবজ্ঞার মনোভাব’ পোষণ করেন। অন্যদিকে রাজনীতিবিদরা জনগণের প্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও অনেক সময় আমলাদের ওপর অতি-নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এই পরনির্ভরশীলতা রাজনীতিবিদদের মধ্যে এক ধরনের হীনমন্যতা বা ভয়ের উদ্রেক করে। ক্ষমতার প্রধান উৎস হওয়া উচিত ‘নলেজ পাওয়ার’ (জ্ঞানের শক্তি) এবং ‘মরাল পাওয়ার’ (নৈতিক শক্তি)। শুধু দাপ্তরিক ফাইল বা পদের ক্ষমতা দিয়ে রাষ্ট্র চালানো সম্ভব নয়। একজন রাজনীতিবিদের যদি অগাধ জ্ঞান এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা না থাকে, তবে তিনি আমলাতন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান। ফলে রাষ্ট্রটি কার্যত একটি ‘আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়, যেখানে জনস্বার্থের চেয়ে প্রশাসনিক নিয়মাবলি বেশি গুরুত্ব পায়। আমলারা রাষ্ট্রের স্থায়ী সেবক এবং রাজনীতিবিদরা অস্থায়ী নীতিনির্ধারক। কিন্তু যখন আমলারা নিজেদের নীতিনির্ধারক ভাবতে শুরু করেন এবং রাজনীতিবিদরা প্রশাসনিক কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ বা প্রশাসনিক জ্ঞানের অভাব প্রদর্শন করেন, তখনই বিরোধ চরমে ওঠে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : এ চ্যালেঞ্জ কি বিএনপি ওতরাতে পারবে বলে মনে করেন?
আবুল কাসেম ফজলুল হক : যদি তাদের মধ্যে প্রবল ইচ্ছাশক্তি জাগ্রত হয় এবং সেই ইচ্ছাশক্তি পুঁজি করে তারা নিজেদের শ্রম ও মেধার সমন্বয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়, তবে সাফল্য নিশ্চিত। এটি রাতারাতি সম্ভব না হলেও ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় অবশ্যই অর্জনযোগ্য। অন্যদিকে বিরোধী দলের মূল লক্ষ্য যদি কেবল সরকারকে উৎখাত করা হয় এবং তারা নিজেদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত ও আদর্শিকভবে গড়ে তোলার চেষ্টায় অবহেলা করে, তবে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসবে না।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আমাদের রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির ব্যাপারে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
আবুল কাসেম ফজলুল হক : দুর্নীতি কথাটা ব্রিটিশ আমলেই আরম্ভ হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান এবং এইচ এম এরশাদের শাসনকালে দুর্নীতির অভিযোগ অত্যন্ত প্রকটভাবে উচ্চারিত হয়েছে। সেই সময়ে দুর্নীতির ভয়াবহতা জনমনে গভীর হতাশার সৃষ্টি করেছিল। বিশেষ করে তৎকালীন সরকারি পত্রিকা ‘বিচিত্রা’, যা সরকারি অর্থায়নে চললেও এক ধরনের ‘বিপ্লবী’ চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিল; পত্রিকাটি এমনভাবে জনমত তৈরি করেছিল যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান বাদে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, আমলাসহ সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরের মানুষ, মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত থেকে শুরু করে স্কুলের শিক্ষক পর্যন্ত দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলে চিত্রিত করা হয়েছিল। একটি সরকারি পত্রিকা যখন নিজ প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির কথা প্রচার করে এবং সরকার তাতে মৌন সমর্থন দেয়, তখন সমাজে এক চরম নৈরাজ্য ও নৈতিক অবক্ষয় এবং হতাশা তৈরি হয়। যখন একটি জাতির মধ্যে সামগ্রিক অনাস্থা ও হতাশা জন্ম নেয়, তখন সেই জাতির উন্নতির পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তবে আশার কথা হলো, গত এক দশকে দুর্নীতির সেই সর্বগ্রাসী রূপ কিছুটা হলেও স্তিমিত হয়েছে। মানুষের মধ্যে যে চরম হতাশা ছিল, তা আগের তুলনায় অনেকটা কমেছে। বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য, বিশেষ করে বিএনপির মতো দলগুলোর জন্য নলেজ-বেইজড পলিটিকস বা ‘জ্ঞানের চর্চা’ অত্যন্ত জরুরি। ক্ষমতায় যাওয়া বা দেশ পরিচালনার স্বপ্ন সার্থক করতে হলে তথ্য ও জ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ ঘটাতে হবে। আমাদের সুস্থ ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক বিকাশের পথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূমিকা আজ এক বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমা শক্তিগুলো চায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষ খেয়ে-পরে কোনোমতে টিকে থাকুক। তারা জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান বজায় রাখাকে সমর্থন করে ঠিকই, কিন্তু সেই দেশগুলো যাতে রাজনৈতিকভাবে এবং শিক্ষাদীক্ষার দিক দিয়ে শক্তিশালী বা আত্মনির্ভরশীল হয়ে না ওঠে, সেদিকে কড়া নজর রাখে। জ্ঞানবিজ্ঞান এবং উন্নত প্রযুক্তিচর্চার মাধ্যমে কোনো জাতি যখন প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হওয়ার পথে হাঁটে, তখন তা পশ্চিমা স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তারা চায় না এসব দেশ মেধার ভিত্তিতে বিশ্বমঞ্চে সমাসীন হোক। তাদের মূলনীতি হলো ‘ডমিন্যান্স অ্যান্ড ডিপেনডেন্স’। অর্থাৎ, তারা একদিকে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে আমাদের মতো দেশগুলোকে চিরকাল তাদের ওপর নির্ভরশীল করে রাখতে চায়। সাহায্য বা ঋণের মোড়কে তারা এমন এক ব্যবস্থার জাল বিস্তার করে, যেখানে রাজনৈতিক স্বকীয়তা বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশে এই গভীর রাজনৈতিক দর্শন বা ভূরাজনৈতিক মারপ্যাঁচ নিয়ে কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বা দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা খুব একটা দেখা যায় না। এই চিন্তাহীনতা আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের পথ আরও দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ করে তুলছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : এ প্রতিবন্ধকতা কি আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা ওতরাতে পারবেন বলে মনে করেন?
আবুল কাসেম ফজলুল হক : একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে কেবল রাজনীতিবিদদের একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয় বরং রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং ব্যবসায়ী সমাজের একটি সমন্বিত ঐক্য একান্ত প্রয়োজন। এ ঐক্যের মূল ভিত্তি হতে হবে একটি সুনির্দিষ্ট নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং উন্নয়নের যথার্থ লক্ষ্য। বর্তমানে বাংলাদেশে অনেক যোগ্য ব্যক্তি রয়েছেন যাঁরা রাজনীতির কলুষতা থেকে দূরে থাকছেন এবং এক ধরনের হতাশায় ভুগছেন। বিএনপি বা যেকোনো দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল চাইলে এ দক্ষ জনবলকে সম্পৃক্ত করে দেশের উন্নয়নকাঠামো নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে। বিগত বছরগুলোতে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দেশত্যাগের এক ভয়াবহ প্রবণতা দেখা গেছে। ইউরোপ, আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমাতে পারলেই যেন মুক্তি-এমন একটি নেতিবাচক ধারণা শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মনে গেঁথে গেছে। ‘বাংলাদেশে কিছু হবে না’ বা ‘বাঙালি জাতি হিসেবে পিছিয়ে পড়েছে’ এ ধরনের হীনমন্যতা সমাজকে গ্রাস করেছে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, কত বিপুলসংখ্যক মেধাবী মানুষ দেশ ছেড়ে অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান বা গবেষণা আজ পর্যন্ত কোনো অর্থনীতিবিদ বা রাজনৈতিক দল গুরুত্বের সঙ্গে করেনি। এই মেধা পাচার রোধ এবং দক্ষদের দেশমুখী করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। যারা বাংলাদেশে বাস করে প্রায়ই বলেন যে বাংলাদেশ কোনো দিন ভালো হবে না। বাঙালি মানুষ না। বাঙালি অমানুষ। এর চরিত্র উন্নত হবে না। এ রকম ধারণা নিয়ে যারা চলেন তারা বিদেশে চলে যেতে চান। অন্তত ছেলেমেয়েদের ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ায় নাগরিকত্ব দিতে চান।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : সার্বিক এই পরিস্থিতিতে আপনি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চান?
আবুল কাসেম ফজলুল হক : ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে দেখার আকাক্সক্ষা আমাদের সবার। তবে এই রূপান্তর রাতারাতি সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত এবং পর্যায়ক্রমিক উন্নয়ন। এই যাত্রার শুরুটা দ্রুত হতে পারে, কিন্তু লক্ষ্যপানে পৌঁছতে হবে ধাপে ধাপে। এ পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো জনমনে আশার সঞ্চার করা, আর এ দায়িত্ব মূলত নেতৃত্বের। এখানে নেতৃত্ব বলতে কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকেও বোঝায়। আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষিত ও জ্ঞানী মানুষের অভাব নেই, কিন্তু অভাব রয়েছে ‘ইন্টেলেকচুয়াল ক্যারেক্টার’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক চরিত্রের। প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও মেরুদণ্ডসম্পন্ন মানুষ আমাদের সমাজে আজ বড্ড কম। যাঁদের মধ্যে এই চারিত্রিক দৃঢ়তা আছে, তাঁরাও অনেক সময় প্রতিকূল পরিবেশের কারণে এগোতে পারেন না। আমাদের সমাজের একটি নেতিবাচক প্রবণতা হলো, কেউ মর্যাদাবান হলে তাঁকে টেনে নিচে নামানো বা অপমানিত করা। দীর্ঘকালের অভ্যাসগত এ পরশ্রীকাতরতা ও ঈর্ষা আমাদের জাতীয় অগ্রগতির পথে বড় বাধা। তবে আশার কথা হলো, গত এক দশকে এই মানসিকতা কিছুটা হলেও কমতে শুরু করেছে। বৈশ্বিক রাজনীতির পরিবর্তনও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমল থেকে শুরু করে বর্তমান বিশ্বের যে বর্ণবাদী ও রক্ষণশীল নীতি, তা বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোকে আত্মনির্ভরশীল হতে শিখিয়েছে। অন্ধভাবে ইউরোপ বা আমেরিকায় পাড়ি জমানোর মোহ এখন বাস্তবতার মুখে ম্লান হয়ে আসছে। মানুষ এখন অনেক বেশি বাস্তববাদী হচ্ছে।সর্বোপরি, বাংলাদেশকে একটি প্রকৃত স্বাধীন জনগণের রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
আবুল কাসেম ফজলুল হক : আপনাকেও ধন্যবাদ।