বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে গত কয়েক দশকের সাফল্য অস্বীকার করার উপায় নেই। স্বাধীনতার পর খাদ্য ঘাটতির দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে এগিয়েছে। ধান উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাসে কৃষি শুধু একটি উৎপাদন খাত নয়, বরং এটি দেশের সামাজিক স্থিতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত্তি। শিল্প ও সেবা খাত দ্রুত প্রসারিত হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় কৃষির গুরুত্ব এখনো অটুট। দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বড় অংশ সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জাতীয় আয়ের হিসাবেও কৃষির অবদান উল্লেখযোগ্য। কিন্তু বাস্তবতার এক কঠিন দিক হলো- এই খাতের মূল চালিকাশক্তি কৃষকই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করেন। উৎপাদনের ঝুঁকি, বাজারের অনিশ্চয়তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে কৃষি অনেক সময় লাভজনক পেশা হিসেবে টিকে থাকতে পারে না। ফলে কৃষক ক্রমেই অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে পড়ছেন।
বাংলাদেশের নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কৃষিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জোর দিয়ে বলছে। সরকারের প্রথম দিককার সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যেই দেখা যাচ্ছে কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত হলো ক্ষুদ্র কৃষকের ঋণের বোঝা কিছুটা লাঘব করা। সরকার ঘোষণা করেছে, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে। এতে লাখ লাখ ক্ষুদ্র কৃষক নতুন করে স্বস্তির নিশ্বাস নিতে পারবেন। যারা অনেক সময় সামান্য ঋণের চাপে আবার নতুন মৌসুমের চাষে নামতে দ্বিধায় পড়ে যান, তাদের জন্য এই উদ্যোগ হতে পারে নতুন আশার আলো।
এর আগে ১৯৯১-১৯৯৫ এবং ২০০১-২০০৫ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার কৃষিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়। বিশেষ করে ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পর বেগম খালেদা জিয়া পোলট্রি ও মৎস্যশিল্প বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। সরকারের সহযোগিতায় গণমাধ্যমও দারুণ ভূমিকা রাখে। প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে সে সময়কার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী প্রয়াত আবদুল্লাহ আল নোমান কার্যকরী সব প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন।
যতটুকু জানি, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও কৃষির প্রতি যথেষ্ট অনুরুক্ত। মনে আছে, ২০০৪ সালে বন্যার পর কৃষক যেন সহজে বীজ পান, তার ব্যবস্থা করতে তিনি আমার সঙ্গেও কথা বলেছিলেন। সে সময়টাতে আমি আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) লিফ কালার চার্ট (ধানের জমিতে ইউরিয়া সারের মাত্রা নির্ধারণ) নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছিলাম। তিনি কৃষকের মাঝে লিফকালার স্কেল পৌঁছে দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ২০০৪-২০০৫ সালে তিনি যখন সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হলেন, তখন চ্যানেল আই প্রথম সুযোগ পেয়েছিল তার সাক্ষাৎকার নেওয়ার। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন প্রথিতযশা সাংবাদিক, দৈনিক মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী। আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান এবং ছোট্ট কন্যাশিশু আজকের ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। সাক্ষাৎকারটি ধারণ করা হয়েছিল সেই সময়কার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারের পর তারেক রহমানের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘসময় কৃষি বিষয়ে কথা হয়। বুঝতে পারি, কৃষি নিয়ে বিশেষ আগ্রহ আছে তাঁর। মনে পড়ে, এরপর তিনি একবার আমাদের তখনকার চ্যানেল আই কার্যালয় সিদ্ধেশ্বরীর অফিসে এসেছিলেন।
এখন তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। তাঁর নেতৃত্বে নতুন সরকারের কৃষি বিষয়ক কর্মকাণ্ডে আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা হচ্ছে, কৃষিকে শুধু জীবিকা নয়, একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসা ও উদ্যোক্তা খাতে রূপান্তর করার চিন্তা আছে এই সরকারের।
বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নে গত কয়েক দশকের সাফল্য অস্বীকার করার উপায় নেই। স্বাধীনতার পর খাদ্য ঘাটতির দেশ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে এগিয়েছে অনেকখানি। ধান উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। যদিও উৎপাদনের পরিসংখ্যান নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছে। সবজি উৎপাদনেও দেশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবু প্রশ্ন রয়ে যায়, উৎপাদনের এই সাফল্য কি কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছে? বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই তা হয়নি।
কৃষকের প্রধান সংকট উৎপাদনের ঘাটতি নয়, বরং উৎপাদনের পর বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া। ফসল উৎপাদনের পর কৃষক যখন বাজারে যান, তখন তিনি প্রায়ই মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি জটিল নেটওয়ার্কের মুখোমুখি হন। এই মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকের কাছ থেকে কম দামে পণ্য কিনে বাজারে বেশি দামে বিক্রি করে। কৃষক তার শ্রম ও বিনিয়োগের যথাযথ মূল্য পান না। ফলে উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের আয় বাড়ে না। কৃষি খাতের এই কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করলে কৃষির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বাজার ব্যবস্থাপনার সংস্কার তাই কৃষি উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত। প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক কৃষি বাজার কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা এ সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। এসব বাজারে কৃষক সরাসরি তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করার সুযোগ পাবেন। সেখানে থাকবে সংরক্ষণাগার, পরিবহন সুবিধা এবং ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবস্থা। প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব অনেকাংশে কমে আসবে।
বাংলাদেশে কৃষিপণ্যের অপচয় একটি বড় সমস্যা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে উৎপাদিত ফল ও সবজির প্রায় এক-চতুর্থাংশ সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। এই অপচয় শুধু কৃষকের ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতিরও ক্ষতি। কারণ উৎপাদনের জন্য যে শ্রম, জমি ও সম্পদ ব্যবহার করা হয়, তা শেষ পর্যন্ত কাজে লাগে না। যদি আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ এবং সংরক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়, তাহলে এই অপচয়ের বড় অংশ রোধ করা সম্ভব।
পিঁয়াজের উদাহরণ এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ প্রায় নিজের চাহিদা অনুযায়ী পিঁয়াজ উৎপাদন করে। তবু প্রতি বছর পিঁয়াজ আমদানির প্রয়োজন হয়। কারণ উৎপাদনের সময় বাজারে পিঁয়াজের দাম কমে যায় এবং সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় কৃষক দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হন। পরে বাজারে ঘাটতি দেখা দিলে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। যদি পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার থাকত, তাহলে এই পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো যেত।
বাজারকেন্দ্রিক সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার বিষয়টি কৃষকের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় কৃষক বাজারে গিয়ে ন্যায্যমূল্য না পেলে পণ্য ফিরিয়ে আনতে পারেন না। পরিবহন খরচ এবং সংরক্ষণের অভাব তাকে বাধ্য করে কম দামে বিক্রি করতে। যদি বাজারের কাছেই কৃষিপণ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকে, তাহলে কৃষক বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিক্রির সময় নির্ধারণ করতে পারবেন। এতে তার দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে।
কৃষির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থায়ন। কৃষি একটি মৌসুমি পেশা। বীজ, সার, সেচ এবং শ্রমিকের জন্য কৃষকের শুরুতেই বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮ হাজার কোটি টাকা এবং বিতরণ হয়েছে ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। এই ঋণের সুবিধাভোগী কৃষকের সংখ্যা প্রায় ৩৮ লাখ। এর মধ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সংখ্যা প্রায় ২৯ লাখ। তারা প্রায় ২৫ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছেন। এই পরিসংখ্যান দেখায় যে, কৃষি খাতে আর্থিক প্রবাহ ধীরে ধীরে বাড়ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৃষকদের ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি। প্রায়ই মনে করা হয় যে, কৃষিঋণ ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। করোনার মতো কঠিন সময়েও কৃষক তাদের ঋণ পরিশোধে দায়িত্বশীল আচরণ করেছেন। ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে কৃষক ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ পরিশোধ করেছেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই তথ্য প্রমাণ করে যে কৃষক ব্যাংকের অন্যতম বিশ্বস্ত গ্রাহক। অথচ বড় বড় ব্যবসায়ীর ক্ষেত্রে এ চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত।
তবুও কৃষকদের একটি বড় অংশ এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ সুবিধার বাইরে রয়ে গেছেন। ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় জটিল প্রক্রিয়া এবং জামানতের বাধ্যবাধকতা কৃষকদের নিরুৎসাহিত করে। ফলে তারা উচ্চ সুদের এনজিও ঋণ বা স্থানীয় মহাজনের কাছে যেতে বাধ্য হন। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান করা জরুরি। চার শতাংশ বা তার কম সুদে জামানতবিহীন কৃষিঋণ চালু করা গেলে কৃষক অনেক বেশি নিরাপদভাবে উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে পারবেন।
কৃষকের জন্য শস্যগুদাম ঋণ প্রকল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। ফসল কাটার সময় বাজারে পণ্যের সরবরাহ বেশি থাকে এবং দাম কমে যায়। এ সময় কৃষক যদি গুদামে ফসল জমা রেখে তার বিপরীতে ঋণ নিতে পারেন, তাহলে তিনি তৎক্ষণাৎ কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না। পরে যখন বাজারে দাম বাড়বে, তখন তিনি ফসল বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। এতে কৃষকের লাভ বাড়বে এবং বাজারে অস্থিরতাও কমবে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের কৃষির অন্যতম বড় ঝুঁকি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা বা শিলাবৃষ্টিতে অনেক সময় কৃষকের পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে কৃষক এক ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে যান। তাই সর্বজনীন শস্যবিমা চালু করা অত্যন্ত প্রয়োজন। বিমার মাধ্যমে কৃষক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থেকে আংশিক সুরক্ষা পেতে পারেন। যদি বিমার প্রিমিয়ামের বড় অংশ সরকার বহন করে, তাহলে কৃষক এতে অংশ নিতে উৎসাহিত হবেন। কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার এখন একটি বড় প্রয়োজনীয়তা। গ্রামীণ সমাজে শ্রমিকের সংকট এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে যান্ত্রিককরণ দ্রুত বাড়ছে। কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার এবং রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মতো যন্ত্র কৃষি কাজের সময় এবং খরচ উভয়ই কমিয়ে দেয়। সরকার যদি বড় যন্ত্রপাতির পাশাপাশি ক্ষুদ্র কৃষিযন্ত্রে বিশেষ ভর্তুকির ব্যবস্থা করে, তবে প্রকৃত কৃষক লাভবান হবেন।
কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো ড্রোন এবং প্রিসিশন এগ্রিকালচার। ড্রোন ব্যবহার করে সার এবং কীটনাশক প্রয়োগ করলে তা সাশ্রয়ী হয় এবং পরিবেশ দূষণও কম হয়। একই সঙ্গে মাটি পরীক্ষার ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা গেলে কৃষক জানতে পারবেন তার জমির প্রকৃত প্রয়োজন কী।
বাংলাদেশে ইউরিয়া সারের ব্যবহার অনেক বেশি এবং অপচয়ও বেশি। দেশের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ ইউরিয়া আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বড় চাপ পড়ে। সারের অপচয় কমানোর জন্য নতুন প্রযুক্তির প্রয়োজন রয়েছে। ন্যানো ইউরিয়া এ ক্ষেত্রে একটি সম্ভাবনাময় সমাধান হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, অল্প পরিমাণ ন্যানো ইউরিয়া প্রচলিত ইউরিয়ার তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। একই সঙ্গে কৃষিজমির মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে অনেক অঞ্চলের মাটির উর্বরতা কমে গেছে। তাই মাটি পরীক্ষা এবং জৈবসারের ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
কৃষির সঙ্গে প্রাণিসম্পদ খাতের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। পোলট্রি, ডেইরি এবং গবাদিপশু পালন গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে। কিন্তু এই খাত প্রায়ই বাজার অস্থিরতা এবং পশুখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সংকটে পড়ে। পশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় এবং দেশে ভুট্টা ও সয়াবিন উৎপাদনে প্রণোদনা দেওয়া হলে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হতে পারে।
গ্রাম পর্যায়ে ভেটেরিনারি সেবা সম্প্রসারণও গুরুত্বপূর্ণ। মোবাইল ভেটেরিনারি ক্লিনিক চালু করা গেলে খামারিরা দ্রুত চিকিৎসা সেবা পাবেন। এতে পশুর রোগ কমবে এবং উৎপাদন বাড়বে।
বাংলাদেশে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু স্থানীয় উৎপাদন এই চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। ফলে বাজারে গুঁড়া দুধের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে দেশের গুঁড়া দুধের চাহিদার ৯০ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর। এর ফলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে স্থানীয় খামারিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি সমন্বিত দুগ্ধনীতি প্রয়োজন। ভোক্তা পর্যায়ের গুঁড়া দুধ আমদানিতে সুরক্ষামূলক শুল্ক বজায় রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি দুগ্ধশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট পরিমাণ দেশীয় দুধ সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা দেওয়া যেতে পারে। এতে স্থানীয় খামারিরা বাজার পাবেন।
দুগ্ধশিল্পের উন্নয়নে গ্রাম পর্যায়ে দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র এবং কোল্ড চেইন অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। বর্ষা মৌসুমে যখন দুধ বেশি উৎপাদন হয়, তখন তা সংরক্ষণ করে গুঁড়া দুধে রূপান্তর করা গেলে বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে।
কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ মূলত কাঁচা কৃষিপণ্য বিক্রি করে আসছে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি করলে মূল্য সংযোজন অনেক বেশি হয়। দেশের উত্তরাঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকায় বিশেষায়িত কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল গড়ে তোলা যেতে পারে। রপ্তানি বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষককে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী চাষাবাদে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে এবং উত্তরাঞ্চলে খরা বাড়ছে। তাই লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল নতুন জাত উদ্ভাবনে গবেষণা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বিগত সময়ে বেশ কয়েকটি ধানের জাত উদ্ভাবনের কথা বললেও, মাঠের চিত্র ভিন্ন। অনেক কৃষক সেসব ধানের জাত সম্পর্কে ধারণা রাখেন না। অনেক কৃষক বলেন, উৎপাদন আশানুরূপ হয় না।
এ ছাড়া সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমায় বিপুল সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উঠে আসছে। কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন এবং কুয়াকাটা এলাকায় ইতোমধ্যে শৈবাল চাষ শুরু হয়েছে। শৈবাল শুধু পুষ্টিকর খাদ্য নয়, এটি বিভিন্ন শিল্পেও ব্যবহৃত হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্যজীবীদের জন্য শৈবাল চাষ বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। মাছ ধরা নিষিদ্ধের সময় তারা শৈবাল চাষ করে আয় করতে পারেন। এতে নারীর অংশগ্রহণও বাড়ছে।
তবে এই খাতের উন্নয়নের জন্য গবেষণা, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং রপ্তানি বাজার তৈরি করা জরুরি।
কৃষির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে জ্ঞান এবং দক্ষতার ওপর। তাই কৃষি শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে তরুণরা কৃষিকে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে দেখতে শুরু করবেন।
বাংলাদেশের কৃষিতে নারীর অবদানও অসাধারণ এবং অনস্বীকার্য। বীজ সংরক্ষণ থেকে শুরু করে সবজি চাষ, হাঁস-মুরগি পালন এবং ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপে নারীরা যুক্ত। অথচ অনেক সময় তারা সরকারি সহায়তা এবং প্রশিক্ষণের বাইরে থেকে যান। নারীদের সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কৃষক ভর্তুকি বা খয়রাতি সাহায্য চান না। তিনি চান তার শ্রমের মর্যাদা এবং ফসলের ন্যায্যমূল্য। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল ভিত্তি শক্তিশালী করতে হলে কৃষিকে নীতি-নির্ধারণের কেন্দ্রে রাখতে হবে।
একটি কৃষিবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে শুধু কৃষকের জীবনই বদলাবে না, বদলে যাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎও।
বাংলাদেশের কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার কেবল উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নয়, বরং এটি টেকসই উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার। ডিজিটাল প্রযুক্তি, ড্রোন, সোলার পাম্প এবং প্রিসিশন এগ্রিকালচারের মাধ্যমে কৃষক তার উৎপাদন খরচ কমাতে পারবেন এবং পরিবেশও রক্ষা করা সম্ভব হবে। এই প্রযুক্তির বিস্তার হলে শ্রমিক সংকটও আংশিকভাবে পূরণ হবে। কম খরচে উৎপাদন বৃদ্ধি মানে কৃষকের আয় বৃদ্ধি।
ন্যানো প্রযুক্তি বাংলাদেশের কৃষিতে একটি বিপ্লবী দিক খুঁজে দিয়েছে। ইউরিয়া সার, কীটনাশক এবং জৈবসার উৎপাদনে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারে খরচ কমানো সম্ভব। ন্যানো ইউরিয়া প্রচলিত ইউরিয়ার তুলনায় কম পরিমাণে বেশি কার্যকর, যা সারের অপচয় কমায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি কৃষকের জন্য লাভজনক হবে। সরকার ইতোমধ্যে খাল খননের কথা বলেছে। খাল খননের পাশাপাশি বাংলাদেশে সেচব্যবস্থা আধুনিকায়নের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা যায়। সোলার পাম্প ব্যবহারে কৃষককে উৎসাহী করতে হবে। সোলার পাম্পের ব্যবহার বিদ্যুৎ খরচ হ্রাস করে। এছাড়া সোলার পাম্প গ্রিডে সংযুক্ত হলে অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ থাকে, যা কৃষকের আয় বাড়াতে সাহায্য করে।
কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। দেশের উত্তরাঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকায় বিশেষায়িত কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল গড়ে তুললে কাঁচামাল বিক্রির বদলে প্রক্রিয়াজাত পণ্য বিক্রির সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। এতে ফসলের মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি পাবে এবং রপ্তানি আয় বাড়বে।
রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চাষাবাদ করতে হবে। কৃষকদের GAP (Good Agricultural Practice) অনুযায়ী প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের আম, লিচু, ইলিশ ও সবজি আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিং করার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। কৃষি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বাংলাদেশের কৃষির জন্য অপরিহার্য। প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে তরুণরা কৃষিকে লাভজনক ব্যবসা হিসেবে দেখবে। কৃষি এখন কেবল চাষাবাদ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবসা। বীজ উৎপাদন, নার্সারি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, লজিস্টিক এবং অনলাইন বিপণন সমন্বিত শিক্ষার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে কৃষিতে আগ্রহী করে তোলা সম্ভব।
দেশের প্রধান প্রধান কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় ফসলের জন্য ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ বা প্রাইস কমিশন গঠন অত্যন্ত জরুরি। এ ছাড়াও দেশের কৃষকের ফসল মৌসুমে ওই ফসল আমদানি নিরুৎসাহিত করতে হবে, যেন কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান।
লেখক : মিডিয়া ব্যক্তিত্ব