অনির্বাচিত সরকারের দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এ ধরনের সরকার সামরিক সরকার নয় যে সামরিক বিধিবিধান জারি করে অনির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য দেশ পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। সবকিছুর একটি সীমা ও মেয়াদ থাকে।
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব যদি ভুল হাতে পড়ে, তাহলে তা তিন মাসের জন্য হোক, আঠারো মাসের জন্য হোক, অথবা সংবিধান অনুযায়ী পাঁচ বছরের জন্যই হোক না কেন, দেশের সর্বনাশ ঘটানোর জন্য যথেষ্ট। সদ্য সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর গ্রামীণ ব্যাংক এবং নোবেল পুরস্কার পাওয়ার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত ও খ্যাত ব্যক্তিত্ব। প্রতিটি মানুষের প্রকৃতি, মেধা, বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পার্থক্য থাকে এবং প্রত্যেকে যার যার নিজস্ব কর্মক্ষেত্রে যেভাবে স্বাচ্ছন্দ্য ও সফল হতে পারেন, সেটিকে সঠিকভাবে পরিচালনা করে মহিরুহেও পরিণত করতে পারেন। কিন্তু হঠাৎ যদি তাকে তার নিজস্ব বলয় থেকে সম্পূর্ণ অচেনা বলয়ে নিয়ে ফেলা হয়, যেখানে চর্চিত আচার-আচরণে তিনি পুরোপুরি অনভ্যস্ত, সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ, সেখানে মেধা খাটাতে গিয়ে তিনি অনেকটাই তালগোল পাকিয়ে ফেলবেন। সেটাই স্বাভাবিক। এবং তেমনটাই ঘটেছে। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে : ‘ইউ ক্যান নট পুট দ্য সেম সু অন এভরি ফুট’, যার মর্মার্থ হলো, ‘একটি ক্ষেত্রে সফলতা সর্ব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না’। ড. ইউনূস তাঁর গ্রামীণ ব্যাংকের অভিজ্ঞতা ও কর্মকৌশল সরকার পরিচালনায় ব্যবহার করতে চেষ্টা করেছিলেন। সেজন্য তিনি সব ক্ষেত্রে সফল হতে পারেননি। সংক্ষিপ্ত সময়ে তা সম্ভবও ছিল না।
চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের প্রচণ্ডতার মুখে ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পলায়ন ও তাঁর সরকারের পতনের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিপ্লবের সমন্বয়করা ও তাঁদের পরামর্শকরা জাতীয়ভাবে বিতর্কের ঊর্ধ্বে গ্রহণযোগ্য ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বেছে নিয়ে দুর্যোগ মুহূর্তে দেশের হাল ধরার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তিনি সাড়া দেওয়ায় দেশবাসী উচ্ছ্বসিত হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের সংবিধানে ‘অন্তর্বর্তী’ সরকারের কোনো বিধান নেই। ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তারা ভোট কারচুপি ও ফলাফল জালিয়াতির মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চেষ্টা করে, এ অভিযোগ ছিল বরাবরের। অতএব রাজনৈতিক দলগুলোর দাবির মুখে বিএনপি সরকার ১৯৯৬ সালে সংবিধানে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংযোজন করেছিল, যারা ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালে এ বিধান বাতিল করায় ড. ইউনূসের সরকার ‘তত্ত্বাবধায়ক’ সরকারও ছিল না।
অন্তর্বর্তী সরকারব্যবস্থাই একটি গোঁজামিল ছিল, যা আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য। এ গোঁজামিলের সমর্থনে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের গণ অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট এরশাদের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। তবে বাংলাদেশে এমন গোঁজামিলের দৃষ্টান্ত কেবল এ দুটোই নয়। সর্বপ্রথম গোঁজামিল ছিল বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের ‘গণপরিষদ’। ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান’-এর জন্য ‘ইসলামী সংবিধান’ প্রণয়নের লক্ষ্যে ১৯৭০ সালে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্যরা প্রণয়ন করেছিলেন ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’-এর ‘ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক’ সংবিধান। চ্যালেঞ্জ করার প্রশ্ন নেই, যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা তাদের মতো ব্যাখ্যা দিয়েই উতরে যায়। গোঁজামিলের ‘অন্তর্বর্তী সরকার’ ১৮ মাস রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, জুলাইয়ের বিপ্লবীদের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের উদ্দেশ্যে ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করার পর গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে বিদায় নিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে নিয়মিত কাজগুলো পরিচালনার পাশাপাশি অতিরিক্ত কাজ করা সম্ভব হয়েছে সেনাবাহিনী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিটি কাজে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছে বলে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস যাঁদের পরামর্শ নিয়েই উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করে থাকুন না কেন, উপদেষ্টা নির্বাচনে তিনি বিজ্ঞতার পরিচয় দিতে পারেননি। বেশ কজন উপদেষ্টাকে নিয়োগ করার পর তাঁদের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ ও অপসারণের দাবি ওঠা সত্ত্বেও তিনি তাঁদের অপসারণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল যে তাঁর হাত-পা কোথাও বাঁধা। জুলাই বিপ্লবের সমন্বয়ক ও তাঁদের বিপুল কর্মীবাহিনীর যে ঐক্য সাড়ে পনেরো বছরের দানবীয় শাসনের প্রাসাদ তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, তাঁদের সেই ঐক্য ভেঙে যাওয়ায় তাঁরা অন্তর্বর্তী সরকারে কোনো ভূমিকা রাখার অবস্থায় ছিলেন না। এ সুযোগে সরকারের সুযোগসন্ধানী উপদেষ্টারা বিভিন্ন বিধিবদ্ধ সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদে ইচ্ছেমতো তাঁদের অযোগ্য চামচা ও বশংবদদের বসিয়েছেন। এসব ব্যক্তির অযোগ্যতায় প্রতিষ্ঠানগুলো ১৮ মাসেই দেউলিয়া হয়ে পড়েছে এবং তাঁদের প্রায় প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনের পর কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে উপদেষ্টাদের পছন্দনীয় ব্যক্তিদের অত্যন্ত অসম্মানজকভাবে বিদায় করা হয়েছে। কারও কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাও দায়ের হয়েছে। উপদেষ্টাদের অনেকে যে ধোয়া তুলসী পাতা ছিলেন না, তা বেরিয়ে আসছে।
অনির্বাচিত সরকারের দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এ ধরনের সরকার সামরিক সরকার নয় যে সামরিক বিধিবিধান জারি করে অনির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য দেশ পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। সবকিছুর একটি সীমা ও মেয়াদ থাকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান করা হয়েছিল এবং তা সুষ্ঠুভাবে কাজ করে প্রমাণ করেছিল যে ৯০ দিনের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই সনদ প্রস্তুত করতে সময় নিয়েছে নয় মাস। এ সনদ প্রস্তুতকারীদের মাথায় ছিল না যে, বাংলাদেশের আস্ত সংবিধান প্রণয়ন এবং সেটি কার্যকর সময় লেগেছিল মাত্র নয় মাস। ‘জুলাই সনদ’ তৈরিতে এত দীর্ঘ সময় ব্যয় করা অনর্থক কালক্ষেপণ ও দেশ পরিচালনায় জটিলতা বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টির অপচেষ্টার অংশ ছিল বললে বোধহয় বাড়িয়ে বলা হবে না। ‘জুলাই সনদ’ ছাড়া সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয় বলে এক ধরনের জিকির তোলা না হলে অন্তর্বর্তী সরকার ৯০ দিনের স্থলে ১২০ দিন, অথবা সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করে সসম্মানে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে পারত।
বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে এমন দাবি সব সময় করা হয় নির্বাচন কমিশন কর্তৃক। নির্বাচনে যে রাজনৈতিক দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে তারাও নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করে; অন্যদিকে পরাজিত দলগুলো নির্বাচনে কারচুপি, জালিয়াতি, ব্যালট ছিনতাই, জালভোট প্রদান, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ফলাফল পরিবর্তন ইত্যাদি অভিযোগ তুলে নির্বাচন বাতিল, কোনো কোনো আসনে বা কেন্দ্রে ভোট পুনর্গণনা ইত্যাদির দাবি জানায়। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে এ ধারাবাহিকতা চলে আসছে। সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। নির্বাচন কমিশন ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সুন্দর’ নির্বাচন পরিচালনার দাবি করেছে এবং বিজয়ী দল বিএনপিও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের কারণে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। নির্বাচনের বেশ আগে থেকে দেশে এমন একটি আবহের সৃষ্টি হয়েছিল, বিএনপি নয়, জামায়াতে ইসলামীই সরকারে আসছে। আমার কাছে তা বরাবর অবাস্তব ও অতিশয়োক্তি বিবেচিত হলেও, জনগণের একটি অংশের মাঝে যে এ উচ্ছ্বাস ছিল, তা অস্বীকার করা যাবে না। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, জামায়াতের বেশ কিছু প্রার্থী, যাঁদের বিজয় নিশ্চিত ছিল, তাঁরা পরাজিত হয়েছেন।
সরকার গঠন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পেরে জামায়াত হতাশ হয়েছে এবং হতাশার চেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছে তাদের সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থীদের পরাজয়ে। অভিযোগ তুলেছে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর। তবু ফলাফল মেনে নিয়ে জাতীয় সংসদে দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা ও সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করার পাশাপাশি একটি ‘ছায়া সরকার’ গঠনের ইচ্ছার কথাও দেশবাসীকে জানিয়েছে। চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে জামায়াতের অভিযোগ যখন প্রায় প্রশমিত হয়ে গিয়েছিল, তখন সাবেক প্রভাবশালী উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এক সাক্ষাৎকারে মুখ ফসকে যে কথাটি বলেছেন, তাতে বোঝা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের ফলাফলে কারসাজি করেছে। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে রিজওয়ানা জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বলেন, তাঁরা জামায়াতে ইসলামীকে মেইনস্ট্রিম হতে দেননি। তাঁর মতে ‘তারা সংসদে বিরোধী দলে থাকলেও আমরা তাদের মেইনস্ট্রিমে আসতে দিইনি।’ সাবেক উপদেষ্টার বক্তব্যে এটা স্পষ্ট, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কারসাজিমুক্ত ছিল না।
