অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস আমরা সরকারের কারণে ভয়াবহ চাপে ছিলাম। বৈষম্যবিরোধী নামধারী কিছু উচ্ছৃঙ্খল মানুষের মবের শিকার হয়েছি। বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক চাপেও ছিলাম। রাজনৈতিক দল ও বৈষম্যবিরোধীদের প্রতিনিধির পক্ষ থেকে আমাদের কাছে তালিকা আসতে থাকে। একেকটি বিশাল বড় বড় তালিকা।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮টি মাস বাংলাদেশ প্রতিদিনের খুব কষ্টে কেটেছে। এ সময় সম্মানিত পাঠকের অনেক ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা আমরা পূরণ করতে পারিনি। না পারার বিষয়টি আমাদের ইচ্ছাকৃত ছিল না; ছিল সার্বিক পরিস্থিতির কারণে। অর্থাৎ বাংলাদেশ প্রতিদিন নানান প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে প্রাণরক্ষার চেষ্টা করেছে। আমরা মবের শিকার হয়েছি, নির্দিষ্ট কোটার নিউজপ্রিন্ট পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছি। পত্রিকার অন্যতম প্রাণশক্তি ‘বিজ্ঞাপন’ বন্ধ করেছে রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে। সার্বিক পরিস্থিতি যদি একবাক্যে বলতে হয় তাহলে বলা যায়, আমরা অনেকটা গভীর পানিতে শুধু নাকটা ভাসিয়ে বেঁচে ছিলাম। মহান আল্লাহর অসীম রহমত এবং বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের দিকনির্দেশনা, অনুপ্রেরণা ও সার্বিক সহায়তায় আমরা টিকে আছি। ১৮ মাসে আমরা সরকার, রাজনৈতিক ও বিভিন্ন প্রেশার গ্রুপের কী ভয়াবহ চাপে ছিলাম, সেই দুর্বিষহ সময়ের নানান কাহিনি পাঠককে বিস্তারিত জানানো খুবই জরুরি মনে করছি।
শুরুটা করতে চাই ১৮ মাসের শেষ সময়ের দুটি ঘটনা দিয়ে। প্রায় ১৬ বছর ভোট না হওয়া দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হলো। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভূমিধস বিজয় হয়েছে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশে নিচে, একটু ভিন্ন আঙ্গিকে নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠান হয়েছে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। দেশিবিদেশি ১২০০ অতিথি এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সম্পাদক/প্রধান সম্পাদক এবং নিউজ এজেন্সি ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রধানগণের মধ্যে ২৩টি আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সরকার গঠন ও রাষ্ট্রাচার শাখা এবং তথ্য মন্ত্রণালয় এসব নামের তালিকা চূড়ান্ত করে। প্রচারসংখ্যায় বাংলাদেশ প্রতিদিন গত ১৪ বছর ১ নম্বর স্থান ধরে রেখেছে। সরকারের খাতায় গত ১৮ মাসেও ১ নম্বরেই আছে। অথচ অত্যন্ত পরিতাপ ও দুঃখজনক হলো, শপথ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। প্রচারসংখ্যায় শীর্ষে থাকার পরও তথ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ প্রতিদিনের নাম বাদ দিয়ে তালিকা তৈরি করেছে। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, মহান ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর বিশেষ ক্রোড়পত্র না দেওয়া। নতুন সরকারের সময়ে ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হলেও, দায় পুরোটাই বিগত সরকার এবং তার তথ্য মন্ত্রণালয়ের। কারণ সরকার শপথ গ্রহণ করেছে ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার। বুধবার ও বৃহস্পতিবার নতুন মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তথ্য মন্ত্রণালয় বিশেষ ক্রোড়পত্রের তালিকা চূড়ান্ত করে। শুক্রবার বন্ধ। শনিবার ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি। তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানা তাঁর মনমতো তালিকা তৈরি করে ক্রোড়পত্র বিতরণ করেন। সে তালিকায় বাংলাদেশ প্রতিদিনের নাম ছিল না। বিষয়টি মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনকে অবগত করলে তিনি রীতিমতো বিস্মিত হন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সচিব পদে পদোন্নতি পাওয়া তথ্য সচিব মাহবুবা ফারজানা নতুন সরকারের যাত্রাতেই মন্ত্রীকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করলেন। বর্তমান তথ্য সচিব ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন। ইতোমধ্যে তিনি নাহিদ ইসলাম, মাহফুজ আলম ও সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের অধীনে কাজ করেছেন। কাজ বলতে যা বোঝায় তা হলো, তিনি মূলত তিন উপদেষ্টার প্রটোকল করেছেন। সচিব হিসেবে মর্যাদার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। অবশ্য এর কারণও আছে। তিনি ইতঃপূর্বে কোনো মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বশীল পদে কাজ করেননি। ২০১৯ সালে তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে উপসচিব ছিলেন। এর পরে কোনো মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিব বা অতিরিক্ত সচিব পদে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ডেস্কে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর নেই। তাই উপদেষ্টাদের প্রটোকল করা ছাড়া তাঁর কোনো উপায় ছিল না। এই তিন উপদেষ্টা ও সচিব শুরু থেকেই বাংলাদেশ প্রতিদিনকে লাল তালিকাভুক্ত করেন। সে কারণে গত ১৮ মাস বাংলাদেশ প্রতিদিন যৌক্তিকভাবে প্রাপ্য অধিকারগুলো থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়েছে। আমাদেরও দুর্বিষহ সময় অতিক্রান্ত করতে হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে সরকারি কোনো ক্রোড়পত্র দেওয়া হয়নি। গত ৫ আগস্ট জুলাই অভ্যুত্থান দিবসে দেশের ১৭০টি দৈনিক পত্রিকায় বিশেষ ক্রোড়পত্র দেওয়া হলেও বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া হয়নি। একইভাবে ১৬ ডিসেম্বর বা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ভিত্তিক যেসব ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর একটিও আমরা পাইনি। শুধু বিশেষ ক্রোড়পত্র নয়, কেন্দ্রীয়ভাবে সরকারের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা, মাঠ প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বিজ্ঞাপন প্রদানে অনীহা প্রকাশ করেন। এ সময়ের মধ্যে একটি জেলার একজন পুলিশ কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনে একটি বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। বিজ্ঞাপনটি ছাপা হওয়ার পর তাঁর রেঞ্জের ডিআইজি তাঁকে এই বলে শাসিয়েছেন যে, কেন তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন? কোনো কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বকেয়া বিজ্ঞাপন বিল প্রদানেও বিরত থাকে। এমনকি দেশের সব প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকের জন্য ন্যায্যতার বিবেচনায় যেসব অধিকার পাওয়ার কথা, সেসব অধিকার থেকেও আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। সারা দেশে আমাদের প্রতিনিধিগণও পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধাগ্রস্ত হয়েছেন। তবে আমরা সবকিছু সহ্য করে টিকে থাকার চেষ্টা করেছি। সেই সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বাংলাদেশ প্রতিদিনের স্বাভাবিক পথচলায় যিনি বা যাঁরা বাধা সৃষ্টি করেছেন, আমরা তাঁদের একটি তালিকাও প্রস্তুত করে রেখেছি।
কেন বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য ন্যায্য সুবিধা থেকে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, তা জানার জন্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ করতে আমাদের সিনিয়র রিপোর্টার মানিক মুনতাসিরকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। মানিক যথারীতি নাহিদ ইসলামের একান্ত সচিব আর এইচ এম আলাউল কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হলে লিখিত দরখাস্ত করতে হবে। সাক্ষাৎপ্রার্থী আরও ৪০টি আবেদন এখনো অপেক্ষমাণ। ওই ৪০ জনের পর সাক্ষাতের সময় দেওয়া যেতে পারে। তবে সেটা কয় মাস লাগবে বলা যাবে না। একান্ত সচিবের কথা শুনে আমি রীতিমতো হতবাক হয়েছিলাম। তথ্য উপদেষ্টার কাজ গণমাধ্যম নিয়ে। সাংবাদিকরা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এটাই স্বাভাবিক। এর জন্য একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদককে সাক্ষাৎ প্রার্থনা করে আবেদন করতে হবে এবং সেই সাক্ষাৎ কত দিনে পাওয়া যাবে সেটাও নিশ্চিত নয়। এমন এক পাগলা রাজার দেশে আমরা ১৮ মাস বসবাস করেছি। যেহেতু চাকরি আন্দোলন করতে গিয়ে অকল্পনীয় সৌভাগ্যসূত্রে মন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেও লিখিত আবেদন করতে হবে, জেনে নিজেকে অত নিচে নামাতে চাইনি। সাক্ষাতের জন্য আবেদনও করিনি।
ওই উপদেষ্টা রাজনৈতিক দল গঠন করার কারণে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিলেন এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেন আরেক ছাত্র প্রতিনিধি মাহফুজ আলম। ভেবেছিলাম নতুন উপদেষ্টা তাঁর পূর্বসূরির পথ অনুসরণ না করে সবার জন্য ন্যায্যতার বন্দোবস্ত করবেন। কিন্তু না, তিনি আমাদের ব্যাপারে আরও এক কাঠি ওপরে। তাঁর কাছ থেকেও আমরা কোনো সহায়তা পেলাম না। অবশেষে আবার উদ্যোগ নিয়েছিলাম প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে বিস্তারিত জানানোর। সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে শফিকুল আলম সময় দিলেন এবং তাঁর বাসায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। একজন সাংবাদিকের কাছ থেকে এমন সৌজন্যই কাঙ্ক্ষিত ছিল। অবশেষে দুজন সহকর্মীকে নিয়ে শফিক সাহেবের সরকারি বাসায় গেলাম। তিনি অত্যন্ত সানন্দে এবং আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের স্বাগত জানালেন। বাংলাদেশ প্রতিদিন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা বিস্তারিত তাঁকে জানালাম। সবকিছু শুনে তিনি সমব্যথী হলেন এবং ভবিষ্যতে যেন এমন আর না হয়, সে ব্যাপারে দৃষ্টি রাখার চেষ্টা করবেন বলে আশ্বস্ত করলেন। তিনি পরে কতটুকু করার চেষ্টা করেছেন জানি না। তবে অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরং আরও অবনতি হয়েছে। পরে খোঁজখবর নিয়ে জানলাম প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের উপ প্রেস সচিব আজাদ মজুমদার নাকি বাংলাদেশ প্রতিদিনের নাম শুনলেই খেপে যেতেন। তাঁর সঙ্গে উপদেষ্টা মাহফুজের খুব মধুর সম্পর্ক। কী কারণে তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে সহ্য করতে পারতেন না, তা আমরা জানি না। তিনি সাংবাদিক ছিলেন। সাংবাদিকতা পেশার স্বল্পসংখ্যক মানুষ হয়তো তাঁকে চিনতেন। কারণ তিনি ছিলেন একটি ইংরেজি দৈনিকের স্পোর্টস রিপোর্টার। কিন্তু আমার সঙ্গে কখনো দেখা হয়েছে বা আমি তাঁকে চিনি, এমন কোনো স্মৃতি নেই। হতে পারে এটা আমার দুর্ভাগ্য। প্রেস উইংয়ে তাঁর নাম দেখে আমি আমার সহকর্মীদের প্রশ্ন করেছিলাম, ‘কে এই লোক’?
তারপর এলেন বিশিষ্ট পরিবেশ আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা হওয়ার পর আমাদের অশান্তি আরও বাড়ল। নানাভাবে আমাদের সমস্যার মধ্যে ফেলতে শুরু করলেন। প্রথম যে দুটি ঘটনা দিয়ে শুরু করেছিলাম সে দুটি তাঁরই অবদান।
১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আমাদের মানসিকভাবেও অনেক চাপ সহ্য করতে হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ ও ডেইলি সান মুদ্রণের জন্য অত্যাধুনিক প্রেস আছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার মধ্যে প্রেসের সীমানাও বিশাল। বলা যায় এটা একটি স্বতন্ত্র শিল্প ইউনিট। অত্যাধুনিক আটটি মেশিনসহ মুদ্রণ কাজের আরও অনেক মেশিন ও যন্ত্রপাতি আছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপি) এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আমাদের অফিস পরিদর্শনে আসেন। ডিএফপির ডিজি খালেদা বেগমসহ কর্মকর্তারা আসার পর আমরা তাঁদের উপযুক্ত মর্যাদায় স্বাগত জানাই। তাঁরা আমাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। আমাদের অফিসের বিভিন্ন শাখা ঘুরে দেখেন। আমরা ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন করি কি না তার খোঁজখবর নেন। আমরা তাঁদের সব প্রশ্নের উত্তর তথ্যপ্রমাণসহ উপস্থাপন করি। ওই দিন তাঁদের কথাবার্তায় মনে হলো, তাঁরা আমাদের অফিসে হয়তো আগে কেউ আসেননি। কারণ এত বড় মিডিয়া হাউস দেখে তাঁরা রীতিমতো বিস্মিত হন। আমাদের বিশাল এক ভবনে বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ, ডেইলি সান, নিউজ টোয়েন্টিফোর টেলিভিশন, টি স্পোর্টস টেলিভিশন, রেডিও ক্যাপিটাল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। তিনটি করে ইউনিট রয়েছে। অর্থাৎ অনলাইন ও মালটিমিডিয়া রয়েছে। এ ছাড়া আছে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজ ২৪। বিগত অনেক বছরই সেনাবাহিনীর ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্সের শিক্ষার্থীরা আমাদের অফিস পরিদর্শন করে বিস্মিত হয়েছেন। বাংলাদেশে এতগুলো মিডিয়া একটি দৃষ্টিনন্দন ভবনের মধ্যে অবস্থিত, যা তাঁরা ভাবতেই পারেননি। সেদিন খালেদা বেগমও একইভাবে অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন। তার পরও তাঁদের মধ্যে কেমন যেন একটু অস্বস্তির ভাব লক্ষ করলাম। অবশেষে তাঁরা বললেন আমাদের প্রেসে যাবেন। তাঁদের আগ্রহে আমরা আরও বেশি আগ্রহী হয়ে নিয়ে গেলাম। কারণ আমরা জানি, এত বড় প্রেস বাংলাদেশে আর কোনো মিডিয়া হাউসের নেই। প্রেস দেখেও তাঁরা বিস্মিত। এর পরও মনে হচ্ছে তারা কী যেন খুঁজছেন, কী যেন দেখতে চাচ্ছেন। তারপর তাঁদের মধ্য থেকে একজন জানতে চাইলেন প্রতিদিন কত কপি পত্রিকা মুদ্রিত হয়। এ তথ্য অবশ্য তাঁদের অফিস পরিদর্শনের সময় জানানো হয়েছে। তার পরও তাঁরা জানতে চাচ্ছেন। এ তথ্য সঠিক কি না তা তাঁরা মেশিনম্যানদের কাছে জিজ্ঞেস করেন, প্রেসের অন্য মেকানিক্যাল বিভাগের লোকদের কাছে জানতে চান। প্রিন্ট অর্ডার দেখতে চান। কত রোল কাগজ আছে তা দেখতে চান। তাঁদের এমন আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল তাঁরা যেন আমাদের কোনো বিচ্যুতি হাতেনাতে ধরতে এসেছেন। কিন্তু কোনোভাবেই সেদিন তাঁরা কোনো বিচ্যুতি ধরতে পারেননি। সে কারণে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল তাঁদের মন খুব খারাপ। তাঁরা আশাহত হয়েছেন। তাঁদের মিশন সফল হলো না।
এরপর মাহফুজ আলম যখন উপদেষ্টা, তখন রাত ২টার সময় ডিএফপি ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের একটি টিম হঠাৎ প্রেসে এসে হাজির! তাঁরা ঝটিকা অভিযানে আমাদের প্রেসে এসেছেন দেখার জন্য যে প্রকৃতপক্ষে আমাদের পত্রিকা কত কপি ছাপা হয়। সেদিন খবর পেয়ে ওই রাতে আমি প্রেসে যাই। তাঁদের কাছে জানতে চাই, কী কারণে তাঁরা বিনা নোটিসে এত রাতে প্রেসে এসেছেন। তখন ওই টিমে আমার পরিচিত একজন আমাকে একটু আড়ালে নিয়ে বললেন, ‘ভাই কিছু মনে করবেন না, আমি আপনাকে এখন যে কথাগুলো বলব, তা কখনই কাউকে বলবেন না। আপনারা এবিসি রিপোর্টে পত্রিকার মুদ্রণ সংখ্যা যা দেখিয়েছেন, প্রকৃতপক্ষে তা-ই ছাপেন কি না, সেটা যাচাই করার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের ওপর চাপ আছে। সার্কুলেশনে আপনারা ১ নম্বরে আছেন দীর্ঘদিন। উপদেষ্টা ও কয়েকটি পত্রিকার মালিক-সম্পাদক আপনাদের পজিশন নিচে নামানোর জন্য আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। বিশেষ করে একজন সম্পাদক, যিনি এখন বৈষম্যবিরোধীদের অভিভাবক বনে গেছেন, আমি নামটা বললাম না, আপনি বুঝে নেবেন। তাঁদের চাপে আমরা এখানে আসতে বাধ্য হয়েছি। আমরা তো প্রকৃত তথ্য ছাড়া এ কাজ করতে পারি না। তাই আসতে হলো। কিছু মনে করবেন না।’ ভদ্রলোকের কথা শুনে আমার খুব মায়া হলো। তাঁকে খুব অসহায়ও মনে হলো। বেচারা চাকরি রক্ষা করার জন্য রাত ২টায় দলবল নিয়ে আমাদের হাতেনাতে ধরতে প্রেসে হানা দিয়েছেন। আমি তখন তাঁদের ভালোভাবে কাজ করার ব্যবস্থা করার জন্য প্রেসের দায়িত্বপ্রাপ্তদের নির্দেশনা দিয়ে বাসায় চলে গেলাম। পরদিন সকালে জানলাম ছাপা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা প্রেসেই ছিলেন। কিন্তু কোনো ত্রুটি ধরতে পারলেন না। অবশেষে যা সত্যি তা-ই রিপোর্ট করেছেন। তবে ওই রিপোর্টে খুশি হতে পারেনি বিশেষ মহল। এভাবে আরও তিনবার গভীর রাতে প্রেসে হানা দিয়েছেন সরকারের কর্মকর্তারা। পরে আমরা খবর নিয়ে জানলাম, বাংলাদেশের আর কোনো পত্রিকা অফিস বা প্রেসে গত ১৮ মাসে ডিএফপি বা তথ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা হানা দেননি। শুধু ঢাকায় নয়, বগুড়াতেও আমাদের একটি প্রেস আছে। তথ্য মন্ত্রণালয় ও ডিএফপির প্রতিনিধি বগুড়া প্রেসও অতর্কিতে পরিদর্শন করেছেন। সেখানেও তাঁরা প্রেসসংশ্লিষ্টদের কাছে অনেক কিছু জানতে চেয়েছেন। বগুড়ায় কত কপি ছাপা হয়, ঢাকায় কত কপি পত্রিকা ছাপা হয় ইত্যাদি প্রশ্ন ছিল তাঁদের। আমাদের প্রকৃত অবস্থা অবদমন করার জন্য এমন নানান পন্থায় চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।
আমরা শুধু মানসিক চাপেই ছিলাম না। আমাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ এবং নিপীড়নও ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস আমাদের প্রাপ্য নিউজ প্রিন্টের কোটার কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ প্রতিদিনসহ বসুন্ধরা গ্রুপের কোনো পত্রিকাই নিউজ প্রিন্টের এলসি করতে পারেনি। সে কারণে পত্রিকাগুলো চালিয়ে রাখার জন্য বসুন্ধরা পেপার মিল অতিরিক্ত নিউজ প্রিন্ট উৎপাদন করে পত্রিকাগুলোকে সরবরাহ করে। এর ফলে বসুন্ধরা পেপার মিলকে অনেক ভর্তুকি দিতে হয়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে যত চাপই দেওয়া হোক না কেন, বাংলাদেশ প্রতিদিনসহ বসুন্ধরা গ্রুপের কোনো মিডিয়াতেই ১৮ মাসে কোনো বেতনভাতা বকেয়া পড়েনি। বরং ১৮ মাসে প্রায় ৪০০ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিটে মাল্টিমিডিয়া বিভাগ শক্তিশালী করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস আমরা সরকারের কারণে ভয়াবহ চাপে ছিলাম। বৈষম্যবিরোধী নামধারী কিছু উচ্ছৃঙ্খল মানুষের মবের শিকার হয়েছি। বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক চাপেও ছিলাম। রাজনৈতিক দল ও বৈষম্যবিরোধীদের প্রতিনিধির পক্ষ থেকে আমাদের কাছে তালিকা আসতে থাকে। একেকটি বিশাল বড় বড় তালিকা। কোনোটিতে ৫০ জনের নাম। কোনোটিতে ৭২ জনের নাম। কোনো তালিকা হলো বাংলাদেশ প্রতিদিন থেকে কোন কোন সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করতে হবে। কোনো তালিকা হলো কোন কোন সাংবাদিককে কোন কোন পদে কত টাকা বেতনে চাকরি দিতে হবে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের কোন কোন সাংবাদিক পতিত সরকারের দোসর, কে বিএনপি, কে জামায়াত, কে বৈষম্যবিরোধী ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার। আমরা বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাউকে চাকরিচ্যুত করিনি। এ সময়ে তিনজন জেলা প্রতিনিধি পরিবর্তন করা হয়েছে, যা ছিল নিতান্তই প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন।
এখন জাতীয়তাবাদী শক্তির অন্যতম আশ্রয়স্থল বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায়। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন। সে কারণেই বাকশাল শাসনামলে বন্ধ হওয়া সব গণমাধ্যমের শিকল খুলে দিয়েছিলেন। তাঁর সহধর্মিণী তিনবাবের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশে গণমাধ্যমের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করেছিলেন। তাঁদের পুত্র তারেক রহমান এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। একসময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা জহির উদ্দিন স্বপন তথ্যমন্ত্রী। বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাংবাদিক সমাজ তাঁদের কাছ থেকে গণমাধ্যমের যৌক্তিক স্বাধীনতা এবং মূল্যায়ন ও প্রাপ্যতা ন্যায্যতা প্রত্যাশা করে। আমরাও ন্যায্যতা প্রত্যাশা করি। আমরা কোনো ধরনের অযৌক্তিক বা অন্যায় বিশেষ সুবিধার দাবি করি না। বাংলাদেশ প্রতিদিন জনগণের পত্রিকা। বাংলাদেশ প্রতিদিন সব সময়ই জনগণের পক্ষে। সব শেষে আজকের বিশেষ দিনে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সব পাঠক, গ্রাহক, হকার, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন