মানুষের জীবনে কখনো কখনো এমন সময় আসে যখন কবিতার সৌন্দর্য, গানের সুর, চিত্রকর্মের মাধুর্য কিংবা চলচ্চিত্রের তৈরি করা বিহ্বলতার কোনো আবেদন থাকে না। তখন সব কিছুর কেন্দ্রে এসে দাঁড়ায় কেবল অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।
চলচ্চিত্রের বিপ্লবী দায়িত্ব গ্রহণের পরিক্রমায় ইতিহাসের অতি গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে আমরা পাই একজন জহির রায়হানকে। বাংলাদেশের জন্ম প্রক্রিয়াকে যদি সেলুলয়েডের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, তবে জহির রায়হান তার সবচেয়ে বড় পথিকৃৎ। পাশাপাশি জহির রায়হানের চলচ্চিত্রের বিবর্তন এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম অনেকটাই গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। বলা যায়, বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম পুরো যাত্রাটাকে কেউ চাইলে জহির রায়হানের চলচ্চিত্র দিয়েও বুঝে নিতে পারবে। বলা যায়, জহির রায়হানের চলচ্চিত্র ভাবনা ও বাংলাদেশের জন্ম এক সুতোয় বাঁধা।
‘জীবন থেকে নেয়া’ জহির রায়হানের সবচেয়ে আলোচিত ও ট্রেডমার্ক চলচ্চিত্র। এ যাবৎ ছবিটি নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। যখন আপনার মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়, যখন আপনার প্রতিটি পদক্ষেপে রাখা হয় নজরদারি, তখন কীভাবে আপনি নিজের কথা বলবেন, তার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত এই ছবিটি। নিছক সাধারণ এক পারিবারিক গল্পের আবহে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধাক্কা দিয়ে কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো ছবি এটা। প্রথম ছবি কখনো আসেনি-র মতো এই ছবির পোস্টারও ছিল চমকপ্রদ। যেখানে লেখা ছিল, ‘একটি সংসার, একটি চাবির গোছা, একটি আন্দোলন’। এটুকুই সম্ভবত পুরো ছবিটি নিয়ে বড় একটি বার্তা দিয়ে দেয়। রূপককে কোনো টেক্সটের কেন্দ্রে নিয়ে এসে কীভাবে মূল গল্পটাকে প্রান্তে ঠেলে দিয়ে নিজের বক্তব্য বলে ফেলা যায়, সেটি দুর্দান্ত মুন্শিয়ানায় দেখিয়ে দিয়েছেন জহির রায়হান। এই যে কৌশলী অবস্থান, এটা আমরা এর কয়েক বছর আগে আরেকটি উপন্যাসে দেখি, সেটি ছিল শওকত ওসমানের ক্রীতদাসের হাসি। আরব্য রজনীর মতো গল্প বলার ভঙ্গিতে স্বৈরশাসক ও নিপীড়নকারীদের দাঁত-ভাঙা জবাব দিয়েছিলেন শওকত ওসমান। আর চলচ্চিত্রে একই কাজটা বুদ্ধিদীপ্তভাবে করেছেন জহির রায়হান।
পাশাপাশি আগের কাজগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ছবিটা সাধারণ দর্শকদের কাছে যেন উপভোগ্য হয় সেদিকেও দৃষ্টি ছিল তাঁর। এ ছবিতে গল্প বলার এমন অভিনব একটা উপায় জহির রায়হান খুঁজে নিয়েছিলেন, কেউ যদি রাজনৈতিক সচেতনতাকে দূরে সরিয়ে রেখে এ ছবিটি দেখে, তবু সে কোনো বিরক্তি ছাড়াই দারুণভাবে ছবিটি উপভোগ করতে পারে। আর এ কারণেই ছবিটি নিজের সময়কে ছাপিয়ে গিয়ে এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তবে সত্যি কথা হচ্ছে, আড়ালে থাকা রাজনৈতিক ভাষ্যই এ ছবিকে ধ্রুপদী মর্যাদায় উন্নীত করেছে। এই ছবি নিয়ে চিত্রনায়িকা ও স্ত্রী সুচন্দাকে জহির রায়হান বলেছিলেন, ‘আমি এমন একটা ছবি বানাতে চাই যেখানে দেশের কথা থাকবে; থাকবে ভাষা দিবসের কথা। ছবিটা দেখে মানুষ উপলব্ধি করবে আমাদের স্বাধিকার দরকার, কিন্তু আমি সেটা বলতে চাই একটা সুন্দর গল্পের মধ্য দিয়ে।’
এই কথাটুকুই স্পষ্ট করে দেয়, জহির রায়হান মূলত ছবিটা নিছক স্লোগানসর্বস্ব কিছু করে তুলতে চাননি। হ্যাঁ, রাজনৈতিক বিধিনিষেধ কিংবা সীমাবদ্ধতা ছিল। কিন্তু সেটাই সম্ভবত এ ছবিটির জন্য শাপে বর হয়ে এসেছে। আমরা যদি জহির রায়হানের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করি, তবে এ ছবিটি জহির রায়হানের পুরো রাজনৈতিক জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গির চক্রও পূরণ করেছে। অর্থাৎ ভাষা
আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাভাস। সবটাই যেন এ ছবিতে পর্যায়ক্রমিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে তিনি যা বলেছিলেন, ‘সুন্দর গল্পের মধ্য দিয়ে ছবিটা বানানো’, যা সম্ভবত তিনি সব সময় করতে চেয়েছেন। প্রথম চলচ্চিত্রেই যার শুরুটা আমরা দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে কেবলই নান্দনিকতায় গা ভাসিয়ে দেওয়ার মতো মানুষও তিনি ছিলেন না। ফলে দুটোর মাঝামাঝি একটা অবস্থানই হয়তো তিনি খুঁজে নিতে চেয়েছিলেন। যা তিনি খুঁজে পান জীবন থেকে নেয়া-এ এসে। আর এই মিথস্ক্রিয়া আমাদের উপহার দেয় ইতিহাসের অন্যতম সেরা ছবিটি। যার নতুনত্ব ও রেশ এখনো অমলিন।
‘জীবন থেকে নেয়া’র পরই শুরু হয় কঠিন লড়াইয়ের এক বাস্তব গল্পের। মানুষের জীবনে কখনো কখনো এমন সময় আসে যখন কবিতার সৌন্দর্য, গানের সুর, চিত্রকর্মের মাধুর্য কিংবা চলচ্চিত্রের তৈরি করা বিহ্বলতার কোনো আবেদন থাকে না। তখন সব কিছুর কেন্দ্রে এসে দাঁড়ায় কেবল অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। মানবিকতা তখন ধুলোয় লুটাতে থাকে এবং মানুষের কদর্যতা সব মানবিক সীমাকে ভেঙেচুরে দিয়ে আঘাত করে তীব্রভাবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনই একটি সময় ছিল ১৯৭১। যা ইতিহাসের বর্বরতম এবং নৃশংস এক সময়ের দলিলও। ২৬ মার্চ কালরাতে অপারেশন সার্চলাইট দিয়ে শুরু হয় এই নৃশংস অধ্যায়ের। শুরু হয় মানবিকতাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে অবিশ্বাস্য এক গণহত্যার। যার জবাব দিতে অবশ্য দেরি করেনি স্বাধীনতাকামী জনগণ। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। একটি যুদ্ধ মানে কেবল অস্ত্র হাতে লড়াই করা নয়; কিংবা রূপকথাময় এককেন্দ্রিক কোনো বয়ান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আরও অনেক লড়াই। তেমনই একটি লড়াই জহির রায়হান করেছিলেন স্টপ জেনোসাইড দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের অসামান্য এক উদ্যোগ ছিল এটি। একটি দেশের লড়াই এবং তারও পর হয়ে যাওয়া নিকৃষ্টতর নিপীড়নকে ধরে রাখার জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো মাধ্যম আর হতে পারত না। ক্যামেরাকে অস্ত্র বানিয়ে ঠিক সেই কাজটাই করেছেন জহির রায়হান। একটি জাতিগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে একটি প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী কতটা বর্বর হয়ে উঠতে পারে, তা সম্ভবত স্টপ জেনোসাইড না দেখলে উপলব্ধি করা যেত না। প্রথমত, এটি ইতিহাসকে লিপিবদ্ধ করে রাখার একটি প্রক্রিয়া, যার প্রভাব অনেক দূর অবধি বিস্তৃত। এর বাইরে আছে এটির তাৎক্ষণিকতা বা সময়ের প্রয়োজনীয়তাও। তাৎক্ষণিকভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ ধরনের কাজের প্রভাব হয় বিস্ফোরণের মতো। জীবন থেকে নেয়ার ক্ষেত্রেও তেমনটাই হয়েছে। মানুষের ওপর নির্মমতা কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে এবং মানুষ মানবিকতার সমস্ত দেয়াল ভেঙে নিজেকে কতটা বর্বর করে তুলতে পারে, এটি ছিল তার দলিল। এই চলচ্চিত্র বানাতে জহির রায়হানকে যেতে হয়েছিল ভয়ঙ্কর এক সময়ের ভিতর দিয়ে। ছবিটি বানাতে জহির রায়হানকে কতটা সংগ্রাম করতে হয়েছিল, তা উঠেছে আরেক প্রখ্যাত নির্মাতা আলমগীর কবিরের এক লেখায়, ‘ঘরে স্ত্রী সুচন্দা অজ্ঞান। বড় ছেলে অপুও অসুস্থ। জহির ঘরে নেই। স্টুডিওতে। দিন নেই, রাত নেই, ঘুম নেই, স্টপ জেনোসাইড তৈরি করছে। তিনি জানতেন স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রচারই যথেষ্ট নয়। বিশ্বের সব পরাধীন শোষিত মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের একাত্মতা বোঝাতে হবে এ ছবির মাধ্যমে।’ হ্যাঁ, জহির রায়হান তা করতে পেরেছেন। মানুষের কোনো কিছু করতে চাওয়ার অদম্য ইচ্ছা জহির রায়হানকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছে এ কাজটি।
যা আরও কয়েক শ বছর পরও এ দেশের মানুষের ওপর হয়ে যাওয়া এক নারকীয় অধ্যায়ের বিবরণ হয়ে নিজের ভাষাতেই কথা বলবে।
লেখক : চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ও প্রযোজক