আমরা ২০২৪-এর আগস্টে বাংলাদেশের চরম সংকটকালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণকারী অন্তর্বর্তী সরকারের যত সমালোচনাই করি না কেন, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হওয়ার পর তিনি তাঁর লক্ষ্য স্থির করেছিলেন গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে দেশে স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করার। কিন্তু নানামুখী চাপে তাঁর পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, উড়ালসড়ক, কর্ণফুলী টানেল ইত্যাদির মতো বিশাল বাজেটের বড় বড় দৃশ্যমান কিছু প্রকল্প হাতে নিয়ে তাদের সুবিধাভোগীদের অর্থ লুটপাটের দ্বার অবারিত করে দিয়েছিল। ফলে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। রিজার্ভ ছিল মাত্র ১৫ বিলিয়ন ডলার। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক সমস্যা আড়াল করতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর দমনপীড়ন চালিয়ে জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ চব্বিশের জুলাইয়ে মুখ্যত ঢাকাকেন্দ্রিক ছাত্র আন্দোলনকে প্রবল করে তুলেছিল ‘মারব অথবা মরব’ মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে। তা-ই করেছিল তারা। শেখ হাসিনা বিক্ষোভ দমনে তাঁর দল ও অঙ্গসংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে যে নিষ্ঠুরতা প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা তাঁর পলায়ন ত্বরান্বিত করেছিল। তিনি তাঁর নিজের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল যথাশীঘ্র সম্ভব জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করে জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা। প্রধান উপদেষ্টা এবং তাঁর উপদেষ্টারা যেহেতু রাজনীতিবিদ নন, অধিকাংশ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওর শীর্ষ ব্যক্তিত্ব, তাঁরা বুঝে উঠতে পারেননি অথবা কেউ তাঁদের সৎ-পরামর্শ দেননি, ধ্বংসপ্রায় অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনে মৌলিক সংস্কার সাধন করা তাঁদের কাজ নয়। তাঁরা তাঁদের মেয়াদের মধ্যে এসব গুরুদায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবেন না। বরং এসব করতে গেলে জটিলতা বৃদ্ধি পাবে এবং আওয়ামী লীগ ছাড়া দেশে সক্রিয় অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কাছেও তা গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হবে না, যা নির্বাচনের পর প্রমাণিত হয়েছে ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ ২০২৫’-এর ওপর গণভোটসংশ্লিষ্ট দ্বিতীয় শপথ না নেওয়া এবং গণভোট সম্পর্কে দলটির বেশ কিছুসংখ্যক কেন্দ্রীয় নেতার নেতিবাচক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে।
অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু বিষয়ে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম দ্রব্যমূল্যের লাগাম টেনে ধরতে না পারা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে না পারা। জুলাই বিপ্লব প্রতিহত করতে পুলিশবাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করায় দেড় হাজারের বেশি লোক নিহত এবং ২০ হাজারের বেশি আহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে। পুলিশকে এর খেসারত দিতে হয়েছে হাসিনার নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ায় এবং সেনাবাহিনী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোর ফলে। হত্যা ও জুলুমের প্রতিশোধ নিতে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে। কিছুসংখ্যক পুলিশ সদস্য হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। থানায় অগ্নিসংযোগ ও অস্ত্র লুণ্ঠনের ঘটনাও ঘটেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়ার পরও অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময় পর্যন্ত দেশে প্রকৃত অর্থে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরে আসেনি। এর ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসে ‘মব’ বা গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা এত বৃদ্ধি পেয়েছিল যে ‘মব কালচার’ দেশে আইন প্রয়োগকারীদের নিষ্ক্রিয়তা ও বিচারহীনতার প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার যেহেতু একটি সাময়িক সরকার, এমন একটি সরকারের সামনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখা, সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করা এবং বাজেট ঘাটতি কমানো বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বলে অর্থনীতিবিদরাও স্বীকার করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হাসিনা যুগের ১৫ বিলিয়ন থেকে ৩২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। একটি সাময়িক সরকারের পক্ষে বড় প্রকল্প গ্রহণ, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগের মতো বড় পরিসরে পদক্ষেপ গ্রহণ করা সংগত ছিল না এবং ড. ইউনূসের সরকার তা না করে বিচক্ষণতার পরিচয়ই দিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের একটি বড় সাফল্য ছিল ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)’ পুনর্গঠন এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সাড়ে ১৫ বছর যাবৎ দেশে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। দেশে এখন জনগণের নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তারা সবকিছু চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করে দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠে দেশকে জবাবদিহিমূলক সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারায় এগিয়ে নিয়ে যাবেন-এটাই জনগণের প্রত্যাশা।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক